ঢাকা     শুক্রবার   ০৯ জানুয়ারি ২০২৬ ||  পৌষ ২৫ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

আগুন পোহাতে গিয়ে অগ্নিদগ্ধ বাড়ছে, রমেক হাসপাতালে রোগী ৫ গুণ

আমিরুল ইসলাম, রংপুর || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:১২, ৮ জানুয়ারি ২০২৬  
আগুন পোহাতে গিয়ে অগ্নিদগ্ধ বাড়ছে, রমেক হাসপাতালে রোগী ৫ গুণ

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে ৫ গুণ অগ্নিদগ্ধ রোগী ভর্তি রয়েছে।

উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে শীত নিবারণে আগুন পোহাতে গিয়ে প্রতিদিনই অগ্নিদগ্ধের ঘটনা ঘটছে। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে গত তিন সপ্তাহে অর্ধশতাধিক অগ্নিদগ্ধ রোগী ভর্তি হয়েছেন। চলতি শীত মৌসুমে এ সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়েছে। আক্রান্তদের বেশিরভাগই শিশু ও বয়োবৃদ্ধ নারী। ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ রোগীর চাপে চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। 

বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার গোয়ালটলি ইসলামপুর এলাকার দিনমজুর দুলাল হকের প্রথম শ্রেণিপড়ুয়া মেয়ে লামিয়া আখতার পোড়া ক্ষতের তীব্র যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। শয্যাশায়ী লামিয়ার পাশে বসে কাঁদছেন তার মা মিষ্টি বানু।

আরো পড়ুন:

মা মিষ্টি বানু জানান, গত রবিবার (৪ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় তীব্র শীতে বাড়ির উঠানে আগুন পোহাতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয় তার মেয়ে। মুখ থেকে শুরু করে শরীরের প্রায় ৬৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। প্রথমে ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া হলেও অবস্থার অবনতি হলে তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “গরীব মানুষ আমরা। শীতে আগুন পোহাতে গিয়ে চোখের সামনে আমার মেয়েটা পুড়ে গেল। শরীরের জামাকাপড়ে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছিল। তখন মেয়েটা দৌড়ে পাশের বাড়ির পাম্পের পানিতে লাফ দেয়। এখন ওর শরীরের অবস্থা খারাপ। ওর কষ্ট সহ্য করতে পারছি না।”

হাসপাতালটির বার্ন ইউনিট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে লামিয়ার মতো অন্তত ৬০ জন অগ্নিদগ্ধ রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৫০ জনই আগুন পোহাতে গিয়ে দগ্ধ হয়েছেন। তাদের শরীরের ২৫ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত পুড়ে গেছে। মাত্র ১৪ শয্যার এই ইউনিটে রোগীর চাপ সামাল দিতে বিভিন্ন ওয়ার্ড ও করিডোরে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। 

এমন বাস্তবতায় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. শাহীন শাহ বলেন, “রোগীর সংখ্যা আমাদের ধারণক্ষমতার অনেক বেশি। বান বিভাগ একটি সেনসিটিভ বিভাগ। এতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, জনবল ও সরঞ্জাম সংকটের মধ্যে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। তারপরও আমরা সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।”

তিনি আরও বলেন, ‘‘১৪ শয্যার রোগীদের জন্য বরাদ্দকৃত সরঞ্জাম দিয়ে ৪ থেকে ৫ গুণ রোগীর সেবা দেওয়া হচ্ছে। এতে সরঞ্জাম সংকটে পড়তে হচ্ছে। লোকবলও সংকট রয়েছে। গত শীত মৌসুমে শুধু আগুন পোহাতে গিয়ে দগ্ধ ৫০৬ রোগীর অপারেশনের মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এবার শীতের শুরুতে এই সংখ্যা শতাধিক ছাড়িয়েছে। বর্তমানে ৬০ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। যাদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।’’ 

শীতকালে আগুন পোহাতে অসতর্কতায় এসব দুর্ঘটনার প্রধান কারণ উল্লেখ করে তিনি সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। 

শীতজনিত রোগে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডেও চাপ পড়েছে। গাদাগাদি করে চিকিৎসা নিতে গিয়ে সেবা ব্যাহত হচ্ছে বলে স্বজনেরা অভিযোগ করেছেন। হাসপাতাল সূত্র জানায়, চলতি সপ্তাহে শীতজনিত জটিলতায় অন্তত ছয় শিশুর প্রাণ গেছে। আর চলতি শীত মৌসুমে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ জনে। 

নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার টেঙ্গনমারী এলাকার আব্দুস সাত্তারের স্ত্রী জমিলা বেগম তার ৯ মাস বয়সী নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুকন্যাকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। তিনি বলেন, “একটি বেডে চারজন করে শিশু রেখে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। পাঁচ দিন ধরে হাসপাতালে আছি। মেয়ে এখন কিছুটা সুস্থ হলেও ভোগান্তি কমছে না। প্রতিনিয়ত শিশু মৃত্যুর খবর শুনে আতঙ্কে থাকি।”

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বলেন, হাসপাতালটি বর্তমানে ৬০০ শয্যার লোকবল দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। যদিও এটি এক হাজার শয্যায় উন্নীত হয়েছে। তবে জনবল নিয়োগ এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।

তিনি বলেন, “প্রতিদিন হাসপাতালে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার রোগী ভর্তি থাকে। এতে শয্যা বিন্যাস থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে সংকট তৈরি হয়। শীতকালে শিশু ও বয়স্ক রোগীর চাপ বেড়ে যায়।”

বার্ন ইউনিটের সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১৪ শয্যার বিপরীতে এখানে শীতকালে প্রায় অর্ধশতাধিক রোগী ভর্তি থাকে। বহির্বিভাগেও চাপ বেড়ে যায়। তবে এই সংকট কাটাতে আলাদা বার্ন ভবন নির্মাণের দাপ্তরিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলেও জানান তিনি। 

ঢাকা/বকুল

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়