ঢাকা     বৃহস্পতিবার   ০৫ মার্চ ২০২৬ ||  ফাল্গুন ২০ ১৪৩২ || ১৫ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

ইরান যুদ্ধকে কেন ‘ধর্মযুদ্ধে’ রূপ দেওয়ার চেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২২:২৩, ৪ মার্চ ২০২৬   আপডেট: ২২:২৩, ৪ মার্চ ২০২৬
ইরান যুদ্ধকে কেন ‘ধর্মযুদ্ধে’ রূপ দেওয়ার চেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল?

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পঞ্চম দিনে গড়ানোর মধ্যে একটি বিষয় নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। আর তা হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কিছু কর্মকর্তা এই যুদ্ধ নিয়ে এমন ভাষা ব্যবহার করছেন, যা থেকে বোঝা যাচ্ছে, ইরানের বিরুদ্ধে এই অভিযানকে ‘ধর্মীয় যুদ্ধ’ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

আলজাজিরা লিখেছে, মঙ্গলবার মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (সিএআইআর) পেন্টাগনের এমন বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে একে ‘বিপজ্জনক’ ও ‘মুসলিমবিরোধী’ বলে আখ্যা দিয়েছে।

আরো পড়ুন:

গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করে এবং এরপর থেকে দেশটিতে ধারাবাহিকভাবে বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। পাল্টা জবাবে ইরান ইসরায়েলের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার পাশাপাশি বাহরাইন, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক ও সাইপ্রাসে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাতেও হামলা চালিয়েছে।

‘যুদ্ধের লক্ষ্য বাইবেলের শেষ সময় ডেকে আনা’?
এক মার্কিন পর্যবেক্ষক সংস্থা জানিয়েছে, কিছু সেনাসদস্য অভিযোগ করেছেন, তাদের বলা হয়েছে, এই যুদ্ধের উদ্দেশ্য হলো ‘বাইবেলে বর্ণিত শেষ সময়’ বা ‘আর্মাগেডন’ ডেকে আনা।

ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষায় কাজ করা অলাভজনক সংস্থা মিলিটারি রিলিজিয়াস ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (এমআরএফএফ) বলছে, তারা ইমেইলের মাধ্যমে অভিযোগ পেয়েছেন যে, মার্কিন সেনাদের বলা হয়েছে- ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ‘ঈশ্বরের পরিকল্পনার অংশ’।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, একজন কমান্ডার না কি বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ‘যিশু অভিষিক্ত করেছেন, যাতে ইরানে প্রতীকী আগুন জ্বালিয়ে আর্মাগেডনের সূচনা করা যায়।”

নেতাদের বক্তব্যে ধর্মীয় ইঙ্গিত
ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি গত মাসে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বাইবেলে প্রতিশ্রুত ভূমির ভিত্তিতে ইসরায়েল চাইলে ‘পুরো মধ্যপ্রাচ্য’ দখল করলেও তা অস্বাভাবিক হবে না; যদিও তিনি যোগ করেন, ইসরায়েল এমন কিছু করতে চায় না।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্প্রতি বলেন, “ইরান পরিচালনা করছে ধর্মীয় উগ্রপন্থি উন্মাদরা।”

অন্যদিকে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, “ইরানের মতো উন্মত্ত শাসনব্যবস্থা, যারা ভবিষ্যদ্বাণীমূলক ধর্মীয় বিভ্রমে আচ্ছন্ন, তাদের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকা উচিত নয়।”

সিএআইআর দাবি করেছে, হেগসেথের বক্তব্য শিয়া ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি ইঙ্গিত করে দেওয়া হয়েছে।

রবিবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তোরাহ উদ্ধৃত করে ইরানকে বাইবেলের প্রাচীন শত্রু ‘আমালেক’-এর সঙ্গে তুলনা করেন। ইহুদি ঐতিহ্যে ‘আমালেককে’ চরম অশুভ শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।

কেন সংঘাতকে ধর্মীয় রূপ দেওয়া হচ্ছে?
যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোলিয়ন মিচেল আলজাজিরাকে বলেন, ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করে নেতারা জনগণকে একত্রিত করতে চান এবং নিজেদের পদক্ষেপকে নৈতিক বৈধতা দিতে চেষ্টা করেন।

কাতারের নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ইব্রাহিম আবুশারিফ বলেন, এভাবে সংঘাতকে ‘সভ্যতা বনাম উগ্রতা’ বা ‘ভালো বনাম মন্দ’ হিসেবে উপস্থাপন করা হলে সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টি সহজ ও আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে।

তিনি বলেন, “যুদ্ধ আসলে ভূরাজনৈতিক। কিন্তু ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করলে তা নৈতিক নাটকে পরিণত হয়; যেখানে আপস বা সমঝোতার জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়।”

আগে কি এমন হয়েছে?
ইসরায়েলের গাজা অভিযানের সময়ও নেতানিয়াহু ‘আমালেক’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশও ‘ক্রুসেড’ শব্দ ব্যবহার করেছিলেন, যা পরে বিতর্কের জন্ম দেয় এবং হোয়াইট হাউস ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য হয়।

ঝুঁকি কোথায়?
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধকে যদি ‘পবিত্র যুদ্ধ’ হিসেবে তুলে ধরা হয়, তাহলে রাজনৈতিক সমঝোতা আরো কঠিন হয়ে পড়ে। প্রত্যাশা বাড়ে, আপসের সুযোগ কমে যায় এবং কূটনৈতিক সমাধান জটিল হয়ে ওঠে।

ইব্রাহিম আবুশারিফের ভাষায়, “যুদ্ধের ভাষা যখন পবিত্রতার আবরণ পায়, তখন তা শুধু রাজনীতি নয়; পরিচয় ও বিশ্বাসের লড়াইয়ে রূপ নেয়। আর সেখানেই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।”

ঢাকা/রাসেল

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়