সবুজ সংকটে সিলেট অঞ্চল
মোসাইদ রাহাত, সিলেট || রাইজিংবিডি.কম
সিলেট অঞ্চলের উপকণ্ঠে এক সময়ের সবুজ টিলা এখন কংক্রিটে ঢেকে যাচ্ছে। কোথাও কাটা পাহাড়, কোথাও নতুন বসতির ফলে চোখে পড়ছে দ্রুত বদলে যাওয়া দৃশ্য। গত এক দশকের বেশি সময়ে সিলেট অঞ্চলে গাছের সবুজ আচ্ছাদন কমার এই প্রবণতা এখন গবেষণা ও আন্তর্জাতিক ডাটাতেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচ- এর স্যাটেলাইটভিত্তিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সিলেট অঞ্চলে প্রায় ৮ দশমিক ৭ হাজার হেক্টর বৃক্ষ আচ্ছাদন (ট্রি কভার) হারিয়েছে। এটি ২০০০ সালের মোট বৃক্ষ আচ্ছাদনের প্রায় ৭ শতাংশের সমান। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই কমেছে গত এক দশকে, বিশেষ করে ২০১৪-২০২৩ সময়কালে ক্ষতির গতি বেড়েছে। এই সময়ে বন উজাড়ের কারণে আনুমানিক ৪ দশমিক ৩ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড সমতুল্য নিঃসরণ হয়েছে বলে হিসাব পাওয়া গেছে।
সেখানে আরো বলা হয়, ২০০১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সিলেট বিভাগের মোট বৃক্ষ আচ্ছাদন ক্ষতির প্রায় ৫৯ শতাংশই ঘটেছে একটি জেলাতেই। একই সময়ে মৌলভীবাজার একাই হারিয়েছে প্রায় ৫ দশমিক ১ হাজার হেক্টর বনভূমি, যা পুরো অঞ্চলের মধ্যে সর্বোচ্চ। এরপর রয়েছে হবিগঞ্জ, যেখানে এই সময়ে বনভূমি ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ দশমিক ৬ হাজার হেক্টর। তুলনামূলকভাবে সিলেট জেলায় ক্ষতি হয়েছে ৭৪০ হেক্টর এবং সুনামগঞ্জে ২৩০ হেক্টর।
সিলেট নগরের খাদিমনগর, টিলাগড়, এয়ারপোর্ট রোড ও উপশহর এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, যেসব এলাকায় আগে ঘন সবুজ ছিল, সেখানে এখন বাড়ি ও বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে।
নগরীর চৌখিদেখি এলাকার বাসিন্দা ইব্রাহিম আহমদ বলেন, “আগে চারদিকে গাছপালা ছিল, এখন শুধু ধুলা আর গরম।”
আন্তর্জাতিক ওপেন-অ্যাক্সেস গবেষণা জার্নাল প্রকাশক প্রতিষ্ঠান এমসডিপিআইতে প্রকাশিত ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন সংক্রান্ত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সিলেট অঞ্চলে ২০০০ সালের পর থেকে জমি বা এলাকা প্রাকৃতিক অবস্থা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে, আর একই সঙ্গে কমেছে প্রাকৃতিক বনভূমি।
গবেষণায় বলা হয়, গত দুই দশকে সিলেট অঞ্চলের তিনটি কৃষি মৌসুমেই তাপমাত্রাজনিত চাপ স্পষ্টভাবে বেড়েছে। ২০০৫ সালে যেখানে অধিকাংশ এলাকায় কম থেকে মাঝারি মাত্রার চাপ ছিল, ২০২৫ সালে এসে তা অনেক স্থানে উচ্চ ও তীব্র পর্যায়ে পৌঁছেছে। সিলেটজুড়ে উদ্ভিদ আচ্ছাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে এবং ভূ-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়ছে। পূর্ব সিলেটের জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট এলাকায় এই পরিবর্তন সবচেয়ে তীব্র, যেখানে সবুজ আচ্ছাদন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।
বিশ্ববিখ্যাত পরিবেশ বিষয়ক ইনডেস্ক ‘ন্যাচার’- এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সিলেট জেলায় ভূমি ব্যবহার ও ভূমি আচ্ছাদনে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছে।
গুগল আর্থ ইঞ্জিন ব্যবহার করে করা বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই সময়ে নগর এলাকা দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে জলাশয় ও সবুজ আচ্ছাদনের ওপর। বিশেষ করে বিয়ানীবাজার ও সিলেট সদর উপজেলায় নগরায়নের হার সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। একই সময়ে জলাশয় ও প্রাকৃতিক জলাধার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যা পুরো জেলায় প্রায় ৭৭ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পরিবর্তনের ফলে সিলেট অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও বেড়েছে। তাই টেকসই নগর পরিকল্পনা, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে ইয়ুথ নেট গ্লোবালের এক্সিকিউটিভ কো-অর্ডিনেটর সোহানুর রহমান বলেন, “জলবায়ু ঝুঁকিতে আমরা রয়েছি। বৈশ্বিক তামপাত্রা বাড়ছে সেখানে বাংলাদেশের অবদান আছে। সিলেট একসময় সবুজায়নের জন্য বিখ্যাত থাকলেও এখন সেটি দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে নানা রকমের প্রকল্পের মধ্য দিয়ে। এ ধরিত্রী রক্ষায় আমরা প্রতিনিয়ত সচেতনামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করলেও সরকার থেকে তার জন্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। সরকার যদি পরিবেশের দিকে গুরুত্ব দেয়, তাহলে আমাদের জলবায়ু পরিবর্তের প্রভাব থেকে কিছুটা হলেও মুক্ত থাকব।”
সিলেট বিভাগীয় বন অফিসের সহকারী বন সংরক্ষক মোহাম্মদ নাজমুল আলম বলেন, “সিলেট অঞ্চলের বনায়ন কমেছে অনেক। আমাদের হাতে কয়েকটি পরিকল্পনা রয়েছে। সিলেটকে বৈজ্ঞানিক ও পরিকল্পিত উপায়ে পতিত জমি, নতুন স্থানে বৃক্ষরোপণ করে বন সৃষ্টি ও বনের আয়তন বাড়ানোর প্রক্রিয়ার কাজ চলছে।”
ঢাকা/মাসুদ