চলছে নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান বাছাই
বেক্সিমকোর তিন কোম্পানির আর্থিক হিসাব বিশেষ নিরীক্ষার সিদ্ধান্ত
নুরুজ্জামান তানিম || রাইজিংবিডি.কম
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি লিমিটেড (বেক্সিমকো), বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি এবং শাইনপুকুর সিরামিকস পিএলসির পাঁচ বছরের (২০২০ থেকে ২০২৫ সালের ৩০ জুন) আর্থিক হিসাব বিশেষ নিরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
এরই ধারাবাহিকতায় দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী বেক্সিমকো গ্রুপের তিনটি কোম্পানির বিশেষ নিরীক্ষার জন্য একাধিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে প্রস্তাব (কারিগরি ও আর্থিক) দাখিলের জন্য অনুরোধ জানায় কমিশন। ইতোমধ্যে ১০টি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের আগ্রহপত্র দাখিল করেছে। এর মধ্যে থেকে চূড়ান্ত নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান বাছাই করার নির্দেশ দিয়েছে বিএসইসি।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কমিশন সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বিএসইসির নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে, বিশেষ নিরীক্ষায় কোম্পানি ৩টির ২০২০ সালের ৩০ জুন থেকে ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত অর্থাৎ পাঁচ বছরের সমাপ্ত অর্থবছর আর্থিক প্রতিবেদনে নিরীক্ষা করা হবে। এর মধ্যে বেক্সিমকোর বিশেষ নিরীক্ষা কার্যক্রমের জন্য তিনটি অডিট ফার্মকে প্রস্তাব (কারিগরি ও আর্থিক) আহ্বানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো-বাসু ব্যানার্জী নাথ অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস, এ. ওয়াহাব অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস, পিকেএফ আজিজ হালিম খায়ের চৌধুরী চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস। তবে পিকেএফ আজিজ হালিম খায়ের চৌধুরীর পার্টনার মো. আশরাফুজ্জামান এবং ড. এম মোশাররফ হোসেন কমিশনে প্যানেলভুক্ত না থাকায় প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তী ধাপে নির্বাচিত হলেও উল্লিখিত দুই পার্টনার এই নিরীক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবেন না।
এদিকে, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের বিশেষ নিরীক্ষা কার্যক্রমের জন্য দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী আবেদন দাখিলকারী ১০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে ৪টি প্রতিষ্ঠান শর্টলিস্ট করা হয়েছে। এগুলো হলো-আহসান মনজুর অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস, এ. ওয়াহাব অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস, বাসু ব্যানার্জী নাথ অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস, সাইফুল শামসুল আলম অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস।তবে কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আহসান মনজুর অ্যান্ড কোং এর পার্টনার মোখলেছুর রহমান এবং সাইফুল সামশুল আলম অ্যান্ড কোং এর দুই পার্টনার মো. জাফরুল্লাহ ও মো. ইমরান হোসাইন কমিশনে প্যানেলভুক্ত না থাকায় তারা এ বিশেষ নিরীক্ষা কার্যক্রমে নিযুক্ত হতে পারবেন না।
এছাড়া শাইনপুকুর সিরামিকসের বিশেষ নিরীক্ষা কার্যক্রমে জন্য দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী একমাত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে এ ওয়াহাব অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টকে কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব দাখিলের জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে।
কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ সংক্রান্ত সব প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের দায়িত্ব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড ফিন্যান্স ডিভিশনের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএসইসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “বড় ও প্রভাবশালী তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক বিবরণীতে কোনো ধরনের অসঙ্গতি বা প্রশ্ন উঠলে কমিশন তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। এ কারণেই সংশ্লিষ্ট তিনটি প্রতিষ্ঠানের বিগত পাঁচ বছরের আর্থিক বিবরণীর ওপর বিশেষ নিরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।বিশেষ নিরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত আর্থিক অবস্থান, আয়ের উৎস, ব্যয়ের খাত এবং সম্ভাব্য অনিয়ম বা বিচ্যুতি স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।এতে করে কমিশন প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে পারবে।”
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘ সময়ের আর্থিক বিবরণীর ওপর বিশেষ নিরীক্ষা চালানোর সিদ্ধান্ত পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।তাদের মতে, বড় ও প্রভাবশালী কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন নিয়ে কোনো ধরনের প্রশ্ন বা অস্পষ্টতা থাকলে তা বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। স্পেশাল অডিটের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র উঠে এলে বিনিয়োগকারীরা সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।কমিশনের এমন উদ্যোগ নিয়মিত ও ধারাবাহিকভাবে নেওয়া হলে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর করপোরেট গভর্ন্যান্স শক্তিশালী হবে এবং ভবিষ্যতে আর্থিক অনিয়মের ঝুঁকি কমবে।একই সঙ্গে বাজারে শৃঙ্খলা বজায় থাকবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে।
বেক্সিমকো গ্রুপের এই তিন কোম্পানি ধারাবাহিকভাবে বার্ষিক নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন ও ত্রৈমাসিক আর্থিক হিসাব দাখিল করতে ব্যর্থ হয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, বেক্সিমকো লিমিটেড ২০২৫ ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের নিরীক্ষিত হিসাবসহ চলতি অর্থবছরের কোনো ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন জমা দেয়নি। একই ধরনের অনিয়ম বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ও শাইনপুকুর সিরামিকসের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করা গেছে। এওছাড়া সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোতে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ সংক্রান্ত আইনি জটিলতা ছিল এবং এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর ছিল।
সম্প্রতি আপিল বিভাগ সেই নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করায় কমিশনের আদেশ পুনরায় কার্যকর হয়েছে। এই কারণে চলতি বছরের গত ১৫ জানুয়ারি বেক্সিমকো, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস এবং শাইনপুকুর সিরামিকসের পর্ষদ সভা করা জন্য নির্দেশ দিয়েছে বিএসইসি। এ লক্ষ্যে তিনটি কোম্পানির সংশ্লিষ্ট সব পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও) ও কোম্পানি সচিবকে পর্ষদ সভা বাস্তবায়ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা/এনটি/এসবি