ঢাকা     মঙ্গলবার   ০৫ মে ২০২৬ ||  বৈশাখ ২২ ১৪৩৩ || ১৮ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

অবকাঠামো সংকটে স্থবির রাবির সাংস্কৃতিক অঙ্গন

রাজশাহী প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:২৬, ৫ মে ২০২৬   আপডেট: ২০:০২, ৫ মে ২০২৬
অবকাঠামো সংকটে স্থবির রাবির সাংস্কৃতিক অঙ্গন

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) প্রশাসনিক অবহেলা ও অবকাঠামোগত সংকটের কারণে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ক্রমেই হারিয়ে যেতে বসেছে। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে ছাত্র সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো সংকটে পড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে পুরো ক্যাম্পাসের সাংস্কৃতিক পরিবেশে।

একসময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) ভবন ছিল এসব সংগঠনের প্রধান কার্যক্রমের কেন্দ্র। তবে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার পর থেকেই সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে ভাটা পড়তে শুরু করে।

সাংস্কৃতিক কর্মীদের ভাষ্য, গত বছরের ১৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত রাকসু নির্বাচনের আগে ১৫টি সাংস্কৃতিক সংগঠনকে ভবনটি থেকে সরিয়ে একটি পুরোনো টিনশেড ভবনে স্থানান্তর করা হয়, যা আগে শেখ রাসেল মডেল স্কুল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছিল, পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় সাময়িকভাবে এই ভবনেই তাদের রাখা হচ্ছে।

স্থানান্তরের আগে ভবনটির অবস্থা ছিল বেশ নাজুক—সংকীর্ণ, অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে কক্ষ, ভাঙা জানালা, ক্ষতিগ্রস্ত টিনের ছাদ এবং দেয়ালের খসে পড়া পলেস্তারা দীর্ঘদিনের অবহেলার চিত্র তুলে ধরছিল। আঙিনাজুড়ে ছিল ময়লা-আবর্জনা। পর্যাপ্ত মহড়ার জায়গা, সরঞ্জাম সংরক্ষণ, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা কিংবা নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ, কোনোটিই ছিল না। পুরো ভবনে ছিল মাত্র একটি ছোট শৌচাগার।

সাম্প্রতিক সময়ে (১ মে) সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, ভবনটিতে শুধু রং করা হয়েছে; অন্যান্য সমস্যার তেমন কোনো সমাধান হয়নি। সংগঠনগুলোর উপস্থিতিও অনিয়মিত। অনেক সরঞ্জাম বারান্দা ও খোলা জায়গায় পড়ে থাকতে দেখা গেছে। কক্ষগুলো এতটাই ছোট যে সেখানে নিয়মিত অনুশীলন করা সম্ভব নয়, একসঙ্গে ১০ জন বসার মতো জায়গাও নেই।

সাংস্কৃতিক কর্মীদের অভিযোগ, এই সীমাবদ্ধতার কারণে মহড়া, পরিবেশনা এবং সংগঠনের অন্যান্য কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক দল বাধ্য হয়ে খোলা মাঠ বা করিডোরে মহড়া দিচ্ছে।

সমকাল নাট্যচক্রের সভাপতি শিউলি দেবনাথ বলেন, “নাট্যদলের জন্য বড় পরিসরের জায়গা খুবই প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের যে কক্ষগুলো দেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত ছোট। এতে মহড়া ও সরঞ্জাম সংরক্ষণ, দুটোই কঠিন হয়ে পড়েছে।”

তিনি আরো জানান, সংগঠনগুলো নিজেদের উদ্যোগে বরাদ্দকৃত কক্ষ পরিষ্কার ও কিছুটা সংস্কার করেছে। তবে নতুন সদস্য সংগ্রহেও সমস্যা তৈরি হয়েছে। আগে শিক্ষার্থীরা সহজেই সংগঠনগুলোর অবস্থান জানত, এখন অনেকেই জানে না তারা কোথায় আছে।
রাবি কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি সনৎ কৃষ্ণ ঢালি বলেন, ভবনটি বসবাসের জন্যও অনুপযুক্ত। টিনের ছাদ দিয়ে পানি পড়ে, বৈদ্যুতিক সংযোগও ঝুঁকিপূর্ণ। এই অবস্থায় কার্যক্রম চালাতে হলে পূর্ণাঙ্গ সংস্কার জরুরি।

নাট্যকার অধ্যাপক মলয় ভৌমিক বলেন, “এই সংকট উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাংস্কৃতিক চর্চার প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার প্রতিফলন। শিক্ষা কেবল শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়, সাংস্কৃতিক চর্চা শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব, মানবিকতা ও সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলে।”

তিনি আরো বলেন, “একসময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় দেশের অন্যতম শক্তিশালী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল। কিন্তু এখন শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত করার প্রবণতাও বেড়েছে।” এর ফলে ক্যাম্পাসে বিচ্ছিন্নতা ও অসহিষ্ণুতা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

রাকসুর সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক জায়িদ হাসান জোহা বলেন, “সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করা হলেও প্রশাসনিক সহায়তার অভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি।”

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন বলেন, “সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে স্থানান্তরের জন্য ওই পুরোনো ভবনটিই একমাত্র বিকল্প ছিল। পুনর্বাসনের জন্য নতুন কোনো অবকাঠামো না থাকায় এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।”

তিনি জানান, সমস্যা সমাধানে একটি পৃথক প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ঢাকা/মাহী/জান্নাত

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়