ঢাকা, শনিবার, ২০ চৈত্র ১৪২৬, ০৪ এপ্রিল ২০২০
Risingbd
সর্বশেষ:

নিরাপদ অভিবাসন প্রকল্প আসছে

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০২০-০২-১৩ ৮:৪৫:৩০ এএম     ||     আপডেট: ২০২০-০২-১৩ ১২:৫৭:৫৫ পিএম

দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে রেমিট‌্যান্স যোদ্ধাদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য এবং অভিবাসন প্রত্যাশীদের মধ‌্যে সচেতনতার অভাবে এ খাতের সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

কিছু অসাধু ব‌্যক্তির অপতৎপরতার কারণে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। এসব কারণে অভিবাসন খাতে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি প্রকল্প হাতে নিতে যাচ্ছে সরকার।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) প্রকল্পটি হাতে নেবে। বর্তমানে প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) প্রণয়নের কাজ চলছে। প্রকল্পটির মাধ্যমে সারা দেশে সচেতনামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। আশা করা হচ্ছে, এর ফলে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য কমবে এবং অভিবাসন খাতে জনগণের সচেতনতা তৈরি হবে। প্রবাসীদের জন্য সরকারের প্রদত্ত বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত হবে।

বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে দালাল চক্রের তৎপরতা রোধ, বিদেশ যাওয়ার পূর্বে সরকারের বিভিন্ন নিয়ম-নীতিমালা জানা এবং অনুসরণ করার প্রবণতা তৈরি করা। বিদেশে অবস্থানকালে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি অনুকূলে প্রাপ্ত বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা সর্ম্পকে অবগত করা এবং সর্বোপরি প্রবাসী রেমিট‌্যান্স যোদ্ধাদের ও তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য সরকার কর্তৃক প্রদত্ত বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে জানানো, প্রভৃতি লক্ষ‌্য নিয়ে এই প্রকল্পটি গ্রহণ করা হচ্ছে।

প্রকল্পটির অধীনে বিভাগীয় পর্যায়সহ দেশের সকল জেলায় সভা-সেমিনারের আয়োজন করা হবে। গণমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন ও নাটিকা প্রচার করা হবে। রেডিও এবং টেলিভিশনে সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন এবং অনুষ্ঠান প্রচার করা হবে। এসব অনুষ্ঠান এবং বিজ্ঞাপনচিত্রের মাধ্যমে সর্বস্তরের জনগণের সামনে অভিবাসনের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হবে এই প্রকল্পের মূল কাজ।

বিএমইটি সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্প প্রস্তাবনা এখনো শেষ না হয়নি। সূত্র জানায়, ২০১৭ সালে ‘নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতকরণের জন্য সচেতনতার বিকাশ কর্মসূচি’ নামে ৫ বছর মেয়াদী একটি কর্মসূচি হাতে নেয় সংস্থাটি। ২০১৭ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত মেয়াদে গৃহীত এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ২১৩ কোটি টাকা। বাস্তবায়নাধীন এই কর্মসূচির আদলে সচেতনতামূলক নতুন প্রকল্প তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

এদিকে, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতে প্রতি বছর আলাদাভাবে বাজেট বরাদ্দ রাখা হয় বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন‌্য।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সচেতনতা মূলক সেমিনার, প্রচার প্রচারণা ও প্রেসব্রিফিং জন্য বরাদ্দ বাবদ গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জেলা পর্যায়ে ৭১ হাজার টাকা এবং উপজেলা পর্যায়ে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিভাগীয় পর্যায়ে ৯৭ হাজার টাকা উপজেলা পর্যায়ে ৫৫ হাজার ৮০০ টাকা করে বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে।

নতুন প্রকল্পটির বিষয়ে বিএমইটি বলছে, রেমিট‌্যান্স পাঠানো প্রবাসীদের সুযোগ-সুবিধা দিতে সরকার বদ্ধ পরিকর। কেননা বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে প্রবাসী বাংলাদেশি ও কর্মীদের পাঠানো রেমিট‌্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।  প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট‌্যান্সে সচল থাকছে দেশের অর্থনীতির চাকা। তাই সরকারও প্রবাসীদের বিভিন্ন সুযোগ-সু্বিধা দিয়ে রেখেছে। তবে প্রচারণার অভাবে অনেক প্রবাসী জানেন না তার প্রাপ্য সুবিধাগুলো সম্পর্কে। তাই হাতের নাগালে থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রবাসীরা। এ জন‌্য সচেতনতামূলক কার্যক্রমের প্রতি জোর দিচ্ছে মন্ত্রণালয়ও।

প্রকল্পের বিষয়ে বিএমইটি মহাপরিচালক মো. শামসুল আলম রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘আমাদের অভিবাসনের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা হয়ে কাজ করে হচ্ছে অসচেতনতা। সচেতনতার অভাবে বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে যেরকম অনেকেই প্রতারিত হয়, আবার বিদেশে অবস্থান করার সময় সরকার কর্তৃক প্রদত্ত বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত হয়। পাশাপাশি তাদের কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে উক্ত দেশের বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিদের কাছেও তারা সব ধরনের বার্তা পৌঁছাতে পারে না। আবার কোনো শ্রমিক দেশে আসতে গেলে বা কোনো শ্রমিক মারা গেলে দেশে আসার ক্ষেত্রে সরকার থেকে যেসব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে উক্ত শ্রমিক বা তার পরিবারের জন‌্য- সেগুলো থেকেও তারা বঞ্চিত হয়।’

মহাপরিচালক বলেন, ‘যে বিষয়গুলো বললাম এতে শুধু যে শ্রমিকরা বঞ্চিত হচ্ছে তা নয়, পরোক্ষভাবে এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষভাবে দেশও এর ক্ষতির সম্মুখীন হয়।’

তিনি বলেন, ‘এসব বিষয় বিবেচনায় আমরা গণসচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রে একটি প্রকল্প হাতে নিতে যাচ্ছি। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনার সর্বশেষ সভায় প্রকল্পটি বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়। মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।’

প্রবাসীদের জন্য প্রদত্ত বিভিন্ন সরকারি সুযোগ-সুবিধা সর্ম্পকে জানা গেছে, বর্তমান সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে নিরাপদ, সুষ্ঠু ও নিয়মতান্ত্রিক অভিবাসন নিশ্চিত করা। যা কেবল অভিবাসী বাংলাদেশি কর্মীদের অধিকার রক্ষা ও কল্যাণেই কাজ করে।

প্রবাসীদের মেধাবী সন্তানদের শিক্ষাবৃত্তি ও শিক্ষা সহায়তা চালু করেছে সরকার। আরো কিছু চলমান সুবিধার মধ‌্যে রয়েছে- প্রবাসীর সন্তানদের বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার প্রদান। প্রবাসে কেউ মৃত্যুবরণ করলে তার পরিবার বিমানবন্দরে লাশ গ্রহণের সময় ৩৫ হাজার টাকা এবং পরবর্তিতে তিন লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা। প্রবাসীদের সম্পদের সুরক্ষা ও তাদের পরিবারের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সহযোগিতা করা। পঙ্গু ও অসুস্থ কর্মীদের জন্য বাংলাদেশ বিমানবন্দর অ্যাম্বুলেন্স সহায়তা। কাজ করতে গিয়ে গুরুতর অসুস্থ, আহত বা শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে দেশে ফিরতে এবং চিকিৎসা সহায়তায় ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা প্রদান। প্রবাসে মৃত্যু হলে এবং কোম্পানি ও পরিবার লাশ পরিবহনে অক্ষম হলে দেশে লাশ প্রেরণ। এছাড়া, সরকারের বিভিন্ন ঋণ সহায়তা গ্রহণ করতে পারবে প্রবাসীরা।

বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান ব‌্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ নেয়ার ব‌্যবস্থা রয়েছে। ২০১৭ সালে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য প্রথম আলাদা আবাসন ঋণ কর্মসূচি চালু করে বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইনান্স করপোরেশন।

সরকার প্রবাসীদের জন্য প্রবাসী বিমা বাধ্যতামূলক করেছে। এ বিমায় দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন ঋণ সুবিধা। এছাড়া, সরকার বিদেশে বাংলাদেশি কর্মীদের মানসম্পন্ন সেবা দেওয়া, তাদের আস্থা অর্জন, মৃত কর্মীদের মরদেহ দেশে আনা, ব্যয় নির্বাহ এবং এ সংক্রান্ত কাজে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রবাসীদের জন্য গঠন করেছে ওয়েজ আনার্স কল্যাণ বোর্ড। কল্যাণ বোর্ডের সদস্য হলেই প্রবাসীরা এসব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। বাংলাদেশ দূতাবাস ও হাইকমিশনে গিয়ে আবেদনের মাধ্যমে এ কল্যাণ বোর্ডের সদস্য হওয়া যায়।

 

ঢাকা/হাসান/ইভা