নতুন গভর্নর: হিসাববিদের হিসাব মিলবে কতটা
বাংলাদেশ ব্যাংকের নবনিযুক্ত গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নবনিযুক্ত গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানকে নিয়ে একটি দীর্ঘ পোস্ট করেছে বিএনপির মিডিয়া সেল। বৃহস্পতিবার রাত প্রায় আড়াইটার দিকে বিএনপির মিডিয়া সেলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে পোস্টটি করা হয়েছে। যেখানে অর্থনীতিবিদ না হয়েও হিসাববিদ হিসেবে মোস্তাকুর রহমানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালনার যোগ্যতা নিয়ে ওঠা সমালোচনা খণ্ডন করে যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করা হয়েছে। পোস্টটির শিরোনাম দেওয়া হয়েছে, ‘নতুন গভর্নর: হিসাববিদের হিসাব মিলবে কতটা’।
বিএনপির মিডিয়া সেলের পোস্টটি রাইজিংবিডি ডটকমের পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের গভর্নরের বৈশিষ্ট্য নিয়ে কথা বলছিলেন। কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হতে যে একজন অর্থনীতিবিদ হতে হবে তা নয়। একজন হিসাববিদও কিন্তু গভর্নর হওয়ার যোগ্যতা রাখেন। কারণ হিসাবের মধ্যেই থাকেন একজন গভর্নর। আর তার সে হিসাব হচ্ছে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ রাখা, সুদের হার ভারসাম্য রাখা।
একই অনুষ্ঠানে একই সুরে কথা বলেছিলেন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা। তিনি বক্তব্যে অতিরিক্ত যে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করেন তা হলো- কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনেক সময় একজন হিসাববিদের কাছে নিরাপদ থাকে। তবে এ ক্ষেত্রে তাকে খুব সচেতনভাবে কাজ প্রয়োজন।
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের চেয়ারে বসেন হিসাববিদ মো. মোস্তাকুর রহমান। তিনি মূলত একজন পোশাক খাতের সফল ব্যবসায়ী। তবে গভর্নর হিসেবে নাম ঘোষণার পর দায়িত্ব নেওয়ার আগেই সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। অবশ্য গঠনমূলক সমালোচনা শুনতে প্রস্তুত মোস্তাকুর রহমান।
এদিকে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি গণমাধ্যমে যে বার্তাটি দিয়েছেন তা অগ্রাধিকারমূলক অর্থনীতির বাস্তবতার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দায়িত্ব গ্রহণের পর একজন নতুন গভর্নরের কাছে কী গুরুত্বপূর্র্ণ হতে পারে, সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। অর্থনীতির একটি সূত্র হচ্ছে, উৎপাদনের সঙ্গে কর্মসংস্থানের মেলবন্ধন। তিনি কর্মসংস্থানের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ধারণ করেছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সরকারের জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জ। আর এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আর কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে উৎপাদনের কোনো বিকল্প নেই।
উৎপাদনের কথা চিন্তা করেই নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান যে বিষয়টি খুব কম সময়ের মধ্যে উপলব্ধি করতে পেরেছেন তা হলো- বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্প-কারখানা পুনরায় চালু করা। এ কারণে তিনি নিজেই উৎপাদন খাতে বিনিয়োগের সহায়তার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি মনে করেন, সামষ্টিক স্থিতিশীলতার ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে লক্ষ্য হবে বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধি।
কয়েক দিন আগেও তিনি ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। যে ব্যবসার হাত ধরে দেশে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আনতে সহায়তা করেছেন। ব্যবসার নাড়ি-নক্ষত্র ও পথরেখা গভর্নরের কাছে অজানা নয়। তিনি নিজেও একসময় উপলব্ধি করেছিলেন উচ্চ ঋণ সুদের চাপে ছিল শিল্প ও ব্যবসা খাত। যে পরিমাণ সুদে ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া যায় তাতে বিনিয়োগের প্রতি অনেকের আগ্রহ থাকার কথা নয়। অনেক উদ্যোক্তা এ সুদহার নিয়ে অভিযোগ করেছেন। নতুন গভর্নর সুদের হার বিবেচনা করবেন সে প্রত্যাশা ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের। তবে নতুন গভর্নর হিসেবে মূল্যস্ফীতির বিষয়টি চিন্তা করতে হবে। কারণ মূল্যস্ফীতির কারণে যেন আপামর মানুষ কষ্ট না পায়।
নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে উদ্ভাবনী চিন্তা করছেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে। আর সে উদ্ভাবনী চিন্তা হচ্ছে, ঋণ প্রবাহ বাড়ানো। তবে যেন কোনোভাবেই মূল্যস্থিতি বিঘ্নিত না হয়। একজন ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি ব্যবসাবান্ধব হবেন, সেটিই প্রত্যাশা করেন ব্যবসায়ী মহল।
ঘুরেফিরে ব্যাংকিং খাতের বিষয়টি আসে। কারণ গত দেড় বছর সদ্যবিদায়ি গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর এ খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। খাদের কিনারে পড়ে থাকা ব্যাংক খাতকে কিছুটা উঠিয়ে দিলেও এখনও পরিপূর্ণভাবে তা সফল হয়নি। আর এ সফল হওয়ার চ্যালেঞ্জ এখন নতুন গভর্নরের সামনে। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বেশ গুরুত্বপূর্র্ণ বৈঠক করে যাচ্ছেন। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ব্যাংক খাতের সংস্কার। তিনি এ সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখবেন বলে ইতিমধ্যে এবিবির (অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ লিমিটেড) সঙ্গে বৈঠকে আশ্বাস দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, ব্যাংক একীভূত করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা চলমান থাকবে।
অনেক সময় ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব দারুণভাবে কাজ করে। এ ব্যাপারে নতুন গভর্নর সেই বার্তা দিয়েছেন ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের। কোনো ধরনের রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার না করার ব্যাপারে অনুশাসন দিয়েছেন। অর্থাৎ তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নজরে আনছেন তা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। আমানত বাড়ানোর উদ্যোগে নেওয়ার ব্যাপারেও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
ঋণখেলাপি সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে শুধু পরামর্শ দিয়েই ক্ষান্ত হননি নতুন গভর্নর। তিনি ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে ঋণ আদায়ের বিকল্প উদ্যোগ নেওয়া পরামর্শও দিয়েছেন।
দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই আরও একটি বিষয় তিনি নজরে আনেন। তা হলো- রফতানিমুখী পোশাক কারখানার শ্রমিকদের এক মাসের বেতনের জন্য সহজ শর্তের বিশেষ ঋণ চালু করা। এ উদ্যোগকে বিজেএমই নেতারা সাধুবাদ জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য- এ বিশেষ ঋণ তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের উপকারে আসবে। গভর্নর ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন, ঈদের আগে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস প্রয়োজন। সে উপলব্ধি থেকে তিনি যে কাজটি করেছেন তা সত্যি প্রশংসনীয়।
মাত্র কয়েক দিনের নতুন কার্যক্রমের মূল্যায়ন করতে গিয়ে সাবেক গভর্নর ফজলে কবির বলেছেন, তিনি যে অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপ নিয়েছেন তা সত্যি প্রশংসনীয়। তবে মাত্র এ কয়েক দিনেই সার্বিক মূল্যায়ন সম্ভব নয়। তিনি একজন ব্যবসায়ী ছিলেন, তাই তিনি ব্যবসায়ীদের পালস সহজে বুঝতে পারবেন। একজন হিসাববিদ ও ব্যবসায়ী হিসেবে তার কার্যক্রম ভালো হবে বলে আশা করছি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক সাবেক গভর্নর বলেন, নতুন গভর্নরের নিয়োগ নিয়ে প্রথমে যে ধরনের সমালোচনার ঝড় উঠেছিল, মনে হয়েছিল তিনি বোধহয় বেশ কিছুটা বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেছেন। তবে এ সপ্তাহের কার্যক্রমে আস্তে আস্তে তার চিন্তাভাবনা ও কার্যক্রম স্পষ্ট হচ্ছে।
সাবেক এনসিসি ব্যাংকের এমডি ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান নূরুল আমিন বলেন, আসলে এ কয়েক দিনেই তার সম্পর্কে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, তিনি যেহেতু একজন হিসাববিদ ও একজন ব্যবসায়ী, আশা করি তিনি ব্যবসা-বাণিজ্যের সব ধরনের পালস বুঝতে পারবেন। আর ব্যাংক খাত নিয়ে তার অনেক কিছু অজানা থাকার কথা নয়।
ঢাকা/রাসেল