ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ০৭ মে ২০২৬ ||  বৈশাখ ২৪ ১৪৩৩ || ২০ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

সংগ্রাম পেরিয়ে আইন পেশায় দুই বোন

শরিফুল ইসলাম রিফাত, গবি সংবাদদাতা || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:২০, ৭ মে ২০২৬  
সংগ্রাম পেরিয়ে আইন পেশায় দুই বোন

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার সানবান্ধা গ্রামের দুই বোন জান্নাতুন নাঈম মারিয়া ও সানজিদা তাসকিন প্রিয়া। ছোট্ট একটি পরিবার; মা, বাবা আর দুই বোনকে ঘিরেই তাদের বেড়ে ওঠা। স্বপ্ন ছিল বড়, আর সেই স্বপ্নকে সঙ্গী করেই তারা পা রেখেছেন আইন পেশায়। গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই দুই শিক্ষার্থী এখন একসঙ্গে আইনজীবী হয়েছেন, যা তাদের পরিবারের জন্য যেমন গর্বের, তেমনি অনুপ্রেরণারও গল্প।

গ্রামের স্নিগ্ধ পরিবেশেই কেটেছে তাদের শৈশব। দাদা-দাদি, চাচা-চাচি ও চাচাতো ভাই-বোনদের সঙ্গে আনন্দঘন সময়, পুকুরে সাঁতার আর মাঠে খেলাধুলার মধ্য দিয়েই বড় হয়েছেন তারা। ছোটবেলা থেকেই দুই বোনের মধ্যে ছিল গভীর বন্ধন। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ভাগাভাগি করেই এগিয়ে গেছেন তারা।

আরো পড়ুন:

তাদের শিক্ষাজীবনের শুরু গ্রামের একটি প্রাইভেট স্কুলে। পরে স্থানীয় মাদ্রাসা থেকে দাখিল ও আলিম সম্পন্ন করেন। গণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য বেছে নেন দেশের দুটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান। মারিয়া বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিউপি) থেকে এবং প্রিয়া জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলএম সম্পন্ন করেন।

আইন পেশায় আসার অনুপ্রেরণা এসেছে তাদের বাবার কাছ থেকে। পরিবারে আগে কেউ আইন পেশায় না থাকায় মেয়েদের এই অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত দেখতে চেয়েছিলেন তিনি। বাবার সেই স্বপ্নই হয়ে ওঠে তাদের এগিয়ে চলার প্রধান শক্তি।

বার কাউন্সিল পরীক্ষার প্রস্তুতিতে তারা মূল বই, বেয়ার অ্যাক্ট ও ‘লিগ্যাম প্রশ্ন ব্যাংকের’ ওপর বেশি গুরুত্ব দেন। পড়াশোনার সময়ও ছিল ভিন্ন, মারিয়া সকালে আর প্রিয়া রাতে পড়তেন। ফলে প্রায় পুরো সময়ই পড়াশোনার পরিবেশ বজায় থাকত। একজনের দুর্বলতা অন্যজন পূরণ করতেন। ফৌজদারি কার্যবিধি বা দেওয়ানি কার্যবিধি, যে যার দক্ষতার জায়গা থেকে সহযোগিতা করেছেন।

তাদের ভাষ্য, বিশাল সিলেবাস ও মানসিক চাপ ছিল প্রস্তুতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে, একে অপরের পাশে থাকার শক্তিই তাদের এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।

ফল প্রকাশের দিনটি ছিল তাদের জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তগুলোর একটি। নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে গভীর রাতে ফল প্রকাশ হয়। উৎকণ্ঠার মধ্যেই কাঁপা হাতে প্রথমে বোনের, পরে নিজের ফল দেখেন মারিয়া। দুজনই উত্তীর্ণ হয়েছেন জেনে আনন্দে ভরে ওঠে পুরো পরিবার। বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলা, ‘এখন তুমি একজন না, দুইজন আইনজীবীর বাবা’ এই মুহূর্ত আজও তাদের হৃদয়ে গেঁথে আছে।

এই অর্জনের পেছনে ছিল নানা সংগ্রামও। গ্রামে বড় হওয়ায় সামাজিক বাধা তাদের মোকাবিলা করতে হয়েছে। ‘মেয়েদের এত পড়াশোনা করিয়ে কী হবে’ এমন মন্তব্যও শুনতে হয়েছে বারবার। ঢাকায় পড়াশোনার সময়ও নানা নেতিবাচক কথার মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে তাদের বাবা-মা সবসময় সাহস যুগিয়েছেন।

আর্থিক চ্যালেঞ্জও ছিল বাস্তব। ব্যবসার ওঠানামার মধ্যেও বাবা কখনো মেয়েদের কষ্ট বুঝতে দেননি। অন্যদিকে দুই বোনও সীমিত চাহিদার মধ্যেই নিজেদের মানিয়ে নিতে শিখেছেন।

তাদের সম্পর্কে প্রতিযোগিতা নয়, বরং সহযোগিতাই ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি। একজন আগে কিছু শিখলে অন্যজনকে শেখাতেন, একজন নোট তৈরি করলে অন্যজন সেটি আরো গুছিয়ে দিতেন।

ভবিষ্যতে তারা আইন পেশাকে শুধু জীবিকা নয়, দায়িত্ব হিসেবেই দেখতে চান। বিশেষ করে অসহায় ও বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ইচ্ছা রয়েছে তাদের। পাশাপাশি একসঙ্গে আইন পেশায় কাজ করারও স্বপ্ন দেখছেন দুই বোন।

আইন পেশায় আগ্রহী মেয়েদের উদ্দেশে তারা বলেন, এই পেশা চ্যালেঞ্জিং হলেও অসম্ভব নয়। নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। শুরুতে কষ্ট থাকলেও ধীরে ধীরে তার ফল পাওয়া যায়। আত্মসম্মান বজায় রেখে এগিয়ে যেতে হবে।’

ঢাকা/জান্নাত

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়