আইনে নিষিদ্ধ, তবু ব্ল্যাক লিস্টিংয়ের অভিযোগ, ইউনিয়ন গঠনেও ভয়
আরিফুল ইসলাম সাব্বির, সাভার || রাইজিংবিডি.কম
সাভারের আশুলিয়ায় দীর্ঘদিন পোশাক খাতে কাজ করা শ্রমিক মো. মাইনুদ্দিন এখন কার্যত বেকার। প্রায় ১৫ বছর বিভিন্ন কারখানায় কাজ করার পর ২০২৪ সালের অক্টোবরে আন্দোলনের জেরে চাকরি হারান তিনি। এরপর থেকে একাধিক কারখানায় চাকরি খুঁজেও সফল হননি। তার অভিযোগ, বিজিএমইএ’র তথাকথিত ‘কালো তালিকায়’ নাম ওঠায় কোথাও তিনি চাকরি পাচ্ছেন না।
মাইনুদ্দিন বলেন, “আমি স্কাই লাইন কারখানায় চাকরিরত ছিলাম। সেখানে আন্দোলন হলে এরপর অনেকের মতো আমিও চাকরি হারাই। এরপর থেকে আর চাকরি পাচ্ছি না। গেল কিছু দিনের মধ্যে আমি কলমার ডাইনেস্টি, জামগড়ার প্রীতি গ্রুপসহ বিভিন্ন কারখানায় চাকরির চেষ্টা করি। কিন্তু কোথাও চাকরি পাইনি। কারখানায় বায়োমেট্রিক নেওয়া হয়, সেখানে কী কারণে চাকরি গেলো লেখা থাকে। ওই কারণেই এখন আর চাকরি পাচ্ছি না। ব্ল্যাক লিস্টে ফেলে দিয়েছে।’’
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান আশুলিয়ার ইউনিকর্ন সোয়েটার্স থেকে চাকরি হারানো শ্রমিক মোহাম্মদ শরিফুল ইসলাম। তিনি বলেন, “আমি ইউনিকর্নে প্রায় চার বছরের বেশি চাকরি করেছি। শেষের দিকে আমি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। তখন কারখানায় আন্দোলন চলছিল। পরে যেদিন কারখানায় যাই, দেখি কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ আর ছাঁটাই তালিকা। সেখানে আমার নাম ছিল। এরপর দুই বছর ধরে আমি চাকরি পাচ্ছি না।’’
শরিফুল এখন কখনও ছোট সাব কন্ট্রাক্টের কারখানায়, কখনও দোকানে কাজ করছেন বলে জানান। তার ভাষ্য অনুযায়ী ‘বেকার’ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন তিনি।
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী, কোনো শ্রমিককে চাকরিচ্যুতির পর অন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য করার উদ্দেশ্যে তালিকা তৈরি করা ‘ব্ল্যাক লিস্টিং’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত এবং এটি নিষিদ্ধ। আইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে, মালিকপক্ষ কোনোভাবেই এ ধরনের তালিকা তৈরি বা ব্যবহার করতে পারবে না।
২০২১ সালে বিজিএমইএ পোশাক শ্রমিকদের জন্য একটি বায়োমেট্রিক তথ্যভাণ্ডার চালু করে। এতে শ্রমিকদের ব্যক্তিগত তথ্য, কর্মসংস্থানের ইতিহাসসহ নানা তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। শ্রমিকদের অভিযোগ, এই তথ্যভাণ্ডারই পরে ‘কালো তালিকা’ হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। আন্দোলনের মুখে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এটি বাতিল করে এবং পরে আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়।
তবে বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন বলছেন শ্রমিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইন বিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু বলেন, “এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য ছিল শ্রমিকদের একটি ডাটাবেস তৈরি করা, যা নিঃসন্দেহে ভালো একটি উদ্যোগ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, মালিকপক্ষ এই ডাটাবেস অপব্যবহার করছে, ‘টার্মিনেশন’ বা আইন অনুযায়ী অবসান, যা অন্য মালিকদের কাছে নেতিবাচক বার্তা দেয়। এতে ধারণা তৈরি হয় যে, ওই শ্রমিক হয়তো ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, নেতৃত্ব বা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ফলে তাকে আর চাকরি দেওয়া হয় না।”
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন বলেন, “বর্তমানে সরকার আইন করেছে যে ব্ল্যাক লিস্টিং করা যাবে না। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আমাদের অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, এখানে একটি ফাঁকফোকর রয়ে গেছে। ‘টার্মিনেট’ বা অনুরূপ শব্দ ব্যবহার করে শ্রমিকদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করা হচ্ছে, যা কার্যত ব্ল্যাক লিস্টিংয়ের সমতুল্য।”
অভিযোগ অস্বীকার করে বিজিএমইএ’র জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান বলেন, “আমাদের এখানে ব্ল্যাক লিস্টের সিস্টেম নাই। এটি স্পষ্ট কথা। অনেক আগে এটা ছিল এটা সত্য। তবে এই পদ্ধতি উঠে গেছে। তবে এই বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে আমরা তদন্ত করবো।”
তিনি আরও বলেন, “অনেক সময় দেখা যায়, একজন শ্রমিক প্রয়োজন অনুযায়ী যোগ্য নন। একটা লোক কাজ জানলে তার চাকরির অভাব নেই।”
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও আইন সহায়তা সংস্থা ব্লাস্টের পরিচালক (আইন) অ্যাডভোকেট মো. বরকত আলী বলেন, ‘‘শ্রমিকরা এখনও এই তালিকার কারণে চাকরি পাচ্ছেন না শুনতে পাচ্ছি। নতুন আইনে এই বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এই আইনটার বাস্তবায়ন দেখতে চাচ্ছি। এখন আমরা বিষয়টির দিকে নজর রাখছি। সরকার নিশ্চয়ই আইনটি নিয়ে কাজ করবেন।’’
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ বলেন, ‘‘ব্ল্যাক লিস্টিং এর বিষয়টি প্রতিনিয়তই শুনছি। প্রথম কথা হলো, একজন মানুষ একটা কারখানায় চাকরি করবে সেটা তার বিষয়। একটা শিল্প তো এভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, কোনো একটা কারখানায় চাকরি হারিয়েছে বলে অন্য কারখানায় চাকরি করতে পারবে না, যদি সে নৈতিক কোনো অপরাধে জন্য চাকরি হারায়, এটি হতে পারে না। দেখা যায়, অধিকাংশ চাকরিচ্যুতিই ছোটখাটো বিষয়কে কেন্দ্র করে, সুপারভাইজার পছন্দ করে না, ট্রেড ইউনিয়ন করতে চায়, এসব কারণেও চাকরি যায়। ফলে এটা একটা অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয়।’’
‘‘শিল্পের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। কারণ, একজন শিল্পে ১০ বছর চাকরি করলো, তারপর যদি সে শিল্পে চাকরি না পায়, তার মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। ফলে বিজিএমইএ-র উচিৎ, তদন্ত করে একটা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে আসা,’’ বলেন তিনি।
এদিকে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন নিয়েও শ্রমিকদের মধ্যে ভয় কাজ করছে। শ্রম আইন অনুযায়ী, ইউনিয়ন গঠনের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে শ্রমিকসংখ্যার প্রত্যয়ন নিতে হয়। শ্রমিকদের অভিযোগ, এই নিয়ম ইউনিয়ন গঠনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শ্রমিক বলেন, “আমি প্রত্যয়ন চেয়ে পাইনি। আবার অনেকেই এখন সাহস পাচ্ছেন না।”
গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশের আশুলিয়া কমিটির সভাপতি মো. রাজু আহমেদ বলেন, “ট্রেড ইউনিয়ন করতে গেলে মালিকপক্ষ প্রায়ই বাধা দেয়। অনেক সময় চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়।”
“এই প্রত্যয়নপত্র নেওয়ার জন্য শ্রমিকদের মালিকের কাছে আবেদন করতে হয়। এতে করে যারা এই উদ্যোগে জড়িত, তাদের চিহ্নিত করে ইউনিয়ন গঠনের আগেই চাকরি থেকে বাদ দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়,” বলেন খায়রুল মামুন মিন্টু।
তিনি আরও বলেন, “আইন কিছু ক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন সহজ করেছে, কিন্তু অন্যদিকে এমন কিছু শর্ত আরোপ করা হয়েছে, যা বাস্তবে ইউনিয়ন গঠনকে কঠিন করে তুলছে।”
বিলসের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ বলেন, শ্রমিকদের অন্যতম মৌলিক অধিকার হলো স্বাধীনভাবে সংগঠন গড়ে তোলা। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশন অনুযায়ীও এটি একটি স্বীকৃত অধিকার, যা কোনোভাবেই খর্ব করা উচিত নয়। ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের ক্ষেত্রে যদি কারখানার তথ্য বা শ্রমিকসংক্রান্ত কোনো তথ্যের প্রয়োজন হয়, তাহলে সেটি সরকারের পক্ষ থেকেই সংগ্রহ করা উচিত। একটি কারখানায় কতজন শ্রমিক কাজ করেন বা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য সরকারের কাছেই থাকার কথা, কারণ কারখানা নিবন্ধনের সময় এসব তথ্য সরকার সংগ্রহ করে। ফলে এ ধরনের তথ্যের জন্য শ্রমিকদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করা বা জটিল প্রক্রিয়া আরোপ করা যৌক্তিক নয় বলে তিনি মনে করেন।
ট্রেড ইউনিয়ন প্রসঙ্গে বিজিএমইএ-এর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান বলেন, ‘‘দেশে আইন রয়েছে। যে কেউ যে কোনো অভিযোগ করতে পারেন। একজন অভিযোগ করলো, আমরা সেটি নিয়ে দৌড়ালাম, আমাদের সময়ের অপচয় হলো। যুক্তিসঙ্গত ও যথাযথ প্রমাণ দিয়ে কেউ যদি বলতে পারে আইনের ব্যত্যয় হচ্ছে, সেই বিষয়ে নিয়ম অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’
ঢাকা/তারা//
শ্রমিকদলের সমাবেশে যোগ দিলেন তারেক রহমান