ঢাকা     রোববার   ১২ এপ্রিল ২০২৬ ||  চৈত্র ৩০ ১৪৩২ || ২৪ শাওয়াল ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

জ্বালানি সংকট: মোংলা বন্দরে পণ্য খালাসে অচলাবস্থা 

বাগেরহাট প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২১:০৬, ১২ এপ্রিল ২০২৬  
জ্বালানি সংকট: মোংলা বন্দরে পণ্য খালাসে অচলাবস্থা 

জ্বালানি তেলের সংকটে পড়েছে মোংলা সমুদ্র বন্দরে পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত লাইটার জাহাজগুলো। তেলের সংকটে লাইটার জাহাজগুলো বন্দরে আসা বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে পণ্য খালাস ও পরিবহন করতে পারছে না। এতে বন্দরের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। এমন অচলাবস্থা আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের জন্য বড় লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

লাইটার জাহাজের মালিকরা বলছেন, জ্বালানির অভাবে অধিকাংশ লাইটার জাহাজ অলস বসে থাকায় মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। বন্দরের বহির্নোঙরে মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস ব্যাহত হওয়ায় জাহাজের (টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম) নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত অবস্থান বেড়ে যাচ্ছে। এতে জরিমানা হিসেবে বাড়তি টাকা গুনতে হয় আমদানিকারকদের। সব মিলিয়ে আমদানিকৃত খাদ্যশস্য, সার ও শিল্প কলকারখানার কাঁচামাল খালাস ও পরিবহনে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।

আরো পড়ুন:

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে চট্টগ্রামের ডিপোগুলো থেকে প্রয়োজনীয় তেল পাচ্ছেন না বলে লাইটার জাহাজের মালিকরা জানান। তারা জানান, রাষ্ট্রীয় জ্বালানি সরবরাহকারী সংস্থা পদ্মা, যমুনা ও মেঘনা থেকে খুব কম পরিমাণে তেল পাচ্ছেন, যা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। এটি দিয়ে চলা যায় না। জ্বালানির এই সংকট নিরসন চেয়ে লাইটার জাহাজ মালিকদের সংগঠনের পক্ষ থেকে দফায় দফায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী বরাবরে চিঠি দিলেও কোনো সমাধান মেলেনি। ফলে জাহাজ ঘাটে আটকে আছে।

বন্দরের বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে ভোগ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামালসহ বিভিন্ন পণ্য স্থানান্তর করে লাইটার জাহাজে নেওয়া হয়। এরপর নদীপথে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের নানা ঘাটে নিয়ে খালাস করা হয়। তেলের সংকটে লাইটার জাহাজগুলো বন্দরে আসা বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস ও পরিবহন করতে পারছে না।

মোংলা বন্দরের পশুর নদীতে শত শত খালি লাইটার জাহাজ গত কয়েক দিন ধরে অলস বসে আছে। একই অবস্থা খুলনা-রূপসাসহ চার ও পাঁচ নম্বর ঘাট এলাকায়। সেখানেও শত শত লাইটার জাহাজ আটকা। তেল সংকটে সেগুলো চলাচল করানো যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে বন্দরে অবস্থানরত বাণিজ্যিক জাহাজগুলো থেকে পণ্য খালাসে লাইটার জাহাজের সংকট দেখা দিয়েছে। মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস একেবারে স্থবির হয়ে আছে। পণ্য খালাস না হওয়ায় কাঁচামাল সংকটে উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে।

এমভি আর রশিদ-১ লাইটার জাহাজের মাস্টার মোহাম্মদ রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘‘জ্বালানি তেল না পাওয়ায় বন্দরে আসা বাণিজ্যিক জাহাজগুলো থেকে পণ্য খালাস করতে যেতে পারছি না। গত এক সপ্তাহ ধরে পশুর নদীতে লাইটার জাহাজটি আটকে আছে। আমরা তেল পাচ্ছি না।’’

এমভি মিমতাজ লাইটার জাহাজের মালিক মো. খোকন বলেন, ‘‘আমার লাইটার জাহাজে তেল সরবরাহের জন্য মোংলা বাজারের তেল ব্যবসায়ী এসকে এন্টারপ্রাইজকে বলা হয়েছে। কিন্তু ওই প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে ডিপো থেকে তাদের ডিলারকে চাহিদা মতো তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না। তাই তারা আমাদের তেল দিতে পারছেন না। একই অবস্থা সব জাহাজের। তেলের সংকটে কোনো জাহাজ পণ্য খালাস করতে পারছে না।’’

রূপসা এলাকায় অবস্থানরত সেভেন সার্কেল সিমেন্ট কারখানার উৎপাদন বিভাগের কর্মকর্তা মো. মামুন বলেন, ‘‘বন্দরে সিমেন্টের কাঁচামাল নিয়ে আসা আমাদের বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে লাইটার জাহাজ সংকটের কারণে পণ্য খালাস করতে পারছি না। এর ফলে প্রতিদিন বাণিজ্যিক জাহাজকে ১৭ হাজার মার্কিন ডলার মাশুল দিতে হচ্ছে। যত দেরি হচ্ছে, তত মাশুল বাড়ছে। আমাদের কারখানায় কাঁচামালেরও সংকট দেখা দিয়েছে। আবার লাইটার জাহাজ সংকটে কারখানার উৎপাদিত সিমেন্ট বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো যাচ্ছে না।’’

শেখ সিমেন্ট কারখানার এজিএম আজাদুল হক বলেন, ‘‘জ্বালানি সংকটের কারণে বন্দরে অবস্থানরত বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে কাঁচামাল আমাদের কারখানায় নিতে পারছে না লাইটার জাহাজ। আমাদের মালিকানায় সিমেন্ট ও অটোরাইচ মিলে কাঁচামালের সংকট দেখা দিয়েছে। উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এতে কারখানায় কর্মরত শ্রমিকরাও বসে আছে। কাঁচামাল নিয়ে বন্দরে জাহাজ এসে আটকে আছে। কিন্তু খালাস করতে পারছে না লাইটার জাহাজগুলো। তেলের সংকট। আমরা নিরুপায় হয়ে বসে আছি।’’

মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের মোংলার মেরিন ডিলার ও এজেন্ট মেসার্স নুরু অ্যান্ড সন্সের মালিক এইচ এম দুলাল বলেন, ‘‘সরকার খাল খনন, নদী ড্রেজিং, কৃষি উৎপাদন, আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধিসহ নানা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর ফলে তেলের চাহিদা বেড়েছে। মোংলা বন্দরে বাণিজ্যিক জাহাজের আগমনও বেড়ে গেছে। আগের চেয়ে বেশি লাইটার জাহাজ জ্বালানি তেল নিতে মোংলায় আসছে। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী ডিপো থেকে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না আমাদের। তাই আমরা তেল দিতে পারছি না।’’

মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের মোংলার ম্যানেজার (অপারেশনস) প্রকৌশলী প্রবীর হীরা বলেন, ‘‘আমরা চেষ্টা করছি ডিলার বা এজেন্টদের তেল সরবরাহ করতে। তবে যেহেতু যুদ্ধের একটি প্রভাব রয়েছে, সেহেতু তেলের প্রাপ্যতা কম থাকায় সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক সরবরাহ করা হচ্ছে।’’
 

ঢাকা/আমিনুল/বকুল

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়