ভ্রাম্যমাণ আদালত: কতটা সুফল পাচ্ছেন মানুষ?
আহমদ নূর : অতিরিক্ত মুনাফার লোভে খাবারে ভেজাল, মানহীন পণ্য উৎপাদন ও বিক্রি, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি, পরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়সহ বিভিন্ন অপরাধে তাৎক্ষণিক শাস্তি নিশ্চিতে রয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত দেশব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ভ্রাম্যমাণ আদালত।
তাৎক্ষণিক শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা নিয়েই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। তবে প্রশ্ন উঠছে, আলোচনায় থাকা ভ্রাম্যমাণ আদালত থেকে কতটা সুফল পাচ্ছেন সাধারণ মানুষ?
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, যেসব প্রতিষ্ঠানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে শাস্তি দেওয়া হয়, সেসব প্রতিষ্ঠানের মালিক পুনরায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। শুধু তাই নয়, ব্যবসায়ীরা জরিমানার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পরে কৌশলে ক্রেতাদের কাছে বেশি দামে পণ্য বিক্রিও করেন।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একটি প্রতিষ্ঠানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার পর সেখানে অনেক দিন আদালত পরিচালনা করা হয় না। ফলে ওই সময় নির্ভয়ে ভেজাল, মানহীন পণ্য বিক্রি করেন ব্যবসায়ীরা।
এই বিষয়টি ছাড়া সাধারণ মানুষের কাছে ভ্রাম্যমাণ আদালতের সফলতা ও গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি। কারণ, একটি এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করলে ওই এলাকার ব্যবসায়ীরা কিছু দিনের জন্য মানহীন পণ্য বিক্রি করা থেকে বিরত থাকেন। এছাড়া সাধারণ মানুষ মানহীন ও ভেজালকারী প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন।
ঢাকায় নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম। রেস্তোরাঁ, কেমিক্যাল কারখানা, বাস টার্মিনাল, ফলের আড়ৎ, পাইকারি ও খুচরা বাজারসহ বিভিন্ন জায়গায় তিনি প্রায় নিয়মিতই অভিযান পরিচালনা করেন। একটি প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের কারণে জরিমানার পর আবারো সেই প্রতিষ্ঠান অনিয়ম করেছে এমন অভিজ্ঞতা অনেক।
তার অভিজ্ঞতা থেকে ধানমন্ডির একটি রেস্তোরাঁর কথা বলছিলেন তিনি, যেখানে তিন দিন আগে তিনি জরিমানা করে এসেছেন। তিন দিন পর তার কাছে আবারো একই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ আসে।
সারোয়ার আলম বলেন, গত রমজানে ধানমন্ডিতে একটি রেস্টুরেন্টে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করি। আমরা দেখতে পাই সেখানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি ভেজাল ও মানহীন পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। আমরা তাদের জরিমানা করি এবং সতর্ক করে দিয়ে আসি। এর তিন দিন পর আবারো আমার কাছে অভিযোগ আসে ওই রেস্টুরেন্টে আবারো অনিয়ম হচ্ছে।
তিনি বলেন, ওই রেস্টুরেন্টের বিরুদ্ধে আবারও অভিযোগ পাওয়ার পরও সেখানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করিনি। এর দুটি কারণ আমি চিহ্নিত করেছি। এক, তারা হয়তো মনে করছেন সরকারের কাজ সরকার করছে, আামাদের কাজ আমরা করব। অন্যটি হলো, তারা বুঝতে পারছে না তাদের সমস্যাটা কোথায়। এক্ষেত্রে ভোক্তাদের জন্য মানসম্পন্ন পণ্য নিশ্চিতে আমরা ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার চিন্তা করছি। যেন ব্যবসায়ীরা বুঝতে পারেন তাদের সমস্যাটা কোথায়।
‘এরপরও তারা যদি না শোধরায় তাহলে এসব প্রতিষ্ঠান সিলগালা করে দেওয়া হবে।’
এদিকে, সাধারণ মানুষ জানিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের কর্মকাণ্ড নিয়ে তারা সন্তুষ্ট। নিয়মিতভাবে যেন এটি চলমান থাকে সে আহ্বানও জানিয়েছেন তারা।
কাওসার আহমেদ নামে একজন বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করলে অন্তত একটি প্রতিষ্ঠানের মান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।
সরকারি চাকরিজীবী মাইদুল হক বলেন, ভেজাল ও মুনাফালোভীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে।
এছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালতের ভীতি ব্যবসায়ীদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বিরুদ্ধে ঢাকায় বিভিন্ন ফার্মেসিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে প্রায় ২৫ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করে। এ প্রসঙ্গ টেনে গত ২৪ জুন ঢাকার ইংলিশ রোডে বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির কেন্দ্রীয় পরিষদের এক মতবিনিময় সভায় ওষুধের দোকানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা বন্ধের দাবি জানায়। কারণ হিসেবে তারা বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পোষাক পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে গেলে তারা ভয়ের মধ্যে থাকেন।
রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৬ জুন ২০১৯/নূর/সাইফ
রাইজিংবিডি.কম