ঢাকা     সোমবার   ১৭ জুন ২০২৪ ||  আষাঢ় ৩ ১৪৩১

ফ্রি সার্ভিস কি আসলেই ফ্রি?

ইকবাল আব্দুল্লাহ রাজ || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:২৪, ১৪ মার্চ ২০২৪  
ফ্রি সার্ভিস কি আসলেই ফ্রি?

ফ্রি শব্দটা শুনলেই কেমন যেন খুশি হয়ে যাই আমরা তাই না? এই খুশির সূত্র ধরেই বিভিন্ন কোম্পানি বাইক বিক্রির সময় নির্দিষ্ট মেয়াদে কিছু ফ্রি সার্ভিস অফার করে। কিন্ত কখনো কি ভেবে দেখেছেন, সার্ভিস গুলো আসলেই ফ্রি কিনা? না, কখনোই ফ্রি নয়।

সার্ভিসের চার্জগুলো বাইকের দামের সাথেই লুকিয়ে যোগ করা থাকে কোম্পানিগুলো। তাই ফ্রি সার্ভিস পেলে খুশিতে লাফ দেওয়ার কোনো কারণ নেই বরং এটা বাইক ক্রেতার অধিকার।

খেয়াল করে দেখবেন ফ্রি সার্ভিস দেওয়ার ব্যাপারটিকে অফিসিয়াল এবং আন-অফিসিয়ালের প্যাঁচে মোচড় দিয়ে বাইকের পরিবেশক এমনভাবে উপস্থাপন করেন যাতে মনে হবে আপনাকে অতিরিক্ত আদর-আপ্যায়ন করা হচ্ছে, কোম্পানি আপনার প্রতি খুবই যত্নবান। অবশ্য এর পেছনে যৌক্তিক কারণও আছে।

মূলত এই ফ্রি সার্ভিসের আড়ালেই রয়েছে বিরাট ব্যাবসায়িক ফাঁদ। একটা ছোট গল্পের মাধ্যমে উদাহরণটা দিলে আরো ভালোভাবে বুঝবেন।

এই উপমহাদেশে প্রথম  যখন চা ব্যবসায়ীরা চা বিক্রি করতে এসেছিলো তখন কেউই চা পানে তেমন আগ্রহ প্রকাশ করেনি। একপর্যায়ে বিক্রেতারা ফ্রি তে চা খাওয়ানো শুরু করলো এবং চায়ের উপকারিতা সম্পর্কে মানুষকে নানাভাবে বোঝানো শুরু করলো। বিভিন্নভাবে প্রচার প্রচারণা আর বিজ্ঞাপন দেওয়া শুরু করলো তারা। কিছুদিনের মধ্যেই মানুষের মধ্যে চা খাওয়ার অভ্যস্ততা তৈরি হলো এবং বর্তমানে চায়ের ব্যবসা কতটা লাভজনক সেটা আশা করি ব্যাখ্যা করে বুঝাতে হবে না। অলিতে গলিতে আর কিছু না থাক, চায়ের দোকান পাবেন না এটা অসম্ভব। এখন আমরা বিভিন্ন ফ্লেভার, বিভিন্ন নাম এবং দামে বাহারী চা খাচ্ছি উচ্চমূল্যে। 

অপরদিকে, চা পানে যে পরিমাণ সময়, প্রচেষ্টা আর পয়সা খরচ করছি তার বিপরীতে আমাদের ক্ষতির অংক কিন্তু বিরাট। তাছাড়া চা-এ এমন আহামরি কোনো জীবন রক্ষাকারী উপাদান আছে বলেও কোনো গবেষণা নেই। বরং অতিরিক্ত চা পানে ক্ষুধামন্দা, অনিদ্রা, শরীর কড়া হওয়াসহ নানান জটিলতা রয়েছে। 

একইভাবে শুরুতে ফ্রি সার্ভিস (আসলে ফ্রি নয়) দিয়ে অভ্যস্ততা তৈরি করা হয়। কারণ ফ্রি শুনলে আমরা আলকাতরা নিতেও লাইনে দাঁড়িয়ে ধাক্কাধাক্কি করি। ফ্রি সার্ভিসে নিতে গেলে আমাদেরকে বিভিন্নভাবে বুঝানো হয়, রেগুলার সার্ভিস না করালে বাইকের
বিরাট ক্ষতি হবে। একমাত্র তাদের সার্ভিস সেন্টার ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও জেনুইন পার্টস পাওয়া যায় না, অথোরাইজড সার্ভিস সেন্টার ছাড়া অন্যকোনো সার্ভিস সেন্টারে সার্ভিস করালে তারা আর কোনো ওয়ারেন্টি দেবে না ইত্যাদি ভয়ভীতিও দেখানো হয়। বাইরে থেকে কোনো পার্টস কিনে নিয়ে গেলে সেটাও তারা লাগিয়ে দেয় না। তাদের দাবি, সেটা নকল পার্টস।

আদতে একটি নতুন বাইকে প্রথম এক বছরে ফ্রি সার্ভিসের নামে তারা কী কী সার্ভিস দেয় কখনো খেয়াল করে দেখেছেন?

ইঞ্জিন অয়েল ও অয়েল ফিল্টার পরিবর্তন, বড় নাট-বোল্টগুলা চেক করা, চেইনে লুব দেওয়া আর ওয়াশ ছাড়া আর কোনো বিশেষ সার্ভিস কি আসলেই তারা করে? অবশ্য নতুন বাইকে এর চেয়ে বেশি কিছু প্রয়োজনও হয় না৷। বরং বেশি বেশি খোলা ফিটিং হলেই বাইকে নানান রকম সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়া কোম্পানির সার্ভিস সেন্টারে গেলেই দেখবেন নানা উসিলায় পার্টস বিক্রির একটা প্রবনতা তাদের থাকে। মূলত ব্যাবসাটা ওই পার্টস বিক্রির মধ্যেই। বাইক বিক্রি করে লাভ করে একবার, কিন্ত পার্টস বাণিজ্য চলতে থাকে বছরজুড়ে। 

যে কোম্পানিকে যত বেশি সার্ভিস সেন্টার আর জেনুইন পার্টস নিয়ে হাইলাইট করতে দেখবেন, বুঝে নেবেন তাদের বাইকের কোয়ালিটি তত দুর্বল। যদি বাইকের বিল্ড কোয়ালিটি ভালো হয়, পার্টস কোয়ালিটি ভালো হয় তাহলে অতিরিক্ত সার্ভিস এবং স্পেয়ার পার্টস লাগা খুবই অস্বাভাবিক ঘটনা। 

তবে হ্যা, কিছু বেসিক কনজুমেবল পার্টস লাগবেই, যেমন, ব্রেক প্যাড, অয়েল ফিল্টার, এয়ার ফিল্টার, ক্লাচ ক্যাবল, চেইন স্প্রকেট, টায়ার ইত্যাদি।

যদি দেখেন কোনো কোম্পানি ফ্রি সার্ভিস নেওয়ার জন্য বারবার ফোন করে রিমাইন্ডার দিচ্ছে তখন তাদেরকে বন্ধু ভাবার কোনো কারণ নেই।
কেননা তারা যদি বন্ধুই হতো তাহলে পার্টসের দাম ৩-৪ গুণ বেশি নিতো না এবং ভালো বিল্ড কোয়ালিটির বাইক দিয়ে আমাদের মেইন্টেনেন্স খরচ কমিয়ে দিতো। তাহলেই ঘন ঘন সার্ভিস সেন্টারে গিয়ে আমাদের সময় এবং টাকার অপচয় করতে হতো না।

বাস্তবতার সাথে পোস্টের মিল খুঁজে পেলে পোস্টটি শেয়ার করতে পারেন। আর অবশ্যই বাইক কেনার আগে সার্ভিস এবং পার্টস বাণিজ্যের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নেবেন। 

লেখক: 

অ্যাডমিন, Bike Doctor BD

ঢাকা/শাহেদ

আরো পড়ুন  



সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়