ঢাকা     সোমবার   ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ ||  মাঘ ৬ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আন্তর্জাতিক আইনের চেয়ে মার্কিন ক্ষমতাই বড়: গুতেরেস

আন্তর্জাতিক ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৭:১৮, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬   আপডেট: ১৭:৩২, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আন্তর্জাতিক আইনের চেয়ে মার্কিন ক্ষমতাই বড়: গুতেরেস

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস

‘যুক্তরাষ্ট্র দায়মুক্তির মনোভাব নিয়ে কাজ করছে এবং আন্তর্জাতিক আইনের চেয়ে নিজের ক্ষমতাকেই বড় মনে করে’ বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। সোমবার (১৯ জানুয়ারি) বিবিসি রেডিও ৪-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করেন তিনি।

গুতেরেস বলেন, “ওয়াশিংটনের মধ্যে একটি স্পষ্ট বিশ্বাস কাজ করছে যে, বহুপক্ষীয় সমাধান অপ্রাসঙ্গিক।” তিনি বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে, তা হলো মার্কিন ক্ষমতা ও প্রভাবের প্রয়োগ। কখনো কখনো সেই প্রয়োগ আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ডকে পাশ কাটিয়ে করা হচ্ছে।”

আরো পড়ুন:

জাতিসংঘ প্রধানের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যার কয়েক সপ্তাহ আগেই যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় হামলা করেছে ও দেশটির প্রেসিডেন্টকে আটক করেছে। পাশাপাশি গ্রিনল্যান্ড দখল করার বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকি এখনো অব্যাহত রয়েছে।

গুতেরেস বলেন, “জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার মূল নীতিগুলোর মধ্যে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সমতা অন্যতম। কিন্তু এখন এই নীতি হুমকির মুখে।”

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই জাতিসংঘের সমালোচনা করে আসছেন। গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে তিনি জাতিসংঘের অস্তিত্বের প্রয়োজনীয়তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি দাবি করেন, তিনি একাই ‘শেষ করা অসম্ভব এমন সাতটি যুদ্ধ শেষ করেছেন’, অথচ জাতিসংঘ ‘এর একটিতেও সাহায্য করার চেষ্টা করেনি’। ট্রাম্প তখন বলেছিলেন, “পরে আমি বুঝেছি, জাতিসংঘ আমাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সেখানে ছিল না।”

এই কঠোর মূল্যায়নের মুখে গুতেরেস স্বীকার করেন, জাতিসংঘ সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে সনদে বর্ণিত আন্তর্জাতিক আইন মানতে বাধ্য করতে হিমশিম খাচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বড় বড় বৈশ্বিক সংকট সমাধানে জাতিসংঘ ‘অত্যন্ত সক্রিয়।’ তবে তিনি স্বীকার করেন, ‘জাতিসংঘের কোনো চাপ প্রয়োগের ক্ষমতা নেই; এই ক্ষমতা বড় শক্তিগুলোর হাতেই বেশি’।

গুতেরেস প্রশ্ন তোলেন, সেই অতিরিক্ত শক্তি কি সংঘাতের সত্যিকার ও টেকসই সমাধানের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে, নাকি কেবল সাময়িক সমাধানের জন্য। তিনি বলেন, “এই দুইয়ের মধ্যে বড় পার্থক্য আছে।”

তিনি আরো বলেন, জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশের সামনে যে ‘ভয়াবহ সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ’ রয়েছে, তা মোকাবিলায় সংস্থাটির সংস্কার জরুরি। তিনি বলেন, কিছু মানুষ মনে করে আইনের শক্তির জায়গায় ক্ষমতার আইন বসানো উচিত।

জাতিসংঘ প্রধান বলেন, “বাস্তবে, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নীতির দিকে তাকালে দেখা যায়, একটি স্পষ্ট ধারণা কাজ করছে- বহুপক্ষীয় সমাধান গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি ও প্রভাবের প্রয়োগ এবং অনেক সময় তা আন্তর্জাতিক আইনের নিয়মের তোয়াক্কা না করেই করা হয়।”

তিনি ইঙ্গিত দেন, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য গঠিত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ আর বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব করে না এবং এটি এখন ‘অকার্যকর’ হয়ে পড়েছে।

নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্য- ফ্রান্স, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্র- যেকোনো প্রস্তাব ভেটো দিয়ে আটকে দিতে পারে। রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধ বন্ধের বৈশ্বিক প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করতে ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করেছে।

গুতেরেস দাবি করেন, নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য ভেটো ব্যবহার করছে এবং তিনি এই সত্যটির সমালোচনা করেন যে, ‘তিনটি ইউরোপীয় দেশ’ নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্য হিসেবে রয়েছে।

তিনি নিরাপত্তা পরিষদের গঠন পরিবর্তনের আহ্বান জানান। তার ভাষায়, এতে করে পরিষদ ‘আবার বৈধতা ফিরে পাবে’ এবং ‘পুরো বিশ্বের কণ্ঠস্বর শোনা যাবে।’ একই সঙ্গে, তিনি ভেটো ক্ষমতা সীমিত করার কথা বলেন, যাতে অগ্রহণযোগ্য ‘অচলাবস্থা’ এড়ানো যায়।

পর্তুগালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গুতেরেস ২০১৭ সালে জাতিসংঘ প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং চলতি বছরের শেষে তিনি এই দায়িত্ব ছাড়বেন।

সাধারণ পরিষদে তার বার্ষিক ভাষণে বিশৃঙ্খল এক বিশ্বের কথা তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, বর্তমান বিশ্ব সংঘাত, দায়মুক্তি, বৈষম্য ও অনিশ্চয়তায় পরিপূর্ণ। বৈশ্বিক ব্যবস্থার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক আইনের প্রকাশ্য লঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করেন।

গুতেরেস গাজা সংঘাতকে জাতিসংঘের জন্য একটি অন্যতম প্রধান সংকট হিসেবে উল্লেখ করেন। যুদ্ধের বড় একটি সময়ে জাতিসংঘ গাজায় ত্রাণ বিতরণ করতে পারেনি। কারণ, ইসরায়েল আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোকে সেখানে প্রবেশ করতে দেয়নি।

এক পর্যায়ে ইসরায়েল বাইরের একটি প্রতিষ্ঠান জিএইচএফ-কে গাজায় ত্রাণ বিতরণের অনুমতি দেয়, অথচ জাতিসংঘ কয়েক দশক করে গাজায় ত্রাণ বিতরণ করে আসছিল। জিএইচএফ-এর ত্রাণ কেন্দ্রে খাবার পাওয়ার চেষ্টাকালে শত শত ফিলিস্তিনি নিহত হন।

গাজা ইস্যুতে জাতিসংঘ কী শক্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে- বিবিসির এমন প্রশ্নের জবাবে গুতেরেস বলেন, “অবশ্যই, তবে বিষয়টি পরিষ্কার করা দরকার। দীর্ঘ সময় ধরে ইসরায়েল বলছিল, জাতিসংঘ সক্ষম না হওয়ায় মানবিক সহায়তা বিতরণ করা যাচ্ছে না। কিন্তু বাস্তবে, যখনই ইসরায়েল আমাদের গাজায় যেতে দিত না, তখন আমরা গাজায় যেতে পারতাম না। এরপর যুদ্ধবিরতি হয়, এবং তখন বিপুল পরিমাণ মানবিক সহায়তা প্রবাহিত হয়।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, “পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে আমরা প্রস্তুতই ছিলাম।”

কয়েক দিন আগে, গুতেরেস জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বলেন, “১৯৪৫ সালের সমস্যা সমাধানের পদ্ধতি দিয়ে ২০২৬ সালের সমস্যা সমাধান করা যাবে না।” তিনি এর মাধ্যমে সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাকালীন কাঠামোর দিকে ইঙ্গিত করেন। চ্যালেঞ্জ বেড়েই চলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের চাপে ভেনেজুয়েলার নেতৃত্ব পরিবর্তন, ইরানে সরকারি বাহিনীর হাতে হাজার হাজার বিক্ষোভকারীর মৃত্যু এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের ঘোষণা- সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠছে।

বহুপাক্ষিক বিশ্ব ব্যবস্থার মৃত্যু এবং আন্তর্জাতিক আইনের শাসন রক্ষায় কিছু বিশ্বনেতার নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। তবে জাতিসংঘ প্রধান বলেন, তিনি আশাবাদী থাকতে চান।

গুতেরেস বলেন, “মানুষ অনেক সময় শক্তিশালীদের মুখোমুখি হতে অনীহা দেখায়। কিন্তু সত্য হলো, যদি আমরা শক্তিশালীদের মোকাবিলা না করি, তাহলে কখনোই আমরা একটি ভালো বিশ্ব গড়ে তুলতে পারব না।”

ঢাকা/ফিরোজ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়