Risingbd Online Bangla News Portal

ঢাকা     শনিবার   ২৭ নভেম্বর ২০২১ ||  অগ্রহায়ণ ১৩ ১৪২৮ ||  ২০ রবিউস সানি ১৪৪৩

শেকড়ে ঢাকা মানুষের ইতিহাস

ফেরদৌস জামান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৯:১৭, ৫ জানুয়ারি ২০২১   আপডেট: ১৯:২৭, ৫ জানুয়ারি ২০২১
শেকড়ে ঢাকা মানুষের ইতিহাস

বিজন দ্বীপের স্বরলিপি: চতুর্থ পর্ব

চারশ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে আঙ্কোর আর্কিওলজিক্যাল পার্কের অবস্থান। এক সময় পরিত্যাক্ত হয়ে গেলে এলাকাটি শত বছরের সুদীর্ঘ পরিক্রমায় ঘন জঙ্গলে আবৃত হয়ে যায়। বর্তমানে সম্পূর্ণ এলাকা একটি বনাঞ্চল। তার মাঝে মন্দির বা স্থাপনা নিদর্শনগুলো অবস্থিত। এর মধ্যে ৭২টি মূল বা গুরুত্বপূর্ণ মন্দির আছে।

যাহোক, আমার এর পরের গন্তব্য বান্তে কেডি। মানচিত্রে যাকে পাঁচ নম্বর স্পট হিসেবে দেখানো হয়েছে। বনের মাঝ দিয়ে কিছুটা পথ এগিয়ে গেলে মন্দিরের দেখা মেলে। প্রথম দর্শনে মনে হলো মাত্র কয়েকটা ঘরের সমন্বয় কিন্তু ভিতরে প্রবেশ করে বুঝতে পারলাম ভাবনাটা ছিল ভুল। লম্বা স্থাপনার মাঝ দিয়ে একরূপ কোরিডের ধরনের পথ। দুই পাশে শুধু ধ্বংসাবশেষ। ছাদবিহীন দেয়ালগুলো দাঁড়িয়ে আছে। অধিকাংশ দেয়াল ভেঙে পড়ার উপক্রম। কাঠ ও ইস্পাত নির্মিত বিভিন্ন ধরনের  কাঠামো দিয়ে ঠেকা দিয়ে রাখা হয়েছে। ওজনদার পাথরগুলো কত দিন এমন করে ঠেকা দিয়ে রাখা কে জানে? মাঝারি মাত্রার একটা ভূমিকম্পেই যে সব কিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে যেতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়।

টিভি বা পত্র-পত্রিকায় কম্বোডিয়ার একটা বহুল প্রচলিত দৃশ্য খুব দেখা যেতো- বৃক্ষের শেকড়ে ঢেকে গেছে পাথর প্রাচীর। যেন সুবিশাল বৃক্ষের আঁকাবাঁকা শেকড় আস্ত প্রাচীরটাকে খেয়ে ফেলেছে। ভ্রমণের প্রস্তুতি স্বরূপ প্রাক অধ্যয়নেও কম্বোডিয়া বলতে ইন্টারনেটে একই দৃশ্যের অবতারণা লক্ষ্য করেছি। সব মিলিয়ে জায়গাটার প্রতি একটা আকর্ষণ জন্মে যায়। আঙ্কোর ওয়াটের একেকটা পড়ত যখন খুলে খুলে দেখছি আর অভিভূত হচ্ছি; তখনও অলক্ষ্যে মন ছুটে গিয়ে যেন ওই প্রাচীর গ্রাস করা বৃক্ষের তলে পড়ে থেকেছে বহুবার। সত্যি সত্যি যখন শেকড়ের পাশে নিজেকে আবিষ্কার করলাম তখন বিশ্বাস হতে চাইল না!

‘টা প্রম’ মন্দিরের অনেক দেয়ালই এমন শেকড়ে আবৃত। অর্থাৎ স্থাপনার প্রায় ৫০ শতাংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত। বাদবাকি যেটুকু টিকে আছে তার অনেক অংশই বৃক্ষদের দখলে। সরল এবং লম্বা বৃক্ষগুলো একেবারে ডগায় গিয়ে ডালপালা ছড়িয়েছে। কি এক অদ্ভুত কারণে একই প্রজাতীর এই বৃক্ষের বেছে বেছে প্রাচীর অথবা স্থাপনার বিভিন্ন ফাঁকফোকরে বেড়ে ওঠা! কোনো শিল্পী যেন নিজ খেয়ালে প্রাচীরের উপরে তাদের সাজিয়ে শেকড় গুচ্ছ নামিয়ে দিয়েছে নিচের ভূমিতে। স্থাপনার ভগ্নাংশগুলোর বেশিরভাগ চার কোণাকৃতির একেকটা পাথর টুকরো। সবুজ শ্যাওলার আবরণে ঢেকে গিয়ে ধারণ করে আরেক সৌন্দর্য।

এখানে দর্শনার্থীর সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। প্রায় শতভাগেরই মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু মনের মতো করে নিজের কয়েকটা ছবি তুলে রাখা। আমার এই সাধ এখন পর্যন্ত অপূর্ণই রয়ে গেল। এর আগের মন্দির অর্থাৎ বান্তে কেডিতে দর্শনার্থী ছিলাম কেবল আমি এবং এক ব্রিটিশ দম্পতি। ভদ্রলোক পেশায় একজন আইনজীবী হওয়ার সুবাদে সহজেই আলাপ জমে ওঠে। এক পর্যায়ে দুই-চারটা ছবি তুলে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলাম। ছবি মনের মতো না হলেও তাদের আন্তরিকতায় আমি মুগ্ধ না হয়ে পারিনি।

একে তো গরম, তার উপর দিয়ে ফুল প্যান্ট এবং ফুলহাতা শার্ট পরে বেরিয়েছি। ফলে শরীর ঘেমে অবস্থা কাহিল! আমার জানা মতে হাফ প্যান্ট পড়ে মন্দিরে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আছে। ঘটনাস্থলে যখন দেখলাম ওই নিষিদ্ধ পোশাকে দিব্বি অনেক দর্শনার্থী ঘুরে বেড়াচ্ছে তখন আর বাধা কিসে? হাঁটুর উপরের জিপার দুটো খুলে সুন্দর মতো প্যান্টটাকে একটা হাফ প্যান্ট বানিয়ে ফেললাম। এবার ফুরফুরে মেজাজে চললাম আমার চতুর্থ গন্তব্যে ‘টা কেও’-এর দিকে। শুরু হল তুমুল বৃষ্টি, সঙ্গে ভ্যাপসা গরম। প্রতিটি মন্দিরের মাঝে গড়ে দুই থেকে তিন কিলোমিটারের ব্যবধান। পেয়ে গেলাম একটা যাত্রী ছাউনি। ছাউনির দুই ধারে জঙ্গলাকীর্ণ টিলা। ঘন ছায়ায় জায়গাটা একটু অন্ধকার!

চলতি পথের গাড়িগুলো হোডলাইট জ্বালিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। এক হিসেবে ভালোই হলো। প্রকৃতি বোধহয় আমার পেটের খবর জেনে গিয়েছিল। সাথে থাকা কিছুটা শুকনা খাবার খেয়ে লাঞ্চটা ভালোভাবেই সেরে নিতে পারলাম। আধাঘণ্টা কেটে গেল যাত্রী ছাউনির নীরবতায়। দুনিয়াটা যেন শীতল হয়ে গেল। টিপটিপ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে এগিয়ে চললাম। টা কেও-এর উচ্চতা কম করে হলেও চল্লিশ মিটার হবে। মজার ব্যাপার হলো এই মন্দিরের শীর্ষ পর্যন্ত আরোহণ করা যায়। প্রথম পর্বে আরোহণের পর চারিধারে সবুজ ঘাসের গালিচার মাঝে মন্দিরের দ্বিতীয় ধাপ। বেঢপ ধরনের সিঁড়ি ভেঙে উপরে আরোহণের পর আবারও বৃষ্টি শুরু হলো। প্রবল বাতাস আর বৃষ্টির ছাট, তার সঙ্গে যুক্ত হলো ঠান্ডা। চার দিকে খোলা ছোট্ট ঘরটার ভিতর নিজেকে লুকানোর কোনো সুযোগ নেই। চোখ যতদূর যায় শুধু সবুজ অরণ্য। কৌতূহলের বিষয় হলো আশপাশে কোনো পাহাড়-পর্বত নেই। অথচ, মন্দির নির্মাণে বড় বড় পাথরগুলো কোথা থেকে বয়ে আনা হয়েছে? বৃষ্টি কমে গেলে উপরে উঠে এলো একদল পর্যটক। তাদের গাইডকে বলতে শোনা গেল, পাথরগুলো বয়ে আনা হয়েছে ৬০-৭০ কিলোমিটার দূর থেকে। বহনের জন্য নিযুক্ত করা হয়েছিল তিন হাজার হাতি।

এখানেই সাক্ষাত হলো দুজন দর্শনার্থীর সাথে এবং শুরু হলো যুগপৎ এগিয়ে চলা। এ পর্যন্ত আমার দেখা তারাই একমাত্র যারা সাইকেল যোগে আঙ্কোর আর্কিওলজিক্যাল পার্ক ভ্রমণ করছে। সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী, উড়ে এসেছে সুদূর ইয়োরোপ থেকে। চিরতরুণ এই দম্পতিকে শারীরিক বার্ধক্য হার মানাতে পারেনি। কথাবার্তা আর চালচলনে সর্বক্ষণ এক উজ্জীবনী শক্তির ছাপ লেগে আছে। সারাটা দিন একা একা ঘুরছি, তাদের সাথে পথ চলার অভিজ্ঞতাটা নিজের কাছে বেশ উপভোগ্য মনে হতে লাগল। নিরিবিলি ফাঁকা পথে পাশাপাশি চলছি সাথে অর্জিত অভিজ্ঞতা থেকে দুই-চারটা কথার ভাগাভাগি। পরবর্তী গন্তব্য ‘আঙ্কোর থম’। এটা মূলত আঙ্কোর সিটি বলে সমধিক পরিচিত। সিটিতে প্রবেশের রয়েছে আলাদা বিশেষ তোরণ। তার আগে পথের দুই পাশে বহু মূর্তি বসানো। যেন দর্শনার্থীদের স্বাগত জানাতে তাদের বিনম্র অবস্থান। অধিকাংশ মূর্তি ভাঙা। দেখে অনুমান করা যায় মূর্তিগুলো বৌদ্ধ ধর্ম সংশ্লিষ্ট। তোরণের উপর তিনটি উঁচু চূড়া। মাঝের চূড়ার পেটে স্থাপিত পাথর খণ্ডগুলোর সমন্বয়ে প্রকাশ পেয়েছে মানব মুখাবয়ব। তার নিচে কাঠের চৌকাঠ দেওয়া প্রবেশদ্বার। কোনো এক সময় হয়তো পাল্লাও ছিল। ছোট্ট টুকটুক থেকে শুরু করে কার, মাইক্রোবাস এমনকি মিনিবাস অনায়াসেই যাতায়াত করতে পারে।

তোরণ ভেদ করে পথ গিয়ে প্রবেশ করলো আঙ্কোর সিটিতে। প্রবেশের পর কিছুটা পথ অতিক্রম করার পর দুই পাশে সবুজ ঘাসের বিস্তির্ণ চত্বর। তার মাঝে নির্দিষ্ট দূরত্বে পাশাপাশি দঁড়িয়ে আছে কয়েকটা মঠ আকৃতির স্থাপনা। অতঃপর শুরু হয়েছে দূর্গ নগরীর মতো প্রশস্ত প্রাচীর। কোথাও কোথাও প্রাচীরের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসেছে লম্বা সুরবিশিষ্ট হাতির মাথা। আবার কোথাও বা উৎকীর্ণ হয়েছে বৌদ্ধ ধর্মীয় বিভিন্ন  প্রতিকৃতি। দুর্গের ভিতর অনতি দূরে একটি ছাউনির নিচে স্থাপিত হয়েছে বুদ্ধের মূর্তি। সহজেই বোঝা যায় তা সাম্প্রতিক কালের। মূর্তিকে ঘিরে মাত্র কয়েকজন মানুষ প্রার্থনারত। সেখান থেকে সোজা গিয়ে উপস্থিত হলাম এক জঙ্গলাকীর্ণ ধংসপ্রাপ্ত স্থাপনার সামনে। মঠ আকৃতির চূড়াটা নিয়ে কোনো মতে কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে। ওদিকে পেট থেকে গজিয়ে উঠেছে তিন তিনটি বৃক্ষ। বৃক্ষের সর্বগ্রাসী শেকড়ে তার অনেকটাই ঢাকা পড়ে গেছে।

পিছনে ফিরে ডানে মোড় নিলে ঢুকে পড়লাম প্রাচীর ঘেরা আরেক স্থাপনার ভিতর। যেন দুর্গ প্রাচীরের ভিতর বিশেষ সুরক্ষিত এলাকা। পাথর দিয়ে পাড় বাঁধানো দুইটি পুকুরের পর ঢিবির মতো একটা স্থাপনা, যার উপরের অংশজুড়ে অনেকগুলো ঘর। তাতে আরোহণের জন্য চার ধার থেকে সিঁড়িও রয়েছে। সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে অনেক আগেই। সুতরাং যা দেখার তা বাকি সময়টুকুর মধ্যেই সেরে নিতে হবে। প্রাচীরে ঘেরা জায়গাটায় আরও বেশ কিছু মন্দির বা স্থাপনা আছে। সময় স্বল্পতার কারণে সবগুলো দেখা সম্ভব হলো না। (চলবে)

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়