ঢাকা     শনিবার   ০৭ মার্চ ২০২৬ ||  ফাল্গুন ২২ ১৪৩২ || ১৮ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

তেল নিয়ে হুলস্থুল, দুই লিটার তেলের জন্য অপেক্ষা চার ঘণ্টা 

রায়হান হোসেন  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:৩৫, ৭ মার্চ ২০২৬   আপডেট: ২০:৫৩, ৭ মার্চ ২০২৬
তেল নিয়ে হুলস্থুল, দুই লিটার তেলের জন্য অপেক্ষা চার ঘণ্টা 

ছবি: রাইজিংবিডি

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। ইরানের হামলায় গত সোমবার বন্ধ হয়ে গেছে সৌদি আরবে জ্বালানি তেলের সবচেয়ে বড় শোধনাগার। একই দিনে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন ও সরবরাহ বন্ধ করেছে কাতার।

এ অবস্থায় তেল–গ্যাস সাশ্রয়ের নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। এছাড়া বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) গত ৬ মার্চ থেকে দেশে জ্বালানি তেলের রেশনিং শুরু করেছে, যেখানে মোটরসাইকেল প্রতি সর্বোচ্চ দুই লিটার তেল বিক্রির সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।

আরো পড়ুন:

সরকারি নির্দেশনার পর থেকেই রাজধানীসহ সারা দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে তৈরি হয়েছে হুলস্থুল। মাত্র দুই লিটার পেট্রোল বা অকটেনের জন্য বাইকারদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে টানা তিন থেকে চার ঘণ্টা। শনিবার (৭ মার্চ) রাজধানীর নিউমার্কেট, নীলক্ষেত, শাহবাগসহ বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায় দীর্ঘ লাইন।

বিপাকে রাইড শেয়ারিং চালকরা
জ্বালানি তেলের রেশনিং পদ্ধতির জন্য সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন রাইট শেয়ারিং চালকরা। সরকারের বেঁধে দেওয়ার নিয়ম অনুযায়ী একজন বাইক চালক দিনে ২ লিটারের বেশি জ্বালানি নিতে পারবে না। তবে যারা রাইড শেয়ারিং করে তাদের আরো বেশি জ্বালানির প্রয়োজন হয়।

রাইট শেয়ারিং করেন মোস্তফা সরোয়ার। রাজধানীর শাহবাগের মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টার ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ চার ঘণ্টা অপেক্ষা করে দুই লিটার অকটেন নিতে পেরেছেন। তিনি রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “ঘড়ির কাঁটা ঘোরে, কিন্তু পাম্পের সিরিয়াল নড়ে না। দুই লিটার তেলের জন্য চার ঘণ্টা বিসর্জন দেওয়া কেবল অভাব নয়, এক চরম অসহায়ত্বের নাম, আমার চাকা ঘুরলে পেট চলে, আর আজ সেই চাকা সচল রাখতেই পাম্পের লাইনে দাঁড়িয়ে দিনের অর্ধেক আয় ধুলোয় মিশে গেল। রোদে পুড়ে, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে যখন মাত্র দুই লিটার তেল পেলাম এখন মনে হচ্ছে যেন তেলের পাম্প নয়, ইরানের সঙ্গে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ।”

একই পাম্পে কথা হয় বেসরকারি চাকরিজীবী সাইফ হাসানের সঙ্গে। তিনি রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “আমার বাসা পুরান ঢাকা, সেখান থেকে আমার অফিসে বনানী যেতে আসতে সোয়া লিটারের বেশি তেল চলে যায়। আজ ৪ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল পেয়েছি। এ এক মহাযুদ্ধ। অথচ এখন পর্যন্ত তেলের কোনো সংকট নেই।”

রেশনিং পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল সরবরাহের জন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গতকাল ৬ মার্চ সরকারি সংস্থাটি জানায়, একটি মোটরসাইকেলে দিনে ২ লিটার পেট্রল বা অকটেন নিতে পারবে। ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে নেওয়া যাবে ১০ লিটার তেল। স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিক্যাল বা এসইউভি (যা জিপ নামে পরিচিত) ও মাইক্রোবাস দিনে পাবে ২০ থেকে ২৫ লিটার তেল। পিকআপ বা লোকাল বাস দিনে ডিজেল নিতে পারবে ৭০ থেকে ৮০ লিটার। আর দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান বা কনটেইনার ট্রাক দৈনিক ২০০ থেকে ২২০ লিটার তেল নিতে পারবে।

লাইন সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন পাম্পে কর্মচারীরা
জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে রেশনিং পদ্ধতিতে বিক্রি জন্য পাম্পগুলোতে বাড়ছে ভিড়। সকাল থেকে শুরু করে সারাদিন বিরতিহীন সেবা দিয়েও ভিড় কমাতে পারছেন না তারা, বরং সময়ের সাথে সাথে দীর্ঘতর হচ্ছে যানবাহনের সারি।

মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টার ফিলিং স্টেশনের কর্মচারী রবিউল হাসান রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “আমরা সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতি মোটরসাইকেলকে ২ লিটার তেল দিচ্ছি। কেউ যেন দ্বিতীয় বা নিতে না আসতে পারে তার জন্য বাইকের নম্বর লিখে রাখছি। মানুষ শুধু শুধু আতঙ্ক ছড়িয়ে ভিড় করছে।”

একই ফিলিং স্টেশনের হিসাবরক্ষক এম এ মান্নান মজুমদার রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “দেশে এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত পরিমাণ জ্বালানির মজুত রয়েছে। মানুষ আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। আমাদের পাম্পে পর্যাপ্ত পরিমাণ মজুত আছে। আমরা সরকারের নিয়ম মেনে নির্ধারিত দামে তেল বিক্রি করছি।”

উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই, ২ ভ্যাসেল আসছে
জ্বালানি তেল নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।

শনিবার (৭ মার্চ) বিকেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ৪ নম্বর গেটে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে এমনটা জানান তিনি।

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “তেল নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। যুদ্ধটা কতদিন চলবে, সেটি নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে, এ কারণে রেশনিং করা হয়েছিল। রেশনিংয়ে ভয় পেয়ে মানুষ স্টক করা শুরু করেছেন। আসলে তেলের কোনো অভাব নেই। শুধু তাই নয়, ৯ তারিখে আরো দুটি ভ্যাসেল আসছে। সুতরাং, তেলের কোনো সমস্যা নেই।”

তিনি বলেন, “জনগণের প্রতি আহ্বান, তাড়াহুড়ো করে কেনার দরকার নেই। মজুত আছে। পেট্রোল পাম্পে তেল দেওয়া হচ্ছে এবং এটি চলবে। তেলের জন্য লাইন দিয়ে সারারাত জাগার প্রয়োজন নেই। মানুষ গেলে তেল পাবে। যুদ্ধ কবে থামবে জানি না, সে কারণে সঞ্চয় করতে হচ্ছে। শর্টেজ পড়ার কোনো সুযোগ নেই। তবুও যেহেতু যুদ্ধ চলছে, খুব হিসাব করে চলতে হবে।”

জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারের নির্দেশনা
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়ে জনগণের সহযোগিতা কামনা করেছে মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতার কারণে সারা বিশ্বে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। এর ফলে অনিবার্যভাবে দেশের জ্বালানি খাতেও সাময়িক সংকট তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জ্বালানি সংকটের কারণে পবিত্র রোজার মাসে জনদুর্ভোগ এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনে কয়েক দফা নির্দেশনা দিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়, সব ধরনের আলোকসজ্জা পরিহার এবং ব্যক্তিগত যানবাহন ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহন ব্যবহারের অনুরোধ জানানো হচ্ছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, খোলাবাজারে ডিজেল, পেট্রল বিক্রয় না করার জন্য ব্যবসায়ীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তৎপর হওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে জ্বালানি পাচার রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য ইতিমধ্যে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

ঢাকা/এসবি

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়