ঢাকা     শনিবার   ০৪ এপ্রিল ২০২৬ ||  চৈত্র ২২ ১৪৩২ || ১৬ শাওয়াল ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

ছোটগল্প

গোরকুমারী

আনিফ রুবেদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:১৩, ৪ এপ্রিল ২০২৬  
গোরকুমারী


চরম আকারের মাথাব্যথা মাথা চেপে ধরে থাকে আমার। পুরো মাথা এমন ভারী থাকে আর চনচন করে যে নাড়াতে পারি না। মাথাব্যথার থাবার ভেতর থাকার সময় একটা কথাই শুধু মনে হতে থাকে, মরণের মতো সুখ আর কিছুতে নেই; মরণ নিয়ে শুয়ে থাকার মতো আরাম আর কিছুতে নেই; মরে গেলে মাথাব্যথা থাকবে না, এর চেয়ে শান্তিস্তান আর কী আছে?

যখন ব্যথা ওঠে বেদনাতে চোখ দিয়ে পানি ঠেলে বের হয়ে আসে। মরণ আসে না। সাপের মতো বাতাস নাকের ভেতর দিয়ে ঢোকে আর বেরোয়। মাথাব্যথা মাথার ভেতর হাতুড়ি পেটাতে থাকে; মগজ আর চোখ চটকাতে থাকে ময়দার মতো। কোনোভাবেই আটকাতে পারি না। অস্থিরবিস্থির করে তোলে আমাকে; মরণোন্মুখ করে তোলে আমাকে।

‘মাথা ব্যথা করলে কপালে গোরস্থানের মাটি লাগাতে হয়’— স্বপ্নের ভেতর আমার দাদি একথা বলে দিয়েই খালাস; দাদির টিকিটিও আর দেখা যায় না। সময়ের গায়ে রাত লেগে থাকতেই আমার ঘুম ভেঙে যায়। কিছুক্ষণ ঘুম জোড়া লাগানোর জন্য চেষ্টা করি, জোড়া লাগে না; স্বপন জোড়া লাগানোর চেষ্টা করি, জোড়া লাগে না। ভাঙা ঘুম জোড়া লাগানোর কোনো আঠা নেই; স্বপন লাগানোর কোনো আঠা নেই।

বিছানার ধারে ঘুমভাঙা শরীর নিয়ে অনেকক্ষণ বসে থাকি আর অস্পষ্ট স্বপনের গায়ের রেখা স্পষ্ট করে বের করার চেষ্টা করি। রেখা সহজে স্পষ্ট হতে চায় না। স্বপনের ভেতর দাদি আরও কিছু বলেছে কিনা তা মনে করার জন্য আমি আমার ভেতরকে চাপ দিই; স্মৃতিঘরে ঢুকে বাতি জ্বালানোর চেষ্টা করি। বাতি জ্বলে না। আমার স্মৃতিসংবহনতন্ত্র বিকল হয়ে থাকে; স্বপনটাকে স্পষ্টভাবে দেখতে পাই না। মগজকে বেশি চাপ দেওয়ার ফলে লেইয়ের মতো স্বপনের শরীর গড়িয়ে গড়িয়ে মগজ থেকে বেরিয়ে যেতে চায় তবু ধরা দিতে চায় না।

মগজকে আর বেশিক্ষণ চাপাচাপি করি না। চাপাচাপির কারণে মাথার ভেতরেই চুপচাপ সাপের মতো লুকিয়ে থাকা মাথাব্যথা বের হয়ে আসতে পারে। আমার মাথাব্যথা আমার মাথার ভেতরেই বাস করে; শুধু বাইরের চাপের ফলে দলে দলে বেরিয়ে আসে আর আমাকে ছোবলাতে শুরু করে।

স্বপনের ভেতর দাদির দেওয়া মুষ্টিযোগের উপকরণ সংগ্রহ করার জন্য ভোরেরও অনেক আগে আমি গোরস্থানের দিকে হাঁটতে থাকি। বিশাল এক আমবাগান পার হবার পর গোরস্থান। গোরস্থান তার আলাদা পৃথিবী নিয়ে বসে আছে। গোরস্থান হাঁ করে বসে থাকে। মানুষ গেলেই সে নড়ে চড়ে ওঠে। জীবিত মানুষ তার মুখের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে, মৃত মানুষ তার মুখের ভেতর ঢুকে ধীরে ধীরে পেটের ভেতর চলে যায়। মাটি আর মানুষের শরীর এক হয়ে যায়।

শরীর মরে মানুষের কিন্তু মানুষের মন তো মরে না। তাহলে মনের কী হয়? দাদি স্বপনের ভেতর একদিন বলেছিলেন— ‘মানুষ মরে গেলে ঐ মরা মানুষের জীবিত মন জীবিত মানুষের ভেতর বন্টিত হয়ে যায়। বলেই তো জগতে যতগুলো মানুষ আছে তার চেয়ে বেশি মন আছে। মানুষ একবার এত কিছুকে ভালোবাসে, পরক্ষণে অন্য কিছুকে ভালোবাসে বা ঘৃণা করে।’

আমি গোরস্থানের ভেতর গিয়ে সারি সারি কবরের ফাঁকে গিয়ে দাঁড়াই। সূর্য উঠছে ডুগি তবলার বুকে থাকা গাঢ় গাবের মতো; ফারাক শুধু সূর্য কালো নয় আর তবলার গাববৃত্ত সূর্যের রঙের নয়। আচ্ছা, জগতে রাত যখন লাগে তখন তবলার সাদা আকাশে কালো গাবের মতো কি একটা কিছু উঠে, যেটাকে সূর্যের বিপরীতভাবের শব্দ দুর্য বলতে পারি? সূর্যের কারণে দিন, সূর্যের কারণে রাত।

শিশুসূর্য গোরস্থানে থাকা একটা গাছের ফাঁক দিয়ে আমার দিকে তাকাল; আমি এই নরম সূর্যকে ‘শুভ সকাল বালার্ক’ বলব কিনা ভাবলাম। মাটির দিকে আমার চোখ গেল। গোরস্থানের মাটি চোখ বন্ধ করে পড়ে আছে। শিশুসূর্যের মুখে এখনো মোচদাড়ি গজাতে শুরু করেনি ফলে আলোও হয়নি আর প্রাচীর ঘেরা গোরস্থানও ঘনগাছে পূর্ণ ফলে এখনো কিছু কিছু অন্ধকার রয়ে গেছে দলছুট হয়ে।

রোদ আর মাত্র একটু উঠলে আমার জ্ঞান হলো যে, মাটি চোখ বন্ধ করে পড়ে নেই। শত শত চোখ খুলে আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। পুরাতন গর্তের মতো হয়ে যাওয়া কবরগুলোকে গোরস্থানের খোলা চোখের মতো মনে হলো। পলকহীনভাবে গোরস্থানের চোখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

সূর্য ওঠা এখনো সম্পূর্ণ হয়ছে; রশ্মি গজাতে শুরু করেছে বিড়ালের মোচের মতো। সূর্য থেকে চোখ আবার মাটির দিকে দিই। হঠাৎই দর্শন জাগে আমার, মাটির মাত্র হাতখানেক নিচেই আমার মতোই অজস্র মানুষ শুয়ে আছে; তারা মরা মানুষ; মরা মানুষ আর জিন্দা মানুষের মধ্যে মাত্র হাতখানেক পুরু মাটির ফারাক। মাত্র হাতখানেক বা হাতদুয়েক নিচে যারা আছে তারা সূর্য দেখছে না, আমি দেখছি।


স্বপনের ভেতর দাদির বাতলে দেওয়া মুষ্টিযোগের উপকরণ— গোরস্থানের এক খাবলা মাটি তুলে নিয়ে আমি বাড়ির পথে হাঁটা ধরি। সূর্য তার উঠতে থাকা জারি রাখল। সারি সারি গাড়ি গাড়ি আলো ছড়ানো জারি রাখল। ‘আমি আমার কবর হারিয়ে ফেলেছি’ বলে কোনো মরামানুষ পথ জিজ্ঞাসা করার জন্য আমার পিছু আসবে না জেনেও আমি একবার পিছন ফিরে তাকালাম।

আমি ভাবলাম, আমার গায়ের কিছু গন্ধ গোরস্থানের ভেতর রেখে আসলাম। আমি ভাবলাম, আমি কিছুটা গোরস্থানের গন্ধ গায়ে নিয়ে ফিরে আসলাম না কি?

আমার হাতে গোরস্থানের মাটি চুপচাপ রয়েছে, যেমনভাবে গোরস্থানের মাটিতে মানুষের মাংস চুপচাপ থাকে। গোরস্থানের মাটির গোরস্থান এখন আমার হাত; গোরস্থানের মাটির কবর এখন আমার মুষ্টি। গোরস্থানের মাটির পিঞ্জর এখন আমার হাতের তালু আর আঙুল। ফিরছি গোরস্থানের মাটি হাতে করে। মুষ্টিবদ্ধ মাটি যেন নড়াচড়া করছে; মাটির সাথে কোনো পোকা ঢুকে গেছে নাকি; পোকা বেরিয়ে আসার জন্য ছটফট করছে নাকি! হাত খুলি। সত্যি সত্যি একটা কালো পোকা মুষ্টির মাটি ফেড়ে বেরিয়ে হাত বেয়ে কিছুদূর নেমে গড়িয়ে পড়ে গেল। আমার মাথাব্যথা উঠে চরম পর্যায়ে। দাদি স্বপনে বলে দিয়েছে, ‘গোরস্থানের মাটি কপালে লাগালে মাথা ব্যথা সারে।’ এবার হয়তো মুশকিল-আসান হবে; আমার মাথাব্যথা বিদায় নেবে মাথা থেকে। বাড়ি ফিরতে ফিরতে ভোর পেকে পাকা ফল।


গোরস্থানের মাটি তুলে এনে দেখি পায়ের একটা নখ উঠে এসেছে আমার হাতের ভেতর। মাটিতে ডুবে থাকা নখ তাকিয়ে দেখি বহুক্ষণ। পায়ের বুড়ো আঙুলের নখ। সাদা। মাটির ভেতর থেকে এমনভাবে উঁকি দিচ্ছে যেন এখান থেকে একটা নখের গাছ বেরুবে। মানুষের নখের মতো আর কিছুরই নখ নেই। মুরগির নখের সাথে কুত্তার নখের মিল থাকতে পারে কিন্তু মানুষের নখের সাথে অন্য কোনো প্রাণীর নখের মিল আছে কি? বানরের নখ? শিম্পানজি বা ওরাংওটাং বা গরিলার নখ? জানা নেই। ওসব প্রাণীর যদি মানুষের মতো নখ থাকেও তবু এ গোরস্থানে তাদের নখ থাকার সম্ভাবনা একেবারেই নেই; এ মুল্লুকে এরকম বনমানুষের কোনো জাতি প্রজাতি বা উপজাতি নেই। তবে, মাঝে মাঝে হাটেবাজারে মাদারিরা গলায় শেকল বাঁধা বানর নিয়ে আসে আর বানরের নাচ দেখায়, বানরের খেলা দেখায়। বানরের খেলা দেখার সময় খেলা বা নাচই শুধু দেখেছি আর শুনেছি মাদারির ভেলকিবাজি কথা; বানরের নখ কেমন তা দেখা হয়নি। এসব দেখেছি শিশুকালে বা কৈশোরে। ভালো করে মনে নেই কিছু। এখন আর ওসব দেখা হয় না, ওসব খেল ভালো লাগে না; ওসব ভেল কথা ভালো লাগে না; ওসব ভেলকিবাজি ভালো লাগে না।

মাটি থেকে নখটাকে বের করে আনি। সুন্দর নখ। যার নখ তার পা সুন্দর ছিল হতে পারে অথবা নাও হতে পারে। এ নখ দেখে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। মেয়ের নখ কি ছেলের নখ তাও বুঝতে পারছি না। মেয়ের পায়ের নখ হলে এ নখে হয়ত কখনো নেইলপালিশ পরত। পুরো পা আলতা দিয়ে রাঙাত বা না। আমি নখটাকে পানি দিয়ে যত্ন করে ধুই। নখটা তার সাদাস্বাদ নিয়ে জ্বলতে থাকে। আমি নরম কাপড় দিয়ে যত্ন করে মুছি। নখটা নিয়ে কী করব জানি না কিন্তু এসব আমি করি।

সারাদিন ধরে নখটাকে ধরে ধরে রাখি। সারাদিনটা ডুবে যাবার জন্য বেরিয়ে হেঁটে হেঁটে আসছিল; এখন দিনটা আকাশের একটা গর্তে ঢুকে গেল। দিন যেমন পূর্বদিক থেকে শুরু হয় রাতও তেমন পূর্বদিক থেকেই শুরু হয়; যদিও মানুষ ভাবে রাত শুরু হয় পশ্চিম থেকে।

সূর্যের সারাদিনের পরিশ্রমের ফল আকাশের কোনো এক গর্তে প্রবেশ করা। মানুষেরও সারাজীবনের পরিশ্রমের ফল গোরস্থানের গর্তে ঢুকে যাওয়া। মানুষ আশ্চর্য এক সূর্য, সূর্য আশ্চর্য এক মানুষ। তবু সূর্য ডুবে গেলে আবার উঠে, মানুষ ডুবে গেলে আর উঠে না।

সূর্য জগৎ থেকে সরে গেলে, রাত শুরু হয়ে গেলে আমি ঘুমুতে যাই। প্রতিদিন বিশটি নখ আমার সাথে ঘুমায়। আজ একুশটি নখ আমার সাথে ঘুমুবে। বালিশের নিচে রাখি সাদা নখ। গোরস্থানের কোনো এক মৃত মানুষের নখ। কপালে মুসব্বর মিশিয়ে ফ্যাটা গোরস্থানের মাটিও লাগিয়েছি; এবার হয়তো আমার মাথাব্যথা যাবে, আমার দুষ্কাল চলে যাবে। ঘুমের আবেশ আসা না আসার ফাঁকে ভাবি, ঘুমের ভেতর গুম হয়ে বেশিক্ষণ থাকে না মানুষ; আয়ুর ভেতর বেশিক্ষণ থাকে না মানুষ; মৃত্যুর ভেতর থাকে অনন্তকাল। আমার চোখে ঘুম নেমে আসে।

স্বপ্নের ভেতর দাদি ফোকলামুখী কিশোরীর মতো হেসে উঠে আর বলে— ‘ঐ আঙুলের নখ এক কুমারীর ভাই। আমরা মৃতরা বসে বসে গল্প করি তো তাই জানতে পেরেছি। তুই ঐ নখ দিয়ে তোর কপাল কেটে ফেল। এক কুমারী আত্মহত্যা করেছিল পৃথিবীতে। আরো এক কুমারী আত্মহত্যা করেছে অন্ধ কবরের ভেতর জীবিত হবার বাসনায়। আমি জানি না তোর হাতে উঠে আসা নখ কোন কুমারির ছিল।’

দাদি এ কটা কথা বলে দিয়ে, ফিকফিক করে দুষ্টুমির হাসি হেসে উধাও। দাদি উধাও, স্বপ্ন উধাও। ঘুম বেরিয়ে গেল চোখ থেকে। চোখ খুলতেই বুকের ভেতর থেকেও— খালি রাস্তা পেয়ে— বুকের ভেতর জমানো ঘুম বেরিয়ে গেল। ঘুমকে ডাকলাম। ঘুম এলো না। দুষ্টাশয় ঘুম একবার মুখ ঘুরিয়ে হেসে, প্রস্রাব করার নাম করে চলে গেল। আরো কিছুক্ষণ শুয়ে থাকলাম। নাহ্ ঘুম আসে না। বিছানার কিনারে বসে থাকি। এখন নদীর কিনারে গিয়ে বসব কিনা বিছানার কিনারে বসে বসে ভাবি। ভাবতে ভাবতে দাঁড়াই।


ঐ নখ পাবার পর হতে আমি প্রতিরাতে তাড়াতাড়ি বিছানায় যাই ঘুমানোর জন্য। ভোর হতেই সূর্যটাকে মনে মনে পা দিয়ে ঠেলে ঠেলে তাড়াতাড়ি সন্ধ্যার দিকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করি। ভারী সূর্যটাকে একচুল নড়াতে পারি না; সন্ধ্যার আগে সন্ধ্যা লাগে না; একেবারে সন্ধ্যার সময় সন্ধ্যা লাগে; একেবারে রাতের বেলা রাত লাগে। মনে মনে চেষ্টার ফলে মন ব্যথিয়ে ওঠে শুধু, মন ক্লান্ত হয়ে পড়ে থাকে শুধু।

দিনটাকে ছোটো করার চেষ্টা, তাড়াতাড়ি ঘুমের ভেতরে যাবার কারণ, আমি চাইছিলাম যার নখ সে কুমারীকে একবার স্বপনের ভেতর আনতে। প্রতিরাতে আমি একবার কুমারীটিকে স্বপ্নে আনার জন্য চেষ্টা করি কিন্তু সে আসে না। শেষে আমিই সে কুমারীর স্বপ্নের ভেতর যাব বলে মনস্থির করি; কিন্তু দেখি তার স্বপনের দরজা বন্ধ।

একদিন আমার দাদি স্বপনের ভেতর এসে বলে, ‘মৃতরা স্বপন দেখে না ভাই, তাদের স্বপন দেখার ক্ষমতা নাই বলে দেখে না এমন নয়, আসলে তাদের স্বপন দেখার দরকার নাই বলে দেখে না। ইচ্ছে করলে তারা জীবিত মানুষের চেয়ে বেশি বড়ো দৈঘ্যের স্বপন দেখতে পারবে।’ এসব কথা বলে দাদি আবার উধাও। প্রস্রাব পায়খানা করতে যাব বলে আমার ঘুমও উধাও। আবার বিছানার কিনার থেকে নদীর কিনার ভাবনার চলাচল।

ভোর হলে আমি গোরস্থানে যায়। দাদির কবরের কাছে গিয়ে বলি, ‘তুমি তোমার কথা বলে চলে আসো শুধু। সব কথা শেষ হতে পায় না। এবার যদি স্বপনে আসো তো বলে দিও, মেয়েটার স্বপনের ভেতর কিভাবে ঢুকতে পারব আমি। মেয়েটার সাথে আমি কথা বলতে চাই।’ জানি না মৃতরা জীবিতদের কথা শুনতে পায় কিনা তবু বলে এলাম।

সত্যি এক রাতে দাদি স্বপনে আসে আর বলে, ‘তোর স্বপন থেকে আমি তাড়াতাড়ি চলে আসি এটা ঠিক না। আসলে তোরই স্বপন তাড়াতাড়ি ভেঙে যায়। জীবিত মানুষের মতোই অস্থির তাদের ঘুম আর তাদের স্বপন। মৃত মানুষের মতো তাদের মহাস্থির ঘুম, মহাদীর্ঘ স্বপন তাদের নেই। আর মেয়েটিকে স্বপনে পাবার যো নাই। সে কারো স্বপনের ভেতর যেতে চায় না। তুই এক কাজ করতে পারিস, সে যখন জীবিত ছিল তখনের দেখা কোনো একটা স্বপনের ভেতর ঢুকে যেতে পারিস।’

হেঁয়াল ভরা কথার দেয়াল দিয়ে দাদি চলে গেল আবার। আমার ঘুম আর স্বপন আর ঘুমের ওপর আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। তবু একসময় রাগ করা বাদ দিই কারণ, স্বপন দিয়েই তো যোগাযোগ করা যাচ্ছে; এটা একটা ভালো; আমি মেয়েটার সাথে যদি যোগাযোগ করতে পারি তবে সেটা এই স্বপনের ভেতর দিয়েই পারব অন্য আর কোনোভাবেই নয়। এসব যুক্তিজলে পড়ে আমার রাগ গলে যায়।


অবিরাম চেষ্টার ফলে একদিন এক মেয়ের স্বপনের ভেতর আমি ঢুকে যেতে সমর্থ হই; তখনও জানি না এই মেয়েটি কোন মেয়েটি। স্বপনের ভেতর মেয়েটি তাদের বাড়ির বাইরে একটা সোনালু গাছের নিচের সোনালুর ফুল হাতে নিয়ে বসেছি। কী সুন্দর সে! একেবারে চন্দ্রপ্রভ! সে আমাকে খেয়াল করেনি। আমি তার কাছে গিয়ে হঠাৎই জিজ্ঞাসা করি, ‘তুমি কি সেই মেয়ে যে আত্মহত্যা করে মরেছিল আর যার এক পায়ের নখ আমার কাছে আছে।’ প্রথমে কিছুটা হকচকিয়ে গেলেও পরক্ষণেই মেয়েটি হেসে ওঠে। এমন সুন্দর হাসি কোনোদিন আমি শুনিনি। সে বলে, ‘হুম, সেই মেয়েই আমি। কিন্তু আমার জীবৎকালের স্বপনের ভেতর আপনি ঢুকে কী করছেন?’ বললাম, ‘কত যে তোমাকে খুঁজেছি আমি। স্বপন থেকে স্বপনে হেঁটে বেড়িয়েছি কতরাত কিন্তু তোমাকে আমি পাইনি।

শেষে আজ স্বপনের ভেতর তোমাকে পেলাম।’ এবার সে বলে, ‘কেন খুঁজছেন আমাকে?’ আমি বুঝতে পারি না এর উত্তর কী হতে পারে? সত্যিই তো কেন খুঁজছি তাকে! তার নখ যদি না পেতাম তবে কি তাকে খুঁজতাম? এ প্রশ্নের উত্তর করা বাদ দিয়ে তাকে আবার প্রশ্ন করি, ‘তুমি কোন মেয়েটা, যে কবরের ভেতর আত্মহত্যা করেছে সেই, না যে আত্মহত্যা করে কবরে গেছিল সেই মেয়ে?’ সে আবার হেসে ওঠে। সে বলে, ‘কবরের ভেতর কেউ আত্মহত্যা করে না; অনন্ত ছেড়ে কেইবা সান্ত পৃথিবীতে থাকতে চায়! আমিও কবরে আত্মহত্যা করিনি; আমিও মৃলোক ছেড়ে নৃলোকে যেতে চাই না। আপনার দাদি আপনার সাথে ইয়ারকি করেছেন। আমি আত্মহত্যা করে কবরে গেছিলাম।’ 

তার কাছে জানতে চাই তার আত্মহত্যার কথা, কেন সে আত্মহত্যা করেছিল? সে বলে, ‘আমি যখন বড়ো হই তখন জানতে পারি আমার বিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু আমার বাবা-মাসহ বহু বিবাহিত লোককে দেখেছিলাম। তারা ঝগড়া ফ্যাসাদ নিয়ে দারুণভাবে ঘৃণিত জীবনযাপন করছিল। ভালোবাসার কোনো লেশ ছিল না, ঘৃণা আর নিস্পৃহতার বা নৃশংসতার কোনো শেষ ছিল না। সুতরাং আমি বিয়ে করব না বেঁচে থাকা পর্যন্ত এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু বয়স আরেকটু বাড়লে বাড়ির আশেপাশের লোকজন থেকে শুরু করে বাড়ির লোকজন পর্যন্ত আমাকে বিয়ের জন্য পীড়াপিড়ি শুরু করে। তারা যত জোর করে আমি তত মর্তুকাম হয়ে পড়ি। তারা এটা বুঝতে পারে না; তারা ভালো ভালো পাত্রের সন্ধান আনতে থাকে; কিন্তু আমি তো জানি ভালো পাত্র, মন্দপাত্র সবই একই পাত্র; অনেকে এটাকে আমার গ্যামোফোবিয়া বলে মনে করে বলত, বিয়ে দিয়ে দাও এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে; কিন্তু আমি জানতাম এটা কোনো ফোবিয়া ছিল না; ফোবিয়াতে তো কোনো যুক্তি থাকে না কিন্তু আমার যুক্তি আর অভিজ্ঞতা ছিল শক্তিশালী। তাদের বিয়ে দেবার চাপাচাপির ফলে আমি আত্মহত্যা করি।’ 

এসব বলে সে হাসতে লাগল আর আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, ‘এখন কি নৃলোকের লোকেরা ভালো আছে?’ আমার উত্তর শোনার অপেক্ষা না করেই সে স্বপনের বেড়া ভেঙে বেরিয়ে যায়।


এরপর থেকে মাঝে মাঝেই তার স্বপনের ভেতর আমি যেতে থাকি। তার অতীত স্বপন বা বর্তমান স্বপন— দুই স্বপনেই আমাকে ঢোকার অধিকার দিয়েছে। সেও মাঝে মাঝে আমার স্বপনের ভেতর তার হাসিমুখ নিয়ে চলে আসে; গল্পগুজব করে, হাস্যকৌতুক করে আর চলে যায়। চমৎকার কাটে আমার হাস্যমুখরিত, সুখমাখা স্বপনসময়গুলো। দাদিও মাঝে মাঝে স্বপনে এসে আমার সাথে ইয়ারকি করে, ‘কি রে তোর মাথাব্যথা গেছে; সোয়াথ মিলেছে?’ দাদির প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আমি হাসি শুধু।

ঐ মেয়ের প্রতি একধরনের প্রেম তৈরি হয় আমার ভেতর। তাকে একদিন প্রস্তাব দেব বিয়ের কিনা তাও ভাবতে থাকি। বিয়ের প্রস্তাব দিলে হয়তো সে রাজি হবে না তবু বলব। সামনের স্বপনেই তাকে বলব, ‘শোনো গোরকুমারী, তুমি-আমি বিয়ে করব; তুমি থাকবে মৃতজগতে আমি থাকব জিউজগতে। আমরা দেখা করব শুধু স্বপনে, তুমি হবে আমার জীবনবল্লভা আমি হবো তোমার মরণবল্লভ; আমাদের কোনো কলহ হবে না। তোমার কোনো ভয় থাকবে না; আমারও।’

গোরকুমারীকে কথা কটা জিহ্বার ওপার সাজিয়ে নিয়ে অধীর অপেক্ষায় বসে আছি আমি কিন্তু সে তার স্বপনের দরজা খোলে না আর।

ঢাকা/তারা//

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়