ঢাকা     মঙ্গলবার   ১০ মার্চ ২০২৬ ||  ফাল্গুন ২৫ ১৪৩২ || ২০ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

হায় গ্রাহাম, তাহলে তেলই ছিল মনে!

রাসেল পারভেজ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০২:৪২, ১০ মার্চ ২০২৬   আপডেট: ০২:৫৬, ১০ মার্চ ২০২৬
হায় গ্রাহাম, তাহলে তেলই ছিল মনে!

মার্কিন রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম।

ইরান যুদ্ধ বিশ্বকে খাওয়াতে পারছে না যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের সম্ভাব্য পারমাণিক অস্ত্র তৈরি বা যুক্তরাষ্ট্রে হামলার আশঙ্কাকে অজুহাত বানিয়ে বলা-কওয়া ছাড়া যেভাবে ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে বিপুল সামরিক ব্যয় সত্ত্বেও হামলে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র, তার শতগুণ উসুল করার ফন্দি আগেই এঁটে রেখেছে তারা। ফলে খামেনিকে ‘শয়তান’ বলা, ধর্মযুদ্ধের রঙ লাগানো, ট্রাম্পের গায়ে-মাথায় যাজকদের ফু দেওয়া- সবই লোক দেখানো। তাদের আসল ধান্দা তেলে। যে কথা ফুঁস করে বেরিয়ে এসেছে মার্কিন রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের মুখ থেকে। তিনি বলেছেন, “ভেনেজুয়েলা ও ইরানের কাছে বিশ্বের প্রায় ৩১ শতাংশ তেল মজুত রয়েছে। আমরা সেই ৩১ শতাংশের অংশীদার হব। এটা চীনের জন্য দুঃস্বপ্ন। এটা খুব ভালো বিনিয়োগ।”

যুদ্ধ যখন বিনিয়োগ, ভালো বিনিয়োগ; তখন মুনাফা তো উসুল করতেই হবে। ইরানের সব কিছু লণ্ডভণ্ড করে একটি জাতিকে পঙ্গু করে দিয়ে দেশটির মজুত তেল কেড়েকুড়ে নিতে না পারলে মুনাফা আসবে কী করে! এর জন্য গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষার বয়ান, কট্টরপন্থা-সন্ত্রাস বিনাশের নামে পশ্চিমের গণমাধ্যমকে নামিয়ে দিয়ে তলে তলে তেলের খনিতে মুনাফার শূড় ঢুকিয়ে তা টেনে আনতে প্রস্তুত ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ শিরোনামের বৈশ্বিক ধাপ্পাবাজ ট্রাম্প প্রশাসন। সিনেটর গ্রাহামের মুখে সেই শূড়ের সন্ধান পাওয়া মোটেও চমকপ্রদ বিষয় নয়।

আরো পড়ুন:

ফলে আফসোসের সঙ্গে বলতেই হয়, হায় গ্রাহাম! তাহলে তেলই ছিল মনে? মনে কত গভীর সেই তেলের বাসনা, একটু তল্লাশি চালিয়ে দেখা যাক।

লিন্ডসে গ্রাহামের ‘খুললাম খুললাম’ বক্তব্যের পর ইরানে হামলাকে আর যুদ্ধ বলা কোনোমতেই সমীচীন হবে না। এটি আগ্রাসন, নির্ভেজাল আগ্রসান, আগ্রাসনের টেক্সট বুক এক্সামপল। বিপুল বিনিয়োগে যুদ্ধের নামে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের একচেটিয়া মুনাফা ও আধিপত্য নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ইরানের ইসলামি প্রতজতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে তেল টেনে মার্কিন ভান্ডার পরিপুষ্ট করাই যেখানে লক্ষ্য, সেখানে যুদ্ধের যে নৈতিকতা থাকে, তা আর ধোপে টেকে না।

প্রভাবশালী রক্ষণশীল মার্কিন সিনেটর গ্রাহামকে মধ্যপ্রাচ্যে ‘যুদ্ধের ঢোলবাদক’ বলা যায়। দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পক্ষে তার অবস্থান কম-বেশি সবার জানা। ইরানের ব্যাপারে কেন তার এই চরমপন্থা, তার পরিষ্কার হয়ে গেল ইরানে আগ্রাসনের ১০ দিনের মাথায় এসে। গ্রাহাম বলেছেন, এই সরকারকে (খামেনি সরকার) ক্ষমতাচ্যুত করতে টাকা খরচ করাও সার্থক বিনিয়োগ হবে।

বাহ! গ্রাহাম বাহ! একটি সার্বভৌম দেশের সরকার পতন ঘটাতে অর্থলগ্নি করাকে সার্থক বিনিয়োগ বলার মতো ন্যক্কারজনক মন্তব্য আর কী-ইবা হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানে হামলা চালাতে দিনের পর দিন সুড়সুড়ি দিয়েছেন গ্রাহাম। সেসব কিছুুটা প্রচ্ছন্নভাবে উঠে এসেছে রবিবার (৮ মার্চ) ফক্স নিউজকে দেওয়া তার এক সাক্ষাৎকারে। সেখানে গ্রাহাম বলেছেন, “যখন এই সরকারের (খামেনি সরকার) পতন হবে, তখন মধ্যপ্রাচ্য একেবারে নতুন রূপ নেবে, আর আমরা প্রচুর অর্থ উপার্জন করব।”

সিনেটর গ্রাহাম ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর ‘জিগরি বন্ধু’। অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনে তাদের দুজনের নেশা আফিমের আসক্তির চেয়েও ভয়ংকর বলা যায়। দেশে দেশে স্বার্থের প্রয়োজনে, তেল-গ্যাস লুটের জন্য মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের দীর্ঘদিনের সমর্থকও গ্রাহাম।

ফক্স নিউজকে তিনি বলেছেন, ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ এবং ইরানে হামলার পেছনে উদ্দেশ্য হতে পারে দেশগুলোর তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। তার অঙ্কও খুব সহজ। তিনি বলেছেন, “ভেনেজুয়েলা ও ইরানের কাছে বিশ্বের প্রায় ৩১ শতাংশ তেল মজুত রয়েছে। আমরা সেই ৩১ শতাংশ মজুতের সঙ্গে অংশীদার হব।” বলতেই হয়, আহা! যেন ঈশ্বর তাদের এই মুজদের তেলে ভাগ বসিয়ে দিয়েছেন। এখন লুটেপুটে খাওয়ার সময়। সেজন্যই বোধহয়, হোয়াইট হাউসে যাজক দল আনিয়ে ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের বিজয়ের জন্য প্রার্থনা করা হয়েছে। পুরো দুনিয়াকে ক্যামেরায় দেখানো হয়েছে সেই দৃশ্য। বলতে হয়, সাধু সাধু! তলে তেলের ধান্দা, উপরে ঈশ্বর। এতে মুসলিমবিদ্বেষও বেশ জাগিয়ে তোলা যায় আর কী।

ইরানে আগ্রাসনে নামানো মার্কিন সেনাদের ‘ঈশ্বরের ইচ্ছা’ এবং ‘কেয়ামতের আগের অবস্থা ডেকে আনার’ কথা কানে ঢোকানো হয়েছে। ফলে ‘পবিত্রজ্ঞানে’ তারা ইরানে মানুষ খুন করতে পারছে। এর চেয়ে ভন্ডামি আর কিছু হতে পারে!

এই যে সিনেটর গ্রাহাম সাহেব নিদারুণ সত্য বলে ট্রাম্পের আগ্রাসনের লক্ষ্য ফাঁস করে দিলেন, সেই সঙ্গে নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রাভঙ্গ করার মতো নির্বোধের সুখও নিতে চাইলেন। 

ইরান ও ভেনেজুয়েলার তেলে যুক্তরাষ্ট্রের ভাগ নিশ্চিত করতে পারলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীন যে বেকায়দায় পড়তে পারে, সেই গদগদ ভাবটা আটকে রাখতে পারেননি গ্রাহাম। তিনি বলেছেন, “এটা চীনের জন্য দুঃস্বপ্ন। এটা খুব ভালো বিনিয়োগ।”

গ্রাহাম যখন ফক্স নিউজকে সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের কাছা খুলে দিলেন, তখন ইরানও বিশ্বসম্প্রদায়ের জন্য সেই কথাই তুলে ধরল। যদিও অপ্রিয় তেত কথায় কান দিতে চান না পশ্চিমের লুটেরা নেতারা।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সোমবার (৯ মার্চ) দীর্ঘ ব্রিফিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সোজা ভাষায় অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেছেন, তারা ইরানকে খণ্ড খণ্ড করে তেলসম্পদ দখল করতে চায়।

তিনি বলেন, “তাদের পরিকল্পনা স্পষ্ট। তারা আমাদের দেশকে ভাগ করে আমাদের তেলের সম্পদ অবৈধভাবে দখল করতে চায়। তাদের লক্ষ্য আমাদের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করা, জনগণকে পরাজিত করা এবং আমাদের মানবিক মর্যাদা নষ্ট করা।”

ইরানের এই উপলদ্ধি গ্রাহামের বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে। গ্রাহাম বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা আগামী দুই সপ্তাহে আরো তীব্র হবে। তিনি হুমকি দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এই লোকদের ওপর ব্যাপক হামলা চালাবে এবং এরপর আর কেউ হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি দিতে পারবে না।

হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহের এই রুটের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে পুরো এশিয়ার অর্থনীতিতে ছড়ি ঘোরানো যায় আর কী! সুতরাং ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’ বলে যে প্রবাদ আছে, তা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে আগ্রাসনের ক্ষেত্রে যথোপযুক্ত।

গ্রামের আরো কিছু কথা আছে। তার দাবি, “এই সরকার (খামেনি সরকার) এখন শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। তারা হাঁটু গেড়ে পড়বে এবং শেষপর্যন্ত পতন হবে। আর তখন মধ্যপ্রাচ্যে আগে কখনো না দেখা শান্তি ও সমৃদ্ধি আসবে।”

আহা! শান্তি। কার জন্য শান্তি? ইরানের জনগণের জন্য শান্তি? গাজার জন্য শান্তি? ইয়েমেন বা লেবাননের জন্য শান্তি? না। মোটেও না। তাদের জন্য দুঃস্বপ্নের দিবস-রজনী সময়ের দীর্ঘপথ তাড়িত করবে।

ধ্বংস-মৃত্যু অনিবার্য হলেও যুদ্ধের জন্য প্রতিটি দেশেরই কম-বেশি প্রস্তুতি আছে। সার্বভৌমত্ব আক্রান্ত হলে তা রক্ষার জন্য প্রতিটি দেশেই (দু-একটি ব্যক্তিক্রম ছাড়া) যানবাজি রাখা প্রশিক্ষিত সামরিক বাহিনী আছে। তবে যুদ্ধেরও তো ন্যূনতম নিয়ম আছে। যেকোনো যু্দ্ধ শুরুর দিনক্ষণ আগাম ঘোষণা হয়। তবে ইরানে যুদ্ধের নামে গুপ্ত হামলা বা আগ্রাসন শুরু হয়েছে হুট করে। ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে চোরাগোপ্তা হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করে ইরানকে ভড়কে দিয়ে মনোবল ভেঙে দিতে চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। তড়িঘড়ি একটা বিজয় ঘোষণা করে ইরানে ‘পুতুল সরকার’ বসিয়ে তেলের ভান্ডারে ভাগ বসানোর বড় আশা ছিল ট্রাম্পের। তবে ১০ দিনেও তা অধরা থেকে গেছে। ইরানে তারা এখন যা করছে, তা নেহাত যুদ্ধাপরাধ। বেসামরিক নাগরিক হত্যা, স্কুল-মাদ্রাসা-হাসপাতালে হামলা, জীবন রক্ষার জরুরি ব্যবস্থা ধ্বংস করার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ দেদারছে করে যাচ্ছে ইসরাল ও যুক্তরাাষ্ট্র। আর ট্রাম্প বলছেন, ইরানে সন্ত্রাসপন্থি সরকারের পতন তাদের লক্ষ্য! কী অদ্ভুত সময়ে চলছে দুনিয়া, তার প্রমাণ এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বেহুদা কথাবার্তা। 

২ মার্চ এক বক্তব্যে ট্রাম্প বলেছিলেন, “দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত একটি ইরানি সরকার প্রতিটি আমেরিকানের জন্য বড় হুমকি।” 

বেশ তো! হুমকিই তো। তারা থাকলে তো মুনাফার শূড় তেলের খনিতে ঢোকাতে দেবে না। তবে কথাটা ‘কান পেচিয়ে নাক ধরার’ মতো মজা করে বলেছেন ট্রাম্প। তিনি ইরানের অস্ত্রের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের। তাদের বোঝাতে চেয়েছেন, এই যে দেখ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র তোমাদের দিকে তাক করা। বোতাম টিপলেই তোমরা শেষ। আসলে ট্রাম্প যদি সোজা নাক ধরতে চাইতেন, তাহলে বলতেন, ইরানে ঘাড় তেড়া সরকার বসে আছে। তেলের খনির ধারেকাছেও ভিড়তে দেয় না। তাই তা লুট করা যাচ্ছে না। ফলে আমেরিকার ব্যবসায়ীদের মুফানা বাড়ানোর ক্ষেত্রে তারা বড় হুমকি। ট্রাম্প বলতে না পারলেও অঙ্গ দিয়ে সিনেটর গ্রাহাম বলে দিয়েছেন, দেখ, যুক্তরাষ্ট্র কী বিপুল অর্থ হাতাতে যাচ্ছে!

ট্রাম্প প্রশাসন হামলার যৌক্তিকতা দেখাতে দাবি করেছে, ইরান তাৎক্ষণিক হুমকি সৃষ্টি করেছিল। তাদের এই দাবির কোনো আইনি ভিত্তি নেই। উপরন্তু, ট্রাম্প-নেতানিয়াহু মিলে যা করেছেন, তা সমস্ত আন্তর্জাতিক আইনের নজিরবিহীন অপব্যবহার বললেও কম হবে। 

অথচ যুদ্ধের নামে আগ্রাসন চালানো নেতাদের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে। এমনকি সেই প্রভাব থেকে রেহাই পায়নি বাংলাদেশও। অস্থিরতার আঁচ লেগেছে সারা দেশের পেট্রল পাম্পে, হুলস্থূল পরিস্থিতিতে প্রাণহানিও ঘটেছে। আর যুক্তরাজ্যে তো রীতিমতো জিনিসপত্রের দাম বেড়ে মূল্যস্ফীতির বাষ্প কুণ্ডলী পাকাতে শুরু করেছে। যুক্তরাজ্যের মানুষ ঘরের উষ্ণতার জন্য উদ্বেগে পড়েছে; কারণ তা জ্বালানি ছাড়া সম্ভব নয়। 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের মুখে নীরবতা পালন করা উপসাগরীয় অঞ্চলের যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেখানে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে পরিস্থিতি আরো জটিল ও বিস্তৃত করে তুলেছে। বলতে গেলে, ‘মরলে একা মরব না, সবাইকে নিয়ে মরব’ নীতিতে ইরানের এসব হামলা দেখছেন অনেকে। তাতে আরাম-আয়েশে থাকা আরব সাম্রাজ্যগুলোর তেল-গ্যাস উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, জ্বালানি ট্যাঙ্কার আটকে গেছে এবং অনেক দেশের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।

সিনেটর গ্রাহামের হাত কত লম্বা?
আলজাজিরায় সাংবাদিক মারিয়ামনি এভারেট* লিখেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে সর্বশেষ যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে গ্রাহাম একাধিকবার ইসরায়েল সফর করেন এবং দেশটির ধুরন্ধর গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেন।

সাক্ষাৎকারে গ্রাহাম বলেছেন, “তারা আমাকে এমন অনেক তথ্য দেয়, যা আমাদের নিজস্ব সরকারও আমাকে বলে না।”

সাংবাদিক এভারেট যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের জন্য কাজ করেন। বর্তমানে তিনি ফ্রান্সে বসবাস করেন। গ্রাহামের সাক্ষাৎকার ধরে নাতিদীর্ঘ নিবন্ধ লিখেছেন আলজাজিরায়।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের একটি প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরেছেন এভারেট। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব সফরে গ্রাহাম ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গেও সলাপরামর্শ করেন। ট্রাম্পকে যুদ্ধে নামতে কীভাবে রাজি করানো যায়, সে বিষয়ে নেতানিয়াহুকে ‘কানপড়া’ দেন গ্রাহাম।

পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিতর্ক
ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির পরিকল্পনা করছে। তবে ইরান বলছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ বেসামরিক উদ্দেশ্যে।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) বারবার বলেছে, ইরান বর্তমানে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো সুসংগঠিত কর্মসূচি চালাচ্ছে, এমন প্রমাণ নেই।

এই কথা শুধু আইএইএ-ই বলেনি, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সদর দপ্তর পেন্টাগনও একই ভাষায় বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যমের সামনে ব্রিফ করেছে। তাহলে ইরানে যুদ্ধের নামে আগ্রাসনের নৈতিক মানদণ্ড বলে কিছু অবশিষ্ট থাকে না।

বলতে হয়, ইরানে এমন একটি হামলার ছক যুক্তরাষ্ট্রে গোপনে বা প্রকাশ্যে পোক্ত হচ্ছিল বছর পর বছর ধরে। বিশেষ করে ইসরায়েল-ঘনিষ্ট যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের মধ্যে এই প্রবণতা ছিল।

২০১৫ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় বিশ্বের ছয়টি দেশ নিয়ে ইরানের সঙ্গে একটি পারমাণবিক চুক্তি করেছিলেন, যার মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা হয় এবং বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়। কিন্তু নেতানিয়াহু এই চুক্তির বিরোধিতা করেন। ট্রাম্প ২০১৮ সালে ক্ষমতায় এসেই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে ফেলেন। চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেই প্রত্যাহারই ছিল ইরানে আগ্রাসনের ভিত্তি। ইরানের সঙ্গে এক দশকে আর কখনো চুক্তিতে আসার রাস্তা তৈরি হয়নি; উপরন্তু উপগারসীয় অঞ্চলে নানা সামরিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইরানকে অনিবার্য টার্গেটে পরিণত করেছে মার্কিন নীতিনির্ধারকরা।

গ্রাহাম গত দুই দশকে মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব মার্কিন আগ্রাসনের পক্ষে ছিলেন। এর মধ্যে ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধ রয়েছে, যেখানে সরাসরি প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হন। এই যুদ্ধের ফলে ইরাক রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় পড়ে এবং আল-কায়েদা ও ইসলামি স্টেটের মতো বর্বর সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে।

গ্রাহাম সিরিয়া ও লিবিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপেরও সমর্থন করেছিলেন। লিবিয়া এখনো দুই প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে বিভক্ত। অন্যদিকে সিরিয়ায় দীর্ঘযুদ্ধের পর প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-সারার নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দেশের বেশিরভাগ অংশে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতন হয় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এবং তিনি রাশিয়ায় পালিয়ে প্রাণে বেঁচে আছেন।

উপসাগরীয় দেশগুলোকেও যুদ্ধে নামার টোটকা
মজার বিষয় হলো, ইরানে আগ্রাসন যখন ব্যাপক মুনাফার বিষয়, তখন আরব দেশগুলো কেন সেই বিনিয়োগে নামবে না! গ্রাহাম তাদের পথ দেখাচ্ছেন। বলছেন, তোমারাও নেমে পড়ো, না হলে ভাগবাটোয়ারা থেকে বঞ্চিত হবে।

ফক্স নিউজ দেওয়া সাক্ষাৎকারে গ্রাহাম সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবকে ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, “আমি চাই তারা যুদ্ধে যোগ দিক। আমরা তাদের কাছে অস্ত্র বিক্রি করি, আর ইরান তাদের দেশেও হামলা করছে।”

গ্রাহামের কথাতে নির্মম সত্য লুকিয়ে রয়েছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে প্রতিবছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কিনতে বাধ্য করে যুক্তরাষ্ট্র। এখানে আরেকটি মজা আছে। মধ্যপ্রাচ্যের পেট্র-ডলারের আরব দেশগুলোতে রাজতন্ত্র টিকে আছে। তাদের নাকের ডগায় একমাত্র অনারব দেশ ইরানে নামমাত্র গণতান্ত্রিক চর্চাও আছে। তা ছাড়া সিয়া-সুন্নির নামে দলাদলি আরব-অনারবদের পুরোনো কোন্দল। এসব ফ্যাক্টর কাজে লাগায় যুক্তরাষ্ট্র। একদিকে আরব রাজা-বাদশাহ-সুলতানদের গণতন্ত্রের ভয় দেখায়, অন্যদিকে শিয়া সাম্রাজ্যের বিস্তারকেও ভয় পায় আরবরা। ফলে দূর থেকে কেউ এসে যদি ইরানের শাসন ব্যবস্থা উল্টোপাল্টা করে দেয়, তাতে আখেরে আরব শেখদেরই খানিকটা আরাম বোধ হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

আরব দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরব, ইউএই, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, জর্ডান, মিশরের সঙ্গে ইসরায়েল কূটনৈতিক সম্পর্ক ‘মাখোমাখো’ পর্যায়ে নিতে না পারলেও যতকুটু ঘসামাজা করেছে, তাতে বেশ স্বস্তিতে ছিল দেশটি। তবে সেসব সমীকরণ পাল্টে দিয়েছে দেশগুলোর ওপর ইরানের পাল্টা হামলা। আরব-ইসরায়েলিদেরও শান্তিতে ঘুমাতে দিচ্ছে না তেহরান। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা সরাসরি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লার মধ্যে না পড়েনি। কূটনীতিক ও বিনিয়োগকারী হিসেবে যারা মধ্যপ্রাচ্যে ছিলেন, তাদের বেশিরভাগকে নিরাপদে সরিয়ে নিয়েছেন ট্রাম্প। ফলে মার্কিন নাগরিকদের প্রাণহানির সরাসরি থ্রেট ছাড়া এমন একটি ‘তেল তেলে’ আগ্রাসন চালাতে ট্রাম্প শেষপর্যন্ত লোলুপের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্র চায় তেল, ইসরায়েল চায় আরো ভূমি
ইসরায়েল অনেক বছর ধরে ইরানকে তার সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে দেখে আসছে।

এ বিষয়ে আলজাজিরাকে কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের গালফ স্টাডিজ সেন্টারের পরিচালক মাহজুব জিওয়েরি বলেছেন, ইসরায়েল বর্তমান ‘যুদ্ধকে’ বৃহত্তর একটি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখছে, যার লক্ষ্য অঞ্চলটিকে নতুনভাবে গঠন করা। এই পরিকল্পনার পটভূমি তৈরি হয়েছে হামাসের ৭ অক্টোবরের হামলার পর।

তিনি বলেন, “ইসরায়েল মূলত ৭ অক্টোবরের ঘটনাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে, যাতে তারা যাকে ‘মধ্যপ্রাচ্যকে পুনর্গঠন’ বলে, সেটি করতে পারে; ঠিক যেমনটি ৯/১১ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র করেছিল।”

জিওয়েরির মত হলো, “ইসরায়েল এমন সব সম্ভাব্য শক্তিকে নির্মূল, দুর্বল বা পরাজিত করতে চায়, যারা তাদের চ্যালেঞ্জ করতে পারে, যার মধ্যে ইরানও রয়েছে।”

জিওয়েরির মন্তব্যের খানকটা সম্প্রসারণ করা যায়। যদি লেবাননের দিকে তাকানো হয়, তাহলে দেখা যাবে সেদেশে ইসরায়েলি সেনাদের স্থল অভিযানে পাঠানো হয়েছে। দেশটির বড় একটি অঞ্চল থেকে লেবানিজদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। লেবাননের ওই এলাকাটি এখন ইসরায়েলি সেনাদের দখলে। গাজা বা পশ্চিমতীরের মতো লেবাননের একখণ্ড ভূমি চিরতরে ইসরায়েলের মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করে ফেলতে সম্প্রসারণশীল জায়নবাদী নেতানিয়াহু পিছপা হবেন বলে মনে হয় না।

ট্রাম্পের যেমন তেলের ঘ্রাণ ভালো লাগে, নেতানিয়াহুর ভালো লাগে তেমনি ইহুদিদের জন্য আরো একখণ্ড ভূমি। দুটিই জাতীয়তাবাদ, দুটিই আগ্রাসী হয়ে এসেছে ইরানের জন্য।

তবে ইরানে বছরের পর বছর কট্টরপন্থার শাসনে রক্তপাত-প্রাণহানি এবং খোমেনি-খামেনির বাড়াবাড়ি রকমের ক্ষমতা চর্চায় শ্বাসরুদ্ধ জীবনাচার তাদের দিক থেকে উদার বিশ্বের সুনজর সরিয়ে রেখেছে, এ কথা বলাই বাহুল্য। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইরানের কলিজায় শূড় ঢুকিয়ে শুধু তেলই নয়, রক্তও চুষে নেওয়ার ছক করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের কোটি কোটি মানুষের ওপর এই জুলুমের জন্য খামেনি-খোমেনির ‘অন্তত ক্ষমতা’ এবং ‘অমৃত্যু একমাত্র সহি মানুষ’ হয়ে থাকার বন্দোবস্তও ইতিহাসে কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে।

ঢাকা/রাসেল

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়