ঢাকা, শুক্রবার, ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

যত আগ্রহ চা শ্রমিকদের নিয়ে

সাখাওয়াত মিশু : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-১১-২৭ ৬:০০:১৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-১১-২৭ ৮:৫৮:১০ পিএম

দীর্ঘ এক মাসের পরিকল্পনা শেষে আমরা গত ৯ নভেম্বর রাতে ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করলাম মৌলভীবাজার কমলগঞ্জের উদ্দেশ্যে। ইয়ুথ জার্নালিস্ট ফোরাম বাংলাদেশের এই আনন্দ ভ্রমণে ঢাকা থেকে আমরা ১৫ জন অংশ নিয়েছি। বিভিন্ন জেলা থেকে অংশ নিয়েছেন আরো ১০-১২ জন।

রাত ৯টা ৫০মিনিটে রাজধানীর কমলাপুর থেকে উপবন এক্সপ্রেস ছাড়ার কথা থাকলেও ৪০মিনিট বিলম্বে ছাড়ল। দেশের রেলযাত্রীদের জন্য এ যেন প্রতিদিনের বিড়ম্বনা। কৌতুক শুনেছিলাম- প্লাটফর্মে বড় ঘড়ি থাকে কেন? উত্তর হলো, কয়টার ট্রেন কয় ঘণ্টা লেটে ছাড়ে জানার জন্য। এমন বিড়ম্বনায় আমাদেরও পড়তে হবে ভাবিনি। যদিও সঙ্গী অনেকে ছিলেন বিধায় সময় পাড় হয়ে যাচ্ছিল। ঢাকায় শীত এখনও পড়েনি। তবে রাতের ঢাকা ব্যতিক্রম। প্ল্যাটফর্মে হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন ঢুকছে দূর জেলা থেকে। আর তাতেই রাতের নির্জনতা ভেঙে খানখান। ওদিকে আমাদেরও ধৈর্যে আর সইছে না। কখন ছাড়বে ট্রেন কে জানে! অবশেষে রাত ১০টায় ট্রেন দুলে উঠল মৃদু। শোনা গেল হুইসেল। হাফ ছাড়লাম আমরা সবাই।

সারাদিন অফিস করে রাতের ট্রেনজার্নি। ক্লান্তি নেই এতটুকু। ট্রেন ছাড়ার সাথে সাথেই সবাই মেতে উঠল আড্ডায়। আড্ডা আর গল্পে সারাদিনের ক্লান্তি যেন উধাও হয়ে গেল মুহূর্তেই। সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার যাত্রায় কারো চোখেই আর ঘুম এলো না। ১০ নভেম্বর ভোর ৪টা। তখনও রাতের অন্ধকারে ঢাকা চারপাশ। তখন আমরা ভানুগাছ রেলস্টেশনে নেমে পড়ি। প্রায় জনশূন্য স্টেশন। একপাশে ছোট্ট একটি দোকানে চা হচ্ছে। বোঝা যায়, দোকানটি রাতভর খোলাই থাকে। স্টেশন মাস্টারের ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে ঝাপসা আলো। সেই আলোয় হেঁটে স্টেশন পাড় হলাম আমরা। কিন্তু রিকশা নেই। অটোরিকশাও চোখে পড়ছে না। অগত্যা আমাদের ভোরের আলো ফোটার অপেক্ষায় থামতেই হলো।

এর মধ্যে সবাই নিজ নিজ প্রয়োজনীয় কাজ সেরে নিলেন। সাড়ে ৫টা নাগাদ মৌলভীবাজারের স্থানীয় সাংবাদিক সোহেল রানা রেলস্টেশনে এলেন। তাকে আগেই খবর দেয়া ছিল। আমাদের নিয়ে রওনা হলেন লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান স্টুডেন্টস ডরমেটরির উদ্দেশ্যে। যতই পথ চলছিলাম, সবুজে ঘেরা এলাকা দেখে তত মন জুড়িয়ে যাচ্ছিল। মিনিট পনেরো পরেই আমরা পৌঁছে গেলাম ডরমেটরিতে। চারপাশ সবুজে ঘেরা। নরম রোদ সবুজে উপচে পড়ছে। সকালটাই অন্যরকম মনে হতে লাগল। পেছনেই ছোটখাটো একটা লেক। ঘণ্টাদুয়েক বিশ্রাম শেষে ডরমেটরির আশপাশটা ঘুরে দেখলাম আমরা। এর মধ্যেই নাস্তা খাবার পালা এলো। নাস্তা শেষে আমরা প্রস্তুত হলাম মাধবপুর লেকে যাব বলে।

৩০ মিনিটের যাত্রা শেষে আমরা পৌঁছে গেলাম মাধবপুর লেকে। লেকের পাশ ঘিরে বিশাল চা বাগান। সবাই যার যার মতো দলে ভাগ হয়ে গেলেন। চা বাগানে পৌঁছুতেই দেখা গেল, সবার যত আগ্রহ চা শ্রমিকদের ঘিরে। ঘুরেফিরে আশপাশে চোখ বুলিয়ে নিতে নিতে মোবাইলে ছবি তোলাও হচ্ছিল। কিন্তু সবচেয়ে বেশি হচ্ছিল কথোপকথন। এখানে অপরজন হলেন চা শ্রমিকগণ। প্রশ্ন যেন শেষ হতে চায় না। তারাও ছোট ছোট করে উত্তর দিচ্ছিলেন। বলছিলেন জীবন যুদ্ধের কথা।

দিনটি ছিল বৃষ্টিভেজা। আমরা যখন চা বাগানে, তখনও গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। ফলে খুব বেশি শ্রমিক দেখা গেল না। বিরূপ আবহাওয়া তাদের অনুপস্থিতির কারণ বলে কয়েকজন মত দিলেন। এরই মধ্যে আমরা পেয়ে গেলাম স্থানীয় একজনকে। তিনি চা শ্রমিক নন, ওই এলাকার পাহারাদার। নাম রাজকুমার। আদি নিবাস ভারতের উড়িষ্যায়। জন্ম কলকাতায়। তার স্ত্রী অনুপ্রিয়া চা বাগানে কাজ করেন। রাজকুমারের কাছ থেকে আমরা জানার চেষ্টা করেছিলাম চা শ্রমিকদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে। রাজকুমার জানালেন, প্রতি পরিবার থেকে ১ জন চা শ্রমিক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। একজন শ্রমিক যদি একদিনে ২৩ কেজি পাতা তুলতে পারেন, তবে তিনি ১০২ টাকা পারিশ্রমিক পাবেন। অনেকেই একদিন সর্বোচ্চ ১৬-১৭ কেজি পাতা তুলতে পারেন, সেই হিসেবে পারিশ্রমিক পান ৮৫ টাকা। এছাড়াও একজন চা শ্রমিক থাকার জায়গা, চাল, ডাল, ওষুধসহ কিছু নির্দিষ্ট সুযোগ-সুবিধা কোম্পানির কাছ থেকে পান।

চা শ্রমিকরা যে অর্থ পান, তা দিয়ে তাদের চলতে কষ্ট হয় বলে জানালেন রাজকুমার। কথা বলতে বলতেই তিনি কয়েকটি চা পাতা তুলে নিলেন। বললেন, তারা চা পাতাকে খাবার হিসেবেও খেয়ে থাকেন। এতে অলসতা দূর হয়। শরীরের ব্যথা কমে। ঘণ্টাদুয়েক অবস্থান শেষে আমরা মাধবপুর লেক ও লেকসংলগ্ন চা বাগান এলাকা ত্যাগ করি। দিনব্যাপী সফরে আমরা সেদিন লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ও শ্রীমঙ্গল ভ্রমণ করি।

যাবেন যেভাবে : ঢাকা-সিলেট রুটে শ্রীমঙ্গল অথবা কুলাউড়া রেলস্টেশনে নামতে হবে। বাসে গেলে শ্যামলী, রূপসী বাংলা, এনা, সাদ্দাম, রুপালী বাংলা পরিবহনে এসে শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার ও কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা উপজেলায় নামতে পারেন। এরপর সিএনজি, বাস, অটোরিকশায় পর্যটন স্পটগুলোতে যাওয়া যাবে। থাকা-খাওয়ার জন্য শ্রীমঙ্গলে ফাইভ স্টার হোটেল গ্র্যান্ড সুলতান অ্যান্ড গলফ, কুলাউড়া উপজেলায় সিআরপি রেস্ট হাউজ, মৌলভীবাজার সদরের দুসাই রিসোর্ট, গগণঠিলাসহ স্থানীয় সব উপজেলাগুলোতে অর্ধশতাধিক হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে।

সতর্কতা: মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়। এই এলাকায় ভ্রমণে গেলে অবশ্যই যেকোনো সময় নেমে আসা বৃষ্টি মোকাবিলায় সতর্ক থাকতে হবে। ছাতা, রেইনকোট সঙ্গে নিতে ভুলবেন না।

 

ঢাকা/ফিরোজ/তারা

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন