ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ১১ জুন ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ২৮ ১৪৩৩ || ২৫ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

বঙ্কিমচন্দ্র : সাহিত্যের ফেরারি

দীপংকর গৌতম || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৬:৫৪, ৮ এপ্রিল ২০১৫   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
বঙ্কিমচন্দ্র : সাহিত্যের ফেরারি

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

দীপংকর গৌতম : বাংলা সাহিত্যের সম্রাট হিসেবে বঙ্কিমচন্দ্রের অবস্থান ছোট করে দেখার উপায় নেই। প্রকৃত অর্থে বাংলা উপন্যাসের চিরায়ত ধারা যার হাতে পূর্ণতা পেয়েছিল তিনিই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ইংরেজি ভাষায় দক্ষ বঙ্কিমচন্দ্র ‘Rajmohan`s Wife’ নামে ইংরেজিতে একটি উপন্যাস রচনা করেছিলেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে `দুর্গেশনন্দিনী` দিয়েই তার সাহিত্য জীবনের সূচনা। এই উপন্যাস দিয়েই বঙ্কিমচন্দ্র নতুন এক দিগন্ত খুলে দিলেন। বাঙালির রোমান্টিক সত্তার এক নতুন জাগরণ ঘটল তার উপন্যাসে। বঙ্কিমচন্দ্রের এমন তিনটি উপন্যাস হলো, `দুর্গেশনন্দিনী`, `কপালকুণ্ডলা` এবং `মৃণালিনী`। এরপর বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতিভার স্ফূরণ দেখা গেল ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার প্রকাশনা ও সম্পাদনার মাধ্যমে। এই মাসিকপত্রে তিনি পরপর `বিষবৃক্ষ`, `ইন্দিরা`, `যুগলাঙ্গুরীয়`, `চন্দ্রশেখর` ইত্যাদি উপন্যাসের পাশাপাশি নানান বিষয়ে প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন। এগুলোর মধ্যে `লোকরহস্য`, `বিজ্ঞানরহস্য`, `কমলাকান্তের দপ্তর`, `সাম্য` প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।  

বঙ্গদর্শনের আবির্ভাব বাংলা সাহিত্যে যুগান্তর এনেছিল। সম্পাদক বঙ্কিমচন্দ্রের বিশিষ্ট অবদান হলো প্রবন্ধ ও সমালোচনা সাহিত্যের বিকাশ ও বিস্তার। দুই বছর বন্ধ থাকার পর সঞ্জীবচন্দ্রের সম্পাদনায় ‘বঙ্গদর্শন’ পুনরায় প্রকাশিত হয়। `রাধারাণী`, `রজনী`, `কৃষ্ণকান্তের উইল` এই যুগের রচনা। বাংলা উপন্যাসের সূত্রপাত ও এপিকধর্মী বাংলা উপন্যাসের জনক হলেও তিনি সমালোচকদের কাছে আজও সমালোচিত। আজও তাকে সাম্প্রদায়িকতার দোষে দুষ্ট করা হয়। এ জন্য  অনেকে সংস্কৃত শব্দের অতি ব্যবহারকেও এককভাবে দায়ী বলে মনে করেন।অথচ এই বঙ্কিমচন্দ্রই ‘সাম্য’ রচনা করেছিলেন। যিনি সে সময়ে এমন একটি বই রচনা করেছিলেন তিনি সাম্প্রদায়িক হন কি করে? ‘যবন’, ‘ন্যাড়া’ এ শব্দগুলো যদি উপন্যাসের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে হয় তাহলে তিনি সেই দোষে ফেরারী হবেন কেন?

ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাসগুলোতেও তাকে অনেক সমালোচক খাটো করার চেষ্টা করেন। তার ‘সীতারাম’ নিয়ে বহু কথা প্রচলিত আছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, উপন্যাস আর ইতিহাসের বই এক নয়। বঙ্কিমের সীমাবদ্ধতা তার উপন্যাসের চরিত্রে। তার চরিত্র বড়ও হয়নি, ছোটও হয়নি- বামুন রয়ে গেছে। এত বড় ঔপন্যাসিকের জন্য এটা কোন সংকট নয়। এর প্রমাণ বঙ্কিম চর্চা কমেনি বরং সময়ের সঙ্গে বাড়ছে।‘বঙ্কিমচন্দ্র সাম্প্রদায়িক’ যারা বলেন তারা কতোটা বঙ্কিম পাঠ করেছেন তাও বিবেচ্য বিষয়।

বঙ্কিমচন্দ্রের মধ্যযুগের রচনায় দেখা যায় সৌন্দর্য ও লোকশিক্ষার মিলন। শেষ যুগে লোকশিক্ষার প্রাধান্য। প্রতিভার শেষ ধাপে প্রকাশিত পত্রিকা `নবজীবন` ও `প্রচার`। এই যুগের প্রধান উপন্যাস `রাজসিংহ`, `আনন্দমঠ ` `দেবী চৌধুরাণী`, `সীতারাম`। `দেবী চৌধুরাণী` আংশিকভাবে বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত হয়। `সীতারাম` প্রচারে প্রকাশিত হয়। তার অনেক উপন্যাসই তিনি বারবার নতুনভাবে লিখেছেন বা পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করেছেন। এর দৃষ্টান্ত হলো `ইন্দিরা`, `রাজসিংহ` ও `কৃষ্ণকান্তের উইল`।

বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতিভার শেষ পর্যায় পূর্ণভাবে প্রকাশ পায় স্বাদেশিকতা ও অনুশীলন ধর্মের ব্যাখ্যার মাধ্যমে। `কমলাকান্তের দপ্তর’র নায়ক নেশাখোর কমলাকান্তের মুখে মাতৃপ্রেমের প্রথম প্রকাশ `আনন্দমঠ’র বন্দেমাতরম মন্ত্রে যেন পূর্ণ প্রতিষ্ঠা পেল। `অনুশীলন` তার ধর্মমূলক প্রবন্ধ। এ ধরনের প্রবন্ধ তিনি একাধিক লিখেছেন। ধর্মের আদর্শ সম্বন্ধে এক প্রবন্ধে লিখেছেন : ‘সকল প্রকার মানসিক বৃত্তির সম্যক অনুশীলন, সম্যক স্ফুর্তি ও যথোচিত উন্নতি ও বিশুদ্ধিই মনুষ্য জীবনের উদ্দেশ্য’। এখানে বঙ্কিমচন্দ্র জন স্টুয়ার্ট মিলের শিষ্য ও মহাভারতের শ্রীকৃষ্ণের অনুগামী। শ্রীকৃষ্ণই অনুশীলন ধর্মের আদর্শ। `কৃষ্ণচিত্র` প্রথমে ধারাবাহিকভাবে ছাপা হয় প্রচারে।

বঙ্কিমচন্দ্রের প্রায় সব উপন্যাসই ইংরেজি, জার্মান, হিন্দী, কানাড়া, তেলেগু প্রভৃতি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। তার উপন্যাসগুলোর নাট্যরূপ সাফল্যের সঙ্গে মঞ্চে অভিনীত ও সিনেমায় রূপায়িত হয়েছে। উপন্যাসগুলোর নাটকীয়তা ও রোমান্টিকতা সাফল্যের একটা কারণ। ঐতিহাসিক উপন্যাসের বিস্তৃত আঙিনায় বাঙালির রোমান্টিক মনকে প্রথমে মুক্তি দিয়েছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। ভাষা ও উপন্যাসের কাঠামো তৈরির বিষয়ে তিনি পথ দেখিয়েছিলেন। দেশের রাষ্ট্রীয়, ধর্মীয়, সামাজিক ও শিক্ষামূলক উন্নতির সব রকম প্রয়াসে তিনি অবিরাম লিখেছেন। `আনন্দমঠ’র বন্দেমাতরম মন্ত্র ভারতবর্ষে অপূর্ব দেশপ্রীতির উদ্ভব ঘটিয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র কেবলমাত্র সাহিত্যিক বা লেখক নন, উপরন্তু তিনি যুগস্রষ্টা। ঐতিহাসিক, রোমান্টিক, পারিবারিক- এই তিন ধারায় উৎসারিত বঙ্কিমচন্দ্রের আখ্যানগুলোর সমসাময়িক ও পরবর্তী সাহিত্য ও জীবনের ওপর অপরিসীম প্রভাব বিস্তার করেছে। রাসভারী, গম্ভীর লোক হলেও বন্ধুবৎসলতার গুণে সুধীবৃন্দের সমাবেশে উন্নত রুচি, পরিচ্ছন্ন, সুদর্শন বঙ্কিমচন্দ্র প্রতিভার দীপ্তচ্ছটায় বাংলা সাহিত্যের আকাশ সমুজ্জ্বল রেখেছিলেন।

১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জুন চব্বিশ পরগণার অন্তর্গত কাঁঠালপাড়া গ্রামে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় জন্মগ্রহণ করেন। বঙ্কিমচন্দ্রের বাবা যাদবচন্দ্র ঐ বছর মেদিনীপুরে ডেপুটিতে কলেক্টর পদে উন্নীত হয়েছিলেন। বাড়িতেই গ্রাম্য পাঠশালায় গুরুর কাছে কয়েক মাস লেখাপড়ার পরে বঙ্কিমচন্দ্র বাবার কর্মস্থলে গিয়ে ইংরেজি স্কুলে ভর্তি হন। পরে তিনি কাঁঠালপাড়ায় এসে হুগলি কলেজে ভর্তি হন। সে বছর তার বিয়ে হয়। ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে প্রথমা স্ত্রী মারা গেলে তিনি পুনরায় বিয়ে করেন। বঙ্কিমচন্দ্র অপুত্রক ছিলেন, তার তিনটি কন্যাসন্তান ছিল। ছাত্রজীবনে বঙ্কিমচন্দ্রের মেধার পরিচয় পাওয়া যায়। কাঁঠালপাড়ায় চতুষ্পাঠীতে তিনি সংস্কৃত নিয়ে পড়াশুনা করেন,  সঙ্গে বাংলা ভাষার চর্চাও করতেন। ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি আইন পড়বার জন্য প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। আইন পড়া শেষ হওয়ার আগেই তিনি পেশাজীবনে প্রবেশ করেন।

১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে বঙ্কিমচন্দ্র নেঁগুয়ায় (কাঁথি) বদলি হন। এখানেই `কপালকুণ্ডলা` কাহিনির উৎপত্তি। সে বছরই তাকে  খুলনা বদলি করা হয়। খুলনার মহকুমা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে তিনি শক্ত হাতে নীলকর সাহেবদের দৌরাত্ম দমন করেছিলেন। কর্মক্ষেত্রে তিনি ন্যায়নিষ্ঠ, নির্ভীক, কর্তব্যপরায়ণ, সুযোগ্য শাসক ও বিচারক ছিলেন। ইংরেজ সরকার তাকে শেষজীবনে রায়বাহাদুর এবং সিআইই উপাধিতে ভূষিত করেন। তেত্রিশ বছর সরকারি চাকরি করার পর ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দের ১৪ সেপ্টেম্বর বঙ্কিমচন্দ্র অবসর গ্রহণ করেন। শেষ জীবন তিনি কলকাতায় নিজ বাড়িতে কাটিয়েছেন। সেখানেই বহুমুত্র রোগে ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দের ৮ এপ্রিল তার মৃত্যু হয়।

বঙ্কিমচন্দ্রের জীবন দীর্ঘ নয়। এ সময়ের মধ্যে তার সাহিত্য সাধনা বিস্ময়কর। হুগলি কলেজে ছাত্রজীবনে তিনি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের রচনার আদর্শে `সংবাদ প্রভাকর’ এবং ‘সংবাদ সাধুরঞ্জন’-এ গদ্য, পদ্য লিখতেন। ৪২ বছরের সাহিত্যসাধনা তার ছাত্রজীবন, কর্মজীবন, শেষজীবন পর্যন্ত ব্যাপ্ত ছিল। ১৮৯৪ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে তিনি শেষ লেখা লেখেন। বঙ্কিমচন্দ্রের প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ৩৪। ১৫ বছর বয়সে তিনি দুটি ছোট কাব্য রচনা করেন। তিন বছর পরে  কাব্য দুটি ‘ললিতা-পুরাকালিক গল্প তথা মানস` নামে প্রকাশিত হয়।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৮ এপ্রিল ২০১৫/তাপস রায়

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়