ঢাকা     সোমবার   ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  ফাল্গুন ১১ ১৪৩২ || ৬ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

বান্দরবানে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ১৫ ছাত্রকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ

বান্দরবান প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:০৯, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   আপডেট: ১৯:০৯, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বান্দরবানে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ১৫ ছাত্রকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ

বান্দরবান সরকারি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে ১৫ ছাত্রকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে।

ভুক্তভোগী ৮ থেকে ১০ জন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অকৃতকার্য করার ভয় দেখানো এবং অকৃতকার্য ছাত্রদের পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ করে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের ওপর যৌন নির্যাতন চালানো হয়।

আরো পড়ুন:

দুজন শিক্ষার্থী-অভিভাবক ও মানবাধিকারকর্মী ডনাইপ্রু নেলীসহ অন্য শিক্ষার্থীরা গত ১০ ফেব্রুয়ারি জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পর বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। অভিযোগ জানাজানি হওয়ার পর থেকে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত আছেন।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, “বান্দরবান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সিরাজ স্যার আমাদের সাথে অনৈতিক কাজে লিপ্ত হওয়ার জন্য চেষ্টা করেন। আমাদের নিতম্বে হাত দেয়। স্যারের রুমে যেতে বলেন।”

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রধান শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে দরিদ্র পরিবার ও দুর্বল ছাত্রদের টার্গেট করেন। পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ব্যক্তিগত কক্ষে ডেকে নিয়ে যৌন নিপীড়ন করা হতো। এরইমাঝে ১৫ জনের অধিক ছাত্রকে যৌন নিপীড়নের করার অভিযোগ উঠেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বলেছেন, “হেড স্যার প্রথমে কাঁধে হাত রাখা থেকে শুরু করে পরে শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিতো। ভয় ও লজ্জায় আমি প্রথম দিকে পরিবারকে জানাইনি। তবে, অভিযোগের পর ডিসি স্যারের কাছে বিস্তারিত জানিয়েছি।”

নবম শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন,  স্কাউট কার্যক্রমে স্বাক্ষরের অজুহাতে ডেকে নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক স্পর্শ করা হয়। একদিকে ভয়, সামাজিক লজ্জা এবং শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় দীর্ঘদিন বিষয়টি গোপন রাখতে বাধ্য হতে হয়।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভুক্তভোগীর অভিভাবক বলেন, “পরীক্ষায় ফেল করার ভয় দেখিয়ে আমাদের সন্তানদের সঙ্গে যে অপরাধ করা হয়েছে, তা ক্ষমার অযোগ্য। আমরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”

ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থীর বাবা বলেন, “তার ছেলে অষ্টম শ্রেণিতে একবার অকৃতকার্য হলে পুনরায় অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি করানো হয়। পরে সে উত্তীর্ণ হয়ে নবম শ্রেণিতে ওঠে, কিন্তু সেখানে পাঁচটি বিষয়ে খারাপ ফল করে। এ অবস্থায় প্রধান শিক্ষক তাকে দশম শ্রেণিতে উন্নীত না করার কথা জানান।”

পরে তিনি ছেলেকে আবার নবম শ্রেণিতে রাখেন এবং প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। প্রধান শিক্ষক তাকে পরামর্শ দেন যে, শিক্ষক নিজেও গাইড দেবেন এবং অভিভাবকও গাইড করবেন। সেই অনুযায়ী তার ছেলেকে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর প্রধান  শিক্ষকের কাছে পড়তে পাঠানো হয়। শিক্ষক ছয় মাস পর্যবেক্ষণের পর ভালো করলে তাকে দশম শ্রেণিতে উন্নীত করার আশ্বাস দেন।

কিন্তু, অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময় শিক্ষকের কাছে পড়তে যাওয়ার পর তার ছেলের সঙ্গে অনৈতিক ও খারাপ কাজ করা হয়। ঘটনার পর থেকে তার ছেলে আর ওই শিক্ষকের কাছে যেতে চায় না। এ ঘটনায় তিনি ন্যায়বিচার দাবি করেছেন।

অপর এক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর অভিভাবক জানান, গত ৮ ফেব্রুয়ারি তিনি তার নাতিকে একটি অঙ্গীকারনামা নিয়ে প্রধান শিক্ষকের কাছে নিয়ে যান। শিক্ষক তাকে নাতিকে রেখে চলে যেতে বলেন। তিনি নাতিকে শিক্ষকের কক্ষে রেখে নিচে নেমে আসেন। প্রায় এক ঘণ্টা পর নাতি কক্ষ থেকে বের হয়ে আসে, তখন তার চেহারায় আতঙ্ক ও ভয় স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়। ভুক্তভোগীরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

শুধু শিক্ষার্থী নয়, বিদ্যালয়ের একাধিক কর্মচারীও প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলেছেন।

বিদ্যালয়ের এক কর্মচারী বলেন, “অফিস সময়ের বাইরে সন্ধ্যায় প্রধান শিক্ষকের কক্ষে ডেকে নিয়ে দরজা-গেট বন্ধ করে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ করা হয়। বাধা দিলে তাকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হবে বলে ভয় দেখায়। তার মতো আরো কয়েকজন কর্মচারী একই ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।

বিদ্যালয়ের অস্থায়ী অফিস সহায়ক শিল্পী রাণী দে বলেন, “স্কুল ছুটির পর একাধিক শিক্ষার্থীকে প্রধান শিক্ষকের কক্ষে ডাকা হতো এবং কক্ষের গেট তালাবদ্ধ রাখা হতো।”

তিনি বিষয়টি অন্য শিক্ষকদের জানালে তাকে ‘ছোট কর্মচারী’ বলে চুপ থাকতে বলা হয়। পরে তিনি অভিভাবকদের অবহিত করলে তাকে নোটিশ ছাড়াই চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। বিষয়টি জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ যাওয়ার পর তাকে পুনর্বহাল করা হয়।

বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক শাহ মোহাম্মদ রেজাউল বলেন, “হেডমাস্টার বিরুদ্ধে ছাত্ররা ডিসি স্যারের বরাবর অভিযোগ দিয়েছেন, এমন খবর পেয়েছি। তবে, কী বিষয়ে অভিযোগ দিয়েছেন, সে বিষয়ে আমার জানানেই।

বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “গত ১০ ফেব্রুয়ারি তারিখের পর থেকে তিনি স্কুলে অনুপস্থিত। আমাকেও ওনার অনুপস্থিতিতে  মৌখিক বা লিখিত কোনো দায়িত্ব অর্পণ করেননি।”

বিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষক মুশফিকুর রহমান বলেন, “ঘটনা আমরা প্রথমে অস্থায়ী  কম্পিউটার অপারেটর মো. রায়হান, কৃষ্ণ কান্তি দাশ, অমিত দে, ওমর ফারুক ও আজিমদের কাছ থেকে প্রধান শিক্ষকের যৌন নিপীড়নের বিষয়গুলো জেনেছি। পরে ভুক্তভোগী কয়েকজন শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সরাসরি শুনেছি। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়েও ডাকা হয়েছে। আমরা আটজন শিক্ষকও সেখানে গিয়েছি। ঘটনার  লিখিত বর্ণনা জমা দিতে বলেছে তদন্ত কিমিটি। আমরা সবাই লিখিত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি।”

জেলা মানবাধিকার কর্মী ডনাইপ্রু নেলী বলেন, “গত ১০ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার দুপুরে বান্দরবান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভুক্তভোগী ছাত্র ও অভিভাবকরা প্রধান শিক্ষক মো. সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে তার শোবার রুমে ডেকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ নিয়ে জেলা সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন অফিসে এসেছিল। পরে ভুক্তভোগী, অভিভাবক ও মানবাধিকারকর্মী অংচমং দাদাকে সঙ্গে নিয়ে জেলা প্রশাসককে অবহিত করি। ছাত্র ও অভিভাবকেরা আমাদের সামনে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে  ডিসি বরাবর  লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছে।”

জেলা উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মো.জসিম উদ্দিন বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত লজ্জার ও নিন্দনীয়। ভুক্তভোগী ছাত্র, ছাত্রদের অভিভাবক বিষয়টি লিখিত বা মৌখিক আমাকে জানায়নি। তবে, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বুধবার সকালে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে ডেকে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে আমাকে তলব করা হয়। আমার কাছে যদি কোনো অভিযোগ আসে, তাহলে ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষকে যথাযথ আনইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অবহিত করব।”

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম অঞ্চলের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা উপ-পরিচালক মুহাম্মদ ফরিদুল আলম হোসাইনী বলেন, “বান্দরবান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ বিষয়ে আমাকে জানানো হয়নি। জেলা উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগও দেওয়া হয়নি।”

এক সপ্তাহ ধরে বিদ্যায়লের প্রধান শিক্ষকের অনুপস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমার কাছে প্রধান শিক্ষক ছুটির আবেদন করেননি কিংবা মৌখিকভাবেও জানাননি।”

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক শামীম আরা রিনি জানান, বিদ্যালয়ের ভুক্তভোগী ছাত্ররা লিখিত অভিযোগ করেছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত চলছে। যদি প্রমাণিত হয়, একজন শিক্ষক হিসেবে ছাত্রের সাথে এমন আচরণ ও অপরাধের জন্য শুধু স্থায়ীভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত নয়, উপযুক্ত শাস্তি হওয়া উচিত।

এ বিষয়ে জানতে বান্দরবান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক মো. সিরাজুল ইসলামের অফিসে একাধিকবার গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।  এক সপ্তাহ ধরে তার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

ঢাকা/চাই মং/জান্নাত

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়