কিশোরগঞ্জ-১ ও ৫
স্বতন্ত্ররা বিএনপির মাথাব্যথার কারণ, সুবিধা পাবে ১১ দলীয় জোট
রুমন চক্রবর্তী, কিশোরগঞ্জ || রাইজিংবিডি.কম
কিশোরগঞ্জ-১ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম ও স্বতন্ত্র প্রার্থী জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল করিম খান চুন্নু।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জের মোট ছয়টি আসনের দুইটিতে চাপে রয়েছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা। কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) ও কিশোরগঞ্জ-৫ (নিকলী-বাজিতপুর) এই দুই আসনে দলটির প্রার্থীদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন স্বতন্ত্র হিসেবে ভোটের মাঠে থেকে যাওয়া প্রার্থীরা। তারা কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় বিএনপি থেকে বহিষ্কার হয়েছেন। ভোটারদের ধারণা, বিএনপি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দ্বন্দ্বে সুফল ঘরে তুলতে পারে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় কিশোরগঞ্জ-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল করিম খান চুন্নু। তিনি মোরগ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনি প্রচার চালাচ্ছেন। অতীতে তিনি দুইবার এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন। সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া এই নেতা সাধারণ মানুষের পরিচিত মুখ। এবারের নির্বাচনে মনোনয়ন না পাওয়ায় তার সমর্থকরা ক্ষুব্ধ হন। মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলনও হয়। শেষ পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্ত বহাল থাকায় তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে নামেন। এরপর তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
এই আসনে ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির প্রার্থী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম। তিনি বলেন, “দলের অনেকেই মনোনয়ন চেয়েছিলেন। দল আমার ওপর আস্থা রেখেছে। মনোনয়ন নিয়ে বিরোধ থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। প্রথম থেকে মনোনয়ন প্রাপ্তির দৌঁড়ে যারা বিপক্ষে ছিলেন, তারা কিন্তু এখন আমাকে সমর্থন দিয়ে দলের পক্ষে কাজ করছেন।”
তিনি বলেন, “যতদিন গড়াবে বিএনপি সমর্থকরা তাদের প্রতীক ধানের শীষ মার্কাকেই বেছে নেবেন। কাজেই এসব নিয়ে আমি চিন্তিত না। এখন পর্যন্ত আমি বিভিন্ন ওয়ার্ড, ইউনিয়নে ও গ্রামে গ্রামে ঘুরেছি। মানুষ আমার ওপর আস্থা রাখছেন, প্রত্যাশা করছি বিএনপিই বিজয়ী হবে।”
বিএনপি থেকে মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন রেজাউল করিম খান চুন্নু। তিনিও ব্যাপক গণসংযোগ ও প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। নির্বাচিত হলে এলাকার মানুষের কর্মসংস্থান, শহরের যানজট নিরসনসহ নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
রেজাউল করিম খান চুন্নু বলেন, “আমি দলীয় মার্কায় নির্বাচন করতে চেয়েছি। কিন্তু দল আমাকে মনোনয়ন দেয়নি। সমর্থকদের জোড়ালো ভূমিকায় আমি নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। তবে দলের প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল। আমার জনসমর্থনে আমি সন্তুষ্ট।” নির্বাচনে লেবেল প্লেইং ফিল্ড নিয়ে অভিযোগ রয়েছে তার। তিনি চান প্রশাসন যেন আরো কঠোর হয়।
কিশোরগঞ্জ-৫ আসেন বিএনপির প্রার্থী সৈয়দ এহসানুল হুদা ও স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল
অন্যদিকে, হাওর অধ্যুষিত কিশোরগঞ্জ-৫ (নিকলী-বাজিতপুর) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল। তিনি হাঁস প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ কারণে তাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছে।
শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল বলেন, “সমর্থকদের চাপে আমাকে প্রার্থী হতে হয়েছে। কারণ তারাই আমার শক্তি ও সাহস। তাদের সমর্থন নিয়ে এতটা পথ এসেছি আমি। এলাকায় ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। আশা করি, নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলে আমি জয়ী হবো। আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আমি এখানকার মানুষের পাশে ছিলাম, এখনো আছি। তাই এখানকার মানুষ আমার ওপর আস্থা রাখছেন।”
এ আসনে বিএনপির প্রার্থী সৈয়দ এহসানুল হুদা। তিনি আগে বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান ছিলেন। গত ২২ ডিসেম্বর নিজের দল বিলুপ্ত করে তিনি নিজে ও দলের সদস্যদের নিয়ে বিএনপিতে যোগ দেন। এরপর তাকে কিশোরগঞ্জ-৫ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। ফলে স্থানীয় বিএনপিতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। তিনি বাজিতপুর ও নিকলী উপজেলার বিএনপি নেতাকর্মীদের এক ছাতার নিচে আনতে পারেননি।
তিনি জানান, নেতাকর্মীদের মধ্যে কোথাও কোথাও কিছুটা বিভক্তি থাকলেও শেষ পর্যন্ত এটা থাকবে না। সাধারণ ভোটাররা শেষ পর্যন্ত ধানের শীষের প্রার্থীকেই বেছে নেবেন।
ভোটাররা বলছেন, এই দুই আসনে বিএনপির পুরনো ও পরিচিত নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। তাদের অনেক কর্মী-সমর্থক রয়েছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা দলের মূল
প্রর্থীকে যথেষ্ট ভোগাবে। ফলে ভোট ভাগাভাগির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বলতে গেলে স্বতন্ত্র প্রার্থীরাই বিএনপি প্রার্থীদের গলার কাঁটা হয়ে আছেন। ফলে ভোটের সুবিধা নিতে পারেন জামায়াতসহ ১১ দলের মনোনীত প্রার্থীরা।
কিশোরগঞ্জ-১ আসনে ১১ দলীয় জোটের পক্ষে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস থেকে রিকশা প্রতীকে নির্বাচন করছেন হেদায়াতুল্লাহ হাদী। তিনি বলেন, “এ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলাম আমাদেরকে আসটি ছেড়ে দিয়েছেন। তারা আমাদের সাথে সমন্বয় করায় আমি আশাবাদী। এখন পর্যন্ত নির্বাচনি কার্যাক্রমে মাঠ পর্যায়ে যা দেখছি-তাতে জয়ের ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।”
কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচন করছেন মো. রমজান আলী। তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কিশোরগঞ্জ জেলা আমির। নির্বাচনী মাঠে তারো সরব উপস্থিতি ও সমর্থক রয়েছেন। নির্বাচনি প্রচারে হাওরের দুই উপজেলা তিনি চষে বেড়াচ্ছেন। বিএনপি ও স্বতন্ত্র (বিদ্রোহী) প্রার্থী থাকায় তার ভোট ব্যাংক বৃদ্ধি পাবে এমনতাই প্রত্যাশা তার দলীয় সমর্থকদের। তিনি বলেন, “আমি দীর্ঘদিন রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। নির্বাচনে এ আসনে আমার প্রচুর দলীয় সমর্থকসহ নবীন-প্রবীণ ভোটার রয়েছেন। আমি সবার দ্বারে দ্বারে যাচ্ছি। আশাকরি এ আসন থেকে মানুষের ভালবাসায় বিজয়ী হব।”
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-১ আসনে ভোটার রয়েছেন ৫ লাখ ৫৫ হাজার ১৩৭ জন। কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে ভোটার ৩ লাখ ৫৩ হাজার ৬৬৭ জন।
ঢাকা/মাসুদ