ঢাকা     রোববার   ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  ফাল্গুন ২ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

চট্টগ্রামে ফলের রাজ্য ফলমন্ডি

রেজাউল করিম || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০২:৩৩, ৩ জুলাই ২০১৯   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
চট্টগ্রামে ফলের রাজ্য ফলমন্ডি

রেজাউল করিম, চট্টগ্রাম: আফগানিস্তান থেকে সাউথ আফ্রিকা, প্রতিবেশী দেশ ভারত আর নিজেদের দেশ তো আছেই। প্রায় সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকেই হরেক রকমের ফলের আগমন ঘটে চট্টগ্রামের ফলমন্ডিতে। চট্টগ্রাম মহানগরীর প্রধান এবং একমাত্র ফলের মার্কেট ফলমন্ডি। এ যেনো ফলের ভিন্ন এক রাজ্য। এই ফলমন্ডি থেকে সমগ্র চট্টগ্রাম এবং আশেপাশের সব জেলা এবং উপজেলাতে ফলের সরবরাহ হয়। ফলমন্ডি থেকেই ফলের চাহিদা মিটে কয়েক কোটি মানুষের। চট্টগ্রাম মহানগরীর ফলমন্ডি ঘুরে তৈরি করা হয়েছে এই বিশেষ প্রতিবেদন।

 

চট্টগ্রাম মহানগরীর কোতোয়ালী থানাধীন বিআরটিসি মোড়ের উল্টো দিকে সুবিশাল দুটি মার্কেট জুড়ে ফলমন্ডির অবস্থান। নতুন ও পুরাতন মিলে এই মার্কেটে ফলের আড়ত এবং দোকানের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৩শ’। সপ্তাহের প্রতি বৃহস্পতিবার এবং রোববার চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় এই ফলমন্ডিতে বাজার বসে। এই দুইদিনে এই মার্কেটে আর্থিক লেনদেন প্রায় দুইশ’ কোটি টাকা। রোববার সপ্তাহের ফল মার্কেটের ব্যস্ততম বাজারবারে ফলমন্ডি ঘুরে এবং ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে নানা বিচিত্র তথ্য।

ফলমন্ডির ফল আমদানিকারক এবং আড়তদার প্রতিষ্ঠান আল সাফা এন্টারপ্রাইজের কর্মকর্তা দিদার হোসেন রাইজিংবিডিকে জানান, চট্টগ্রামের এই ফলমন্ডি থেকেই চট্টগ্রাম মহানগরী, সমগ্র চট্টগ্রাম জেলার সবগুলো উপজেলা এবং কক্সবাজার জেলায় সব ধরনের ফলের সরবরাহ হয়ে থাকে। এই মার্কেটে পাওয়া যায় সব মৌসুমে সব ধরনের মৌসুমী ফল। বিশেষ করে আমের মৌসুমে সব ধরনের আম, লিচুর মৌসুমে লিচু, কলা আনারস ছাড়াও, বিদেশ থেকে আমদানিকৃত আপেল, কমলা, মুসাম্বির, আনার, আঙ্গুর, খেজুর, স্ট্রবেরীসহ নানা জাতের ফল পাওয়া যায় এই মার্কেটে।

এই ফল সমূহের মধ্যে চায়না থেকে আসে মাল্টা, মিশর থেকে আসে কালো আঙ্গুর এবং আনার, অস্ট্রেলিয়া এবং সাউথ আফ্রিকা থেকে আসে আপেল। এছাড়া ভারত থেকে কমলা এবং সাদা আঙ্গুর আমদানি হয়। ব্যবসায়ীরা জানান, গড়ে প্রতিদিন এই মার্কেটে দেশীয় ফলের আমদানি নিয়ে ৩০ থেকে ৪০টি ট্রাক প্রবেশ করে। এছাড়া আমদানিকৃত ফলের সরবরাহ নিয়ে আসে ২০ থেকে ৩০ ট্রাক। বর্তমানে আমের মৌসুম চলমান হওয়ায় প্রতিদিন ১শ’ ট্রাক পর্যন্ত আম প্রবেশ করছে এই মার্কেটে। পাড়ার ভ্যানগাড়ি থেকে শুরু করে বড় বড় ভিভিআইপি সুপার শপেও সব ধরনের ফলের সরবরাহ হয় এই মার্কেট থেকেই।

ফলমন্ডি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবদুল মালেক রাইজিংবিডিকে জানান, সমগ্র চট্টগ্রাম বিভাগের ফলের চাহিদা পূরণ করছে ফলমন্ডি। এই ফলমন্ডির সাড়ে ৩শ’ দোকান থেকেই সব ধরনের ফল চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ হয়। প্রতিদিন এই মার্কেটে লেনদেন প্রায় শতকোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। বিশেষ করে প্রতি বৃহস্পতিবার এবং রোববার ফলমন্ডির বাজারবার এই দিনে প্রতিটি দোকানে লেনদেন হয় ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা পর্যন্ত। একদিকে ট্রাকে ট্রাকে ফল নামে ফলমন্ডিতে অপরদিকে ট্রাক, মিনিট্রাক, ভ্যান কিংবা বিভিন্ন ধরনের যানবাহনে করে এসব ফল সমগ্র চট্টগ্রামের জেলা উপজেলায় ছড়িয়ে পড়ে।

 

ফলমন্ডি থেকে আম কিনতে আসা ক্রেতা আফজাল কাদের রাইজিংবিডিকে জানান, তিনি ভ্যান গাড়িতে শহরের বিভিন্ন এলাকায় মৌসুমী ফল বিক্রি করেন। এখন আমের সিজন হওয়ায় তিনি আম বিক্রি করছেন। তাই সকাল সকাল আম সংগ্রহ করতে এসেছেন ফলমন্ডি থেকে। আফজাল জানান, এই মার্কেট থেকে প্রতি ভালোমানের আমরূপালি তিনি কিনেছেন ৬৫টাকা কেজি দরে। এসব আম তিনি বাজারে বিক্রি করবেন প্রতি কেজি ৮০ থেকে ৮৫ টাকা কেজি দরে।

নগদ আর্থিক লেনদেনেই এই মার্কেটে বেশি বিক্রি হয় বলে জানিয়ে অপর আম ক্রেতা মান্নান রাইজিংবিডিকে বলেন, আমরা প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা মুল্যের ফল কিনে নিয়ে দিন শেষে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ করতে পারি। তবে কাঁচামাল হওয়ায় অনেক সময় কম লাভ কিংবা কখনো কখনো লোকসানও দিতে হয়। তবে মাস শেষে আয়-ব্যায় হিসেব করে স্বাচ্ছন্দে সংসার চালানোর মতো আয় হয় ফল বিক্রি করে।

ফলমন্ডির আম ব্যবসায়ী পলি এন্টারপ্রাইজের আলী হোসেন জানান, এখন জমজমাট আমের মৌসুম চলছে রাজশাহী, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়িসহ দেশের বিভিন্নস্থান থেকে বিভিন্ন প্রজাতির আম আসছে ফলমন্ডিতে। আমের প্রজাতীর মধ্যে রয়েছে ফজলি, আমরূপালি, ক্ষীরমন, ল্যাংড়া, সেন্দুরাগুটি, তোতাপুরী, ক্ষিরসাপাত, বোম্বাই, সুন্দরী, মধু চুষকি, গোপালভোগ, সুরমা ফজলি, রাঙ্গুই, ডাবল বি, হাড়িভাঙা রানীপছন্দসহ বিভিন্ন প্রজাতীর আম। এখন বিভিন্ন প্রজাপতির আম প্রতি কেজি ৪০ টাকা থেকে ৭৫ টাকার মধ্যে আম পাইকারী দরে বিক্রি হচ্ছে ফলমন্ডিতে। তবে, প্রতিদিনই এই দর উঠানামা করে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

পাইকারী ব্যবসায়ী ছাড়াও সাধারণ ক্রেতারাও চাইলে এই মার্কেট থেকে আম বা যে কোন ফল কিনতে পারেন পাইকারী মুল্যে। এই ক্ষেত্রে এক ক্যারেট বা সর্বনিম্ন ২০ থেকে ২৫ কেজি আম কিনতে হবে। এতে বাইরের যে আম প্রতি কেজি ৮০ বা ৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়, সেগুলো ফলমন্ডিতে কেনা যাবে ৬০ থেকে ৬৫ টাকা কেজি দরে।

আম বা কোন ধরনের ফলেই এখন কোন ফরমালিন বা কেমিক্যাল ব্যবহার হয়না বলে নিশ্চিত করে মার্কেটের ব্যবসায়ীরা জানান, এখন ফলে কোন ফরমালিন থাকে না। সরাসরি বাগান থেকেই ফল আসে মার্কেটে। দ্রুত সময়ের মধ্যেই ফল ভোক্তাদের ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। কোন ধরনের কেমিক্যালের ব্যবহার যাতে কোন ফলেই না থাকে সে ব্যাপারে মার্কেটের প্রতিটি ব্যবসায়ী সচেতন বলে জানান মার্কেটের ব্যবসায়ীরা।


রাইজিংবিডি/চট্টগ্রাম/ ০৩ জুলাই ২০১৯/রেজাউল/হাকিম

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়