ঢাকা     বুধবার   ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ||  মাঘ ২৮ ১৪৩২

Risingbd Online Bangla News Portal

তামিম ইকবাল: যে চরিত্রে সাহস আর আগ্রাসনের উত্থান

আরিফুল হক বিজয় || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৮:৫৯, ৬ জুলাই ২০২৩   আপডেট: ১৯:৫১, ৬ জুলাই ২০২৩
তামিম ইকবাল: যে চরিত্রে সাহস আর আগ্রাসনের উত্থান

চট্টগ্রামের জুবিলী রোডের বিলাসবহুল থ্রি-স্টার আবাসিক হোটেল ‘টাওয়ার ইন’। ঘড়ির কাঁটা বারোটার ঘরে যেতেই সংবাদকর্মীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠলো প্রাঙ্গন। ধীরে ধীরে লোকারণ্যে ভরে উঠলো তৃতীয় তলার হল ঘর। রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা; তামিম কখন আসবেন, কি বলবেন?

তামিম আসলেন। যথারীতি দেড়টায় শুরু হলো বহুল অপেক্ষিত সংবাদ সম্মেলন। শুরুতেই একটা ঝড়ের আভাস টের পাওয়া গেল। ঝড় হলোও, খুবই ছোট্ট। কিন্ত বেদনার সবটা ছুঁয়ে যাওয়া সেই ঝড় যখন থামলো, চট্টগ্রামের আকাশ থেকে তখনো টুপটুপ বৃষ্টিকণা ঝরে পড়ছে।

আরো পড়ুন:

বৃষ্টিস্নাত দিনের অশ্রুজলে ধরে আসা কণ্ঠে তামিমও বলে ফেললেন শেষ কথাটুকু, ‘আমি আমার বাবার স্বপ্ন পূরণের জন্য ক্রিকেট খেলেছি। আমি তাকে ১৬ বছরের ক্যারিয়ারে যতটুকু গর্বিত করতে পেরেছি। তাতে আমি খুশি।’

হ্যাঁ, বাবাকে স্মরণ করেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানালেন বাংলাদেশের অন্যতম সেরা ওপেনার। ইতি টানলেন ১৬ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের। আর কখনো ব্যাট হাতে দেশের হয়ে তাকে বাইশগজে দেখা যাবে না। দেখা যাবে না ডাউন দ্য ট্র্যাকের ছক্কায় সৌন্দর্য্যে।

তামিমের বিদায়ে স্বভাবতই তার পুরো ক্যারিয়ারও চলে আসছে। পোর্ট অব স্পেন থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়াম অবধি ১৬ বছরের পথটা একই সাথে মসৃণ, পিচ্ছিল ও কন্টনাকীর্ণ ছিল। শেষে এসে খানিকটা আক্ষেপও যেন যোগ হলো।

তামিমের শুরুটা ভাবলে বঙ্গদেশীয় ক্রিকেটে ঘুরে-ফিরে চিরচেনা একটা দৃশ্যই ভেসে ওঠে। ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের পোর্ট অব স্পেনে ভারতীয় পেসার জহির খানকে মাত্র ৬ বলেই তুলোধুনো, নাজেহাল করে ফেলা। এক পা এগিয়ে যাওয়া, ব্যাট হাতে তেঁড়ে এসে সপাট সে মার এখনো কোটি চোখের শান্তির খোরাক।

এই শান্তিটা পোর্ট অব স্পেনেরও আগে দেখেছিলো চট্টলার মানুষ। সে সময় খুব হাঁকডাক শুরু হলো, তামিম ইকবাল নামে এক ক্রিকেটার আসছেন। যেনতেন ব্যাটসম্যান নন, নাসিরাবাদ বয়েজের মাঠ থেকে ছক্কা মারলে বল জিইসির মোড়ে এসে পড়ে। কথা তো ভুল ছিল না। তামিমের শটে আছড়ে পড়তো সাগরিকার ঢেউও।

বাংলাদেশ ক্রিকেটে এই যে পাওয়ারহিটিং নিয়ে এখন এতো মাতামাতি। এর শুরুটা করেছিলেন স্বয়ং তামিম। আমাদের ক্রিকেটটকে দুই ভাগে ভাগ করলে দেখা যায় - এক ভাগে তামিম পূর্ববতী যুগ, আরেকভাগে তামিম পরবর্তী আগ্রাসন।

আগ্রাসী ক্রিকেটের সূচনা করলেও শেষটায় তামিম হয়ে পড়লেন খানিকটা খোলসবন্দি। মাঝখানের সময়টা হিসেব করলে তামিমের ক্যারিয়ার চারভাগে ভাগ করা যায় - উত্থান, দোলাচল, পুনরুত্থান এবং বিদায়।

শুরুর তামিম ছিলেন আগ্রাসী। কৈশোরের উদ্দ্যম আর টগটগে ঘোড়ার মতো ছুটতে চাওয়ার দরুণ বাংলাদেশ ক্রিকেটে একটা ছাপ রেখে গেছেন। যেটাকে এখন অবধি আমাদের ক্রিকেটে সাহসিকতার উত্থান হিসেবে ধরা হয়। 

মাঝে পারফর্ম্যান্স কিছুটা নিম্নগামী হলেও ফিরতে সময় নিলেন না দেশসেরা ওপেনার। আর ফেরাটা হলো এশিয়া কাপ দিয়ে। একেবারে রাজার মতো ফেরা যাকে বলে। টানা ৪ ম্যাচে ৪ ফিফটিতে ৬৩.২৫ গড়ে ৮০ স্ট্রাইকরেটে করলেন ২৫৩ রান। দল ফাইনালে হারলেও তামিম ছিলেন স্বমহিমায় উজ্জ্বল।

এরপর থেকে তামিমের ব্যাটে ভর করে দেশের মাটিতে স্মরণীয় সিরিজগুলো নিজেদের করে নিয়েছে টাইগাররা। মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার নেতৃত্বে পাকিস্তান, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে সিরিজ জয়ের পেছনে ব্যাট হাতে নেতৃত্ব দিয়েছেন তামিম। গুরুত্বপূর্ণ এই তিন সিরিজে ৯ ম্যাচে ৩ সেঞ্চুরি ও ১ ফিফটিতে করেছেন ৪৫৬ রান।

এছাড়াও ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে তামিমের ব্যাট ছিল চওড়া। ৪ ম্যাচে ১ সেঞ্চুরি ও ২ ফিফটিতে করেছিলেন ২৯৩ রান। পরিসংখ্যান হিসেব করলে এরকম উল্লেখ করার মতো অনেক পারফর্ম্যান্সই জ্বলজ্বলে হয়ে ধরা দিবে।

তিন ফরম্যাট মিলিয়ে ১৫ হাজারেরও অধিক রান, ২৫টি সেঞ্চুরি, দেশের হয়ে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড। এরকম আরও অনেক প্রথম ও সর্বোচ্চের সঙ্গেই জড়িত নামটি তামিম। বাংলাদেশের হয়ে তিন ফরম্যাটে সেঞ্চুরি করা প্রথম ক্রিকেটারও তিনি।

তবে এসবকিছুই তামিম ছাপিয়ে গেছেন নিদাহাস ট্রফিতে। ব্যান্ডেজ জড়ানো ভাঙ্গা হাতে গ্লাভস পরে বীরদর্পে তার মাঠে নেমে যাওয়ার সেই দৃশ্য এখনো আমাদের ক্রিকেট তো বটেই, বিশ্ব ক্রিকেটেও আইকনিক হয়ে আছে। আরও বহু বছর শুধু এ নিয়েই অনুপ্রেরণার উদাহরণ দেওয়া যাবে।

সৌরভ গাঙ্গুলী ভারতীয়দের কাছে একটা কারণে বেশ জনপ্রিয়। ইংলিশদের দম্ভ চূরমার করে জার্সি খুলে লর্ডসের বেলকনিতে উদ্দ্যম উদযাপনে মেতে উঠেছিলেন বলে। যে কারণে এখনো তিনি সমগ্র ভারতে পূজনীয়। ঠিক লর্ডসেই প্রায় একই রকম কাণ্ড করেছিলেন আরেক বাঙালি তামিম।

বাংলাদেশকে নিয়ে নাক ছিটকানো ইংলিশদেরই ডেরায় গিয়ে বলেকয়ে উড়লেন। হাতের ইশারায় অনার্স বোর্ডে নাম তুলতে বললেন। হ্যাঁ, এখানেও তামিমই প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটার। যে কিনা সাদা পোশাকের শুভ্রতায় উড়িয়েছেন লর্ডসের এক বিকেল। পেয়েছেন অজস্র তালি আর প্রশংসা।

আজ থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তামিম ইকবাল অতীত, দূর নক্ষত্র। কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটে সাহসিকতার ইতিহাস, আগ্রাসনের উত্থান, চোখে চোখ রেখে লড়াই করার মন্ত্র ঠিক যতবার আসবে। ততবার তামিমও ফিরে আসবেন। চট্টগ্রামের কাজীর দেউড়ী থেকেই যে বাংলাদেশ ক্রিকেটে আগ্রাসনের উত্থান...।

ঢাকা/আমিনুল

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়