RisingBD Online Bangla News Portal

ঢাকা     রোববার   ০১ নভেম্বর ২০২০ ||  কার্তিক ১৭ ১৪২৭ ||  ১৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

রশীদ হায়দারের মৃত্যু যে প্রশ্নের জন্ম দিয়ে গেলো

মনি হায়দার || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:২৫, ১৬ অক্টোবর ২০২০   আপডেট: ১৭:৫৫, ১৬ অক্টোবর ২০২০
রশীদ হায়দারের মৃত্যু যে প্রশ্নের জন্ম দিয়ে গেলো

রশীদ হায়দার (১৯৪১-২০২০), আলোকচিত্রী: শাকুর মজিদ

ফেইসবুকে, টেলিভিশনের স্ক্রলে কথাসাহিত্যিক রশীদ হায়দারের মৃত্যুসংবাদ পেলাম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় একুশে পদক ও বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত এই লেখকের প্রয়াণে শোক জানিয়েছেন। অস্বীকার করার উপায় নেই, কথাসাহিত্যিক রশীদ হায়দার পরিণত বয়সে প্রয়াত হয়েছেন। এখন করোনাকাল, মানুষ নিজেকে আটকে রেখেছে ঘরে। ফলে এই সময়ে জমায়েত হওয়ার সুযোগ নেই। তবুও বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে বিদায় শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে; রশীদ হায়দারের কফিনের উপর। খুব বেদনার সঙ্গে দেখলাম, একটি টিভি চ্যানেলের স্ক্রলে নামটা লেখা: ‘রশিদ হায়দার’। অথচ সারা জীবন তিনি ‘রশীদ হায়দার’ নামেই লিখেছেন। এসব কি দেখার কেউ নেই?

গত কয়েক মাসে আমাদের দেশের বেশ ক’জন কীর্তিমান প্রয়াত হয়েছেন। বয়স হয়েছে, বয়স হলে জরাগ্রস্ত হলে, মানুষ মারা যাবে- স্বাভাবিক ঘটনা। সেই ঘটনায় শোক থাকলেও সান্ত্বনা থাকে। কিন্তু প্রশ্ন অন্যখানে, এই যে রশীদ হায়দার বর্ষীয়ান হয়ে অনেক বছর বাসায় ছিলেন, লিখতে পারছিলেন না, হাত ঠিকমতো কাজ করছিল না, উজ্জ্বল বর্ণের মানুষটি ক্রমে ক্রমে চোখের সামনে অচল হয়ে যাচ্ছিলেন অথচ আমরা কেবল চেয়ে চেয়ে দেখলাম। অনেক বিদগ্ধজনের মতো মুক্তিযুদ্ধের স্রোতে প্রবহমান একজন অমিততেজী রশীদ হায়দার মারা গেলেন- আমাদের করার কিছু ছিল না। সত্যিই কি করার কিছু ছিল না?

রশীদ হায়দার ৭০টি পুস্তক রচনা করেছেন। গল্প, উপন্যাস, শিশুসাহিত্য, প্রবন্ধ, অনুবাদ, নাটক- সাহিত্যর সব শাখায় সরব ছিলেন। কবিতা, ছাড়া প্রচুর লিখেছেন। আজীবন ছিলেন মাটি, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর প্রতি মুক্তপ্রাণ। ১৯৮৮ সালে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ড. আবু হেনা মোস্তফা কামালের  নির্দেশনায় তিনি শুরু করলেন ‘স্মৃতি ৭১’ সম্পাদনার মহৎ কাজ। একে একে ১৩টি খণ্ড সম্পাদনা করেছেন মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিনীত প্রার্থনায়। প্রয়াণের পর হয়তো কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে একটা স্মারক বই প্রকাশিত হবে। আমার প্রশ্ন- চার রঙে সুদৃশ্য অনেক বড় ঢাউস আকারে বইটি বের হলে, রশীদ হায়দারের লাভটা কী? মরে যাবার আগে সেই প্রতিষ্ঠানগুলো একবারও উদ্যোগ নিতে পারলো না- মান্যবর রশীদ হায়দার আপনার সারা জীবনের সৃজনকর্ম নিয়ে ব্যাপক আলোচনা পর্যালোচনার প্রবন্ধে, লেখায়, স্মৃতিভাষ্যে সমৃদ্ধ একটি সন্মাননা স্মারক প্রকাশ করতে চাই বা করছি? এই স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ উপলক্ষ্যে একটা সংবর্ধনারও আয়োজন করছি? অনুগ্রহ করে আপনি সদয় সম্মতি দিন আমাদের এই আয়োজনে...।

আহা! রশীদ হায়দারের শরীরের জরা ব্যাধি মুহূর্তে বিলীন হয়ে যেতো। কিন্তু কে বিড়ালের গলায় বাঁধবে ঘণ্টা? আমাদের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো জীবিত সৃজনশীলদের খুব ভয় পায় অথবা ঘৃণা করে। নইলে সামান্য সন্মান দেখাবে না কেনো? এই প্রতিষ্ঠানগুলো মৃত্য মানুষদের খুব ভালোবাসে। মারা যাবার পর স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করে। জন্ম বা মৃত্যদিনে আলোচনা সভার আয়োজন করে। অনাদীকাল থেকে একই প্রকারের প্রথায় আবদ্ধ থাকে। নতুন কোনো ভাবনা বা দিশা নিয়ে এগিয়ে আসে না। রশীদ হায়দারের প্রয়াণের পর তাঁর সমাধি ফুলে ফুলে ভরিয়ে দিলে রশীদ হায়দারের কী লাভ? তিনি কি কবর থেকে উঠে দাঁড়াবেন? সবাইকে স্বাগত জানাবেন? সভ্যতা সমাজ তো ক্রমাগত সৃষ্টিতে এগিয়ে যায়। কিন্তু আমরা পিছিয়ে যাই। দেশের পত্রিকাগুলোও অসম্ভব নির্লিপ্ত। রশীদ প্রয়াত হবার পর আমার কাছে তিনটা পত্রিকা থেকে লেখার আহ্বান এসেছে।  কিন্তু এই পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদকেরাও অবাক নির্লিপ্ত বাংলা সাহিত্যের লিজেন্ডদের সম্পর্কে। কেবল জেগে ওঠে প্রয়াণের পর। আবার যখন নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ঘোষিত হয় আমাদের সম্পাদকেরা ঘুমুতে পারেন না। নোবেল পুরস্কারজয়ীর ঠিকুজি বের করে ফেলেন। অনেক লেখা পড়লে মনে হয়, এই লোক যে নোবেল পাবেন, আমাদের সাহিত্য সম্পাদক জানতেন। এখানেই শেষ নয়। প্রতিবছর বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়া লেখকদের নাম ঘোষণা করার পর এইসব সাহিত্য সম্পাদকদের অবাক নীরবতা দেখে মনে হয়, এরা কখনোই পুরস্কার পাওয়া লেখকদের নাম শোনেননি,  লেখা পড়া তো অনেক পরের ঘটনা।  প্রশ্ন জাগে, আমরা কি তাহলে অপেক্ষা করতে থাকি মৃত্যুর জন্য? বেঁচে থাকার সময়ে আমাদের কিছু করণীয় নেই?

রশীদ হায়দার মৃদুভাষী কিন্তু লক্ষ্যভেদী ছিলেন। কথার তীরে অনেককে ধরাশায়ী করতেন। আবার নির্মল হাসিতে ছিলেন অনবদ্য। রশীদ হায়দারকে অনেক সময় মনে হতো কোনো রাজকীয় বংশের শেষ প্রতিনিধি। উজ্জ্বল রঙের মানুষটির সাদা রঙের বাহারী একদিকে হেলে পড়া চুলের সৌন্দর্য দুত্যি ছড়িয়ে রাখে মাথার চারপাশে। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, চুলের এমন বাহার দেখে কেউ প্রেম নিবেদন করেনি?
বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে উত্তরে বলেছিলেন, এই প্রশ্ন আমাকে কেউ করেনি। তুমি করলে কোন সাহসে?
আপনি কথাসাহিত্যিক। কথাসাহিত্যিকেরা তো উদার হন- সেই জায়গা থেকে প্রশ্ন আমার।
শোনো, কেউ যে কিছু বলেনি এমন নয়, কিন্তু আর বলা যাবে না। কারণ সে কারো সংসারের সুগৃহিণী। কারো সংসার ভাঙুক নিশ্চয়ই তুমি চাও না।

এই সংলাপ রচিত হয়েছিল শিল্পবাড়িতে। রশীদ হায়দারের সঙ্গে সাংগঠনিকভাবে কাজ করেছি বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে; কয়েক বছর আগে। আমি শিশু একাডেমিতে মুক্তিযুদ্ধের কিশোর গল্প সম্পাদনার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। ওরা প্রস্তাব গহণ করলেও এককভাবে আমাকে সম্পাদনার দায়িত্ব দেয়নি। একটা সম্পাদনা পরিষদ গঠন করেছিলো। সেই পরিষদে ছিলাম আমি, রশীদ হায়দার আর আহমাদ মাযহার। তিনি আমাদের চেয়ে অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ, তাই আমাদের নানা আবদার সামলাতেন। তখনই দেখেছি, রশীদ হায়দারের কাজের ধরন। তিনি চাইতেন, কারো গল্প যাতে বাদ না যায়। বিশেষ করে রাহাত খানের গল্প। আমাকে বারবার তাগাদা দিতেন রাহাত খানের গল্পের ব্যাপারে। আমি যতোই বলি, রাহাত ভাইয়ের সঙ্গে ফোনে আলাপ হয়েছে, তিনি লিখছেন। দেবেন আমাদের গল্প। রশীদ হাযদার কেমন একটু সন্দিহান হয়ে বলতেন, রাহাত ভাইয়ের গল্প আদায় করার দায়িত্ব তোমার।

বাংলাদেশ শিশু একাডেমি থেকে মুক্তিযুদ্ধের কিশোর গল্প বইটি বের হতে প্রায় এক বছর লেগেছিল। প্রায় পঞ্চাশটা গল্প নিয়ে ঢাউস আকারের বিশাল বই- মুক্তিযুদ্ধের কিশোর গল্প। প্রতিটি গল্পে ইলাস্ট্রেশন ছিল, প্রুফ দেখার ঝামেলা ছিল। বইটিকে কেন্দ্র করে আমরা বছরে চার থেকে পাঁচবার শিশু একাডেমির মিলনায়তনে মিলিত হয়েছিলাম; বৈঠকে। বিস্ময়কর ঘটনা, বয়োজ্যেষ্ঠ কথাশিল্পী রশীদ হায়দার একবারও দেরী করে আসেননি। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন সময়ের প্রতি নিষ্ঠা। বইটি যখন প্রকাশিত হলো, একটা অনুষ্ঠানের মধ্যে লেখকদের সন্মানীসহ বই দেওয়ার ব্যবস্থা করলো শিশু একাডেমি। আমি চেয়েছিলাম, গল্পকারদের নিয়ে একটা ঘরোয়া অনুষ্ঠানের মধ্যে সন্মানী দিতে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ অন্য একটা অনুষ্ঠানের সঙ্গে মিলিয়ে করায় আমি খুব রেগে গিয়েছিলাম। রশীদ ভাইয়ের কাছে এ বিষয়ে অনুযোগ করলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘এই দেশটা মানুষে চালায় না, চালায় ভূতে। ভূতে কি মানুষকে বা লেখককে সন্মান দিতে জানে? সুতরাং চুপ থাকো। মেনে নাও।’ তিনি সামনে আর বিকল্প কোনো উপমা খুঁজে পাননি। সেদিন না বুঝলে, আজ বুঝি রশীদ হায়দার জীবনের যাত্রায় যে বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন, সেই অভিজ্ঞতাও খানিকটা এই রকম ছিল।

বাবা, আমাদের শিল্প সাহিত্যের উপেক্ষিত চরিত্র। বাবাকে নিয়ে গল্প খুব কম গল্পকারই লিখেছেন। শিল্পবাড়ি অনুষ্ঠানে যখন জিজ্ঞেস করলাম, বাবা সিরিজের গল্পগুলোর চরিত্র কী সত্যি আপনার বাবার?
পুরোটা নয়, তিনি বললেন, প্রথম গল্পটার মধ্যে আমার নিজের বাবা ছিলেন। কিন্ত যখন আরও লিখতে শুরু করলাম, তখন আমার এক চাচা হাবিবুর রহমান ঢুকে গেলেন বাবার চরিত্রের মধ্যে। চাচা ছিলেন শৈশবে আমার হিরো। তিনি কলকাতা যেতেন মঞ্চের নাটক দেখতে। বাবা গল্পের সিরিজে বাবাও আছেন, কিন্তু ওই চাচাই বেশি। আর হ্যাঁ, একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ এনেছো, বাবা সমাজে, রাষ্ট্রে খুব উপেক্ষিত চরিত্র। বাবা হওয়ার আগ পর্যন্ত বুঝিনি। বাবা হওয়ার পর সন্তানের আবদার পূরণ করার অক্ষমতা থেকে বুঝতে পারি, বাবার সংসারে বাবা থেকেও থাকেন না, যদি না...।

রশীদ হায়দারকে শিল্পবাড়িতে আরেকটি কঠিন প্রশ্ন করেছিলাম- আপনি একাত্তরের এই বাংলার তরুণ, লেখক আপনি। মুক্তিযুদ্ধে জাননি কেনো?
তোমার এই প্রশ্ন করার রাইট আছে। তিনি প্রমিত উচ্চারণে শরীর সিটে এলিয়ে দিয়ে দুঃখ ভারাক্রান্ত গলায় বলছিলেন, সবাই কি যুদ্ধে পারে? হ্যাঁ সেই সময়, যখন সোনার বাংলাকে খুবলে খাচ্ছিল শকুনেরা, শিয়ালেরা, ক্ষুধার্থ বাঘেরা, তখন আমার উচিত ছিল প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া। কিন্তু সংসারের মায়া আর নিজের মানসিক দুর্বলতার জন্য যেতে পারিনি। কিন্তু পাকিস্তানি বর্বর আর্মী আর এ দেশীয় রাজাকারদের কারণে নিজ ভূমেও যে খুব শান্তিতে ছিলাম- এ কথা মনে করার কারণ নেই। হাতে প্রাণটা নিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছি। তবে এই বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু আমার ঠিকানা। আর লেখার মধ্যে দিয়ে আমি চেষ্টা করেছি, মুক্তিযুদ্ধের আখ্যান তুলে ধরার। সেই প্রচেষ্টা আমার আমৃত্যু থাকবে।

রশীদ হায়দার কথা রেখেছেন। তিনি দুই হাতে নয়, সহস্র হাতে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ নিয়ে লিখেছেন গল্প, উপন্যাস। সম্পাদনা করেছেন অনন্য বই- ‘স্মৃতি ৭১’। মুক্তিযুদ্ধের শহীদ পরিবারের সদস্য, বন্ধু, স্ত্রী, সহকর্মীরা লিখেছেন শহীদদের হৃদস্পন্দনে, গভীর মমতায়। সেই লেখা  জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ আজ।

‘নষ্ট জোছনা’ এবং ‘এ কোন অরণ্য’ রশীদ হায়দারের মুক্তিযুদ্ধের অনবদ্য দুটি উপন্যাস। যদিও ছোট কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চিত্র অঙ্কনে কথাশিল্পী রশীদ হায়দার ভয়ঙ্কর জায়গায় নিয়ে যান বাংলাদেশকে। জোছনা তো সুন্দর, পবিত্র। সেই জোছনা নষ্ট কেনো?
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি আর্মীরা বাংলাদেশ ও বাঙালির উপর যে পাশবিক নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল তারই অসামান্য উপস্থাপন ‘নষ্ট  জোছনা’। মুক্তিযোদ্ধারা কি রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যথাযথ সন্মান পেয়েছিল? যদি না পেয়ে থাকে, সেই দেশের জোছনা তো নষ্টই হবে; পবিত্র আর সুন্দর থাকে কী করে?

রুবী ভালোবেসেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কামাল আহমেদকে। কিন্তু ২৫ শে মার্চ রাতের পর থেকে তার খবর নেই। যুদ্ধে চলে যায় রুবীর মামা দুলু। দুলুর চার বন্ধু। চারজন মৌজ করার জন্য আসে দূর সর্ম্পকের ভাগ্নে পাশার সঙ্গে শীতলক্ষার তীরে; একটা বাংলোয়। আকণ্ঠ মদ পান করার পর, পাশা আর আওয়াল মুক্তিযোদ্ধা চারজনকে নিয়ে বের হয় খোলা জায়গায়, নদীর পারে। ওরা আনন্দে নাচতে থাকে। নাচতে নাচতে দেখতে পায় বারান্দায় এক নারীর ছায়ামূর্তি।
কে এই ছায়ামূর্তি?
‘নষ্ট জোছনা’র শেষ প্যারায় রশীদ হায়দার লিখেছেন: ‘প্রখর চাঁদের আলোয় নারীমূর্তির চোখমুখের প্রতিটি রেখা দেখা যায়। দুলু চমকে উঠে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে সেই নারীর চোখের দিকে তাকিয়ে দেখতে পায়, সেখানে ক্রোধ আর ঘৃণা প্রকট হয়ে তাদের নিঃশেষ করে দিচ্ছে।
পাশা বললো, চিনতে পারেন? জানেন কি না জানিনে, আমিই ফোন করে আনিয়েছিলাম। আফটার অল আমার বোজোম ফ্রেন্ডের প্রতি আমার একটা কর্তব্য আছে। ঠিক বলিনি?
স্খলিতপায়ে দুলু এগিয়ে যায় রুবীর দিকে। কয়েক হাত পেছনে সরে গিয়ে রুবী স্পষ্টভাবে দুলুর দিকে তাকিয়ে রইলো। স্বচ্ছ চাঁদের আলোয় দুলু স্পষ্ট দেখলো রুবীর চোখের মণি কোটর থেকে বেরিয়ে আসছে। দেখলো সেই চোখের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় লেখা আছে- মামা সুস্থ হও, এখনো সময় আছে। দোহাই তোমার, জেগে ওঠো।’

রশীদ হায়দারের উপন্যাসের চরিত্র নয়, তিনি নিজেই লিখেছেন- আমাদের জেগে উঠবার জন্য। কিন্তু আমরা কি জাগছি? একাত্তরের পরে, বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে, আমরা গভীর ঘুমে ঘুমিয়েছিলাম। এখনও ঘুমাচ্ছি। চারপাশে যেভাবে অপধর্মের জিকির বাড়ছে, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। আমাদের এখনই দাঁড়ানোর সময়, প্রতিরোধের সময়।

এই লেখাটা লিখলাম বাংলা কথাসাহিত্যের অন্যতম কুশীলব রশীদ হায়দারকে নিয়ে। কিন্তু কেনো তিনি জীবিত থাকতে লিখলাম না? কিংবা সাহিত্য সম্পাদক লেখা চাইলো না? তাহলে আমরা কি জীবিত থাকতে কাউকে সন্মান, শ্রদ্ধা জানাবো না? আমরা অপেক্ষা করছি মৃত্যুর?
প্রিয় কথাকার রশীদ হায়দার, মার্জনা করবেন আমাদের এই দীনতার, এই অক্ষমতার। আর আপনি প্রয়াত হননি, আপনি জেগে আছেন, জেগে থাকবেন আপনার লেখায়, এই বাংলায়।

ঢাকা/তারা

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়