কোটিপতি পিয়ন আলাউদ্দিন
রুবেল মজুমদার, কুমিল্লা || রাইজিংবিডি.কম
মাত্র ৮ হাজার ২৫০ টাকা বেতনে চাকরি শুরু করেন আলাউদ্দিন। এক যুগ না পেরোতেই কোটি টাকার সম্পদের মালিক এই চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী (পিয়ন)! কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয়ের পিয়ন আলাউদ্দিনকে নিয়ে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার দক্ষিণ শ্যামপুরের সুলতান আহমেদের ছেলে আলাউদ্দিন। তিন ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট সে। এক ভাই ঠিকাদার, অন্য ভাই শিক্ষক। অল্প দিনে আলাউদ্দিনের সম্পদের এমন বাড়-বাড়ন্ত দেখে হতবাক তার এলাকার বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে লুটপাট ও কমিশন বাণিজ্যের শক্ত সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন পিয়ন আলাউদ্দিন ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আবুল কালাম আজাদ।
২০২৫–২৬ অর্থবছরে চৌদ্দগ্রামে ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিভাগের অধীনে ৬৬টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এসব প্রকল্পে কাজ কম, কাগজে বেশি। এর মধ্যে টিআর খাতে ২ কোটি ১৫ লাখ ৫৭ হাজার ৯৭৪ টাকা এবং কাবিটা খাতে ২ কোটি ৯১ লাখ ৬১ হাজার ৬৬১ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। পাশাপাশি গম ও চাল মিলিয়ে মোট ৩৪৬ টন খাদ্যশস্য বরাদ্দ ছিল।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, অধিকাংশ প্রকল্পেই বরাদ্দ অনুযায়ী কাজ হয়নি। কোথাও আংশিক, কোথাও নিম্নমানের কাজ করে পুরো বিল উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিশেষ করে, উপজেলা কমিটির ২০ শতাংশ রিজার্ভে থাকা কয়েকটি প্রকল্পে নামমাত্র কাজ দেখিয়ে প্রায় ১৯ লাখ টাকার বেশি আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ আছে, আলাউদ্দিনের সঙ্গে সমঝোতা না করলে বরাদ্দ পাওয়া যায় না। প্রকল্পের কাজ পেতে হলে নির্দিষ্ট হারে কমিশন দিতে হয়। এই ‘সমঝোতা’ ছাড়া বরাদ্দ পাওয়া বা বিল ছাড় করানো প্রায় অসম্ভব। ফলে, প্রকল্প বাস্তবায়নে গুণগত মান নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।
অনুসন্ধান করে পিয়ন আলাউদ্দিন সম্পদের বিস্ময়কর তথ্য জানা গেছে। কুমিল্লা নগরীর আনোয়ারা হাউজিং এলাকায় একটি বহুতল ভবনের ৫ম তলায় আলাউদ্দিনের নামে দুটি ফ্ল্যাট আছে। এছাড়া বেনামে আরো কয়েকটি ফ্ল্যাট আছে তার। বুড়িচং উপজেলার দক্ষিণ শ্যামপুর এলাকায় একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণের কাজ চলছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেছেন, “শুনেছি, আলাউদ্দিন অনেক বড় চাকরি করে। কুমিল্লায় ফ্ল্যাট কিনেছে। মাঝে-মধ্যে তার বউ গাড়ি নিয়ে আসে বাড়িতে।”
আলাউদ্দিন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, “আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। আমার নামে যে সম্পদের কথা বলা হচ্ছে, তার অধিকাংশই সত্য নয়।”
তবে, আলাউদ্দিনের পরিবারের এক সদস্য এ প্রতিবেদকের কাছে স্বীকার করেছেন, কুমিল্লা নগরীতে আলাউদ্দিনের দুটি ফ্ল্যাট আছে। একটি তিনি কিনেছেন আলাউদ্দিনের কাছ থেকে। আরেকটি আলাউদ্দিন ব্যবহার করেন।
আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসক এবং ত্রাণ পুনর্বাসন বিভাগে একাধিক লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের দাবি, পিআইও’র সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণেই আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা হচ্ছে না।
এদিকে, এসব অনিয়মের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গেলে ক্যামেরা দেখেই ‘গায়েব’ হয়ে যান উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা। পরে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও পিআইও আবুল কালাম আজাদকে পাওয়া যায়নি। অভিযোগ আছে, সাংবাদিক দেখলেই পালিয়ে যান তিনি।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আবেদ আলী বলেন, “এ বিষয়ে আমরা অবগত। আমরা উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তার সাথে কথা বলছি। আলাউদ্দিনের বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ঢাকা/রুবেল/রফিক
১২ মে থেকে দোকানপাট খোলা রাত ১০টা পর্যন্ত: দোকান মালিক সমিতি