ঢাকা, রবিবার, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, ৩১ মে ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

ফিরে এলেন, দেখলেন, জয় করলেন

ড. রাশিদ আসকারী  : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০৫-১৭ ১১:৩০:২৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০২০-০৫-১৭ ১১:৩৪:৩৩ পিএম

ভেনি, ভিডি, ভিসি (veni, vidi, vici) একটি ল্যাটিন শব্দবন্ধ। ইংরেজিতে I came, I saw, I conquered. বাংলায়: এলাম, দেখলাম, জয় করলাম।

রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার পন্টাসের দ্বিতীয় ফার্নাসেসের বিরুদ্ধে জেলার যুদ্ধে সহজ জয় লাভের পর খ্রিষ্টপূর্ব ৪৭ অব্দে রোমান সিনেটকে লেখা এক পত্রে শব্দগুলো ব্যবহার করেন। সিজার পরাক্রমশালী দ্বিগ্বীজয়ী নৃপতি ছিলেন। সহজেই পররাষ্ট্র জয় করে পরমানন্দ লাভ করছেন। কিন্তু স্বরাষ্ট্র জয় করার প্রয়োজনীয়তা এবং সেই আনন্দ উপভোগের অভিজ্ঞতা তার হয়তো ছিলো না; থাকলে ‘ভেনি’র স্থলে রিভেনিও (Revenio) অর্থাৎ ল্যাটিন ভাষায় ‘ফিরে এলাম’ শব্দটি স্থান পেতো।

‘ফিরে এলেন, দেখলেন, জয় করলেন’ কথাগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসে যার ওপর সর্বাধিক প্রযোজ্য, তাঁর নাম শেখ হাসিনা। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা এবং বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঔরসজাত সন্তান হয়েও তাঁকে দেশ ছেড়ে স্বেচ্ছা নির্বাসনে যেতে হয়েছিল ভিনদেশে। চেনা পৃথিবী হঠাৎ করে অচেনা হয়ে উঠেছিলো তাঁর কাছে। চিরচেনা মানুষগুলো মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো নিরাপদ দূরত্বে, হয়তোবা বিপদের গন্ধ আঁচ করে। সেই চরম প্রতিকুল অবস্থা থেকে দেশ ও মাতৃকাকে পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনে তিনি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন ১৯৮১ সালের ১৭ মে’র এক চরম দুর্যোগপূর্ণ সময়ে। সেদিন সেই দূর্গতিনাশিনীর সাড়ম্বর আবির্ভাবে বাংলাদেশের রাজনীতির বন্ধ বাতায়ন খুলে যায়। গদিনসীন জেনারেল অবশ্য তাঁর আগমন বন্ধ করার নানা ফন্দি ফিকির করেছিলেন। কিন্তু দেশ এবং জনগণের প্রবল প্রতিবাদে তাদের সব কৌশলই সেদিন ব্যর্থ হয়।

শেখ হাসিনা ফিরে এলেন। স্বচক্ষে দেখলেন পঁচাত্তরের পনেরই আগস্টের পর সম্পূর্ণ পাল্টে যাওয়া এক অদ্ভুত বাংলাদেশ! যেখানে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনীদের পুরস্কৃত করা হয়েছে। দেশ-বিদেশে উচ্চপদে আসীন করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির ফরমান জারি করে খোদ জাতির পিতার খুনের বিচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের শ্রাদ্ধ করে একেবারে রাষ্ট্রীয়ভাবে সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কে দেওয়া হয়েছে। জাতীয়তাবাদকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতাকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শত শত সেনা কর্মকর্তাদের নির্বিচারে হত্যা করে এক প্রতিক্রিয়াশীল তাবেদার সামরিক বুহ্য গড়ে তোলা হয়েছে। আর রাজনীতিকদের জন্য রাজনীতি কঠিন করে সেনা ছাউনিতে বসে নতুন দল গড়ে দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতির জন্ম দেওয়া হয়েছে। সুবিধাবাদী আমলা, বিভ্রান্ত রাজনীতিক এবং ভ্রষ্ট সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের অসম্প্রদায়িক চেতনাবিরোধী যে রাজনীতির খেলায় মেতেছিলেন তৎকালিন সামরিক শাসকেরা- শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন না হলে হয়তো এতো দিনে বাংলাদেশ পাকিস্তানের এক ক্লোন রাষ্ট্রে পরিণত হতো। এ কারণে শেখ হাসিনার সময়োপযোগী সাহসী স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে একজন ব্যক্তির দেশে ফিরে আসার মতো সাধারণ ঘটনা হিসেবে মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের ম্যাসাকারে বস্তুত বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বাংলাদেশকেই হত্যা করা হয়েছিলো।

সেদিন নিহত বাংলাদেশের একাংশ দৈবক্রমে বেঁচে ছিলো বঙ্গবন্ধুর রক্ত ও রাজনীতির উত্তরাধিকার জননেত্রী শেখ হাসিনার মাঝে। সেই নির্বাসিত  বাংলাদেশই যেনো ফিরে আসে স্বদেশে শেখ হাসিনার সঙ্গে। শেখ হাসিনার দেখা শেষ হয় না। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পরও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি কীভাবে কৌশলে মসনদে বসে প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদী শক্তির কাঁধে চড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার অজুহাতে, তা দেখেও মনোবল হারাননি তিনি। অবশেষে অনেক পরে, অনেক ত্যাগ এবং আন্দোলনের বিনিময়ে একসময় শেখ  হাসিনার হাত ধরেই নতুন বিজয় আসে মুক্তিযুদ্ধের এই বাংলাদেশে। দীর্ঘ একুশ বছর পর ক্ষমতায় আসে বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি, একাত্তরের গণমানুষের রাজনীতি। প্রধানমন্ত্রীর আসন অলঙ্কৃত করেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। এ কারণেই বলা, শেখ হাসিনা ফিরে এলেন, দেখলেন এবং জয় করলেন। কিন্তু সেই জয় সিজারের জেলার যুদ্ধে জয়ের মতো অতো সহজ ছিলো না। দেশের ভেতর-বাইরের, দলের ভেতর-বাইরের অসংখ্য সঙ্কট মোকাবিলা করে তিনি বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন ক্রমাগত অনন্য উচ্চতায়। হেনরী কিসিঞ্জারের কথিত ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ এখন স্যাটেলাইট যুগের মানচিত্রে জায়গা করে নেওয়া এক গর্বিত দেশ। বিশ্ব ব্যাংকের অসহযোগিতাকে অগ্রাহ্য করে নিজ সামর্থে পদ্মা সেতুর মতো একটি স্টেট অব দ্য আর্ট স্থাপত্য গড়ে তোলার যোগ্যতাসম্পন্ন এক স্বাবলম্বী জাতি।  আর এসবের পেছনে ছায়া হয়ে মিশে আছে একজনের অনিঃশেষ দায়বোধ এবং অপরিসীম দক্ষতা। দুর্মর দেশপ্রেম এবং বলিষ্ঠ নেতৃত্ব। তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং শেখ হাসিনা। জরিপকারীরা ভুল বলেননি, ‘শেখ হাসিনা তার দলের চাইতেও অধিক জনপ্রিয়।’

অনেক দুর্নীতিগ্রস্ত, সুবিধেভোগী ভণ্ড কপট নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ডে আওয়ামী লীগের মতো ঐতিহ্যবাহী দলকে নিয়েও অনেক সময় সমালোচনার ঝড় ওঠে। অনেকে অনিশ্চয়তায় ভোগেন এই দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে। কিন্তু কাউকে কখোনো জননেত্রী শেখ হাসিনার ওপর ক্ষণিকের তরেও আস্থা হারাতে দেখি না। দিনের চব্বিশ ঘণ্টার সিংহভাগ সময় যার কাটে দেশের ভাবনায় ও কাজে- তাঁর ওপর আস্থা হারানো কঠিন।

বাংলাদেশের ইতিহাসে দুটো স্বদেশ প্রত্যাবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। একটি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এবং দ্বিতীয়টি যোগ্য পিতার যোগ্য তনয়া শেখ হাসিনার। প্রথমটি ঘটেছিলো ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি যখন ৭ কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা দীর্ঘ নয় মাস করাভোগের পর পাকিস্তানের মিয়াঁওয়ালি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বদেশের মাটিতে পা ফেলেন। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সেই দৃশ্য স্বচক্ষে দেখে ‘নিউইয়র্ক টাইমস’র সাংবাদিক ফক্স বাটারফিল্ড অসাধারণ এক বর্ণনা দেন। তাঁর বিশেষ প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিলো: Sheikh Mujib Home; 500,000 Give Him Rousing Welcome.

এদিকে ১৯৮১ সালের মে মাসে দিল্লী থেকে কলকাতা হয়ে ঢাকায় অবতরণ করেন শেখ হাসিনা। বিমান বন্দর থেকে সরাসরি তাঁর জন্য আয়োজিত মানিক মিয়া এভিনিউয়ের সমাবেশে যোগদান করেন। বিশাল জনসমাবেশে আবেগভরা কণ্ঠে জননেত্রী বলেন, ‘আমি বাংলাদেশের মানুষের পাশে থাকতে এসেছি। আমি আওয়ামী লীগের নেতা হতে আসেনি। আমি আপনাদের পাশে থাকতে চাই আপনাদের বোন হিসেবে, মেয়ে হিসেবে এবং আওয়ামী লীগের একজন কর্মী হিসেবে, যে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাস করে।’

বিশাল জনসমুদ্রে পিনপতন নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিলো। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর সেই প্রথম জিয়া শাসিত বাংলাদেশে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান উচ্চারিত হয়। ৩০ মিনিটের ভাষণে শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুসহ চার জাতীয় নেতার হত্যাকাণ্ডের বিচার করার প্রতিজ্ঞা করেন। ভারী বর্ষণ, বজ্রপাত অগ্রাহ্য করে অসংখ্য জনতার সঙ্গে তিনি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে যান। সেখানে তখনো বঙ্গবন্ধুর রক্তের দাগ লেগে ছিলো। কিন্তু আদিষ্ট নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁকে নিজ গৃহের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া তো দূরের কথা, বাইরে বসে প্রিয়জনদের আত্মার শান্তি কামনা করতেও দেয়নি।

সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা শেখ হাসিনার পাথেয় হিসেবে কাজ করেছে। ক্ষমতায় এসে তিনি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের বিচার করেছেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছেন। কালো আইন বাতিল করেছেন। জঙ্গি দমনে অভূতপূর্ব সাফল্য এনেছেন। আর রাতদিন কাজ করে চলেছেন দেশের উন্নয়নের মুকুটে নতুন নতুন পালক যুক্ত করতে।

‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র অপবাদ ঘুঁচিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন আর শুধু বাংলাদেশেরই নয়, পুরো প্রাচ্যের বিস্ময় হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এই স্বীকৃতি আমরা নিজেরা দেইনি। খোদ মার্কিন বহুজাতিক ব্যাংকিং ফার্ম গোল্ডম্যান ম্যাচ যারা বৈশ্বিক বিনিয়োগ ব্যাংকিং বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তাসহ অন্যান্য আর্থিক সেবা নিয়ে কাজ করছে, তারাই বাংলাদেশের সমকালীন অর্থনীতিকে ‘প্রাচ্যের আলোচিত’ বলে দাবি করেছেন। তাদের এই দাবি নিছক ছেলেমানুষী নয়। ক্ষুধা-দারিদ্র্য-মঙ্গাপীড়িত বাংলাদেশ আজ এক উদীয়মান অপ্রতিরোধ্য ব্যাঘ্র। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা, শেয়ারবাজার ধস, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ কোনো কিছুই বাংলাদেশের এই অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে পারেনি।

সকল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাঁধা অতিক্রম করে আমাদের অর্থনীতি এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে। বেড়ে চলেছে জিডিপি, গ্রোথ, মাথাপিছু আয়, ফরেন কারেন্সি রিজার্ভ, রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয় সব কিছুই। অর্থনীতির সব সূচকই এখন ঊর্ধ্বগামী। আর এই অগ্রগামিতার উত্তাপ যে কেবল সূচক চিত্রেই সীমাবদ্ধ থাকছে তাও নয়। একেবারে দৃশ্যমানভাবে তার অস্তিত্ব বিকশিত হচ্ছে। আর প্রতিকুলতা পেরিয়ে যাওয়া এই অগ্রযাত্রাকেই হয়তো মূল্যায়নকারীরা অলৌকিক বিস্ময়কর বলতে চাচ্ছেন। সত্যিই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এখন দৃশ্যমান বাস্তবতা। সারাদেশ ঘুরে কোথাও এখন আর তেমনভাবে সেই জীর্ণশীর্ণ কুঁড়েঘর, ক্ষুধাতুর অস্থিচর্মসার মানুষ, বুড়ো হালের বলদ খুঁজে পাওয়া যাবে না। বন্যা, খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়তো সাময়িকভাবে নিম্নবর্গীয় জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে। কিন্তু তা সামলিয়ে উঠতেও খুব বেশি সময় লাগে না। যে জনজীবনের সঙ্গে একদা দুর্ভিক্ষ, মঙ্গা, মন্বন্তর শব্দগুলো ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল সেই জনজীবন এখন অনেক বেশি সুখকর, স্বাস্থ্যকর এবং নিরাপদ। তাই বলে এখনো পুরোপুরি দাবি করার সময় আসেনি যে আমরা শতভাগ সুরক্ষিত। শতভাগ নিরাপদ। তবে আমরা এতটুকু দাবি করতেই পারি যে, প্রতিবেশী অনেক দেশের তুলনায় এবং আমাদের সমান্তরালে অবস্থিত বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় আমরা অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থান অর্জন করেছি।

ভারতের মতো আর্থিক ক্ষমতাধর দেশে এখনো যেখানে ষাট লাখের বেশি নরনারী খোলা আকাশের নিচে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়, ডুয়ার্সের চা বাগানে এখনো যেখানে কথিত ডাইনি পুড়িয়ে মারা হয়, তখন বাংলাদেশ নারীর ক্ষমতায়নে আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করছে। উন্নয়নের আর্থ-সামাজিক অনেক সূচকে যে বাংলাদেশ-ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছে সে সাক্ষ্য স্বয়ং ভারতীয় নোবেলবিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনই দিচ্ছেন। আর পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনার তো প্রশ্নই ওঠে না। খোদ উপাসনালয় যেখানে অনিরাপদ, সেখানে উন্নয়নের প্রশ্ন কতটুকুই বা প্রাসঙ্গিক।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো- এই উন্নয়ন কোনো আকস্মিক উন্নয়ন নয়। মেঘাচ্ছন্ন অন্ধকার আকাশে হঠাৎ আলোর ঝলকানি নয়, কিংবা পাণ্ডুর বিবর্ণ দেহে ক্ষণিকের ঔজ্জ্বল্য নয়। এই উন্নয়ন সুপরিকল্পিত, ধারাবাহিক এবং টেকসই। মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলসের সিঁড়ি বেয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলসের দিকে। রূপকল্প ২০২১-এর যে অভীষ্ট, একুশ শতকের তৃতীয় দশকের শুরুতেই মধ্যম আয়ের দেশে যাওয়া- তা সম্ভবত আমরা নির্ধারিত সময়ের আগেই অর্জন করতে সক্ষম হবো। তার সুলক্ষণগুলো ইতোমধ্যেই প্রকাশ পেয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে গ্রোথ রেট ৭-এর উপরে ধরে রেখেছে। আজ বাংলাদেশের অর্থনীতি ২৫০ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মতে এই অগ্রযাত্রা ২০২১-এ গিয়ে ৩২২ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে পৌঁছবে। অসংখ্য বিনিয়োগ সুবিধা সৃষ্টি হবে। বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যেই বাংলাদেশকে নিম্নমধ্য আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাদের প্রতিবেদন মতে বাংলাদেশে শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি পেয়েছে, জন্মহার কমেছে, যা নির্ভরতা হার কমাতে এবং মাথাপিছু আয় বাড়াতে সহায়ক হচ্ছে। বাংলাদেশের বাজার নির্ভর অর্থনীতি আজ সাধারণ বিচারে বিশ্বের ৪৪তম অর্থনীতি এবং ক্রয় ক্ষমতার সাম্যের বিচারে বিশ্বের ৩২তম অর্থনীতি। পরবর্তী ১১-এ উদীয়মান বাজার অর্থনীতির তালিকাভুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের হিসেব মতে বাংলাদেশ তার ৭.১% প্রবৃদ্ধিসহ বিশ্বের দ্বিতীয় দ্রুততম বর্ধিষ্ণু অর্থনীতি হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। এ দেশের অর্থ খাত এখন উপমহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থ খাত। আইএমএফ-এর তথ্য মতে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় প্রায় ২০০০ ডলারের কাছাকাছি। বাংলাদেশ বর্তমানে কমনওয়েলথ, অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন, সার্ক, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন এবং এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের সুযোগ্য সদস্য হিসেবে উন্নয়নের সোপান বেয়ে এগিয়ে চলেছে। বাংলাদেশ সফরে আসা মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব জন কেরি বঙ্গবন্ধু জাদুঘর পরিদর্শন করতে গিয়ে পরিদর্শন বইয়ে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা এবং এর পেছনে বঙ্গবন্ধুর রক্ত ও রাজনীতির সুযোগ্য উত্তরাধিকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন।

বাংলাদেশের এই অসামান্য অর্থনৈতিক উন্নয়ন দৈবযোগে সংঘটিত হয়নি। এর পেছনে রয়েছে এ দেশের মানুষের স্বপ্নসাধ, অসংখ্যের শ্রম-ঘাম, আর একটি সুদক্ষ সরকারের নেতৃত্ব, বিশেষ করে সেই সরকার প্রধানের দৃঢ়তা, আন্তরিকতা, স্বপ্ন এবং দেশপ্রেম। সত্যিই আজ বাংলাদেশের উন্নয়নের উপাখ্যানে জননেত্রী শেখ হাসিনার অবদানের জুড়ি মেলা ভার। শেখ হাসিনা আজ কেবল বাংলাদেশের উন্নয়নের রোল মডেলই নন, তিনি আজ পুরো দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়ন-রাজনীতির রোল মডেল। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক।

শেখ হাসিনা তাঁর অনুপম ব্যক্তিত্ব, গতিশীল চৌকস নেতৃত্ব, কর্মদক্ষতা, মেধা ও ব্যক্তিগত ক্যারিশমা দিয়ে নিজেকে বিকল্পহীন হিসেবে এবং দেশে ও দেশের বাইরে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে নিজের দলকে সাফল্যের সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়ে আবারো তিনি নবম বারের মতো নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। বিগত কাউন্সিলে একদিকে যেমন তাঁর দলের নেতাকর্মীরা তাঁকে আমৃত্যু পার্টিপ্রধান হিসেবে কাজ করে যাওয়ার ম্যান্ডেট দিয়েছে, তেমনি বহিঃর্দেশীয় অতিথিরাও তাঁর আন্তর্জাতিক গুরুত্বের কথা নানাভাবে প্রকাশ করেছেন।

জননেত্রী শেখ হাসিনা ক্রমাগত প্রমাণ করে চলেছেন, তিনি কেবল তাঁর দলের জন্যই নয়, তিনি দেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। বঙ্গবন্ধু যেমন আওয়ামী লীগের মধ্য দিয়ে দেশবাসীকে স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার দিকে পরিচালিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন; সাড়ে সাত কোটি মানুষকে চূড়ান্ত স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত করেছিলেন এবং স্বাধীনতা পাইয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর রক্ত ও রাজনীতির সুযোগ্য উত্তরাধিকার জননেত্রী শেখ হাসিনাও তেমনি ষোল কোটি মানুষকে নিয়ে সবসময় ভাবছেন। ভয়াল করোনা- সংক্রমণের এই বৈশ্বিক বিপর্যয় কালেও তিনি ভার্চুয়াল যোগাযোগের মাধ্যমে রাতদিন দেশবাসীর ভালোমন্দের খোঁজখবর রাখছেন। বঙ্গবন্ধু দিয়েছেন স্বাধীনতা। শেখ হাসিনা দিচ্ছেন অর্থনৈতিক মুক্তি। এই জায়গায় পিতা-পুত্রীর অবস্থান পরস্পরের পরিপূরক। আজ বাংলাদেশের উন্নয়ন যে প্রাচ্যের বিস্ময়ে পরিণত হয়েছে এর পেছনে কাজ করছে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন এবং তা বাস্তবায়নে শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দেশবাসীর- তৎপরতা। এই তৎপরতার সাফল্য অনিবার্য।

আজ জননেত্রী শেখ হাসিনার ৪০তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে তাঁর প্রতি দেশবাসীর শুভেচ্ছার ফল্গুধারা প্রবাহিত হচ্ছে। এই নশ্বরজগত ও জীবনের কাছে তাঁর হয়তো চাওয়ার কিংবা পাওয়ার আর তেমন কিছু নেই। এক নৃশংসতম ঐতিহাসিক বর্বরতায় যিনি জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষগুলোকে হারিয়েছেন, তাঁর আর কিই-বা প্রত্যাশা থাকতে পারে? তবে দেশবাসীর এখনও অনেক কিছু পাবার আছে এই মহীয়সী নারীর কাছে।

লেখক: উপাচার্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া


কুষ্টিয়া/মাহি/তারা