ঢাকা     বুধবার   ১৭ আগস্ট ২০২২ ||  ভাদ্র ২ ১৪২৯ ||  ১৮ মহরম ১৪৪৪

কলেজছাত্রী হামিদার ‘মানিক’ এর দাম ১৫ লাখ টাকা

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১০:৪১, ৫ জুলাই ২০২২   আপডেট: ১০:৪৯, ৫ জুলাই ২০২২
কলেজছাত্রী হামিদার ‘মানিক’ এর দাম ১৫ লাখ টাকা

গরুর বড় খামারি হওয়ার স্বপ্ন দেখন হামিদা আক্তার

লম্বায় প্রায় ১০ ফুট। উচ্চতা ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি। ওজন ৪৫ মণ। কালো ও সাদা রঙের এই ষাঁড়টির নাম ‘মানিক’। এবারের কোরবানির ঈদে ফ্রিজিয়ান জাতের এই ষাঁড়টির দাম হাঁকা হচ্ছে ১৫ লাখ টাকা। ‘মানিককে’ লালন-পালন করা হচ্ছে হামিদা আক্তার নামে এক কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীর খামারে। 

হামিদা আক্তার টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার লাউহাটি ইউনিয়নের ভেঙ্গুলিয়া গ্রামের কৃষক আব্দুল হামিদের মেয়ে। ঈদে ষাঁড়টি বিক্রির পরিকল্পনা থাকলেও সঠিক ক্রেতা না মেলায় ন্যায্য দাম নিয়ে শঙ্কিত তিনি।

চাকরি নয়, গরুর বড় খামারি হওয়ার স্বপ্ন দেখেন টাঙ্গাইলের সরকারি সা’দত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে ইতিহাসে অর্নাস পাস করা হামিদা আক্তার। গরুর বড় খামারি হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে লেখাপড়ার পাশাপাশি গত পাঁচ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে অস্ট্রেলিয়ান ফ্রিজিয়ান জাতের গাভীসহ ষাঁড় লালন পালন করেছেন তিনি। 

হামিদা আক্তার খামার তৈরির চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। বর্তমানে তার খামারে আছে অস্ট্রেলিয়ান ফ্রিজিয়ান জাতের তিনটি গরু। দেশি পদ্ধতিতে লালন-পালন করে এরই মধ্যে বড় করে তুলেছেন বিশালাকৃতির ‘মানিককে।’

এদিকে ষাঁড়টি দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিদিন মানুষ আসছেন হামিদার বাড়িতে। ন্যায্য দামে ষাঁড়টি বিক্রি হলেই খামার করার স্বপ্ন সম্ভব হবে, এমনটাই মনে করছেন হামিদা আক্তার।

নিজের ও দুই বোনের লেখাপড়ার ব্যয় বহনসহ কৃষক বাবার সংসারের হাল ধরেছেন হামিদা আক্তার। ইতোমধ্যেই তিনি তার ছোট দুই বোনকে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পাসও করিয়েছেন। এক বোনের বিয়ে দেওয়াসহ আরেক বোনকে লেখাপড়া করাচ্ছেন নার্সিং এ।  

ভিটেবাড়িসহ হামিদা আক্তারের বাবার জমি পরিমাণ মাত্র ৫০ শতাংশ। বাবার পক্ষে সংসারের এতো খরচ বহন অসম্ভব হওয়ায় ২০১১ সাল থেকে লেখাপড়ার পাশাপাশি হামিদা আক্তার শুরু করেন দর্জির কাজ। এরপর ৫ বছর ধরে করেছেন গরু, রাজহাঁস ও কবুতর লালন পালনসহ  বিকাশ এজেন্টের ব্যবসাও করছেন তিনি।

হামিদা আক্তার বলেন, ‘পরিবারের সদস্যের মতোই বড় হচ্ছে তার অস্ট্রেলিয়ান ফ্রিজিয়ান জাতের গরুগুলো। গুরুগুলোর থাকার ঘরে রয়েছে দুটি সিলিং ফ্যান আর মশারি। নিয়মিত খাবারের তালিকায় রয়েছে খড়, ভূষি, কাঁচাঘাস, পেয়ারা, কলা, মিষ্টি কুমড়া ও মিষ্টি আলু। রোগ জীবাণুর থেকে প্রাণীগুলোকে বাঁচতে নিয়মিত সাবান আর শ্যাম্পু দিয়ে গোসল করানো হয়।’

হামিদা আক্তারের খামারে লালন-পালন করা হচ্ছে ফ্রিজিয়ান জাতের গরু

হামিদা আক্তার জানান, তার খামারের ফ্রিজিয়ান জাতের একটি গাভী থেকেই জন্ম নেয় মানিক ও রতন নামের দুটি ষাঁড়। গত কোরবানির হাটে ওই ষাঁড় দুটি বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন। গত বছরই মানিকের ওজন ছিল ৩৫ মণ আর রতনের ওজন ছিল ৩৪ মণ। দাম চেয়েছিলেন মানিকের ১৪ আর রতনের ১৩ লাখ। কোরবানির আগে বাড়িতে গরুর ব্যাপারিরা এসে ‘মানিকের’ দাম বলেছিলেন ৯ লাখ টাকা। কিন্তু বাকিতে নেওয়ার কথা বলায় মানিককে আর বিক্রি করা হয়নি। পরে ঢাকার গাবতলী হাটে নেওয়া হয় মানিক ও রতনকে। তবে করোনার কারণে হাটে নিয়েও সুবিধা হয়নি। মাত্র ৪ লাখ টাকায় রতনকে বিক্রি করতে পারলেও মানিককে নিয়ে বাড়ি আসি।’

হামিদা আক্তার বলেন, ‘মানিকের পেছনে দৈনিক খাবার লাগছে ১৭ কেজি গমের ভূষি, ৪ কেজি ছোলা, ২ কেজি খুদের ভাত, আধা কেজি সরিষার খৈল। এছাড়াও দৈনিক তাকে খাওয়ানো হচ্ছে নানা জাতের পাকা কলা, মিষ্টি কুমড়াসহ অন্য প্রাকৃতিক খাবার। বর্তমানে মানিকের ওজন ৪৫ মণ বা ১৮০০ কেজি।’

এই উদ্যোক্তা বলেন, ‘আমরা বাড়ি থেকেই ষাঁড়টি বিক্রি করার চেষ্টা করছি। বাড়িতে এসে যদি কোনো ক্রেতা ন্যায্য দাম বলেন সেক্ষেত্রে আমরা নিজ খরচে মানিককে ক্রেতার বাড়িতে পৌঁছে দেব। আসা করছি এ বছর ভালো দামে মানিককে বিক্রি করতে পারবো।’

লেখাপড়া করেও গরু লালন পালন করছেন এমন প্রশ্নে হামিদা বলেন, ‘আমি পড়ালেখা করছি, চাকরি করার জন্য নয়। আমার স্বপ্ন আমি একজন বড় গরুর খামারি হবো। এ বছর যদি ভালো দামে আমি মানিককে বিক্রি করতে পারি, তবে সেই টাকায় আমি আমার স্বপ্নের খামারটি নির্মাণ করবো। ওই খামারে লালন পালন করবো ভালো জাতের সব গরু।’  

হামিদার মা রিনা বেগম বলেন, ‘আমার মেয়ে ওর বাবার গরু লালন পালন দেখেই এ বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছে।’ 

কেদারপুর থেকে ষাঁড়টি দেখতে আসা সোহেল রানা বলেন, ‘এত বড় ষাঁড়ের কথা শুনেই এখানে এসেছি। আমার ধারণা এটি এ জেলার সবচেয়ে বড় ষাঁড়।’

লাউহাটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহীন মোহাম্মদ খান বলেন, ‘হামিদা যদি কখনও বড় ধরণের খামার করতে আমাদের সাহায্য সহযোগিতা চায়, তবে অবশ্যই আমরা করবো।’

দেলদুয়ার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. বাহাউদ্দিন সারোয়ার রিজভী বলেন, ‘উপজেলায় হামিদার ষাঁড়টিই সবচেয়ে বড়। আমাদের অনলাইন হাটে তার ষাঁড়টির ছবি, ওজন ও দাম উল্লেখ করে বিক্রির জন্য প্রচারণা চালানো হয়েছে। এছাড়াও আমাদের কাছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বড় ষাঁড় কেনার জন্য গ্রাহক যোগাযোগ করেন। আমরা সেই সব ক্রেতাকেও হামিদার ষাঁড়টির বিষয়ে অবগত করবো।’

কাওছার/ মাসুদ

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়