ঢাকা     শুক্রবার   ১৯ জুন ২০২৬ ||  আষাঢ় ৫ ১৪৩৩ || ৩ মহররম ১৪৪৮ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

ভোজিনিয়া: গোলপোস্টের মানবপ্রাচীর

সাতসতেরো ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৮:৫৫, ১৯ জুন ২০২৬   আপডেট: ০৮:৫৯, ১৯ জুন ২০২৬
ভোজিনিয়া: গোলপোস্টের মানবপ্রাচীর

ভোজিনিয়া। ছবি: সংগৃহীত

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজেদের প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমে কেপ ভার্দে গোলশূন্য ড্র করে শক্তিশালী স্পেনের বিপক্ষে। আর সেই অবিশ্বাস্য ফলের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক জোসিমান জোসে ইভোরা দিয়াস—যাকে পুরো বিশ্ব চেনে ‘ভোজিনহো’ বা ‘ভোজিনিয়া’ নামে।

আরো পড়ুন:

স্পেনের বিপক্ষে তিনি করেন সাতটি দুর্দান্ত সেভ। ম্যাচ শেষে আবেগঘন এক সাক্ষাৎকারে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে তার গল্প। মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তার ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা বেড়ে যায় কয়েক হাজার থেকে কয়েক মিলিয়নে। 

‘ভোজিনিয়া’ নামের পেছনের গল্প
১৯৮৬ সালের ৩ জুন কেপ ভার্দের সাঁও ভিসেন্তে দ্বীপের মিন্দেলো শহরে জন্মগ্রহণ করেন ভোজিনিয়া। তার বাবা চেয়েছিলেন আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ফুটবলার জর্জ ভালদানোর নামানুসারে সন্তানের নাম রাখতে। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন সেই নাম অনুমোদন না করায় শেষ পর্যন্ত ১৯৮৬ বিশ্বকাপে আলো ছড়ানো ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার জেসিমার -এর নাম থেকে তার নাম রাখা হয় জোসিমান।

বাবা সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন, মা দীর্ঘ সময় কাজ করতেন। ফলে ছোটবেলা কেটেছে দাদা-দাদির স্নেহে। রাস্তায় বড় ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে গিয়ে প্রায়ই ধাক্কা খেতেন, পড়ে যেতেন, আবার হেরে গেলে রাগ করে বাড়ি ফিরে যেতেন। তখন অন্য শিশুরা মজা করে বলত, সে তার ‘আভোজিনিয়া’—অর্থাৎ দাদির কাছে নালিশ করতে যাচ্ছে। সেখান থেকেই জন্ম নেয় ‘ভোজিনিয়া’ ডাকনামটি।

ছোটখাটো গড়ন থেকে গোলপোস্টের প্রহরী
শৈশবে তার শারীরিক গঠন ছিল বেশ ছোট। ফলে অনেক কোচই তাকে গুরুত্ব দেননি। কিন্তু ১৮ থেকে ১৯ বছর বয়সের মধ্যে হঠাৎ তার উচ্চতা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১.৮৯ মিটার। তবুও ফুটবল ক্যারিয়ার সহজ ছিল না। পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে তাকে বাসচালক এবং ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কাজ করতে হয়েছে। পেশাদার ফুটবলে প্রথম চুক্তি পান ২০১২ সালে, তখন তার বয়স ২৫। যে বয়সে অনেক ফুটবলারের ক্যারিয়ার প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, সেই বয়সে ভোজিনিয়া মাত্র শুরু করেছিলেন নিজের স্বপ্নের পথচলা।

আফ্রিকা থেকে ইউরোপ
কেপ ভার্দের সীমিত ফুটবল অবকাঠামো তাকে দেশের বাইরে পাড়ি জমাতে বাধ্য করে। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি খেলেছেন অ্যাঙ্গোলার প্রোগ্রেসো, মলদোভার জিমব্রু চিসিনাউ, পর্তুগালের জিল ভিসেন্তে ও সিডি চাভেস এবং স্লোভাকিয়ার এএস ট্রেনচিনের মতো ক্লাবে। অ্যাঙ্গোলায় খেলাকালেই তার পেশাদার পরিচয়ের সঙ্গে স্থায়ীভাবে জুড়ে যায় ‘ভোজিনিয়া’ নামটি। দলে আরেকজন গোলরক্ষকের নামও ছিল জোসিমার। নিজের জার্সিতে একই নাম ব্যবহার না করে তিনি ছোটবেলার ডাকনাম ‘ভোজিনিয়া’ লেখার সিদ্ধান্ত নেন। সেই সিদ্ধান্তই পরবর্তীতে তাকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করে তোলে।

অবসর ভাবনা থেকে বিশ্বকাপে
একসময় আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন তিনি। বয়স বাড়ছিল, সুযোগ কমছিল। কিন্তু সতীর্থদের অনুরোধে জাতীয় দলে থেকে যান। ৪০ বছর বয়সে বিশ্বকাপ অভিষেকে ক্লিন শিট রেখে ইতিহাস গড়েন তিনি। বিশ্বকাপের মঞ্চে অভিষেক ম্যাচে ক্লিন শিট রাখা সবচেয়ে বয়স্ক গোলরক্ষকদের একজন হিসেবে নাম লেখান ফুটবল ইতিহাসে।

কান্নার পেছনের গল্প
স্পেনের মতো শক্তিশালী দলের আক্রমণ সামলে ম্যাচ শেষে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন ভোজিনিয়া। কারণ সেই মুহূর্তে তার মনে পড়ছিল দাদা-দাদির কথা। যাদের স্নেহে তিনি বড় হয়েছেন, তারা কয়েক বছর আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনের মুহূর্তটি তারা দেখে যেতে পারেননি। আরও একটি কষ্ট ছিল তার হৃদয়ে। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে তার মা আনা ক্যান্ডিডা ইভোরা যুক্তরাষ্ট্রে এসে বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখতে পারেননি।

সাক্ষাৎকারে মায়ের প্রসঙ্গ তুলে ধরার পর বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এরপর মার্কিন রাজনীতিক হাকিম জেফারিস এবং মার্কো রুবিও-র হস্তক্ষেপে তার মায়ের ভ্রমণ-সংক্রান্ত জটিলতা দূর হয়। 

ফুটবল বিশ্বকাপে প্রায়ই জন্ম নেয় নতুন তারকা। কিন্তু ভোজিনিয়ার গল্প শুধু ফুটবলীয় সাফল্যের নয়; এটি অধ্যবসায়, সংগ্রাম এবং পরিবারের প্রতি ভালোবাসার গল্পের জয়। বিশ্বকাপের অভিষেক ম্যাচে তিনি স্পেনের বিপক্ষে সেই সাতটি গোল সেভ করে  একটি ম্যাচ বাঁচায়নি; জন্ম দিয়েছেন ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ী রূপকথার।

তথ্যসূত্র: বিবিসি স্পোর্টস, রয়টার্স, দ্যা গার্ডিয়ান

ঢাকা/লিপি

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়