ঢাকা     শুক্রবার   ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ ||  পৌষ ২৫ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

ভিক্ষুকের ঘরে চোরের হানা, কেড়ে নিল শেষ সম্বল!

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৫:৫৪, ৪ জানুয়ারি ২০২৬   আপডেট: ১৫:৫৬, ৪ জানুয়ারি ২০২৬
ভিক্ষুকের ঘরে চোরের হানা, কেড়ে নিল শেষ সম্বল!

রামনারায়ণ রবিদাস।

জন্ম থেকে পৃথিবীর আলো দেখেননি রামনারায়ণ রবিদাস। চোখে না দেখলেও জীবনের নিষ্ঠুরতা অনুভবে দেখেছেন তিনি। মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার শরিফপুর ইউনিয়নের পালকিছড়া চা বাগানে টিনের চালায় বাস তার। পরিবারে সদস্য সংখ্যা চারজন।

চরম দারিদ্রতার মাঝে বসবাস। স্বামী-স্ত্রী দুজনই ভিক্ষা করে কোনো রকমে দিন পার করেন। তবে স্বপ্ন ছিল ভিক্ষুকের জীবন একদিন বদলে যাবে। ছেড়ে দেবেন ভিক্ষা, ভিক্ষার থালা চিরতরে ছুঁড়ে ফেলবেন জীবন থেকে।

বহু কষ্টে, অনেক লজ্জা আর অনিশ্চয়তায় ভেসে এক লাখ টাকার ঋণ নেন। ঘরের জমানো শেষ সম্বল তাতে যোগ করে ছেলের জন্য একটি অটোরিকশা কিনলেন। ভেবেছিলেন- ছেলে সেটি চালাবে, ঘরে দুমুঠো ভাতের নিশ্চিয়তা আসবে। অবসান হবে ভিক্ষুক জীবনের। 

তবে সেই স্বপ্ন টিকে থাকল মাত্র ছয় মাস। গত মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোরে ঘুম ভাঙলো। কিন্তু আশার আলোর বদলে যেন রামনারায়ণের জীবনে নেমে এলো ঘোর অমানিশা। জন্মান্ধতার অন্ধকারের চেয়েও বেশি তমশাচ্ছন্ন সেই অমানিশা। উঠোনে বেরিয়ে দেখেন অটোরিকশার ছোট্ট ঘরটির তালা ভাঙা। ভেতরে অটোরিকশাটি নেই। যে বাহনটি ছিল বেঁচে থাকার শেষ ভরসা, সেটি চোরের কারণে চিরতরে হারিয়ে গেল!

বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) বিকেলে তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়- চারদিক শুনশান নীরবতা। কোনো শব্দ নেই, নেই কোনো কোলাহল। টিনের চালার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো যেন একেকটি হেরে যাওয়া জীবনের প্রতিচ্ছবি। কারো শরীরে গরম কাপড় নেই, চোখে মুখে ক্লান্তি আর অসহায়ত্ব।

উঠোনে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় রামনারায়ণ বলেন, “বড় অভাবে দিন চলে। ভিক্ষা করেই সংসার চলতো। অনেক কষ্টে এক লাখ টাকা লোন নিয়ে অটোরিকশা কিনেছিলাম। ভেবেছিলাম আর ভিক্ষা করতে হবে না। ছেলে অটো চালিয়ে সংসার ঠিকঠাক মতো চালাতে পারবে। কিন্তু আল্লাহ আর সে সুখ দিলেন না।”

এই কথাটুকু বলতেই তাঁর কণ্ঠ ভেঙে আসে, চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু।

পাশে দাঁড়িয়ে স্ত্রী বাসমতি রানী রবিদাস শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলেন, ‘‘এই অটোরিশাটাই আছিল বিপদের ভরসা। মনে করছিলাম আর ভিক্ষা করব না। সংসারটা একটু দাঁড়াইব। সব শেষ হয়ে গেল। চোরে মরা মানুষরে মারিয়া গেল।”

চুরির ঘটনা পুলিশকে জানানো হয়েছে কি না জানতে চাইলে রামনারায়ণের কণ্ঠে যেন হতাশা ঝরে পড়ে। তিনি বলেন, “পুলিশকে জানাইয়া লাভ কী? এলাকায় কত গরু চুরি হইছে, কোনটার খবর মিলছে? আমারটা কীভাবে পাইব?”

স্থানীয়দের ভাষ্য, গত সাত মাসে ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ২৫টি গরু চুরি হয়েছে। একটি গরুও উদ্ধার হয়নি। চোরের সাহস বেড়েছে, সাথে সাধারণ মানুষের ভয়ও বেড়েছে।

এ বিষয়ে কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) হাবিবুর রহমান বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত পরিতাপের। জড়িতদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” 

তবে গত বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) পর্যন্ত রামনারায়নের বাড়িতে পুলিশ খোঁজ নিতেও যায়নি।

স্থানীয় ইউপি সদস্য গনেশ গোয়ালা বলেন, “অন্ধ চোখে যে মানুষটি একটু আলোর স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই আলো নিভে গেছে চোরের হাতে।”

ঢাকা/আজিজ/এস

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়