ঢাকা     সোমবার   ৩০ মার্চ ২০২৬ ||  চৈত্র ১৭ ১৪৩২ || ১০ শাওয়াল ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

আসিফ মাহমুদের ‘ডিপ স্টেট’ মন্তব্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড়, মিশ্র প্রতিক্রিয়া শরিকদের

রায়হান হোসেন  || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ২২:৪৪, ২৯ মার্চ ২০২৬   আপডেট: ২২:৫৩, ২৯ মার্চ ২০২৬
আসিফ মাহমুদের ‘ডিপ স্টেট’ মন্তব্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড়, মিশ্র প্রতিক্রিয়া শরিকদের

এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়া

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়ার এক মন্তব্য। তিনি দাবি করেছেন, ‘ডিপ স্টেট’ থেকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে। এ মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের অন্য শরিক দলগুলোর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

জোটভুক্ত কয়েকটি দল সরাসরি এই বক্তব্যকে ‘গুরুতর’ উল্লেখ করে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেছে। তাদের মতে, এমন সংবেদনশীল বিষয় জনসম্মুখে আনার আগে প্রমাণসহ বিস্তারিত তুলে ধরা জরুরি। অন্যথায়, এটি জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে।

আরো পড়ুন:

অন্যদিকে, কিছু শরিক দল বিষয়টিকে রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছে। তারা মনে করছে, এটি মূলত ক্ষমতাসীনদের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করার একটি প্রচেষ্টা হতে পারে। তবে, তারা এটাও বলছে, ডিপ স্টেট ইস্যুটি হালকাভাবে নেওয়ার মতো নয় এবং প্রয়োজনে যৌথভাবে এ বিষয়ে জোটের অবস্থান নির্ধারণ করা উচিত।

বিশ্লেষকদের মতে, ডিপ স্টেট প্রসঙ্গটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এটি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাস্তব কোনো প্রেক্ষাপট সামনে আসবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে, এই ইস্যুতে জোটের শরিকদের ভিন্নমত ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে। আবার এটা তার রাজনৈতিক কৌশলগত বয়ানও হতে পারে।

গত বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ আলোচনা সভায় দলটির মুখপাত্র ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, “আমরা যখন সরকারের দায়িত্বে ছিলাম, শুরুর দিকে আমাদেরকে বিভিন্ন শক্তিশালী ইনস্টিটিউশন, যাদেরকে আসলে ডিপ স্টেট বলা হয়, তাদের থেকে আমাদেরকে অফার করা হয়েছিল যে, আপনারা শেখ হাসিনার যে মেয়াদ আছে ২০২৯ সাল পর্যন্ত, সেটা শেষ করেন। আপনারা শেষ করেন, আমরা আপনাদেরকে সহযোগিতা করি। তবে, অন্তর্বর্তী সরকার এই প্রস্তাবে সায় দেয়নি।”

তিনি বলেন, “কীভাবে ক্ষমতায় থাকা যায়, সেই কৌশল সাজিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাদের সাথে একধরনের নেগোসিয়েশন, সমঝোতার ভিত্তিতে। আমরা কিন্তু সেটাতে সায় দিইনি। আমরা সব সময় গণতন্ত্রকেই সামনে রেখেছি এবং সেটার প্রতি কমিটমেন্ট লাস্ট সরকারের ছিল বলেই নির্বাচনটা হয়েছে এবং আমাদের ছিল বলেই আমরা ইভেন নির্বাচনকে, নির্বাচন যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, সেজন্য নিজেরা আগবাড়িয়ে পদত্যাগ করে চলে এসেছি।”

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, “তাদের (ডিপ স্টেট) সার্টেইন কিছু শর্ত ছিল যে, তাদেরকে কিছু কিছু জায়গায় ফ্যাসিলিটেটেড করা এবং তারা পুরা রোডম্যাপও করে নিয়ে আসছিল যে, বিএনপির নেতাদের তো সাজা আছে; তো সাজা থাকলে সাধারণভাবে নির্বাচন দিলেও তারা নির্বাচন করতে পারবে না। তো তাদের সাজাগুলো ইয়ে না করে আদালতের মাধ্যমে এগুলো লেংদি (দীর্ঘায়িত) করে- আপনারা তো জানেন- সেটা কীভাবে করা যায়, আদালতের ডেট ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে। তারেক রহমানের নামেও সাজা ছিল। তিনি যদি সাজাপ্রাপ্ত অবস্থায় থাকতেন, নির্বাচন হলেও তিনি বাংলাদেশের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারতেন না।”

জোটসঙ্গী হিসেবে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজিব ভূঁইয়ার মন্তব্যকে কীভাবে দেখেন, জানতে চাইলে খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “এই বিষয় নিয়ে আমাদের ফোরামে এখন পর্যন্ত কোনো আলোচনা হয়নি। তবে, যদি এমন কিছু হয়ে থাকে, তাহলে তাকে অবশ্যই সবকিছু খোলাসা করে জাতির সামনে বলা উচিত। আর কেউ এই প্রস্তাব দিতে পারে কি না, সেটা একটা প্রশ্ন থাকে।”

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আরেক জোটসঙ্গী জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহ-সভাপতি ও দলীয় মুখপাত্র রাশেদ প্রধান রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “তার এই বক্তব্য এখন দিয়ে কোনো লাভ হয়নি, বরং যখন তাদের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তখন জাতির সামনে এটা প্রকাশ করা উচিত ছিল। এবারের নির্বাচনে এরা (ডিপ স্টেট) প্রভাব রেখেছে। তখন যদি তাদের মুখোশ উন্মোচন করা হতো, তাহলে নির্বাচনে এই খেলা খেলতে পারত না। এটা আমার একান্তই নিজস্ব মতামত, জোটগত কোনো বক্তব্য না।”

এই বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা তাঁর বক্তব্য শুনেছি। এটা নিয়ে আমাদের জোটে আলোচনা হতে পারে। তবে, এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে আমি কোন আলোচনা জানতে পারিনি। রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সময় সবার সচেতন থাকা উচিত।”

এই বিষয়ে জানতে জামায়াতে ইসলামী সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেছেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে আমরা কোনো ডিপ স্টেস্ট তৎপরতা দেখিনি। যেটা আমরা দেখেছি এক-এগারোর সরকারের সময়ে। বরং, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আমার দেখেছি, নিরাপত্তা বাহিনীসহ সবাই হেল্প করেছেন একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য। এখন যদি ব্যক্তিগতভাবে কারো যোগাযোগ থাকে, সেটা অন্য বিষয়।”

আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমানের (মঞ্জু) বলেন, “আসিফ মাহমুদ শুধু সরকারের একজন উপদেষ্টা ছিলেন না, তিনি গণঅভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিলেন। তাই, তার এই মন্তব্য অত‍্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর আগেও ড. ইউনুসকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান করা নিয়ে কী হয়েছিল এবং জাতীয় সরকার করা কেন সম্ভব হয়নি, সে নিয়ে তিনি স্পষ্ট কথা বলেছেন। কেউ তার সেসব কথা বা বক্তব্যকে অস্বীকার করেননি। অভ‍্যুত্থান পরবর্তীতে ছাত্র নেতৃত্বকে নানা দিক থেকে গাইড করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে আমরা শুনেছি। সুতরাং, কোনো শক্তিশালী পক্ষ থেকে এ ধরনের প্রস্তাব আসাটা অমূলক নয় বলে আমি মনে করি।”

ঢাকা/রফিক

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়