ঢাকা     সোমবার   ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  মাঘ ২৬ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

বাকৃবির গবেষণা

হাওর অঞ্চলে কৃষি বৈচিত্র্যে নতুন সংযোজন সরিষা চাষ

বাকৃবি প্রতিনিধি || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৬:৪০, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬  
হাওর অঞ্চলে কৃষি বৈচিত্র্যে নতুন সংযোজন সরিষা চাষ

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অঞ্চল প্রতিবছরই জলবায়ুজনিত নানা ঝুঁকির সঙ্গে লড়াই করে। বাটি আকৃতির এই ভূ-প্রকৃতির কারণে বর্ষা মৌসুমে পুরো এলাকা পানিতে তলিয়ে গিয়ে বিশাল জলাভূমিতে রূপ নেয়। ফলে এখানকার কৃষি ব্যবস্থা অন্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ। হাওরের প্রধান ফসল বোরো ধান হলেও আগাম বন্যা, শিলাবৃষ্টি, খরা ও শীতজনিত চাপ নিয়মিতভাবে উৎপাদনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে স্বল্পমেয়াদি সরিষা চাষ। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর এবং বোরো রোপণের আগের অব্যবহৃত সময়কে কাজে লাগিয়ে সরিষা আবাদ করলে কৃষকরা অতিরিক্ত একটি ফসল ঘরে তুলতে পারবেন। এতে যেমন পতিত জমির ব্যবহার বাড়বে, তেমনি বোরো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কৃষকের আর্থিক ঝুঁকি কমবে। সেই সাথে উন্মোচিত হবে টেকসই ও লাভজনক শস্যক্রমের নতুন দিগন্ত। এ তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) এক গবেষণায়। 

আরো পড়ুন:

সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) গবেষণা প্রকল্পটির বিষয়ে এসব তথ্য তুলে ধরেন প্রধান গবেষক বাকৃবির কৃষিতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. মমিনুল ইসলাম। সহযোগী গবেষক হিসেবে ছিলেন একই বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. পারভেজ আনোয়ার।

‘কৃষকদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলে বিদ্যমান পতিত-বোরো-পতিত ফসল ক্রমে সরিষা প্রবর্তন’ প্রকল্পটি ২০২৩ সাল হতে কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার হাওর অঞ্চলে পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেমের (বাউরেস) তত্ত্বাবধানে এবং সিটি ব্যাংকের অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
কৃষিতত্ত্ব বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. আহমদ খায়রুল হাসানের সভাপতিত্বে মাঠ দিবসে উপস্থিত ছিলেন, বাকৃবি রিসার্চ সিস্টেমের (বাউরেস) পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. হাম্মাদুর রহমান, বাউরেসের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. পরেশ কুমার সাহা, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওবায়দুল ইসলাম খান অপু এবং অতিরিক্ত উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহাবুব আলমসহ স্থানীয় কৃষকরা।

গবেষকরা জানান, এই অঞ্চলে উচ্চফলনশীল বোরো ধান উৎপাদনের প্রধান বাধা হলো আগাম বন্যা, শিলাবৃষ্টি ও খরা।
 হাওর অঞ্চলে সবচেয়ে প্রচলিত শস্যক্রম হলো পতিত–বোরো–পতিত, যা মোট আবাদি জমির প্রায় ৪০ শতাংশ জুড়ে রয়েছে। ফলে রবি মৌসুমে বিপুল জমি পতিত পড়ে থাকে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর এবং বোরো ধান রোপণের আগের সময়টুকুতে স্বল্পমেয়াদি সরিষা চাষের মাধ্যমে একটি অতিরিক্ত ফসল অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। এতে কৃষকরা অন্তত একটি ফসল নিশ্চিতভাবে ঘরে তুলতে পারবে। এমনকি বোরো ধান যদি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তও হয়।

গবেষণার বিষয়ে তারা বলেন, গবেষণার প্রথম বছর (২০২৩–২০২৪) বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট (বারি) ও বাংলাদেশ পরমাণু গবেষণা ইন্সটিটিউটের(বিনা) উদ্ভাবিত ছয়টি স্বল্পমেয়াদি সরিষার জাত তিনটি বপন সময়ে (১০, ২০ ও ৩০ নভেম্বর) পরীক্ষা করা হয়।

ফলাফলে দেখা যায়, ২০ নভেম্বর বপনে বিনা সরিষা-৯ সর্বোচ্চ ফলন দেয়, যার কাছাকাছি ফলন দেয় বারি সরিষা-১৭। সরিষার পরবর্তী ধান (ব্রি ধান ১০০) গড়ে ৬.২ টন প্রতি হেক্টরে ফলন দেয়, যা শস্যক্রমকে লাভজনক হিসেবে তুলে ধরে।

দ্বিতীয় বছর (২০২৪–২০২৫) গবেষণায় নির্বাচিত দুটি জাত, বিনা সরিষা-৯ ও বারি সরিষা-১৭ কে বিভিন্ন সার ও বীজ হার ব্যবস্থাপনায় পরীক্ষা করা হয়। প্রস্তাবিত বীজ হার (৮ কেজি প্রতি হেক্টর) ও সার মাত্রা (১০০ শতাংশ ) প্রয়োগে সর্বোচ্চ ফলন পাওয়া গেছে বিনা সরিষা-৯ থেকে। সরিষার পর হাইব্রিড বোরো ধান (সবুজ সাথী) গড়ে ৬.৪ টন প্রতি হেক্টরে ফলন দেয়, এবং পুরো শস্যক্রমে ধান সমতুল্য ফলন দাঁড়ায় ১০.১ টন প্রতি হেক্টর । গবেষণার তৃতীয় বছর (২০২৫–২০২৬) বর্তমানে চলমান। তারা আশা করছেন, এটি বাস্তবায়িত হলে হাওর অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন ও কৃষকের আয় দুটোই বাড়বে এবং জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যেও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

হাওর অঞ্চলে সরিষা চাষের প্রতিবন্ধকতার বিষয়ে গবেষকরা বলেন, প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলো হলো-প্রতি বছর একই সময়ে পানি নেমে না যাওয়ায় সরিষা বপনের সময় নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, হাওরের সব ধরনের জমিতে সরিষা চাষ সম্ভব নয়, বিশেষ করে উঁচু বা মাঝারি উঁচু জমি বা কান্দা এলাকার জমিই সরিষা চাষের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি উপযোগী, বিশেষ করে অক্টোবরের শেষদিকে বা নভেম্বর এর শুরুতে অনাকাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি সরিষার বপন ও প্রাথমিক বৃদ্ধিতে বড় বাধা সৃষ্টি করে।

ঢাকা/লিখন/জান্নাত

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়