ঢাকা     রোববার   ০৫ এপ্রিল ২০২৬ ||  চৈত্র ২২ ১৪৩২ || ১৬ শাওয়াল ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

‘কচ্ছপ প্রাণ- সেও তুচ্ছ আজ’

টিপু || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৫:১৮, ২৩ মে ২০১৫   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
‘কচ্ছপ প্রাণ- সেও তুচ্ছ আজ’

কচ্ছপ (ফাইলফটো)

শাহ মতিন টিপু : কচ্ছপকে বলা হয় দীর্ঘজীবী প্রাণী। ব্রিটিশ রয়েল ফ্যামিলিকে বৃটিশ পরিব্রাজক ক্যাপ্টেন কুকের উপহার দেওয়া কচ্ছপটি ১৮৮ বছর বেঁচেছিল। ভারতের আলীপুর চিড়িয়াখানার ‘আদৃতা’ নামের একটি কচ্ছপ বেঁচেছিল ২৫০বছর। কিন্তু দীর্ঘজীবী এই প্রাণীটিও এখন মারা পড়ছে অবাধে। এক ধরনের শিকারী ও পাচারকারীদের টার্গেটে পড়ে প্রাণীটি বিলুপ্ত হতে চলেছে। অবস্থাটা এমন যে, বলা যায়, ‘কচ্ছপ প্রাণ- সেও তুচ্ছ আজ।’ শিকারে পরিণত হচ্ছে দীর্ঘজীবন প্রাপ্তির আগেই। আজ বিশ্ব কচ্ছপ দিবস। বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন এ প্রাণী সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যেই ২০০০ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দিনটি উদযাপন করা হচ্ছে।

 

বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন  জীব কচ্ছপ সম্পর্কে  মানুষের মধ্যে জনসচেতনতা তৈরি, প্রকৃতির অন্যান্য জীবের পাশাপাশি এই জীবের প্রতি সম্মান দেখান ও এর সম্পর্কে জ্ঞান গরিমা বৃদ্ধি করাই এই দিবসটি পালনের মূল কারণ। দিবসটি পালনে উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ করেছিল আমেরিকার একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘আমেরিকান টরটয়েজ রেসকিউ’।

 

কচ্ছপ এমন সরীসৃপ, পানি এবং ডাঙা দুই জায়গাতেই যার বসবাস করে। শরীরের উপরিভাগ শক্ত খোলসে আবৃত। বর্তমানে পৃথিবীতে কচ্ছপের প্রায় ৩০০ প্রজাতি রয়েছে, এদের মধ্যে কিছু প্রজাতি মারাত্মক ভাবে বিলুপ্তির পথে রয়েছে। কচ্ছপ বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তার নিজের শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা পরিবর্তন করতে পারে। কচ্ছপ সাধারণত ঠান্ডা-রক্তের প্রাণী।

 

কচ্ছপ পাচার কতটা ভয়াবহ পর্যায়ে কয়েকটি সংবাদচিত্র থেকেই যা অনুমান সম্ভব। ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৪ শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে অবৈধভাবে পাচারকালে বিরল প্রজাতির বিপুলসংখ্যক কচ্ছপ উদ্ধার করে কাস্টম কর্তৃপক্ষ। বিমানবন্দরের বহির্গমন বিভাগের হেভি লাগেজ গেট থেকে দু’টি পরিত্যক্ত ব্যাগে এসব কচ্ছপ পাওয়া যায়। উদ্ধার হওয়া কচ্ছপের সংখ্যা ছিল ৫১০টি। ২৩ মার্চ ২০১৫ মালয়শিয়ায় পাচারকালে ঢাকার হজরত শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ১১৩টি বিরল প্রজাতির চিত্রা কচ্ছপ উদ্ধার করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। ওইদিন রাতে বিমানবন্দরের বহির্গমনের ৬ নম্বর গেট থেকে কচ্ছপগুলো উদ্ধার করা হয়। কচ্ছপগুলো লাগেজে ভরে মালিন্দ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে মালয়েশিয়া নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। আবার ৫ মে ২০১৫ ভারত থেকে পাচার হয়ে আসা বিরল প্রজাতির ৩৬১টি কচ্ছপ উদ্ধার করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ। বেনাপোলের পুটখালী সীমান্তের বারপোতা গ্রামের একটি মাঠ থেকে এই কচ্ছপগুলো উদ্ধার করা হয়।

 

অন্যদিকে একটি উদ্বেগজনক তথ্য এই যে, প্লাস্টিক ব্যাগের কারণে প্রতিবছর প্রায় এক লাখ সামুদ্রিক প্রানী মারা যায়। আর এই সামুদ্রিক প্রানীর মধ্যে রয়েছে কচ্ছপও। এইসব প্রানীর বেশিরভাগই খাবার হিসেবে প্লাস্টিক ভক্ষণ করে, যা পরবর্তীতে তাদের মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়। মানুষ অজ্ঞানতার কারণে প্লাস্টিককে সাগরে নিক্ষেপ করে। কিন্তু তারা হয়তো জানেও না যে তাদের নিক্ষেপিত প্লাস্টিকের কারণে প্রতিবছর এক লাখেরও বেশি কচ্ছপ মারা যায়। প্রতিবছর শুধু প্রশান্ত মহাসাগরেই ১৪ বিলিয়ন পাউন্ড প্লাস্টিক নিক্ষেপ করা হয়। প্রসঙ্গত, সাগরের প্রানীকূলের ভারসাম্য এবং বাস্তুসংস্থান রক্ষায় কচ্ছপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বর্তমানে সাগরের বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীদের মধ্যে কচ্ছপ অন্যতম।

 

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আমাদের দেশে লেগেছে অনেক আগ থেকেই। এই পরিবর্তিতধারার কারণে আমাদের দেশের অনেক প্রাকৃতিক সম্পদ আজ অস্তিত্ব সংকটে। এর মধ্যে জলজ প্রাণীর ক্রমহ্রাস চোখে পড়ার মত। আমাদের দেশে এক সময়ের কাঠুয়া কাছিম এখন আর অহরহ চোখে পড়ে না। বাংলাদেশের স্বাদু জলের শক্ত আবরণযুক্ত কচ্ছপ জাতীয় প্রাণীকে কাঠুয়া এবং নরম আবরণযুক্ত প্রাণীকে কাছিম বা কচ্ছপ বলা হয়।

 

বাড়ীর আঙ্গিনা থেকে শুরু করে সাগর সংযুক্ত স্বাদু জলের স্পর্শ পর্যন্ত এদের বিচরণ ভূমি ছিল। কাঠুয়া কাছিম এ সময়ের প্রজন্মের অনেকের কাছেই অদেখা প্রাণী। কাঠুয়া কাছিম খাদ্য হিসেবে যতটুকু না পছন্দের তার চেয়ে অধিক পছন্দ বাণিজ্যিক কারণে এবং তা বহু আগ থেকে। বিদেশের বাজারে কাছিমের ব্যাপক চাহিদা থাকার কারণে আমাদের দেশ থেকে অবাধে পাচার হয়ে যাচ্ছে এসব কাঠুয়া কাছিম।

 

কাছিম ইতিপূর্বে দেশের অভ্যন্তরীন জলাশয়সহ বিস্তৃীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলে বিচরণ করত এবং তাদের উৎপাদন অঞ্চলও ছিল এখানে। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর, নদীর মোহনা, বিল-বাওড়, নদী, পুকুরসহ বাড়ীর আঙ্গিনাতে কাঠুয়া কাছিম পাওয়া যেত। কাঠুয়া কাছিম দেশের চেয়ে বিদেশ যেমন হংকং, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর এবং ইউরোপিয় ইউনিয়নভূক্ত দেশগুলোতে খাদ্য হিসেবে ব্যাপক সমাদৃত।

 

পুকুর বা জলাশয়গুলোতে বিষ ও কীটনাশকের ব্যবহার, উৎপাদন বা সংরক্ষণে অনাগ্রহ বা উদ্যোগের অভাব, জলাশয়গুলোতে সহনশীল পরিবেশের অভাব, প্রয়োজনীয়তার বিষয় জানার অভাব, বাণিজ্যিকভিত্তিতে চিন্তা না করা, সঠিক বাজার অনুসন্ধান না করা, প্রাণীটি দেখামাত্র মেরে ফেলার প্রবণতা, সর্বোপরি জলবায়ু বা পরিবর্তিত পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে কাছিম আজ বিলুপ্তির পথে।

 

স্বাধীনাত্তোর সময়েও এদেশে বছরে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার কাঠুয়া কাছিম ধরা হতো বলে এক পরিসংখ্যানে জানা যায়। বর্তমানে এ বিষয়ে কোনো সঠিক পরিসংখ্যান জানা নাই। এতটুকু বলা যায়, স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে কাঠুয়া কাছিমের উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে সরকারিভাবে কচ্ছপ প্রতিপালনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

 

সাধারণত বর্ষা মৌসুমের পরে জলাশয়গুলো হতে জল সরে গেলে অর্থাৎ নভেম্বর হতে ফেব্রুয়ারী মাস পর্যন্ত সময়ে কাঠুয়া কাছিম ধরা পড়ে। দেশে সাধারণত দু জাতীয় কাঠুয়া এবং চার জাতীয় কাছিম পাওয়া যায়। প্রাণীটি সংরক্ষণে আজ উদ্যোগি ভূমিকা জরুরী। কাছিম বসবাসস্থল  নিরাপদ হওয়া দরকার। বিষ বা কীটনাশক ব্যাবহার সীমিত এবং নিয়ন্ত্রিত হতে হবে। বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে উদ্যোগী হয়ে কাছিম উৎপাদনের কাজে এগিয়ে আসতে হবে। বিশ্ব বাজার অনুসন্ধান করে উৎপাদিত এ পণ্য রপ্তানির ব্যবস্থা করতে হবে।

 

দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনযাত্রার হুমকি মোকাবেলায় কাঠুয়া কাছিম উৎপাদন এবং সংরক্ষণের জন্য গবেষণামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। একদিকে তা হবে পরিবেশগত ভারসাম্যের উপাদান, আবার কাঠুয়া কাছিমকে উৎপাদনমুখি করে তুললে দেশের বেকার মানুষের কাজের সংস্থানের পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।

 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৩ মে ২০১৫/টিপু

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়