ঢাকা, বুধবার, ১৩ ফাল্গুন ১৪২৬, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

ভালোবাসার একাল-সেকাল

স্টার্লিং ডি মামুন : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০২-১৪ ১১:২৪:৩১ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০২-১৪ ১১:৩৪:০৪ এএম

ভালোবাসা একটি পবিত্রতম শব্দ। আর প্রেম একটি সুন্দর অনুভূতি। এর দেখা সবাই পান না। সবার জীবনে ভালোবাসা কমবেশি মেলে, কিন্তু প্রেমের দেখা পান খুব সৌভাগ্যবান মানুষেরা।

এই প্রেম-ভালোবাসা কোনো কিছু দিয়ে আটকানো যায় না। আবার কেউ চাইলেও যেমন ইচ্ছা তেমন করে বিলিয়ে দিতে পারেন না। অবস্থা ভেদে একান্তে দমিয়ে রাখতে গেলেও দেখা যায় মানসিক বিপর্যয়। এ জন্য বলা হয়ে থাকে, মানুষ মাতাল হলে আর প্রেমে পড়লে তা গোপন থাকে না।

সবাই ভালোবাসা পেতে চান, প্রিয় মানুষদের ভালোবাসতে চান। জাতি ধর্ম, বর্ণ সবার ভালোবাসার রঙ এক। ভালোবাসা কাঁটাতারের বাঁধন মানে না। ভালোবাসা মানতে চায় না জাত কিংবা মান। ভালোবাসা মানুষের একটি শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। এক কথায় দিন শেষে সবাই ভালোবাসার কাঙাল। সবার পরম চাওয়া, আবেগ, উচ্ছ্বাস ভালো লাগার কাঙ্ক্ষিত এই ভালোবাসা দু’দশক আগে কেমন ছিল?

ভালোবাসার অনুভূতি, স্বাদ, গন্ধ সব একই রকম। হয়তো প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় প্রকাশের ধরনটা বড্ড বেশি বদলে গেছে। পূর্বে ভালোবাসা ছিল আত্মা কেন্দ্রীক, আর এখন সেটা হয়েছে অনেকটা শরীর কেন্দ্রীক। ভালোবাসা মানে তখন ছিল কারো জন্য বুকের মাঝে অনুভূতির বীজ বপন করা। চুপিচুপি রাত জেগে একটা চিঠি লেখা, হাজারো অব্যক্ত কথা বলা, সেটা পৌঁছে দেয়া ডাকযোগে, আর সেই চিঠির উত্তরের জন্য রাত দিন অপেক্ষার প্রহর গোনা।

দিন পেরিয়ে মাস বছর অপেক্ষায় থেকে ভালোবাসার মানুষটিকে পাওয়া। আর না পেলে বুকের মাঝে এক বুক না পাওয়ার ব্যথা নিয়ে বিনিদ্র রজনীতে চোখের জলে কপোল ভেজানো। এই ছিল প্রেমিক প্রেমিকার ভালোবাসা। এখনকার মতো প্রতিদিন বিকেলে ফুচকা খাওয়া, রেস্টুরেন্টে যাওয়া, নামে-বেনামে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাবার পকেট কেটে উপহার দেয়া। এসবের কিছুই ছিল না। কিন্তু ছিল এক বুক বিশ্বাস, পাহাড় সমান শ্রদ্ধা, একটু চাওয়া, সীমাহীন ভালোবাসা।

বর্তমানে ভালোবাসার মোড়কে কাম তাড়নার এই শহরে ভালোবাসা আজ পণ্যের মতো ব্যবহার হচ্ছে। ভালোবাসাকে বেচাকেনা হচ্ছে। যেমন কয়েক দিন ধরে কিছু অনলাইনে দেখছি ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে গার্লফ্রেন্ড টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভালোবাসাটা এখন অনেক হালকা মনে হয়। একটা মেয়ে/ছেলেকে ভালোবাসার প্রস্তাব দেয়া এখন খুব সহজ হয়ে গেছে। এখন প্রেম মানে মোবাইল, ফেসবুক ও ইমোতে অডিও-ভিডিওতে কথা বলা আর নানা রকম সংক্ষিপ্ত নামে ডাকা।

মাঝে মাঝে পার্কে ডেটিং, হাত ধরা থেকে লোক সম্মুখে চুমু খাওয়া আর জড়িয়ে ধরা। বাকিটা ইতিহাস হয়ে থেকে যায়, তারপর হয় ব্রেকআপ। এই আরকি একটা প্রেমের শুরু থেকে ইতি। এইগুলো দেখলে বড্ড খারাপ লাগে। মাঝে মাঝে চায়ের দোকান, ক্যাম্পাসের ক্যান্টিনে দেখা যায় ছেলেরা আলোচনা করছে কে কয়টা প্রেম করছে। তখন আরো বিমর্ষ। ভাবি, প্রেম কি খেলনা নাকি! এটা পবিত্র একটা দান। চারদিকে ভালোবাসা-প্রেম নামধারী যৌন সম্পর্কগুলো মাহামারী আকার ধারণ করেছে। ফলে বৃদ্ধি পেয়েছে ময়লার ডাস্টবিনে পড়ে থাকা বেনামী সন্তানের সংখ্যা।

জানা নেই শোনা নেই, আবেগে গা ভাসিয়ে দিয়ে প্রেমের জ্বালে ফেঁসে যাচ্ছে যুবক যুবতীরা। দু’দিনের পরিচয়েই রুম ডেটিং এ যাচ্ছেন। হচ্ছে গণধর্ষণের শিকার, বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা। এমনকি প্রেমের নামে সব লুটে নিয়ে ঘটাচ্ছে খুনের মতো জঘন্য অপরাধ।

মনের চাহিদা পুরণের আগেই শরীরের চাহিদা পূরণে ব্যস্ত অনেক যুব সমাজ। এ যেন লাগামহীন ঘোড়া। এ জাতীর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আজ নেশা আর যৌনতায় পুরোপুরি বিকারগ্রস্ত। সমাজের প্রত্যেকটা গলিতে আজ অমানিশার ঘন কালো অন্ধকার। এই অন্ধকার গলিতে আলো ফেলতে হবে আমাকে আপনাকে এমনকি সবাইকে।

দেশের নামী দামী হোটেল, শিক্ষাঙ্গন ক্রমেই হয়ে উঠছে অবাধ মেলামেশা এবং মাদকের উন্মুক্ত চারণভূমি। অনেকের চিন্তা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা মানেই দু’চারটা প্রেম করতে হবে। যৌনতায় পড়ে থাকতে হবে৷ নেশা করতে হবে। বেশির ভাগ আড্ডায় এখন যুবকেরা বিপরীত লিঙ্গের নানা স্পর্শকাতর বিষয়ে আলোচনা করেন। যুবকের একটা বড় অংশ যৌবনের বেশির ভাগ সময় কাটান এই যৌনতার চিন্তা মাথায় নিয়েই।

হাতের কাছের পর্নোগ্রাফির মতো চকচকে মাকাল ফল যুবকদের এই বিকৃত চিন্তায় নিমজ্জিত করে রেখেছে। এতে হয় সামাজিক অবক্ষয়। নষ্ট হয় তরুণদের সোনালী স্বপ্নের সুন্দর ভবিষ্যৎ।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সাথে আদর্শের শিক্ষাগুলো অত্যান্ত জরুরি। দেশ, সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে এখনই সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করে সমাধানের পথ বের করা সমায়ের দাবি। তরুণদের আদর্শের জায়গায় ফেরাতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিশিদ্ধ নেশায় বুঁদ হয়ে অতল সায়রে হারিয়ে যাবে। 

লেখক: শিক্ষার্থী (প্রাক্তন), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

 

জাবি/হাকিম মাহি

     
 
রাইজিংবিডি স্পেশাল ভিডিও