চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভোটের মাঠে আতঙ্ক বাড়াচ্ছে লুট হওয়া অস্ত্র
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়। ফাইল ফটো।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিনটি সংসদীয় আসনে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক সৃষ্টি করছে প্রায় ১৮ মাস আগে লুণ্ঠিত বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র। সাধারণ ভোটাররা বলছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পট পরিবর্তনের দিন জেলার সরকারি মালখানা থেকে খোয়া যাওয়া অস্ত্র দীর্ঘ সময়েও উদ্ধার না হওয়ায় জনমনে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে এই অবৈধ অস্ত্র সহিংসতার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
তবে, জেলার পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস বলছেন, “আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে কোনো ভয় বা নিরাপত্তার ঝুঁকি নেই।”
পুলিশের দায়ের করা মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের দিন উদ্ভূত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে একদল দুর্বৃত্ত সুপরিকল্পিতভাবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সরকারি মালখানায় হামলা চালায়। তারা মেইন গেট ও গোডাউনের তালা এবং সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে প্রায় ৫০টি পিস্তল, ১০০টি ম্যাগাজিন, ২৫০ রাউন্ড গুলি এবং ২০টি ওয়ান শুটার গানসহ বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ লুট করে নিয়ে যায়। পুলিশের নথি অনুযায়ী, আগ্নেয়াস্ত্রসহ সেদিন সরকারি মালখানা থেকে প্রায় ৬০ কোটি টাকার সম্পদ লুট হয়েছিল।
লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ভোটার রফিকুল ইসলাম বলেন, “দেড় বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত সরকারি মালখানা থেকে লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়নি। এ নিয়ে আমরা শঙ্কিত।’
সদর উপজেলার প্রবীণ ভোটার আবুল কালাম বলেন, “ভোটের দিন ঘনিয়ে আসছে, কিন্তু এলাকায় একটা থমথমে ভাব রয়েছে। আমরা সাধারণ মানুষ তো আর অস্ত্র চিনি না, কিন্তু পিস্তল-গুলির খবর শুনলে বুক কাঁপে। লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া মানে একটা অনিশ্চিত ঝুঁকির মধ্যে ভোট দিতে যাওয়া।”
নারী ভোটার শাজনাহ বেগম বলেন, “নির্বাচন মানেই উৎসব হওয়ার কথা, সেখানে লুণ্ঠিত অস্ত্রের খবর আমাদের ঘরের বাইরে বের হতে ভয় ধরাচ্ছে। নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত ছিল ভোটের আগেই বিশেষ অভিযান চালিয়ে অন্তত কিছু অস্ত্র উদ্ধার করে আমাদের আশ্বস্ত করা।”
চাঁপাইনবাবগঞ্জ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মোহা. মোজাজ্জেম হোসেন মেহেদী বলেন, ‘যে কোনো মুহূর্তে শান্ত পরিবেশকে অস্থিতিশীল করতে পারে অপরাধীরা। লুট হওয়া অস্ত্রের মাধ্যমে ভয়াবহতা ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হতে পারে।”
সরকারি মালখানা লুটের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলাটির তদন্তে ‘ঢিমেতাল’ গতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন নাগরিকরা। এ প্রসঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আইনজীবী নূরে আলম সিদ্দিকী আসাদ বলেন, “এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার তদন্ত কার্যক্রমে কোনো অগ্রগতি নেই; তদন্তে গাফিলতি রয়েছে। অস্ত্র লুট হওয়ার ঘটনায় বিভিন্ন উপজেলা থেকে কয়েকজনকে আটক করা হলেও তাদের কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে পুলিশ ব্যর্থ হয়েছে। লুট হওয়া এসব অস্ত্র দীর্ঘদিনেও উদ্ধার না হওয়ায় এখন সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে।’
মামলার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সদর মডেল থানার ওসি (তদন্ত) সুকমল দেবনাথ বলেন, “লুটের মামলায় এখন পর্যন্ত দুটো মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। কোনো আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এই মামলায় ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, তারা এখন জামিনে আছেন।”
নির্বাচনের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে আশ্বস্ত করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস। তিনি বলেন, “আমরা এখনো এমন কোনো তথ্য পাইনি যে- এসব অস্ত্র কোথাও প্রদর্শন হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আমরা সবসময় প্রস্তুত আছি। আমাদের সঙ্গে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও র্যাব সবাই রয়েছে।”
তিনি বলেন, “আশা করছি, আমরা একটি সুন্দর ও সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে পারব। আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে কোনো ভয় বা নিরাপত্তার ঝুঁকি নেই।”
ঢাকা/মেহেদী/মাসুদ