ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ১১ জুন ২০২৬ ||  জ্যৈষ্ঠ ২৮ ১৪৩৩ || ২৫ জিলহজ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

বালাগঞ্জে অযত্নে-অবহেলায় একাত্তরের গণকবর

বদর উদ্দিন আহমদ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:১৪, ৬ ডিসেম্বর ২০১৪   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
বালাগঞ্জে অযত্নে-অবহেলায় একাত্তরের গণকবর

সিলেটে অরক্ষিত গণকবর

নিজস্ব প্রতিবেদক, সিলেট : সিলেটের বালাগঞ্জ প্রবাসী অধ্যুষিত ধনীদের এলাকা। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি কর্নেল এমএজি ওসমানী এ এলাকারই সন্তান। একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর হাতে এ এলাকায় অসংখ্য হত্যাকাণ্ড ঘটে। গালিমপুর, বুরুঙ্গা, আদিত্যপুর ও সুরীকোনায় মুক্তিযোদ্ধাসহ নিরীহ অনেক মানুষকে হত্যা করা হয়। কিন্তু এর সঠিক পরিসংখ্যান নেই। এরমধ্যে তিনটি স্থানে গণকবর চিহ্নিত করা হলেও সুরীকোনায় সেটা সম্ভব হয়নি।

 

গালিমপুর, বুরুঙ্গা ও আদিত্যপুরের যে তিনটি গণকবর রয়েছে সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। প্রবাসী অধ্যুষিত ওই এলাকায় অনেক ধনী ব্যক্তি রয়েছেন, যারা সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড করে থাকেন, কিন্তু যারা দেশের জন্য যুদ্ধ করে জীবন দিয়েছেন তাদের সম্মান দেখানোর মানসিকতা তাদের নেই।

 

এ দেশীয় দালালদের সহযোগিতায় সিলেটের বিভিন্নস্থানে পাকবাহিনী নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালায়। হত্যাকাণ্ডের পর কোথাও লাশ মাটি চাপা দিয়ে রাখা হয়। আবার কোথাও উন্মুক্তস্থানে ফেলে রাখা হয় লাশের সারি। কোথাও কোথাও হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয় লোকজন লাশগুলোর দাফন করেন।

 

মুক্তিযুদ্ধে দেশপ্রেমিক জনতার আত্মত্যাগের অনন্য নির্দশন হচ্ছে এসব বধ্যভূমি ও গণকবর। কিন্তু দেশ স্বাধীনের পর এই বধ্যভূমি ও গণকবরগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অযত্ম অবহেলায় পড়ে থাকতে থাকতে ইতিমধ্যে সিলেটের অনেক গণকবর ও বধ্যভূমি নিশ্চিহ্ন ও দখল হয়ে গেছে। বিগত মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর সারাদেশে বধ্যভূমি ও গণকবর সংরক্ষণের উদ্যোগ নেই। উচ্চ আদালতও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নগুলো সংরক্ষণের নির্দেশ দেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত সিলেটের গণকবর ও বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অথচ নির্দেশনগুলো সংরক্ষণ করা গেলে মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের মানুষের আত্মত্যাগ, হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের বর্বরতার ইতিহাস নতুন প্রজন্মের পক্ষে জানা সহজ হতো।

 

১৯৭১ সালে পাকবাহিনী এদেশীয় বিশ্বাসঘাতকদের সহায়তায় বালাগঞ্জে নির্বিচারে গণহত্যা চালায়। আদিত্যপুর, বুরুঙ্গা ও গালিমপুর গণকবরগুলো সেই স্মৃতি ধারণ করে আছে। এরমধ্যে আদিত্যপুর ও বুরুঙ্গায় পাকা দেয়ালে গণকবর দুটি চিহ্নিত করা হলেও গালিমপুর গণকবরটির সামনের দিকে তিনফুট উচ্চতার দেয়াল ছাড়া অন্য তিন দিক খোলা। যার জন্য গরু-ছাগল প্রবেশ করে প্রতিনিয়ত। গণকবরে নিহতদের নাম ফলকও নেই। বালাগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রাক্তন কমান্ডার যুদ্ধাহত দয়াময় দাস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস এভাবে নষ্ট হবে তা কখনও ভাবতে পারিনি। এমনটি হতে দেওয়া যায় না। এরজন্য সকলকে এগিয়ে আসা উচিত।

 

সুরীকোনা : ১৯৭১ সালের ১৮ জুলাই। পাকবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে থেমে নেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা। বালাগঞ্জের সাদীপুর ইউনিয়নের তিনদিকে নদী বেষ্টিত সুরীকোনা গ্রাম। পাকিস্তানিদের কবল থেকে রক্ষা পেতে উপজেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ এ গ্রামে আশ্রয় নিয়েছে। সেদিন রাতে ছিল গ্রামের জনৈক হারিছ আলীর মেয়ের বিয়ে। প্রথা অনুযায়ী তখন বিয়ের আয়োজন হতো রাতে। বিয়ে উপলক্ষে ব্যাপক লোক সমাগম হয়। প্রায় ৫ কিলোমিটার দূর শেরপুর পাকিস্তানি ক্যাম্পে খবর আসে সুরীকোনায় মুক্তিবাহিনী আশ্রয় নিয়েছে। হারিছ আলীর বাড়িতে মুক্তিবাহিনীর খাবার দেওয়া হয়েছে। এ সংবাদে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে দখলদার বাহিনী। রাত ৩টার দিকে দুটো লঞ্চযোগে পাকিস্তানি বাহিনীর শতাধিক সদস্য রাজাকারদের সহযোগিতায় সুরীকোনা গ্রাম ঘেরাও করে। ফজরের আজানের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের প্রায় প্রতি বাড়ির দরজায় আঘাত করে তারা। প্রতিটা বাড়ির পুরুষদের ‘মুক্তি’ সম্বোধনে ধরে এনে তিন লাইনে দাঁড় করায় পাকিস্তানিরা। গ্রামের উত্তরে নাটকিলা নদীর পাড়ে এক লাইন, দক্ষিণ পশ্চিমে কুশিয়ারা নদীর পাড়ে দুই লাইন। সব মিলিয়ে গ্রামের প্রায় ৩০ জন ও অন্য এলাকা থেকে ধরে আনা আরো প্রায় ২০ জনকে পাকিস্তানিরা প্রথমে কালেমা পড়তে বলে। কালেমা পড়া শেষ হলে মুহূর্তেই নির্বিচারে গুলি ছুঁড়তে থাকে। গুলিবিদ্ধ অবস্থাতেই প্রাণ বাঁচাতে অনেকে নাটকিলা ও কুশিয়ারা নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আহতদের রক্তে নদীর পানি লাল বর্ণ ধারণ করে। আহজারিতে ভারি হয়ে উঠে পুরো এলাকা। গ্রামের মহিলারা প্রাণ ও সম্মান বাঁচাতে লুকিয়ে থাকেন। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী পাকিস্তানি বাহিনীর তাণ্ডবে এলোমেলো হয়ে পড়ে পুরো গ্রাম। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মৃত্যুর ভান করে বেঁচে যান মানিক মিয়া, আতাউর রহমান, শামসুল হক। ওই দিন অনেকে পাকবাহিনীর হাতে জীবন দিয়েছেন। তবে তাদের হদিস নেই।

 

স্থানীয়রা জানান, এ পর্যন্ত যে কয়েকজন শহীদের নাম পাওয়া গেছে তারা হলেন মকরম উল্যা, মুহিব উল্যা, জহির উল্যা, বাহার, সুরুজ উল্যা, আবদুল জব্বার, সাজিদ উল্যা, জাহির, আব্দুল কাহার, সাজিদ আলী, আফিজ আলী, সামছুল হক, আবদুল হেকিম ও ইউনুছ উল্লাহ।

 

অনেক মুক্তিযোদ্ধার লাশ নদীতে ভেসে যাওয়ায় তাদের পরিচয় মেলেনি।  পাকিস্তানি বাহিনী শেরপুরে ফিরে যাবার পর এলাকার লোকজন শহীদদের কবর দেন সুরীকোনা গ্রামে।

 

১৯৮০ সালের দিকে কুশিয়ারা নদীর ভাঙনের শিকার হয় সুরীকোনা গ্রাম। সে সময় অনেক কবর নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ‘৯০ সালে ভাঙনকবলিত এলাকায় চর জেগে উঠে। ফলে সে কবরগুলোর চিহ্ন নেই। কেউ তা আবিষ্কারের উদ্যোগও নেয়নি। ফলে এ বিষয়টি নতুন প্রজন্মের কাছে অজানা রয়ে গেছে। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পার হলেও কেউ সুরীকোনা গ্রামের শহীদ পরিবারগুলোর খবর নিতে আসেনি। এমনকি দীর্ঘ অবহেলায় গ্রামের অনেকে ভুলে গেছে গণহত্যার তারিখটিও। সুরীকোনা গ্রামে নেই গণকবর বা স্মৃতিস্মম্ভ।

 

স্থানীয় সূত্র জানান, স্বাধীনতার পর এ এলাকার প্রতিটি শহীদ পরিবার বঙ্গবন্ধু সরকারে দেওয়া ১০০০ টাকা ও যুদ্ধাহত পরিবার ৫০০ টাকা ভাতা পেয়েছিল। এরপর এ নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়নি। ১৯৭১ সালের শহীদ পরিবারগুলোর কষ্টের কথা জানান যুদ্ধাহত আতাউর রহমান। তিনি বলেন, ‘দুই মেয়ে ও দুই পুত্রকে নিয়ে অভাবে বসবাস করছি।’ তিনি বলেন, ‘কেউ তাদের খবর নেয় না। সরকার থেকে সাহায্যও দেয় না। সুরীকোনা গ্রামের গণহত্যা নিয়ে কাউকে কিছু বলতে দেখা যায় না।

 

গালিমপুর : ‘৭১-এর ২০ মে স্থানীয় রাজাকার মদরিছ আলীর সহযোগিতায় পাকবাহিনীর দু’জন সেনা গালিমপুর গিয়ে গ্রামবাসীর কাছে টাকা দাবি করে। গ্রামবাসী টাকা জোগাড় করে মদরিছ আলীর হাতে তুলে দেয়। কিন্তু সেই টাকা পাকিস্তানিদের হাতে পৌঁছায়নি। ওইদিন পাকসেনারা গ্রামে এসে টাকা পৌঁছে দিয়ে কার্ড সংগ্রহের জন্য বলে। দুপুরে তারা গ্রামের ভেতরে প্রবেশ করে। গ্রামবাসী কার্ড দেখালেও ছয়জনকে হত্যা করে তারা। শুধু তাই নয়, আরো ২৫ জনকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে হত্যা করে কয়েকজনের লাশ নদীতে ফেলে দেয়। অনেক লাশ শেয়াল-কুকুর খেয়ে ফেলে। পরে এলাকার লোকজন তাদের কবর দেয়। গালিমপুর গণকবর হিসেবে হুরুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশে একাংশে তিন ফুট দেয়াল দেওয়া স্থানটিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন থেকে এ গণকবর অরক্ষিত।

 

বুরুঙ্গা : বুরুঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ে এলাকাবাসীকে নিয়ে একটি সভার মাধ্যমে শান্তি কার্ড দেওয়ার ঘোষণায় সেখানে অনেকে হাজির হন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ২৬ মে পাকবাহিনী তা ঘোষণা করলে রাজাকার আবদুল আহাদ চৌধুরী (ছাদ মিয়া), রুস্তুম চৌকিদার ও আবদুল খালেকসহ পাকবাহিনী দু’ভাগে বিভক্ত করে বিদ্যালয়ে শান্তি কার্ড নিতে আসা লোকদের বেঁধে ফেলে। দুপুর ১২টার দিকে তাদের বিদ্যালয় মাঠে লাইন বেঁধে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হয়। পাকবাহিনীর গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যায় ৭৮ জনের শরীর। এরপর মৃত-অর্ধমৃত দেহে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। সারাদিন আহতদের চিৎকারে ভারি হয়ে উঠে বুরুঙ্গার চারদিক। পরদিন স্থানীয় চেয়ারম্যান ও গ্রামবাসীরা বুরুঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশের খালি জায়গায় তাদের কবর দেয়। যা পরবর্তীকালে বুরুঙ্গা গণকবর হিসেবে পরিচিতি পায়। স্থানীয়রা জানান, বঙ্গবীর এমএজি ওসমানী জীবদ্দশায় প্রতি ১৬ ডিসেম্বরের বুরুঙ্গায় আসতেন; গণকবরে ফুল দিতেন। তবে তিনি আফসোস করতেন গ্রামবাসীর জন্য। বুরুঙ্গা গণকবর রক্ষার্থে যুদ্ধে গুলিবিদ্ধ স্থানীয় স্কুল শিক্ষক শ্রী নিবাস চক্রবর্তী ১৯৮৪ সালে দেখা করেন তৎকালীন বালাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লতিবুর রহমানের সঙ্গে। তার সহযোগিতায় সরকার ১১ হাজার টাকা ব্যয়ে বুরুঙ্গা গণকবরের চারদিকে দেয়াল নির্মাণ করেছিলেন। সংস্কারের অভাবে তা এখন পরে আছে অনাদরে।

 

আদিত্যপুর : ১৯৭১ সালের ১৪ জুন নারকীয় তাণ্ডব চলে আদিত্যপুরে। ওই দিন সকালে দু’টি জিপে করে ২০ থেকে ২৫ জন পাকসেনা রাজাকারদের সহযোগিতায় গ্রাম থেকে নিরীহ লোকদের ধরে নিয়ে যায়। আদিত্যপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে ৬৫ জনকে লাইনে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হয়। মুহূর্তের মধ্যে মাঠের সবুজ ঘাস মানুষের রক্তে লাল হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের বেশ কয়েক বছর পর যুদ্ধাহত শিবপ্রসাদ সেন আদিত্যপুর গণকবরের সীমানা নির্ধারণে দেয়াল তৈরির কাজে হাত দেন। ইট, বালু ইত্যাদি ক্রয় করার পর জমির মালিক বাঁধা দেয়। ফলে তার এ উদ্যোগ ভেস্তে যায়। ১৯৮৪ সালের ৩০ এপ্রিল বালাগঞ্জ থানা পরিষদের এক সভায় আদিত্যপুর গণকবর নামে ২৪ হাজার ৮৩২ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। চারদিকে দেয়াল দেওয়ার পর টাকা শেষ হয়ে যায়। বিশেষ দিবসে গ্রামের লোকজন ও ছাত্র/ছাত্রীরা সেখানে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।

 

বালাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আশ্রাফুল ইসলাম বলেন, গণকবরগুলো অবহেলায় পড়ে আছে- এ অভিযোগ ঠিক নয়। প্রাক্তন সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান চৌধুরীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বালাগঞ্জের চারটি গণকবরের মধ্যে বুরুঙ্গা ও আদিত্যপুরে গণকবরের স্থান টালইস দিয়ে সংস্কারের কাজ করা হয়। বিভিন্ন দিবসে স্থানীয় সাধারণ জনগণ সেই গণকবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

 

তিনি বলেন, সুরীকোনা গণকবরের স্থানটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। পরবর্তীকালে যে চর জেগে ওঠে সেখানে নিজে গিয়ে খোঁজ নিলেও সঠিকভাবে কেউ দেখাতে পারছে না কোথায় গণকবর ছিল।

 

 

 

রাইজিংবিডি/সিলেট/৬ ডিসেম্বর ২০১৪/বদর উদ্দিন আহমদ/বকুল

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়