ফিলিস্তিনিদের ভূমি কেড়ে নিতে ইসরায়েলের নতুন ‘আইনি’ ফাঁদ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি পতাকা দিয়ে সাজানো ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের একটি বেড়ার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন একজন ফিলিস্তিনি ব্যক্তি
ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, ১৯৬৭ সালের পর প্রথমবারের মতো অধিকৃত পশ্চিম তীরে ভূমি নিবন্ধনের কার্যক্রম পুনরায় শুরু করার ইসরায়েলের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ ও বাস্তুচ্যুত করার প্রক্রিয়াকে সহজতর করবে। খবর আল-জাজিরার।
সুদীর্ঘ ছয় দশক পর অধিকৃত পশ্চিম তীরে ভূমি নিবন্ধনের কার্যক্রম (যা ভূমির মালিকানা নিষ্পত্তি হিসেবেও পরিচিত) আবারো চালু করা হয়েছে। গত রবিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) ইসরায়েলি সংসদের অনুমোদনের পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দেশটির অতি-ডানপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ, বিচারমন্ত্রী ইয়ারিভ লেভিন এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ এই প্রস্তাবটি সংসদে তুলেছিলেন।
গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ইসরায়েল সামরিক আদেশের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি জমি দখল বৃদ্ধি করেছে, তবে নতুন এই পদক্ষেপটি ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদে ইসরায়েলকে একটি আইনি পথ তৈরি করে দেবে।
ইসরায়েলের মানবাধিকার সংস্থা বিমকোম এক বিবৃতিতে বলেছে, এটি ‘ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ ও বর্ণবাদী শাসনকে শক্তিশালী করতে ফিলিস্তিনি ভূমি দখলের বিষয়টিকে একটি কাঠামোগত রূপ দেবে।”
বিমকোম-এর গবেষণা প্রধান মিশাল ব্রায়ার আল-জাজিরাকে বলেন, ফিলিস্তিনি জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশের কাছে এই ভূমি নিবন্ধন প্রক্রিয়াটি জটিল হবে। কারণ অনেকের জমি কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত হয়নি অথবা তারা মালিকানা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হতে পারেন।
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ১৯৪৯ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত জর্ডান প্রশাসনের অধীনে (ব্রিটিশ ম্যান্ডেট শাসনের পর) মোট এলাকার মাত্র ৩০ শতাংশ জমি নিবন্ধিত হয়েছিল। ব্রায়ার জানান, এর ফলে পশ্চিম তীরের প্রায় ৭০ শতাংশ জমিই ‘সম্পূর্ণ অনিবন্ধিত’। ফলে ‘প্রকৃতপক্ষে জমির মালিক কে তা নির্ধারণ করা খুবই কঠিন’।
এমনকি যাদের জমি নিবন্ধিত ছিল, তাদের ক্ষেত্রে ব্রায়ার বলেন, “জমির মালিকানা প্রমাণ করার আইনি মানদণ্ড এতটাই কঠিন যে, বেশিরভাগ ফিলিস্তিনিদের কাছে তা প্রমাণ করার মতো যথাযথ নথি থাকবে না।”
‘পূর্ণ দখলদারিত্ব’
১৯৬৮ সালে দখলদার ইসরায়েলি সরকার গাজা উপত্যকা ও পশ্চিম তীরে বেশিরভাগ ভূমি নিবন্ধন কার্যক্রম স্থগিত করে দেয়, যার ফলে ফিলিস্তিনিদের জন্য বংশপরম্পরায় মালিকানা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তার ওপর, অনেক আইনি দলিল হারিয়ে গেছে বা এমন সব বাড়িতে রয়ে গেছে যা এখন ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের নাগালের বাইরে। ১৯৪৮-৪৯ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় তারা বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন, যখন সদ্য প্রতিষ্ঠিত ইসরায়েল ফিলিস্তিনের ৭৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল মিশরের কাছ থেকে সিনাই উপদ্বীপ এবং সিরিয়ার কাছ থেকে গোলান মালভূমি দখল করার পাশাপাশি পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম ও গাজা দখল করে নেয়।
ইসরায়েলি বসতি-বিরোধী গোষ্ঠী পিস নাউ বলছে, ভূমি নিবন্ধনের নতুন এই কার্যক্রমটি ফিলিস্তিনি ভূমি ‘পূর্ণভাবে আত্মসাৎ বা দখলের’ শামিল।
পিস নাউ-এর সদস্য হাগিত অফরান আল-জাজিরাকে বলেন, “এটি পশ্চিম তীরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার একটি ইসরায়েলি কৌশল। সরকার এমন সব কাগজপত্র চাইছে যা ১০০ বছর আগের ব্রিটিশ ম্যান্ডেট বা জর্ডান আমলের।” তিনি আরো যোগ করেন, “ফিলিস্তিনিদের পক্ষে এটি প্রমাণ করা খুব কমই সম্ভব হবে, আর তাই ডিফল্টভাবে জমিগুলো ইসরায়েলের নামে নিবন্ধিত হয়ে যাবে।”
গত মাসে ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্ট ভূমি নিবন্ধন কার্যক্রম পুনরায় শুরুর বিরোধিতাকারী একটি আবেদন খারিজ করে দেয়। বিমকোম, ইয়েশ দিন, অ্যাসোসিয়েশন ফর সিভিল রাইটস ইন ইসরায়েল এবং হামোকড-এর মতো মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই আবেদন করেছিল। আদালত সরকারের সিদ্ধান্তের বাস্তবায়নের বিষয়ে রায় দেওয়াকে ‘অপরিণত’ বলে অভিহিত করেছে।
‘সম্পূর্ণ অবৈধ’
ইসরায়েল সরকার ভূমি নিবন্ধন কার্যক্রমটি কীভাবে পরিচালিত হবে সে সম্পর্কে খুব কম তথ্য প্রকাশ করেছে। তবে অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে ইতিপূর্বেই একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ২০১৮ সালে শুরু হওয়া ভূমি নিবন্ধনের ফলে ফিলিস্তিনি জমি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
বিমকোম-এর গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পূর্ব জেরুজালেমে নিবন্ধিত জমির মালিকানার মাত্র ১ শতাংশ ফিলিস্তিনিদের নামে নিবন্ধিত হয়েছে। বাকি সব জমি ইসরায়েল রাষ্ট্র বা ব্যক্তিগত ইসরায়েলি মালিকদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
এই পদক্ষেপটি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে পূর্ব জেরুজালেমের ওপর ইসরায়েলের দখলদারিত্বকে প্রসারিত করেছে, যা ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) দেওয়া রায়েরও পরিপন্থি।
বিশ্ব আদালত তার ঐতিহাসিক রায়ে বলেছিল, ইসরায়েলের ‘জমি ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা, জনসংখ্যা স্থানান্তর এবং দখলকৃত অংশকে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে প্রণীত আইনগুলো সম্পূর্ণ অবৈধ এবং ওই অঞ্চলের মর্যাদাকে পরিবর্তন করতে পারে না।”
সামগ্রিকভাবে, আইসিজে রায় দেয় যে, পূর্ব জেরুজালেম, পশ্চিম তীর এবং গাজা উপত্যকা নিয়ে গঠিত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি দখলদারিত্ব অবৈধ এবং এটি ‘যত দ্রুত সম্ভব’ শেষ করতে হবে।
ইসরায়েলের মানবাধিকার সংস্থা বিমকোম-এর গবেষণা প্রধান ব্রায়ার বলেন, ইসরায়েলি সরকারের এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর সর্বশেষ পদক্ষেপ। তার মতে, “ইসরায়েলি সরকার তাদের উদ্দেশ্য গোপন করছে না। তারা বসতি সম্প্রসারণ করতে চায় এবং ফিলিস্তিনিদের যতটা সম্ভব ক্ষুদ্র এলাকায় ঠেলে দিতে চায়।”
ঢাকা/ফিরোজ