Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     শুক্রবার   ২৩ এপ্রিল ২০২১ ||  বৈশাখ ১০ ১৪২৮ ||  ০৯ রমজান ১৪৪২

ঝিল কুটুম: ঝিলের পাড়ে গড়ে ওঠা এক সিনে-ক্যাফে’র গল্প

নিউজ ডেস্ক || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২৩:০২, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১   আপডেট: ২৩:০৯, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১
ঝিল কুটুম: ঝিলের পাড়ে গড়ে ওঠা এক সিনে-ক্যাফে’র গল্প

ঝিল কুটুম

রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে দৃষ্টিনন্দন হাতির ঝিলের পাড়ে স্থাপিত ক‌্যাফেটি। অন‌্য আর দশটি ক‌্যাফের চেয়ে ভিন্ন বৈশিষ্ট‌্য সম্পন্ন। এটি একটি ‘সিনে-ক‌্যাফে’। ক‌্যাফেটি সিনেমা প্রেমিদের কাছে ধীরে ধীরে ভালোবাসার একটি প্রতীক হয়ে উঠেছে ইতোমধ্যে। নাম ‘ঝিল কুটুম’।

গুলশান-১ এর পুলিশ প্লাজা থেকে হাতিরঝিলের রাস্তা ধরে রামপুরার দিকে যেতে হাতের ডানে হাতিরঝিল আইল্যান্ডে ঢোকার মুখেই পাওয়া যাবে ঝিল কুটুমের দেখা।

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অন্যতম ব্র্যান্ড অ‌্যাম্বাসেডর চলচ্চিত্র নির্মাতা কামার আহমাদ সাইমন। তার মতে, ‘ঝিল কুটুম’-ই হতে যাচ্ছে এপার বাংলার ‘কফি হাউজ’ তথা দেশের অন্যতম বড় একটি কালচারাল হাব। যার পরিধি শুধুই খাবার বিক্রির মধ্যে না থেকে হয়ে উঠবে শিল্প-সংস্কৃতিমনা মানুষদের অন্যতম একটি কম্ফোর্টজোন। 

সাইমন বলেন, ‘ছবির হাট, আজিজ মার্কেটকেন্দ্রিক কালচারাল হাবগুলোর বিলুপ্তির পরে ‘ঝিল কুটুম’-ই আমাদেরকে প্রগতিশীল এক প্রজন্মের স্বপ্ন দেখিয়ে যাচ্ছে। 

‘শুনতে কি পাও!’; ‘নীল মুকুট’; ‘শিকলবাহা’; ’অন্যদিন’ এর মতো দুর্দান্ত সিনেমা নির্মাণ করেছেন কামার আহমাদ সাইমন। 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলোতে নিজেদের ভিন্নধর্মী ইন্টেরিওর এবং বিপণন স্ট্র্যাটেজির কারণে করোনা মহামারীর মধ্যেও দেশের ট্রেন্ডিং ক্যাফেতে পরিণত হয়েছে ‘ঝিল কুটুম’।

২০২১ সালের শুরুতে গুণী নির্মাতা ‘মোস্তফা সরয়ার ফারুকী’র আলোচিত সিনেমা ‘শনিবার বিকেল’, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যা ‘স্যাটারডে আফটারনুন’ নামে পরিচিত। সেই সিনেমার সেন্সর অনুমতি প্রাপ্তির লক্ষ্যে ঝিল কুটুম ক্যাফের বানানো ‘প্রতিবাদী টি-শার্ট’ ক্যাম্পেইনটি মিডিয়া পাড়ায় এক ধরনের ঝড় বইয়ে দিয়েছিলো।

‘ঝিল কুটুম’ এর এই টি-শার্ট ক্যাম্পেইনে অংশ নিয়েছিলেন চলচ্চিত্র নির্মাতা অমিতাভ রেজা, রেদোয়ান রনি, শাওকি সৈয়দ, সাদিয়া খালিদ রীতি, আশফাক নিপুণ, আদনান আল রাজীব, নিয়ামুল মুক্তা, ইমেল হক, নুসরাত ইমরোজ তিশা, কাজল আরেফিন অমি, মাবরুর রশীদ বান্নাহ, খায়রুল বাসারসহ আরও অনেক স্বনামধন্য চলচ্চিত্র কর্মী এবং নির্মাতা। 

একইসঙ্গে ক্যাম্পেইনটি কাভার করে নিউজ করেছিল দি ডেইলি স্টার, ঢাকা ট্রিবিউন, চ্যানেল আই, এনটিভি, বণিক বার্তা, দেশ রুপান্তর, দৈনিক ইত্তেফাকসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলি। 

এছাড়াও নতুন বছরে ‘ঝিল কুটুম’ নিজেদের অনলাইন ক্যালেন্ডারে দেশের তরুণ নির্মাতা, অভিনেতা, সাংবাদিক এবং উদ্যোক্তাদেরকে কাভার করায় সব শ্রেণির মানুষের কাছেই ভিন্নধর্মী এই বিপণন কর্মসূচিটি তুমুল জনপ্রিয়তা পায়।

ঝিল কুটুমের ইন্টেরিওর ডিজাইনিং এর মূল ফোকাসে রয়েছে দেশি-বিদেশি সিনেমার রঙচঙে পোস্টার এবং সিনেমার মানুষের এস্থেটিক ছবি। এছাড়াও ‘ঝিল কুটুম’-এর প্রতিটি প্লেট, গ্লাস, টেবিল, কফির মগ, টিস্যু হোল্ডারেও আছে সিনেম্যাটিক আবহের ছোঁয়া। 

লাইভ মিউজিকের মিউজিকাল আবহ এই রেস্তোরাঁকে শুধুই খাবার বিক্রি করার লক্ষ্যে গড়ে ওঠা অন্যান্য রেস্তোরাঁ থেকে অনেকটাই আলাদা করে তুলেছে। এছাড়াও ক‌্যাফেটির খাবারের সুনামে ম ম করছে ফুডব্যাংকের মতো ফেসবুককেন্দ্রিক মিলিয়ন মিলিয়ন মেম্বারের ফুড ব্লগিং গ্রুপগুলো। 

শুধু এটুকুই নয়, ঝিল কুটুমে প্রতিনিয়তই সেইসব মুখ গুলোর দেখা পাওয়া যায়- যাদেরকে কিনা এতদিন শুধু বড় পর্দা আর টিভি-অনলাইন চ্যানেলের স্ক্রিনেই দেখে এসেছেন। 

নতুন দিনের ওটিটি ওয়েব ফিল্ম, ওয়েব সিরিজ, বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে স্বাধীন নির্মাতাদের স্বাধীন সিনেমার প্রি-প্রোডাকশন মিটিং, অডিশন, শ্যুটিং সব কিছুরই প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠেছে ঝিল কুটুম।

পরিচালক মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, কামার আহমাদ সাইমন, সারা আফরিন, মাসুদ হাসান উজ্জ্বল, হাসিবুর রেজা কল্লোল, নোমান রবিন, রিয়াজুল রিজু, রায়হান রাফি, নিয়ামুল মুক্তা, শাহাদাত রাসেল, অপরাজিতা সংগীতা, কেএম কনক, মাহমুদ নিয়াজ চন্দ্রদীপ, অভিনেতা ওমর সানি, মৌসুমী, শাকিল খান, খায়রুল বাসার, মোস্তাফিজুর নুর ইমরান, নাজিয়া হক অর্ষা, আনন্দ খালেদ, জ্যোতিকা জ্যোতি, সোহেল রানা মন্ডল, আহসান স্বরণ, সাদিয়া এস আয়মান, পার্থ শেখ, তবীব মাহমুদ, সিনেমাটোগ্র্যাফার খায়ের খন্দকার, বিদ্রোহী দীপন, সম্পাদক রাশেদুজ্জামান সোহাগ, বিশ্ববিখ্যাত আর্টিস্ট, মডেল মোরশেদ মিশুসহ মিডিয়া পাড়ার অনেকেরই নিত্যদিনের আনাগোনা এই ক্যাফেতে। 

এছাড়া জানুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক পুরষ্কার বিজয়ী নির্মাতা ও প্রযোজক জসিম আহমেদ ও গুপি বাঘা প্রোডাকশনের অন্যতম কর্ণধার এবং নুহাশ হুমায়ূনের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মুভিং বাংলাদেশ’-এর প্রযোজক ‘আরিফুর রহমান’-এর পরবর্তী সিনেমার মিটিংও হয়েছে ঝিল কুটুমে। 

এসবের বাইরে কিছুদিন আগেই ঝিল কুটুমে শ্যুটিং হলো ‘সুজুকি জিক্সার’ বাইকের অনলাইন ভিডিও কমার্শিয়ালের। এর আগেও বেশ কয়েকটি টিভি প্রোডাকশন এবং স্বাধীন চলচ্চিত্রের শ্যুটিং হয়েছে ঝিল কুটুমে।

তবে এসব শ্যুটিংয়ের কোনোটিতেই ঝিল কুটুম কোনো স্পট ভাড়া নেয়নি। শুধু তাই নয়, কামার আহমাদ সাইমনের নতুন সিনেমা ‘নীল মুকুট’ এর প্রোমোশনের কাজও করতে যাচ্ছে ‘ঝিল কুটুম’।

‘শুধুমাত্র সিনেমার প্রতি ভালোবাসা এবং সিনেমাকে সবার কাছে জনপ্রিয় করার তাগিদ থেকেই এ কাজগুলো করে যাচ্ছি আমরা’ বলে মন্তব‌্য করেছেন সিজু খান। যিনি এই সিনে-ক্যাফেটির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছেন। 

তবে সিজু খানের মূল পরিচয় কিন্তু এটা নয়, তিনি মূলত একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা, সাংবাদিক এবং চলচ্চিত্র সংসদ কর্মী। বাংলা ট্রিবিউন, ইত্তেফাক, অনন্যা ম্যাগাজিনে নিয়মিত লিখতেন। এখন কাজ করছেন বাংলা ভাষার প্রথম সিটিজেন জার্নালিজম মিডিয়া ‘সিজেএমবি’র ‘শিল্প’ বিভাগের সম্পাদক হিসেবে। 

এছাড়া জয় বাংলা ইয়ুথ এওয়ার্ডপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র সংসদ ‘সিনেমা বাংলাদেশ’ এর সাংগঠনিক সম্পাদক এবং গ্লোবাল ইয়ুথ ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের অন্যতম আয়োজকও ছিলেন তিনি। 

এসবের পাশাপাশি রেদোয়ান রনি’র প্রোডাকশন হাউজ ‘পপকর্ন’ এর সহযোগী ক্রিয়েটিভ প্রোডিউসার এবং সহকারী পরিচালক হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন সিজু খান। বর্তমানে তিনি নিজের প্রথম দুটি ছোট সিনেমা ‘নট এ ফিকশন, এবং ‘বিদ্বেষের ভাইরাস’ এর পোস্ট প্রোডাকশনের কাজ করছেন। দুটি সিনেমাই তিনি ‘ওয়ান শট’ এ বানিয়েছেন। 

তাঁর পরবর্তী ছোট সিনেমাটি তিনি ‘সাদাত হোসাইন মান্টো’র আলোচিত ছোটগল্প ‘ঠান্ডা গোশত’ অবলম্বন করে বানাতে যাচ্ছেন, এই সিনেমাতে সম্মানী ছাড়াই কাজ করছেন খায়রুল বাসার, বিদ্রোহী দীপন, নুসরাত জাহান জেরি-সহ আরও বেশ কিছু গুণী শিল্পী। এছাড়াও করোনাকালীন ঢাকায় তাঁর শ্যুট করা তথ্যচিত্রটি এখন পোস্ট প্রোডাকশনে রয়েছে। হাতে আছে আরও বেশ কিছু স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এবং ওটিটি কন্টেন্টের কাজ।

‘ঝিল কুটুম’ এর বিপণন বিভাগের কাজটি মূলত নতুন কিছু করার তাগিদ থেকেই করছেন সিজু খান, শিগগিরই নিজের সিনেমা এবং অন্যান্য কাজের দিকে ফিরে যাবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

ঝিল কুটুমের স্বত্বাধিকারী ‘আনন্দ কুটুম’ এর মতে এই ক্যাফেটি হচ্ছে তার ব্যর্থতার গল্প। ব্যর্থতা কেন? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘ফিল্মমেকার হবার স্বপ্ন নিয়েই এসেছিলাম ঢাকায়। কিন্তু নানান কারণেই তা আর হয়ে উঠল না। তাই জীবিকার তাগিদেই ঝিল কুটুমের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করেছি।’ 

তবে ‘ঝিল কুটুম’কে শুধুই আশাভঙ্গের গল্প ভাবলে ভুল হবে। কেননা আনন্দ কুটুমের মুখ থেকে পরক্ষণেই শোনা যায় নতুন দিনের সম্ভাবনার কথা। 

তিনি বলেন, ‘ঝিল কুটুম আজ যেভাবে চলচ্চিত্র শিল্পের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে, যেভাবে নতুন সব সিনেমার জন্ম হচ্ছে ঝিল কুটুমের চার দেয়ালের গণ্ডির ভেতরে- সেভাবেই কোনো একদিন হয়তো জন্ম নেবে আমার একান্ত নিজের স্বপ্নের সিনেমাটি। প্রযোজকদের দ্বারে দ্বারে না ঘুরে নিজের কামানো পয়সা দিয়ে নিজের সিনেমাগুলো বানাবো বলেই ব্যবসায় নেমেছি আমি। সে ব্যবসাও যাতে শুধুই কর্পোরেট কিছু না হয়ে ওঠে তাই ব্যবসার মধ্যেও নিজের ভালোলাগা, শিল্পবোধ এবং সিনেমার ছোঁয়া রেখে করে যাচ্ছি নিজের কাজটুকু।’ 

‘আনন্দ কুটুম’ নিজের কিছু টিভি প্রোডাকশন ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পরিচালক হিসেবে কাজ করার আগে তানভীর মোকাম্মেল, অনিমেষ আইচ, ফখরুল আরেফিন খান এর সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছিলেন। তিনি নিজের গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছেন কোলকাতার ‘মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বিশ্ববিদ্যালয়’ থেকে।
 
ঝিল কুটুম রেস্তোরাঁটির ইন্টেরিওর ডেকোরেশনের কাজ করেছে ‘কুটুম ইন্টেরিওর-এক্সটেরিওর সল্যুশনস’, যেটি কুটুম এক্সপ্রেস-এরই একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। ঝিল কুটুমও মূলত কুটুম এক্সপ্রেসেরই অঙ্গ প্রতিষ্ঠান।

ঢাকা/সনি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়