Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     রোববার   ০৯ মে ২০২১ ||  বৈশাখ ২৬ ১৪২৮ ||  ২৬ রমজান ১৪৪২

পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের ব্যাকরণ : একটি পর্যালোচনা (তৃতীয় পর্ব)

মুহাম্মদ শহীদুল ইসলাম || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:৪৯, ১২ এপ্রিল ২০২১   আপডেট: ১৮:৫৭, ১২ এপ্রিল ২০২১
পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের ব্যাকরণ : একটি পর্যালোচনা (তৃতীয় পর্ব)

বাক্য বিষয়ক আলোচনা
ষষ্ঠ শ্রেণির ব্যাকরণের বাক্যতত্ত্ব-পরিচ্ছেদে বাক্যের পরিচয় দেওয়া হয়েছে এভাবে — ‘আমরা বাক্য তৈরি করি এক বা একাধিক শব্দ একত্রে সাজিয়ে।’ (পৃ. ৪৮)। এই ব্যাকরণের অন্যত্র, প্রথম পরিচ্ছেদে, বাক্যের এরকম একটি সংজ্ঞা পাওয়া যায়— ‘যা উক্তি হিসেবে সম্পূর্ণ এবং যাতে শ্রোতা পরিপূর্ণভাবে তৃপ্ত হয় তা-ই হলো বাক্য।’(পৃ. ৩)। সপ্তম শ্রেণির ব্যাকরণে বলা হয়েছে, ‘যে সুবিন্যস্ত পদসমষ্টি দ্বারা কোনো বিষয়ে বক্তার মনোভাব সম্পূর্ণরূপে প্রকাশিত হয়, তাকে বাক্য বলে।’ (পৃ. ৫৮)। অষ্টম শ্রেণির ব্যাকরণে আছে, ‘এক বা একাধিক পদের দ্বারা যখন বক্তার মনোভাব সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ পায়, তখন তাকে বাক্য বলে।’ (পৃ. ৫৫)। নবম-দশম শ্রেণির ব্যাকরণে বলা হলেছে, ‘এক বা একাধিক শব্দ দিয়ে গঠিত পূর্ণ অর্থবোধক ভাষিক একককে বাক্য বলে। বাক্য দিয়ে বক্তার মনের ভাব সম্পূর্ণ প্রকাশিত হয়।’ (পৃ. ৮৩)।

এখানে লক্ষ্য করার বিষয় হলো ষষ্ঠ, অষ্টম আর নবম-দশম শ্রেণির ব্যাকরণ অনুসারে বাক্য এক শব্দ/পদ দিয়ে যেমন তৈরি হতে পারে, তেমনি একাধিক শব্দ/পদ দিয়েও তৈরি হতে পারে। কিন্তু সপ্তম শ্রেণির ব্যাকরণ অনুসারে বাক্য তৈরির জন্য পদসমষ্টি প্রয়োজন— এক নয়, একাধিক পদ তাতে থাকতে হবে। আবার, ষষ্ঠ শ্রেণির ব্যাকরণে বলা হয়েছে, বাক্যকে উক্তি হিসেবে সম্পূর্ণ হতে হবে। সপ্তম, অষ্টম আর নবম-দশম শ্রেণির ব্যাকরণ তিনটির সংজ্ঞায়ও আছে যে, বাক্য বক্তার মনোভাব সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করবে। বাক্যের এই বৈশিষ্ট্যের কথা প্রথাগত ব্যাকরণে দু-হাজার বছর ধরে বর্ণিত হয়ে আসছে। কিন্তু এই দু-হাজার বছরে, ‘প্রথাগত আনুশাসনিক ব্যাকরণবিদেরা কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছোতে পারেন নি একটি বাক্যে ঠিক কি পরিমাণ ভাবনার প্রকাশ ঘটালে মনোভাব সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ পায়।’ (হুমায়ুন আজাদ, বাক্যতত্ত্ব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৯৪, পৃ. ১৮)। এরকম সিদ্ধান্তে পৌঁছানো আসলে সম্ভবই নয়। ষষ্ঠ শ্রেণির ব্যাকরণে শ্রোতাকে ‘পরিপূর্ণভাবে তৃপ্ত’ করার শর্ত আছে। বক্তার উক্তি কেমন হলে শ্রোতা পরিপূর্ণভাবে তৃপ্ত হবে সেরকম সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও অসম্ভব।

ষষ্ঠ শ্রেণির ব্যাকরণে বলা হয়েছে যে, বাক্য গঠনের সময় পদ সাজানোর নিয়ম মানতে হবে, ‘পদগুলো পরপর সাজালেই বাক্য হবে না।’ (পৃ. ৪৮)। সপ্তম আর অষ্টম শ্রেণির ব্যাকরণ অনুসারে, আদর্শ বাক্য গঠিত হবে তখন, যখন তা আকাঙ্ক্ষা, আসত্তি ও যোগ্যতার শর্ত পূরণ করবে। ব্যাকরণ দুটিতে আকাঙ্ক্ষা, আসত্তি ও যোগ্যতার যে-বিবরণ আছে তা সংক্ষেপে এরকম— বাক্যের অর্থ পরিষ্কারভাবে বোঝার জন্য এক পদের পর অন্য পদ শোনার ইচ্ছা হলো আকাঙ্ক্ষা, বাক্যের অর্থসঙ্গতি রক্ষার জন্য সুশৃঙ্খল পদবিন্যাসই আসত্তি আর বাক্যস্থিত পদসমূহের অন্তর্গত ও ভাবগত মিলবন্ধনের নাম যোগ্যতা। কেবল সপ্তম আর অষ্টম শ্রেণির ব্যাকরণেই নয়, উল্লিখিত তিন শর্ত এবং সেগুলির অনুরূপ ব্যাখ্যা, প্রথাগত ধারার বহু বাংলা ব্যাকরণে আছে। শর্ত তিনটির উৎস সংস্কৃত ব্যাকরণ। সংস্কৃতের অন্বিতাভিধানবাদী বৈয়াকরণেরা মনে করতেন, আসত্তি, আকাঙ্ক্ষা ও যোগ্যতাসম্পন্ন শব্দের সমষ্টিই বাক্য। শর্ত তিনটির যে-ব্যাখ্যা তাঁরা দিয়েছিলেন, হুমায়ূন আজাদের ভাষায়, তা হলো — আসত্তি (নৈকট্য) বলতে বোঝায় যে, বাক্যের যে-সমস্ত শব্দের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান, সেগুলো পরস্পরের থেকে সুদূরে অবস্থান করবে না, তাদের অবস্থান হবে সন্নিকট। আকাঙ্ক্ষা বলতে বোঝায় যে, অনন্বয়ী শব্দপুঞ্জের সমাহার বাক্য নয়, বাক্যে ব্যবহৃত শব্দসমূহ সহাবস্থানযোগ্য হ’তে হবে। যোগত্য (সঙ্গতি) বোঝায় যে, বাক্যে ব্যবহৃত শব্দসমূহের অর্থে সঙ্গতি থাকতে হবে।(বাক্যতত্ত্ব, পৃ. ৪০৩)।  
প্রথাগত বাংলা ব্যাকরণে আকাঙ্ক্ষা আর আসত্তির ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সপ্তম আর অষ্টম শ্রেণির ব্যাকরণ সম্পর্কেও এই কথা সমভাবে প্রযোজ্য।

বোর্ডের ব্যাকরণগুলির মধ্যে ষষ্ঠ শ্রেণির ব্যাকরণে বাক্যের উপাদান বা অঙ্গগুলি সম্পর্কে কোনো আলোচনা নেই, আছে সপ্তম, অষ্টম আর নবম-দশম শ্রেণির ব্যাকরণে। তবে সে আলোচনা তেমন সুশৃঙ্খল নয়, যৌক্তিকতারও ঘাটতি আছে তাতে। যেমন, সপ্তম শ্রেণির ব্যাকরণে বলা হয়েছে, ‘সাধারণত প্রতিটি বাক্যের দুটি প্রধান অংশ থাকে : ১. উদ্দেশ্য ও ২. বিধেয়।’ (পৃ. ৫৯)। আর নবম-দশম শ্রেণির ব্যাকরণে বলা হয়েছে, ‘প্রতিটি বাক্যকে উদ্দেশ্য ও বিধেয়— এই দুই অংশে ভাগ করা যায়।’ (পৃ. ৮৩)। অষ্টম শ্রেণির ব্যাকরণেও প্রত্যেক বাক্যে উদ্দেশ্য-বিধেয় থাকার কথা আছে। (পৃ. ৫৭ )। লক্ষণীয় যে, সাধারণত বা সচরাচর উদ্দেশ্য ও বিধেয় অংশ নিয়ে বাক্যশরীর নির্মিত হয়, এমন কথা সপ্তম শ্রেণির ব্যাকরণে থাকলেও অষ্টম আর নবম-দশম শ্রেণির ব্যাকরণে তা নেই। অর্থাৎ, সপ্তম শ্রেণির ব্যাকরণ অনুসারে, উদ্দেশ্য ও বিধেয়-এর যে কোনো একটি ছাড়াও বাক্য গঠিত হতে পারে। কিন্তু অষ্টম আর নবম-দশম শ্রেণির ব্যাকরণ অনুসারে তা পারে না। স্মরণ করা যেতে পারে — ষষ্ঠ, অষ্টম আর নবম-দশম শ্রেণির ব্যাকরণে বাক্যের সংজ্ঞায় একটিমাত্র পদ নিয়েও বাক্য গঠিত হওয়ার কথা আছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এক পদবিশিষ্ট বাক্যে উদ্দেশ্য-বিধেয় দুটিই কী করে থাকবে?

আলোচ্য ক্ষেত্রে আরও একটি উদাহরণ দেওয়া যায়। নবম-দশম শ্রেণির ব্যাকরণে ‘বর্গ’ সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। বর্গের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘বাক্যের মধ্যে একাধিক শব্দ দিয়ে গঠিত বাক্যাংশকে বর্গ বলে।’ (পৃ. ৮৬)। বর্গ আসলে এক শব্দ দিয়েও গঠিত হতে পারে। বর্গের মধ্যে একাধিক শব্দ থাকতেই হবে এমন কোনো কথা নেই।

বোর্ডের চার ব্যাকরণের তিনটিতে— সপ্তম, অষ্টম আর নবম-দশম শ্রেণির ব্যাকরণে— বাক্যের গঠনগত শ্রেণিবিভাগের বিবরণ আছে। বিবরণের শুরুতেই আছে সরল বাক্যের কথা। সপ্তম আর অষ্টম শ্রেণির ব্যাকরণে বলা হয়েছে, যে-বাক্য একটি উদ্দেশ্য বা কর্তা ও একটি সমাপিকা ক্রিয়া বা বিধেয় থাকে তাকে সরল বাক্য বলে। কিন্তু নবম-দশম শ্রেণির ব্যাকরণে বলা হয়েছে, ‘যে বাক্যে একটি সমাপিকা ক্রিয়া থাকে, তাকে সরল বাক্য বলে।’ (পৃ. ৯০)। 

অর্থাৎ সরল বাক্যের সংজ্ঞা সম্পর্কে বোর্ডের ব্যাকরণের লেখক-সম্পাদকগণ একমত হতে পারেননি। এই বিষয়ে প্রথাগত বাংলা ব্যাকরণের পুরোধা-পণ্ডিতেরাও মতৈক্যে পৌঁছুতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁদের কেউ কেউ এবিষয়ে আগে প্রকাশ করা মত পরে পরিবর্তনও করেছেন। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সরল বাক্যের সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে— ‘কোনও বাক্যে একটি সমাপিকা ক্রিয়া থাকিলে তাহা সরল বাক্য।’ (বাঙ্গালা ব্যাকরণ, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, ২০০৩, পৃ. ১৬০ )। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘ভাষা-প্রকাশ বাঙ্গালা ব্যাকরণে’ (১৯৩৯) বলেছেন, “যে বাক্যে একটি মাত্র উদ্দেশ্য ও একটি মাত্র বিধেয় (সমাপিকা ক্রিয়া) থাকে, তাহাকে সরল বাক্য বলে।’ এই মত পরে তিনি পুনর্বিবেচনা করেন এবং ‘সরল ভাষা-প্রকাশ বাঙ্গালা ব্যাকরণ’ (১৩৬৬) গ্রন্থে বলেন, ‘যে বাক্যের বিধেয় একটি, সেই বাক্যকে বলে সরল বাক্য।’ (উদ্ধৃত, হুমায়ুন আজাদের বাক্যতত্ত্ব, পৃ. ১০০)। লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, সুনীতিকুমার ‘একটি মাত্র উদ্দেশ্য’-এর শর্ত থেকে সরে এসেছেন এবং বিধেয় অংশে সমাপিকা ক্রিয়া থাকা না থাকার বিষয়ে নীরবতা পালন করেছেন। শেষোক্ত গ্রন্থে তিনি সরল বাক্যের যেসব উদাহরণ দিয়েছেন সেগুলির একটি এরকম— ‘ঠেলাগাড়িতে ইংরাজ রমণী এবং অশ্বপৃষ্ঠে ইংরাজ পুরুষগণ বায়ু-সেবনে বাহির হইয়াছেন।’ (উদ্ধৃত, হুমায়ূন আজাদের বাক্যতত্ত্ব, পৃ. ১০১)।

এই বাক্যে বিধেয় একটি বলে সুনীতিকুমারের মতে এটি সরল বাক্য। সমাপিকা ক্রিয়া একটি থাকায়, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এবং পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের নবম-দশম শ্রেণির ব্যাকরণের সংজ্ঞানুসারেও এটিকে সরল বাক্য বলতে বাধা নেই। কিন্তু বোর্ডের সপ্তম আর অষ্টম শ্রেণির ব্যাকরণের সংজ্ঞা অনুসারে, ক্রিয়া সম্পাদনকারী বা কর্তা একাধিক হওয়ায়, বাক্যটিকে সরল বাক্য বলা যাবে না। বোর্ডের প্রগুক্ত ব্যাকরণ তিনটিতে সরল বাক্যের পরই আছে জটিল বাক্যের আলোচনা। সপ্তম শ্রেণির ব্যাকরণে জটিল বাক্যের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এভাবে — যে বাক্যের মধ্যে একটি প্রধান বাক্য থাকে এবং একাধিক বাক্যকে প্রধান বাক্যের ওপর নির্ভরশীল দেখা যায়, তাকে জটিল বা মিশ্র বাক্য বলে। অথবা, অন্যভাবে বলা যায়, যে বাক্যে একটি প্রধান খণ্ড বাক্যের এক বা একাধিক আশ্রিত বাক্য পরস্পর সাপেক্ষভাবে ব্যবহৃত হয়, তাকে জটিল বা মিশ্র বাক্য বলে। (পৃ. ৬০)। 

লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, এখানে দুটি সংজ্ঞা আছে। প্রথম সংজ্ঞানুসারে জটিল বাক্য তিন বা ততোধিক বাক্যের সমষ্টি। এর মধ্যে ‘একটি প্রধান বাক্য’ থাকবে আর সেই প্রধান বাক্যের ওপর ‘নির্ভরশীল’ থাকবে ‘একাধিক বাক্য’। দ্বিতীয় সংজ্ঞা অনুযায়ী তিনের কম বাক্য নিয়েও জটিল বাক্য গঠিত হতে পারে। জটিল বাক্যে কোনো ‘প্রধান খণ্ড বাক্যের এক বা একাধিক আশ্রিত বাক্য’ ব্যবহৃত হয় ‘পরস্পর সাপেক্ষভাবে’। নবম-দশম শ্রেণির ব্যাকরণে জটিল বাক্যের পরিচয় দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, ‘একটি মূল বাক্যের অধীনে এক বা একাধিক আশ্রিত বাক্য বা বাক্যাংশ থাকলে জটিল বাক্য তৈরি হয়। যেমন— যদি তোমার কিছু বলার থাকে, তবে এখনই বলে ফেল।’ (পৃ. ৮৩)।

আরও বলা হয়েছে, ‘যে-সে, যারা-তারা, যিনি-তিনি, যাঁরা-তাঁরা, যা-তা প্রভৃতি সাপেক্ষ সর্বনাম এবং যদি-তবে, যদিও-তবু, যেহেতু-সেহেতু, যত-তত, যেটুকু-সেটুকু, যেমন-তেমন, যখন-তখন প্রভৃতি সাপেক্ষ যোজক দিয়ে যখন অধীন বাক্যগুলো যুক্ত থাকে, তাকে জটিল বাক্য বলে।’ (পৃ. ৯০)। জটিল বাক্যের অধীন-আশ্রিত বাক্যকে সাপেক্ষ সর্বনাম বা সাপেক্ষ যোজক দিয়ে যুক্ত করতে হবে — এরকম কথা সপ্তম শ্রেণির ব্যাকরণে নেই, নেই অষ্টম শ্রেণির ব্যাকরণেও। শেষোক্ত ব্যাকরণে জটিল বাক্যের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এভাবে— ‘যে বাক্যে একটি স্বাধীন বাক্য এবং এক বা একাধিক অধীন বাক্য পরস্পর সাপেক্ষভাবে ব্যবহৃত হয়, তাকে জটিল বাক্য বা মিশ্র বাক্য বলে।’ এই সংজ্ঞা দেওয়ার পর, অষ্টম শ্রেণির ব্যাকরণে, উদাহরণ হিসাবে তিনটি বাক্য ব্যবহার করা হয়েছে। বাক্য তিনটির দুটি এরকম— ‘কোথাও পথ না পেয়ে তোমার কাছে এসেছি’ এবং ‘তুমি আসবে বলে আমি অপেক্ষা করে আছি’। (পৃ. ৫৯)। লক্ষণীয় যে, কোনোটিতেই সাপেক্ষ সর্বনাম বা সাপেক্ষ যোজক নেই। প্রশ্ন হচ্ছে এগুলিকে জটিল বাক্য বলার অবকাশ আছে কি? আরও একটি প্রশ্ন না করলেই নয়। জটিল বাক্য সম্পর্কে নবম-দশম শ্রেণির ব্যাকরণ থেকে যে-দুটি উদ্ধৃতি আমরা দিয়েছি, সে-দুটির শেষোক্তটি(পৃ. ৯০ থেকে নেওয়া) এক বাক্যের। এতে সাপেক্ষ যোজক ‘যখন-তখন’-এর প্রথমাংশ ‘যখন’ ব্যবহৃত হয়েছে, শেষাংশ ‘তখন’ ব্যবহৃত হয়নি। এভাবে সাপেক্ষ যোজকের একাংশ বাদ দিয়ে জটিল বাক্য তৈরি করা যায় কি?

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, জটিল বাক্যের আলোচনা প্রথমে এসেছে সপ্তম শ্রেণির ব্যাকরণে। এই আলোচনায় ‘খণ্ড বাক্য’ ও ‘আশ্রিত বাক্যে’র কথা আছে। কিন্তু এগুলির সংজ্ঞায়ন ব্যাকরণটিতে করা হয়নি। তা করা হয়েছে অষ্টম শ্রেণির ব্যাকরণে। এতে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, উদাহরণও দেয়া হয়েছে সাথে। তবে সংজ্ঞা আর উদাহরণের মধ্যে মিল সবক্ষেত্রে পাওয়া যায় না। যেমন ‘খণ্ডবাক্যে’র সংজ্ঞা আর উদাহরণ —
একটি উদ্দেশ্য ও একটি বিধেয় ক্রিয়ার (সমাপিকা) সমষ্টি যদি নিজে একটি স্বাধীন বাক্য হিসেবে ব্যবহৃত না হয়ে অন্য কোনো  বৃহত্তর বাক্যের অংশরূপে ব্যবহৃত হয়, তাকে খণ্ডবাক্য বলে। যেমন : যারা ভালো ছেলে, তারা শিক্ষকের আদেশ পালন করে। এ বাক্যে দুটি খণ্ডবাক্য আছে : ১. যারা ভালো ছেলে ২. তারা শিক্ষকের আদেশ পালন করে। (পৃ. ৫৭)। 
প্রথম অর্থাৎ ১ সংখ্যক পদসমষ্টিতে কোনো বিধেয় ক্রিয়া (সমাপিকা) নেই। সে-কারণে, প্রদত্ত সংজ্ঞানুসারে, এটি খণ্ডবাক্য হতে পারে না। অথচ এটিকে খণ্ডবাক্যের উদাহরণ হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে।

জটিল বাক্য বিষয়ক আলোচনায় উল্লেখ করেছি, এই ধরনের বাক্যের দুটি সংজ্ঞা মেলে সপ্তম শ্রেণির ব্যাকরণে। যৌগিক বাক্যেরও দুটি সংজ্ঞা পাওয়া যায়, তবে তা সপ্তম শ্রেণির ব্যাকরণে নয়, নবম-দশম শ্রেণির ব্যাকরণে। সংজ্ঞা দুটির একটি এরকম— ‘এক বা একাধিক বাক্য বা বাক্যাংশ যোজকের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে যৌগিক বাক্য গঠন করে।’ (পৃ. ৮৩)। অন্য সংজ্ঞাটি হলো — ‘দুই বা ততোধিক স্বাধীন বাক্য যখন যোজকের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে একটি বাক্যে পরিণত হয়, তখন তাকে যৌগিক বাক্য বলে।’ (পৃ. ৯১)। সপ্তম শ্রেণির ব্যাকরণে যৌগিক বাক্যের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এভাবে— ‘পরস্পর নিরপেক্ষ দুই বা ততোধিক সরল বা জটিল বাক্য মিলিত হয়ে যখন একটি সম্পূর্ণ বাক্য গঠন করে, তখন তাকে যৌগিক বাক্য বলে।’  (পৃ. ৬১)।

আর অষ্টম শ্রেণির ব্যাকরণে বলা হয়েছে, ‘দুই বা তার অধিক সরল বা জটিল বাক্য মিলিত হয়ে যদি একটি সম্পূর্ণ বাক্য গঠন করে, তবে তাকে যৌগিক বাক্য বলে।’ (পৃ. ৫৯)। সপ্তম শ্রেণির ব্যাকরণের সংজ্ঞায় যৌগিক বাক্যের অন্তর্গত বাক্যগুলিকে ‘পরস্পর নিরপেক্ষ’ বলা হয়েছে কিন্তু অষ্টম শ্রেণির ব্যাকরণের সংজ্ঞায় সে রকম কিছু বলা হয়নি। তবে পরে, জটিল ও যৌগিক বাক্যের তুলনামূলক আলোচনায়, অষ্টম শ্রেণির ব্যাকরণে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘জটিল বাক্যের অন্তর্গত বাক্যাংশগুলো পরস্পর সাপেক্ষ’ আর ‘যৌগিক বাক্যের অন্তর্গত বাক্যগুলো প্রায় স্বতন্ত্র।’ (পৃ. ৫৯)। প্রশ্ন উঠতে পারে, ‘পরস্পর নিরপেক্ষ’ আর ‘প্রায় স্বতন্ত্র’ পদগুচ্ছের অর্থ কি এক?  নিশ্চয়ই নয়। এক্ষেত্রে আরও একটি ব্যাপার লক্ষ্য করার মতো। যৌগিক বাক্যের অন্তর্গত বাক্যগুলি কোন দিক থেকে, কোন বিবেচনায় পরস্পর নিরপেক্ষ বা প্রায় স্বতন্ত্র তা বলা হয়নি ব্যাকরণ দুটিতে। বললে ভালো হতো। কারণ, খোয়াল-খুশি মাফিক একাধিক বাক্য জুড়ে যৌগিক বাক্য তৈরি করার নিয়ম নেই। যৌগিক বাক্যে যে-দুই বা ততোধিক বাক্য যুক্ত হবে তাদের মধ্যে ‘একটা ব্যাপক সংগতি থাকা চাই। যেমন: ‘শাহেদুল ভালো ফুটবল খেলে আর আমার কুকুরটার সামনের ডানদিকের ঠ্যাংটা ভেঙে গেছে’ ঠিক সিদ্ধ যৌগিক বাক্য হবে না।’ (পবিত্র সরকার, পকেট বাংলা ব্যাকরণ, পাঞ্জেরী পালিকেশন্স, ঢাকা, ২০১১ পৃ. ১৩২)।

নবম-দশম শ্রেণির ব্যাকরণে, সরল বাক্যের আলোচনায় বলা হয়েছে, ‘সরল বাক্যে অনেক সময় ক্রিয়া অনুপস্থিত থাকে।’ (পৃ. ৯০)। এরকম কথা জটিল বা যৌগিক বাক্যের আলোচনায় নেই। জটিল আর যৌগিক বাক্যে কি ক্রিয়া উহ্য-অনুপস্থিত থাকতে পারে না? পারে, অবশ্যই পারে। সরল বাক্য যেমন, জটিল আর যৌগিক বাক্যও তেমনি ক্রিয়া উহ্য রেখে গঠন করা যায়। তাহলে জটিল ও যৌগিক বাক্যের আলোচনায় তা কেন উল্লেখ করা হবে না?

পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চার ব্যাকরণের তিনটিতে — সপ্তম, অষ্টম আর নবম-দশম শ্রেণির ব্যাকরণে — উদ্দেশ্য-বিধেয়ভিত্তিক বাক্যবর্ণনা আছে। এক্ষেত্রে, প্রথাগত ধারার আর সব বাংলা ব্যাকরণের মতই, অনুসরণ করা হয়েছে প্রথাগত ইংরেজি ব্যাকরণকে। সপ্তম আর নবম-দশম শ্রেণির ব্যাকরণে কারকের আলোচনাও আছে। কারক হলো প্রথাগত সংস্কৃত ব্যাকরণের বাক্যতত্ত্ব। হুমায়ুন আজাদের ভাষায়— 
‘কারকতত্ত্বের মর্মবাণী হচ্ছে বাক্যের ক্রিয়ার সাথে বিভিন্ন বিশেষ্যপদ জড়িত থাকে কয়েক রকম সম্পর্কে; অর্থাৎ বাক্য শুধু দুটি প্রধান খণ্ডে বিভাজ্য নয়, বেশ কয়েকটি খণ্ডে ভাগ করা সম্ভব বাক্যসংগঠন … উদ্দেশ্যবিধেয়তত্ত্বের সার কথা হচ্ছে বাক্য দ্বিআংশিক, তা যতো বড়ো বা ছোটো হোক-না-কেন। তত্ত্ব দুটি পরস্পরবিরোধী, তাই তাদের মিশ্রণ অসম্ভব।’ (বাক্যতত্ত্ব, পৃ. ১০৮ )।

বহু বাংলা ব্যাকরণবিদ এই অসম্ভবকে সম্ভব করতে গেছেন এবং ব্যর্থ হয়েছেন। সপ্তম আর নবম-দশম শ্রেণির ব্যাকরণের লেখক-সম্পাদকমণ্ডলীকেও সে-ব্যর্থতা বরণ করতে হয়েছে। (চলবে)

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, খুলনা সরকারি মহিলা কলেজ

**পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের ব্যাকরণ : একটি পর্যালোচনা (দ্বিতীয় পর্ব)
**পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের ব্যাকরণ: একটি পর্যালোচনা (সূচনা পর্ব)

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়