‘ওয়াইড বলে’ বাংলাদেশ কেন রিভিউ নিয়েছিল?
ম্যাচে তখন রুদ্ধশ্বাস মুহূর্ত। পেন্ডুলামের মতো ঝুলছিল ম্যাচ। যে জিতবে তার হাতেই উঠবে দ্বিপক্ষীয় সিরিজের শিরোপা। পাকিস্তানের ২ বলে প্রয়োজন ১২ রান। বাংলাদেশের কেবল ওই রান আটকে রাখতে পারলেই হলো।
বোলিংয়ে রিশাদ হোসেন। যিনি গতকাল তেমন ভালো করতে পারেননি। নিজের প্রথম ৬ ওভারে বিলিয়ে আসেন ৫৪ রান। তাকে শেষ ওভারে মেহেদী হাসান মিরাজ বোলিংয়ে আনেন ১৪ রান পুঁজি নিয়ে।
শুরুটা খারাপ করেননি রিশাদ। গুগলিতে শাহীন শাহ আফ্রিদিকে শান্ত রাখেন। পরের বল শাহীন হাওয়ায় ক্যাচ উড়ালেও নিজের বোলিংয়ে উইকেট নিতে পারেননি এই লেগ স্পিনার। দৌড়ে পেছনে গিয়েছিলেন। বল নাগালেও ছিল। হাতের ছোঁয়াও পেয়েছিল। কিন্তু রিশাদ বল জমাতে পারেননি। ডট বল।
তৃতীয় বল লং অফে পাঠিয়ে দৌড়ে ২ রান নেন শাহীন। চতুর্থ বল ডট। শেষ ২ বলে ২টি ছক্কা হলেই পাকিস্তান ম্যাচ জিতে যাবে। আর বাংলাদেশ একটি ডট হলেই হাফ ছেড়ে বাঁচবে। এমন উত্তেজনাময়, নখ কামড়ানো মুহূর্তে রিশাদের হাফ ভলি বল টার্ণ পেয়ে যায় লেগ সাইডে।
আম্পায়ার কুমার ধর্মাসেনা ওয়াইডের সংকেত দেন। কিন্তু বাংলাদেশ আবেদন করে বলটা ওয়াইড হয়নি। মুহূর্তেই ক্রিজের পাশে জড়ো হয়ে যান লিটন, শান্ত, মিরাজ, রিশাদ, তাসকিন। তাদের মধ্যে চলে আলোচনা।
এরপর মিরাজ রিভিউ চেয়ে বসেন। আম্পায়ার কুমার ধর্মাসেনা রিভিউয়ের আবেদন গ্রহণ করে তৃতীয় আম্পায়ারের স্বরণাপন্ন হন। ওয়াইড বলের জন্য রিভিউ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নেই। এটা চালু আছে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে। তাহলে বাংলাদেশ কিভাবে রিভিউ নিল? সেই প্রশ্নই অনেকের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
জানা যায়, বাংলাদেশ রিভিউ নিয়েছিল এলবিডব্লিউর জন্য। বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা যে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছিল তা হল, রিভিউ নিলে আম্পায়ার ওই বলের সবকিছু খুটিয়ে খুটিয়ে দেখবেন। বল কোথায় পিচ করেছে, ইমপ্যাক্ট কোথায়, ব্যাটের স্পর্শ পেল কি না, প্যাডের সঙ্গে সম্পর্ক আছে কি না এবং বল ড্রপ হয়েছে কি না। একই সঙ্গে নো বল ও ওয়াইড বল দেখা হয়।
উপস্থিত বুদ্ধিমত্তায় লেটার মার্কস পাওয়া অধিনায়ক মিরাজ কাজের কাজ করেন রিভিউ নিয়ে। রিপ্লেতে দেখা যায়, বল উইকেটে ড্রপ পড়ার আগে শাহীনের ব্যাটে আলতো চুমু খায়। এরপর ড্রপ পড়ে টার্ণ হয়ে যায় উইকেটের পেছনে লিটনের হাতে।
আম্পায়ার রিভিউয়ের সিদ্ধান্ত জানালে বাতিল হয়ে যায় ওয়াইড। ফলে পঞ্চম বলও ডট। তাতে বাংলাদেশের জয়ও প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়। শেষ বলে পাকিস্তান ৬ রান পেলেও বাংলাদেশ এগিয়ে থাকবে ৫ রানে। কারণ শেষ বলেও পাকিস্তানের জয়ের জন্য ১২ রান লাগত।
রিশাদের লেগ ব্রেকে ষষ্ঠ বলেও কিছু করতে পারেননি পাকিস্তানের অধিনায়ক। উল্টো স্টাম্পড হয়ে যায়। তাতে বাংলাদেশের জয় নিশ্চিত হয়ে যায় ১১ রানের।
রিভিউয়ের ঘটনা জানাতে গিয়ে ম্যাচ শেষে মেহেদী হাসান মিরাজ বলেছেন, ‘‘রিভিউ নেওয়ার আগে আমরা আলোচনা করেছিলাম। লিটন ও শান্ত দুজনেই বলছিল যে রিভিউটা নেওয়া যেতে পারে। যেহেতু আমাদের হাতে দুটি রিভিউ ছিল, তাই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই আমরা রিভিউ নিয়েছিলাম।’’
শেষ বল পর্যন্ত বোঝা যাচ্ছিল না কার ভাগ্যে থাকবে সিরিজ জয়। কখনো পাকিস্তান এগিয়ে যায়, কখনো বাংলাদেশ। তবে স্বাগতিক দলের অধিনায়কের পুরো বিশ্বাস ছিল, দিনটা বাংলাদেশেরই হবে, ‘‘দেখেন, আমাদের বিশ্বাস ছিল যে আমরা ম্যাচটা জিততে পারব। যদিও ম্যাচটা খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিল। মিডল ওভারে আমরা কিছু উইকেট নিতে পারিনি। যদি তখন আরও কয়েকটা উইকেট নিতে পারতাম, তাহলে ম্যাচটা আমাদের জন্য সহজ হয়ে যেত।’’
২০১৫ সালের পর দুই দল প্রথম ওয়ানডে সিরিজ খেলল। ১১ বছর আগে বাংলাদেশ পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করেছিল ৩-০ ব্যবধানে। এবার বাংলাদেশ জিতেছে ২-১ ব্যবধানে। এই সিরিজের প্রাপ্তির খবর জানাতে গিয়ে মিরাজ বলেছেন, ‘‘এই সিরিজে সবাই দলগতভাবে ভালো খেলেছে। বিশেষ করে নাহিদ রানা দারুণ বোলিং করেছে। প্রথম ম্যাচে পাঁচ উইকেট পেয়েছে। তাসকিন ও মুস্তাফিজুরও ভালো করেছে। প্রথম ম্যাচে আমরা তাদের ১১৪ রানে অলআউট করেছি। দ্বিতীয় ম্যাচে শুরুটা ভালো না হলেও শেষ দিকে আমরা শক্তভাবে ফিরে এসেছি। তবে ব্যাটিংয়ে এখনও কিছু জায়গায় উন্নতি প্রয়োজন।’’
আজকের জয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে পেছনে বাংলাদেশ র্যাংকিংয়ে এগিয়ে এসে নয়ে। সরাসরি বিশ্বকাপে খেলার চিন্তায় সামনে প্রতিটি ম্যাচে বাড়তি মনোযোগ দেওয়ার কথা বলেছেন মিরাজ, ‘‘আমাদের জন্য প্রতিটি পয়েন্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সামনে ২০২৭ ক্রিকেট বিশ্বকাপ খেলা আছে। সেই বিশ্বকাপে সরাসরি জায়গা নিশ্চিত করতে হলে প্রতিটি সিরিজ ও ম্যাচ জেতার দিকে আমাদের মনোযোগ দিতে হবে।’’
ঢাকা/ইয়াসিন