ঢাকা     রোববার   ১২ এপ্রিল ২০২৬ ||  চৈত্র ৩০ ১৪৩২ || ২৪ শাওয়াল ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

হামের প্রাদুর্ভাব

শিশু হাসপাতালে রোগীর চাপ, আইসিইউ সংকটে বাড়ছে উদ্বেগ

সাহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:২০, ১২ এপ্রিল ২০২৬  
শিশু হাসপাতালে রোগীর চাপ, আইসিইউ সংকটে বাড়ছে উদ্বেগ

হামের প্রাদুর্ভাবে রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে রোগীর চাপ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বিশেষায়িত হাম ইউনিট চালু হলেও চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক, নার্স। প্রতিটি ওয়ার্ডেই রয়েছে রোগীর চাপ। আইসিইউ সংকট এই পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। অভিভাবকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে গভীর উদ্বেগ।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, সংক্রমণ মোকাবিলায় আলাদা ইউনিট চালুর পর সেখানে ৭০টি বেড প্রস্তুত করা হয়েছে। কিন্তু রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ায় নির্ধারিত সক্ষমতা অতিক্রম করেও ভর্তি নিতে হচ্ছে। বর্তমানে বেড ও কেবিন মিলিয়ে ৭৫ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। এর মধ্যে আইসিইউ সুবিধা রয়েছে মাত্র ১৪টি শয্যায়। এ ছাড়া হাই ডিপেনডেন্সি ও আইসোলেশন ইউনিটে আছে ১৭টি বেড, যেখানে অপেক্ষাকৃত ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের রাখা হচ্ছে।

আরো পড়ুন:

হাসপাতালের হাম ইউনিটে কর্তব্যরত একজন চিকিৎসক রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘‘হামে আক্রান্ত শিশুকে সাধারণ রোগের মতো চিকিৎসা দেওয়া যায় না। একজন হাম আক্রান্ত শিশু থেকে অন্তত ১০ জন আক্রান্ত হতে পারে। আলাদা আইসোলেশন নিশ্চিত না করলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। একইসঙ্গে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্টসহ অন্যান্য জটিলতায় আক্রান্ত শিশুদের অবস্থা আরও জটিল হয়ে উঠেছে। তাই বেড খালি থাকা সাপেক্ষে হামের রোগী ভর্তি করানো হচ্ছে।’’

‘‘সারাদেশ থেকে এখানে মানুষ ছুটে আসছেন। আমাদের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবে আমরা জটিল কোন রোগী আসলে বেড খালি না থাকলেও চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করছি,’’ যোগ করেন তিনি। 

অভিভাবকদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ আইসিইউ সংকটকে ঘিরে। গুরুতর শিশুদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সীমিত শয্যার কারণে অনেক ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।

হাম ইউনিটে ভর্তি থাকা ছয় মাস বয়সী শিশু সাইমনের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, “ডাক্তাররা বলেছেন, অবস্থা খারাপ হলে আইসিইউ নিতে হতে পারে। কিন্তু সিট পাওয়া যাবে কি না, সেটাই বড় দুশ্চিন্তা।”

আট মাস বয়সী আরেক শিশুর মা জান্নাতুল ফেরদৌস জানান, তার সন্তানের শ্বাসকষ্ট বাড়ছে এবং অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে কী হবে। এই আশঙ্কা সবসময় তাকে তাড়া করছে।

হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের এক চিকিৎসক জানান, গুরুতর রোগীদের প্রথমে অক্সিজেন সাপোর্ট এবং বাবল সিপ্যাপের মাধ্যমে শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হয়। এতে অনেক ক্ষেত্রে উন্নতি হয়। তবে অবস্থার অবনতি হলে তখন নিবিড় পরিচর্যা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। কিন্তু সীমিত সংখ্যক আইসিইউ বেডের কারণে কেবল সবচেয়ে সংকটাপন্ন রোগীদেরই সেখানে স্থান দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।

হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহবুবুল হক রাইজিংবিডিকে বলেন, “হামের রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় একটি বিশেষায়িত ইউনিট চালু করা হয়েছে। তবে আইসিইউ সুবিধার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। জটিল অবস্থায় থাকা শিশুদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আইসিইউ সেবা প্রদান করা হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে চিকিৎসকদের ওপর চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। রোগীর সংখ্যা বেশি হলেও বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা সীমিত থাকায় প্রতিটি চিকিৎসা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। আমরা আইসিইউ সেবা বৃদ্ধি করার চেষ্টা করছি।’’

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোজাফফর হোসেন বলেন, ‘‘হামের মতো সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে আগাম ও সমন্বিত প্রস্তুতি অত্যন্ত জরুরি ছিল। বাস্তবে সেই প্রস্তুতির ঘাটতি এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শুধু টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করলেই এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলা সম্ভব নয়। কার্যকর নজরদারি, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, আইসোলেশন ব্যবস্থা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এসব উদ্যোগ সময়মতো বাস্তবায়ন না হলে সংক্রমণ দ্রুত বিস্তার লাভ করে এবং তা বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পরিণত হয়।’’

তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘‘ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে হলে স্বাস্থ্যখাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, পরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদার করা ছাড়া বিকল্প নেই। অন্যথায় প্রতিরোধযোগ্য রোগও বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।’’
উল্লেখ্য, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী গত ১৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া বর্তমান প্রাদুর্ভাবে সারাদেশে হাম আক্রান্ত ও উপসর্গ রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৬৫৩ জনে। এর মধ্যে ১৭৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

ঢাকা/এমএসবি/

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়