ঢাকা     শুক্রবার   ২০ মার্চ ২০২৬ ||  চৈত্র ৭ ১৪৩২ || ৩০ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

ভর্তি পরীক্ষার বোঝা চাপিয়ে আমরা কি শৈশব কেড়ে নেব?

কবীর আলমগীর || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:০১, ২০ মার্চ ২০২৬   আপডেট: ১৪:১২, ২০ মার্চ ২০২৬
ভর্তি পরীক্ষার বোঝা চাপিয়ে আমরা কি শৈশব কেড়ে নেব?

লেখাটি শুরুর আগে নিজের অভিজ্ঞতা জানাতে চাই। যাকে মেধা বলি, আমার ছেলে সেই মানদণ্ডে গড়পড়তা। এ বছর তাকে ঢাকার একটি স্ব-শাসিত স্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা দিতে হয়েছিল। ওই স্কুলে আসন সংখ্যা ৫০। সারা দেশ থেকে অন্তত চার হাজার প্রতিযোগী নামল ভর্তি পরীক্ষায়। পরীক্ষার আগের রাতটি আমার ছেলের জন্য ছিল নিদারুণ। পরীক্ষার চিন্তায় তার নির্ঘুম রাত কেটেছে প্রায়, সে ভর্তি পরীক্ষায় পারবে কি পারবে না? এই চিন্তায় তাকে কাটাতে হয়েছে সময়। পরীক্ষার পর ফল প্রকাশ হওয়ার আগ পর্যন্ত তার চিন্তা যেন কাটে না। আমাকে প্রশ্ন করে, আব্বু রেজাল্ট কী হয়েছে? আমার নাম কি আছে? পাঁচ বছর লটারিতে ব্যর্থ হয়ে আমার ছেলে লটারিতে ঢাকার একটি নামকরা সরকারি স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। লটারি না হলে যা ছিল আমার জন্য প্রায় অসাধ্য কিছু।

স্কুলে চান্স পাওয়া না-পাওয়ার চেয়ে আমার কাছে উদ্বেগের কারণ ছিল পরীক্ষার আগে রাতে শিশুর নির্ঘুম সময়, পরীক্ষা দেওয়ার পরও তার বিচলিত সময়! বিএনপি সরকার স্কুলে ভর্তিতে লটারি পদ্ধতি বাতিল করেছে। প্রথম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত তাদের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে। দৃশ্যটি কল্পনা করা যাক, হাজার হাজার কচিকাঁচা শিশুরা স্কুল শেষ করছে ভারী ব্যাগ নিয়ে, ছুটছে কোচিং সেন্টারে, গাদা গাদা শিট ফটোকপি করছে, মুখস্থ করছে, পাঠ্যপুস্তকের বাইরেও শিশুদের আরও বই কিনতে হচ্ছে, ভর্তি পরীক্ষার মাঠে পিঁপড়ার সারির মতো লাইন, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।

আরো পড়ুন:

শিশু মানেই এক নির্মল আকাশ— যেখানে কৌতূহল ডানা মেলে, আর খেলার মাঝেই গড়ে ওঠে জীবনের প্রথম পাঠ। কিন্তু আমরা কি শিশুদের সেই আকাশটিকে ধীরে ধীরে মেঘে ঢেকে দিচ্ছি? শিক্ষা কাঠামোয় উন্নয়নের নামে, প্রতিযোগিতার নামে, আমরা কি এমন এক সমাজ তৈরি করছি; যেখানে শিশুদের শৈশবই সবচেয়ে বড় বলি হয়ে উঠছে?

‘ভর্তি পরীক্ষা’ শব্দটি শুনতে যতটা নিরপেক্ষ, বাস্তবে তা চাপপূর্ণ। মেধা মূল্যায়ন পদ্ধতির আড়ালে যেখানে একটি শিশুকে বলা হয় ‘হয় তুমি পারবে কিংবা পারবে না।’ যে বয়সে শিশুরা নিজেদের চেনা শুরু করে, যে বয়সে তাদের পৃথিবীকে জানার কথা আনন্দ আর অভিজ্ঞতার মাধ্যমে, সে বয়সেই যদি তাদের এমন এক প্রতিযোগিতায় নামানো হয়, তবে তা কতটা যৌক্তিক?

এই পরীক্ষাভিত্তিক ব্যবস্থার একটি বড় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো কোচিং সংস্কৃতির বিস্তার। আমাদের দেশে কোচিং সেন্টারগুলো বিশাল বাণিজ্যিকখাতে পরিণত হয়েছে। ফলে স্কুলের পড়া স্কুলে হয় না। অভিভাবকরা কোচিংমুখি, কোনো কোনো শিক্ষক ব্যস্ত কোচিংয়ে পড়াতে। এতদিন লটারি ব্যবস্থা বহাল থাকার কারণে ভর্তি কোচিংগুলো সুবিধা করতে পারেনি। আগামী বছর থেকে ভর্তি পরীক্ষা চালু হলে এই খাত আরও ফুলে-ফেঁপে উঠবে। তখন শিশুরা স্কুল থেকে ফিরে কিংবা স্কুলে যাওয়ার আগে কোচিংয়ে যাবে, সৃজনশীলতার বদলে গাইড বই মুখস্থ করবে এবং সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তর শিখবে। তাদের শেখার প্রক্রিয়াটি হয়ে উঠবে যান্ত্রিক। ভালো স্কুলে পড়ানোর প্রতিযোগিতায় অভিভাবকরা টাকা খরচ করবেন এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা। 

যাদের বাবা-মা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল, তারা সহজেই ভালো কোচিং, গাইড বই, ব্যক্তিগত টিউটর—সবকিছুই জোগাড় করতে পারবে। কিন্তু একজন দিনমজুর বা নিম্ন আয়ের পরিবারের পক্ষে কি এসব খরচ বহন করা সম্ভব? ফলে শুরু থেকেই একটি বৈষম্য তৈরি হবে, যা শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। সবার জন্য শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। শিক্ষা তো হওয়ার কথা সমতা প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার। কিন্তু ভর্তি পরীক্ষা যদি সেই শিক্ষাকেই বৈষম্যের উৎসে পরিণত করে, তবে আমরা কীভাবে এটিকে মানতে পারি?

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য। একটি শিশু যখন প্রথমবার ভর্তি পরীক্ষায় বসে এবং ব্যর্থ হয়, তখন সেটি তার মনে একটি গভীর ছাপ ফেলে। যদি সে দ্বিতীয়বারও ব্যর্থ হয়, তবে সেই ব্যর্থতার অনুভূতি আরও গভীর হয়। এই বয়সে শিশুরা খুব সংবেদনশীল থাকে; তারা সহজেই নিজেদের অযোগ্য মনে করতে শুরু করে। আমি পারি না, আমি ভালো না—এই ধরনের নেতিবাচক ধারণা তাদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেয়। শৈশবে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা এবং চাপ শিশুদের স্বাভাবিক মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে, আত্মবিশ্বাস হারায়, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে পড়াশোনার প্রতি বিরূপ মনোভাব তৈরি হয়। আমরা কি এমন একটি প্রজন্ম চাই, যারা ছোটবেলা থেকেই ভয়ের মধ্যে বড় হবে? আমরা কি এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করতে চাই, যারা বছর বছর মন খারাপের অভিজ্ঞতা নিয়ে বড় হবে?

শুধু মানসিক নয়, শারীরিক বিকাশের দিক থেকেও এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। শিশুরা স্বাভাবিকভাবে খেলাধুলার মাধ্যমে বড় হয়। খেলার মাধ্যমে তারা দলবদ্ধতা শেখে, সমস্যা সমাধান করতে শেখে, শারীরিকভাবে সুস্থ থাকে। কিন্তু বাস্তবতা হলো— বিশেষ করে ঢাকার মতো শহরে— শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত খেলার জায়গা নেই। অনেক মাঠ দখল হয়ে গেছে, অনেক জায়গা বাণিজ্যিক স্থাপনায় রূপান্তরিত হয়েছে।
ফলে শিশুরা ঘরের ভেতর বন্দি হয়ে যাচ্ছে। তারা মোবাইল ফোন, টেলিভিশন বা বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে যদি যুক্ত হয় ভর্তি পরীক্ষার চাপ, তবে তাদের জীবনে খেলার জায়গা একেবারেই সংকুচিত হয়ে যাবে। একটি প্রজন্ম বড় হয়ে উঠছে, যারা প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ হারাচ্ছে, শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে।

আমরা প্রায়ই মেধা বিকাশ নিয়ে কথা বলি। কিন্তু মেধা কি শুধুই পরীক্ষার নম্বর দিয়ে পরিমাপ করা যায়? একজন শিশুর সৃজনশীলতা, কল্পনাশক্তি এসব কি কোনো লিখিত পরীক্ষায় ধরা পড়ে? বরং অতিরিক্ত পরীক্ষানির্ভরতা অনেক সময় এই গুণগুলোকে দমিয়ে দেয়। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে প্রাথমিক স্তরে পরীক্ষার ওপর এতটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। তারা খেলাধুলা, প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষা, অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শেখাকে গুরুত্ব দেয়। কারণ তারা জানে, একটি শিশুর সামগ্রিক বিকাশই তার ভবিষ্যতের ভিত্তি তৈরি করে। আমরা যদি সত্যিই একটি দক্ষ ও মানবিক প্রজন্ম চাই, তবে আমাদের সেই দিকেই নজর দিতে হবে।

ভর্তি পরীক্ষার পক্ষে যারা যুক্তি দেন, তারা বলেন, এটি মেধাবী শিক্ষার্থী বাছাইয়ের একটি কার্যকর উপায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মেধা নির্ধারণের জন্য কি এটিই একমাত্র পদ্ধতি? এবং তা কি এত অল্প বয়সে প্রয়োগ করা উচিত? একটি শিশুর সম্ভাবনা সময়ের সঙ্গে বিকশিত হয়; একটি নির্দিষ্ট দিনে একটি নির্দিষ্ট পরীক্ষায় তার পারফরম্যান্স দিয়ে তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা কতটা যুক্তিসঙ্গত?

আমরা যদি ভর্তি পরীক্ষাকে পুরোপুরি বাতিল করতে না-ও পারি, তবে অন্তত এটি উচ্চতর শ্রেণিতে সীমাবদ্ধ রাখার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত। অষ্টম বা নবম শ্রেণির পর শিক্ষার্থীরা কিছুটা পরিণত হয়, তারা প্রতিযোগিতা বোঝে, চাপ সামলাতে পারে। সেই পর্যায়ে একটি বাছাই প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কিন্তু প্রাথমিক স্তরে এটি আরোপ করা শিশুদের প্রতি এক ধরনের অবিচার।
শিক্ষা ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শেখার আনন্দ সৃষ্টি করা, জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা গড়ে তোলা। কিন্তু যদি শিক্ষা শুরুই হয় ভয়, চাপ আর প্রতিযোগিতা দিয়ে, তবে সেই ভালোবাসা কি আদৌ জন্ম নিতে পারে? আমাদের নীতিনির্ধারকদের এই বিষয়টি গভীরভাবে ভাবতে হবে। এটি লাখ লাখ শিশুর জীবনে প্রভাব ফেলার বিষয়। তাদের মানসিক স্বাস্থ্য, তাদের আত্মবিশ্বাস, তাদের স্বপ্ন— সবকিছুই এর সঙ্গে জড়িত।

অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। অনেক সময় আমরা নিজেরাই অজান্তে শিশুদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করি— ভালো স্কুলে না পড়লে ভবিষ্যৎ অন্ধকার— এই ধরনের ধারণা তাদের মনে ঢুকিয়ে দিই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, একটি শিশুর সাফল্য শুধু তার স্কুলের ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে তার মানসিক অবস্থা ও শেখার সুযোগের মধ্যে। তার পরিবেশ, তার মানসিক অবস্থা, তার শেখার সুযোগ— সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের নিজেদেরই একটি প্রশ্ন করা উচিত—আমরা কেমন সমাজ চাই? এমন একটি সমাজ, যেখানে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই প্রতিযোগিতার চাপে দমবন্ধ হয়ে বড় হবে? নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে তারা আনন্দে, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বড় হতে পারবে? একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শিশুদের মাধ্যমে। তাই তাদের শৈশবকে রক্ষা করা মানে আমাদের ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা। শিক্ষার উন্নয়নের নামে যদি আমরা সেই শৈশবই কেড়ে নিই, তবে সেই উন্নয়ন কতটা টেকসই? আমরা কি সত্যিই এমন এক পথ বেছে নিতে চাই, যেখানে একটি শিশুর প্রথম পরিচয়ই হবে প্রতিযোগী হিসেবে, শিশু হিসেবে নয়? আমাদের উপলব্ধির জায়গায় আসতে হবে আমরা কি ভর্তি পরীক্ষা চাপিয়ে দিয়েছি শিশুদের শৈশবকে কেড়ে নিতে চাই?

ঢাকা/তারা//

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়