কেন ২৭ মার্চই হওয়া উচিত আমাদের ঐক্যের কেন্দ্রবিন্দু
নিউজ ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম
মনোয়ার হোসেন প্রান্ত
বাংলাদেশের সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ’। কিন্তু, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পর এসে ইতিহাস চর্চার দিকে তাকালে এক ধরনের বৈপরীত্য চোখে পড়ে। ইতিহাসের পাতায় সাধারণ মানুষ যেন কেবল দর্শক; অথচ তাদের আত্মত্যাগ, রক্ত এবং স্বতঃস্ফূর্ত সংগ্রামই ছিল স্বাধীনতার মূল শক্তি। বাস্তবতা হলো, রাষ্ট্র যদি জনগণের হয়, তবে তার ইতিহাসও হতে হবে জনগণের। সেই ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে ‘কালেক্টিভ মেমোরি’; যা কোনো কক্ষের সিদ্ধান্ত নয়, বরং রাজপথের লড়াই আর সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠা স্মৃতি।
ইতিহাসের বাঁক: সিদ্ধান্ত নাকি প্রতিরোধ
স্বাধীনতার সূচনালগ্নকে যদি দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নয়, সাধারণ মানুষের চোখে দেখা হয়, তাহলে ভিন্ন এক বাস্তবতা সামনে আসে। এর সূত্র খুঁজে পাওয়া যায় ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ গাজীপুরের জয়দেবপুরে, যেখানে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট পাকিস্তানি বাহিনীর অস্ত্র হস্তান্তরের নির্দেশ অমান্য করে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এটি ছিল দেশপ্রেমিক সৈনিক ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধের এক অনন্য উদাহরণ।
২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংস হামলা সাধারণ মানুষের কাছে ছিল এক চরম বিভ্রান্তি ও ট্রমার মুহূর্ত। সেই পরিস্থিতিতে কোনো নির্দেশনার অপেক্ষা না করে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি কর্মকর্তারা মেজর জিয়ার নেতৃত্বে বিদ্রোহ করেন। রাত ২টা ১৫ মিনিটে পাকিস্তানি কমান্ডিং অফিসারদের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে যে সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু হয়, সেটিই কার্যত প্রথম সংগঠিত সামরিক প্রতিরোধ হিসেবে বিবেচিত হয়।
২৭ মার্চ: ‘লোকাল’ থেকে ‘ন্যাশনাল’
২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে প্রেরিত স্বাধীনতার বার্তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকলেও, তা তখনো সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে পৌঁছায়নি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ তখনো দিশাহীন ছিল, তাদের সামনে স্পষ্ট কোনো রূপরেখা ছিল না।
এই পরিস্থিতি বদলে যায় ২৭ মার্চ। কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়ার কণ্ঠে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারিত হলে তা সারা দেশের মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। একটি সীমিত সামরিক বিদ্রোহ তখন জাতীয় যুদ্ধে রূপ নেয়। রেডিওর সেই ঘোষণা লাখো মানুষের মনে সাহস জোগায়, তাদের মধ্যে আস্থা তৈরি করে—তারা বুঝতে পারে, তারা একা নয়।
এই মুহূর্ত থেকেই সাধারণ মানুষের মানসিক ও সক্রিয় অংশগ্রহণ শুরু হয়। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটিকেই স্বাধীনতার প্রকৃত সূচনা হিসেবে দেখা যায়—যখন একটি জাতি সম্মিলিতভাবে যুদ্ধে সম্পৃক্ত হয়।
ব্যক্তিকেন্দ্রিক ইতিহাস বনাম জনগণের অবদান
বর্তমান ইতিহাস চর্চায় ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা স্পষ্ট। কিন্তু, কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মধ্যে স্বাধীনতার কৃতিত্ব সীমাবদ্ধ করলে সাধারণ মানুষের অবদান আড়ালে পড়ে যায়। দলিলে লেখা ইতিহাস আর মানুষের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠা ইতিহাস এক নয়।
একটি শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রয়োজন ‘অর্গানিক নেশন বিল্ডিং’, যেখানে জনগণের সম্মিলিত অভিজ্ঞতা ও অবদান স্বীকৃতি পায়। সেই লক্ষ্য অর্জনে ইতিহাসকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া জরুরি।
২৭ মার্চ কেবল একটি তারিখ নয়; এটি জনগণের মানসিক জাগরণের প্রতীক। এই দিনেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ এক সুতোয় গাঁথা হয়। যদি আমরা বিশ্বাস করি রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, তবে সেই জনগণের স্মৃতি ও অংশগ্রহণকেই ইতিহাসের কেন্দ্রে স্থান দিতে হবে।
ঐক্যবদ্ধ জাতীয় পরিচয় গড়ে তুলতে ২৭ মার্চকে জাতীয় স্মৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে, এমনটাই মনে করেন বিশ্লেষকরা। তবেই এমন একটি রাষ্ট্র গঠন সম্ভব, যেখানে প্রতিটি নাগরিক নিজেকে ইতিহাসের অংশীদার মনে করবে।
[ফিচারটি লিখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মনোয়ার হোসেন প্রান্ত]
ঢাকা/জান্নাত