ঢাকা     রোববার   ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  মাঘ ১৯ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

সংসদ হোক গণমানুষের প্রতিষ্ঠান: দিলরুবা নূরী

এনাম আহমেদ, বগুড়া || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২২:৪১, ৩১ জানুয়ারি ২০২৬  
সংসদ হোক গণমানুষের প্রতিষ্ঠান: দিলরুবা নূরী

নির্বাচনি প্রচারে বগুড়ায় বাসদ মনোনীত গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী দিলরুবা নূরী। ছবি: রাইজিংবিডি

‘কোটিপতি, দুর্বৃত্ত আর সাম্প্রদায়িক অপশক্তির ক্লাব নয়, সংসদ হোক গণমানুষের অধিকার আদায়ের প্রতিষ্ঠান’-এই শ্লোগান সামনে রেখে বগুড়া শহরের বিভিন্ন এলাকা ছুটে বেড়াচ্ছেন বাসদ মনোনীত গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী অ্যাডভোকেট দিলরুবা নূরী।

নির্বাচনি প্রচারে তিনি ব্যবহার করছেন ছোট একটি বাহন। বগুড়া-৬ (সদর) আসনে মই প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে লড়ছেন তিনি।

আরো পড়ুন:

এই প্রথম নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন দিলরুবা নূরী। তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মতো হেভিওয়েট প্রার্থী। এই আসনে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৫ জন প্রার্থী। বগুড়া জেলার ৭টি আসনের ৩৪ জন প্রার্থীর মধ্যে একমাত্র নারী প্রার্থীও তিনি। সে কারণে নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়েই এগোতে হচ্ছে তাকে। তবে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী নূরী সাম্যের সমাজ বিনির্মাণের প্রত্যয়ে শ্রমজীবী ভোটারদের দ্বারে ছুটছেন।

২০০৩ সালে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের মাধ্যমে রাজনৈতিক জীবন শুরু দিলরুবা নূরীর। ২০২২ সাল থেকে বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) বগুড়া জেলার সদস্য সচিব এবং সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া নারী সংগঠনের জেলা শাখার সভাপতিও তিনি।

নূরীর নির্বাচনি হলফনামা থেকে জানা গেছে, তার নগদ টাকা মাত্র ১০ হাজার আর মাত্র ৫৪ শতাংশ জমির মালিক তিনি।নির্বাচনি ব্যয়ের জন্য পেশাগত আয় থেকে তিনি খরচ করছেন ৩০ হাজার টাকা। এর বাইরে গণ-অর্থ সংগ্রহ এবং আত্মীয়-স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছ থেকে পাওয়া ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা ভোটের মাঠে খরচ করবেন তিনি।

ভোটের মাঠের অবস্থা, চ্যালেঞ্জ, মোকাবিলাসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা হয় অ্যাডভোকেট দিলরুবা নূরীর সঙ্গে। ভোটের মাঠে নামার পর নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, “অনেক ভোটারই মনে করছেন আমি সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থী। তাই সরাসরি সংসদীয় আসনে নির্বাচন করছি এটা তাদেরকে বারবার বুঝিয়ে বলতে হচ্ছে। এতে বোঝা যায়, সমাজ এখনো নারীকে সরাসরি নির্বাচনে দেখার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়, আর এই মানসিকতা ভাঙতেই আমাকে লড়াই করতে হচ্ছে।”

তিনি বলেন, “আমার রাজনীতি শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে। অল্প অর্থ নিয়ে, সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে থেকেই প্রচার চলছে। সেখানে বিপুল অর্থ, পেশিশক্তি আর প্রভাবশালী প্রার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করাটা অবশ্যই চ্যালেঞ্জ। এছাড়া ভোটারদের মধ্যে পুরনো মার্কার প্রতি মোহ কাজ করছে। ৫৪ বছর ধরে মানুষ যে মার্কার রাজনীতিতে অভ্যস্ত, সেখান থেকে বের হয়ে নিজের ‘মই’ মার্কা পৌঁছে দিতে অনেক চেষ্টা করতে হচ্ছে।”

নূরী বলেন, “প্রচার শুরু হওয়ার পর থেকেই দেখছি, আচরণবিধির জায়গায় কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো থাকছে না। একের পর এক আচরণবিধি ভেঙে তারা সকাল ১০টা থেকেই নির্বাচনি সমাবেশ করছে, আবার ২টার আগেই প্রচার চালাচ্ছে। আমাদের ক্ষেত্রে নিয়ম হচ্ছে, একই সঙ্গে তিনটার বেশি মাইক ব্যবহার করা যাবে না, তিনটার বেশি হর্ন ব্যবহার করা যাবে না, ২টার আগে মাইক ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু অন্য রাজনৈতিক দলগুলো সেগুলো প্রকাশ্যেই করছে। তফসিল ঘোষণার আগে যে রঙিন পোস্টারগুলো তারা লাগিয়েছে, সেগুলো এখনও দিব্যি ঝুলছে। অথচ নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো কঠোর ভূমিকা আমরা দেখতে পাচ্ছি না। এই যে নিয়ম ভাঙার একটা রাজনৈতিক সংস্কৃতি, তারা সেটার মধ্য দিয়েই আইন তৈরির জায়গায় যেতে চায়। আর আমি যাচ্ছি শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে আইন তৈরি করতে, সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য।”

নারী প্রার্থী হিসেবে লড়াইটা কঠিন উল্লেখ করে তিনি বলেন, “যুক্তি দিয়ে, কথা বলে মানুষকে বোঝাতে হচ্ছে। তবে তিনি ভোটারদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষ, রিকশাচালক, হকার, ছোট দোকানদাররা তাকে আপন করে নিচ্ছেন।”

তিনি বলেন, “সংগ্রামী নারীরাও পাশে দাঁড়াচ্ছেন। পারিবারিক ও সামাজিক লড়াইয়ে থাকা নারীরা মনে করছেন, নারীদের এগিয়ে যাওয়ার জন্য একজন নারী প্রার্থী দরকার। এসব মিলিয়ে ভোটারদের কাছ থেকে মিশ্র হলেও আশাব্যঞ্জক প্রতিক্রিয়া পাচ্ছি।”

নির্বাচনি প্রচার করছেন দিলরুবা নূরী। 


সাংগঠনিক শক্তি তুলনামূলক কম হলেও নিজ নিজ এলাকায় থাকা নেতাকর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তার পক্ষে কাজ করছেন বলে জানান নূরী। তিনি বলেন, “স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও মানুষ খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের মৌলিক অধিকার পুরোপুরি পায়নি। বগুড়ায় কর্মসংস্থানের সংকট তীব্র, কৃষক ন্যায্য দাম পায় না, শ্রমিক কাজের অভাবে অনিশ্চিত জীবনযাপন করছে। আমি নির্বাচিত হলে কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা, সরকারি উদ্যোগে সার-বীজ সরবরাহ ও ক্রয়কেন্দ্র চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি স্নাতক পর্যন্ত শিক্ষাব্যয় ফ্রি করা, জলাবদ্ধতা দূর করা, রাস্তা প্রশস্ত করে যানজট কমানোর পরিকল্পনাও আছে।”

নারী ভোটারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “বগুড়ায় নারী নিরাপত্তা আজো সংকট। ঘরে-বাইরে কোথাও নারীরা নিরাপদ নয়। এই বাস্তবতা পরিবর্তনে সংসদে গিয়ে নারীবান্ধব আইন করতে চাই। বগুড়ায় ৫২ শতাংশ নারী ভোটার, তাদের সমর্থন পেলে জয় সম্ভব।”

বগুড়া-৬ (সদর) এই আসনটি জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত আসনগুলোর একটি। এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৪৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২২ হাজার ৭৯৬ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৩১ হাজার ২৩৭ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গ ভোটার রয়েছেন ১০ জন।

২০০৮ সাল পর্যন্ত সব জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসনটি বিএনপির দখলে ছিল। এর মধ্যে ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত চারবার সংসদ সদস্য হন খালেদা জিয়া। ২০১৪ সালে এই আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জাপার নুরুল ইসলাম বিজয়ী হন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তবে তিনি শপথ না নেওয়ায় উপনির্বাচনে বিএনপির গোলাম মো. সিরাজ বিজয়ী হন। পরে দলীয় সিদ্ধান্তে পদত্যাগ করলে আরেকটি উপনির্বাচনে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রাগেবুল আহসান বিজয়ী হন। ২০২৪ সালের নির্বাচনেও তিনি জয়ী হন।

এবার এই আসনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বগুড়া শহর জামায়াতের আমির আবিদুর রহমান সোহেল, বাসদের প্রার্থী হিসেবে জেলা কমিটির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট দিলরুবা নূরী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আবু নুমান মো. মামুনুর রশিদ এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জেএসডির আব্দুল্লাহ আল ওয়াকি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

ঢাকা/এসবি 

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়