ঢাকা     বুধবার   ১৩ মে ২০২৬ ||  বৈশাখ ৩০ ১৪৩৩ || ২৬ জিলকদ ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

ভারত-নেপাল নতুন কূটনীতি

তৈয়বুর রহমান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ০৮:৪৮, ৪ আগস্ট ২০১৪   আপডেট: ০৫:২২, ৩১ আগস্ট ২০২০
ভারত-নেপাল নতুন কূটনীতি

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নেপাল সফরকালে তাকে স্বাগত জানান সে দেশের প্রধানমন্ত্রী সুশিল কৈরালা

তৈয়বুর রহমান : ভারত-নেপাল সীমান্ত পার হতে পাসপোর্ট লাগে না, ভিসার তো প্রশ্নই ওঠে না। দেশ দুটোও দাবি করে, তাদের সম্পর্ক খুবই ভালো।

কিন্তু কতটা ভালো, সে ব্যাপারে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। নইলে ১৭ বছর পর নেপাল সফরে গেলেন কেন ভারতের কোনো প্রধানমন্ত্রী? তাদের দাবি অনুযায়ী সম্পর্ক যদি এতটাই ভালো, তাহলে ভারতের আগের সব প্রধানমন্ত্রীর একবার হলেও নেপাল সফরে যাওয়া বাঞ্ছনীয় কি ছিল না? এই প্রশ্ন তোলা কি অস্বাভাবিক?

আসলে ভারত-নেপাল সম্পর্ক যতটা ভালো মনে করা হয়, মোটেও ততটা ভালো নয়। সম্পর্কে কাঁটা আছে, আর তা বিঁধছে সবসময়, সর্বক্ষণ। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কাঁটা হয়ে আছে পানি সম্পদের ভাগাভাগি।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নেপাল সফরে গেলেন রোববার। ১৭ বছরের মধ্যে এটিই কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর নেপাল সফর। মে মাসে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি তার দ্বিতীয় বিদেশ সফর। এর আগে তিনি ভুটান সফর করেন।

দেশ দুটির মধ্যে অতীতের চুক্তিগুলো নিয়ে বিতর্ক যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে গভীর পারস্পরিক সন্দেহ। এর কবলে বন্দি হয়ে রয়েছে নেপালের নদীগুলো নিয়ে পরিকল্পিত কয়েকটি মেগা প্রজেক্ট। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যায় যে, শুকনো মৌসুমে ভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত গঙ্গার পানির ৭০ শতাংশ আসে নেপালের নদীগুলো থেকে।

একচ্ছত্র আধিপত্য
মোদির সফরকালে পারস্পরিক অবিশ্বাস আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে দেশ দুটির মধ্যে। সম্প্রতি নয়াদিল্লির প্রস্তাবিত একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে দেখা দিয়েছে বিতর্ক, উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে নেপালের রাজনীতিও। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের রাজনীতিকরা এরই মধ্যে প্রশ্ন তুলেছেন, মেগা প্রজেক্টগুলোর প্রস্তাব দেওয়ার মধ্য দিয়ে তাদের পানি সম্পদের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করতে চায় ভারত।

কিন্তু নয়াদিল্লি প্রশ্নটি স্রেফ হেসে উড়িয়ে দিয়েছে। সেই সঙ্গে বলেছে, তাদের প্রস্তাব ইচ্ছে করলে কাঠমান্ডু সংযোজন, বিয়োজন ও সংশোধন করতে পারে। এ কথা মনে করিয়ে দেয়া উচিত যে, ভারতের ছোট ছোট প্রতিবেশি দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে বদ্ধপরিকর মোদি সরকার।

মোদির সফর ফলপ্রসূ করে তোলার জন্য গত সপ্তাহে কাঠমান্ডু সফর করেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। সফরকালে তিনি একটি ইশতেহার সই করেন। এতে কমপক্ষে ছয়টি পানি সম্পদ ও বিদ্যুৎ প্রকল্পের কথা উল্লেখ করা হয়।

নেপালের কিছু রাজনীতিক মনে করেন, ছোট প্রতিবেশি দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক পানি সম্পদের উন্নয়ন ভরতের নতুন পররাষ্ট্র নীতিতে প্রতিফলিত হতে পারে।

‘মনে হয় তারা অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি আর করবে না,’ বললেন ভিম রাওয়াল। মোদির সঙ্গে পানি সম্পদ নিয়ে আলোচনায় কোন কোন বিষয়ে ঐক্য হতে পারে, সে ব্যাপারে নেপাল সরকারকে পরামর্শ দেওয়ার জন্য গঠিত বহুদলীয় টাস্কফোর্সের সদস্যের দায়িত্ব পালন করছেন ভিম রাওয়াল। তিনি বলেন, ‘তারা যে আভাস দিয়েছে, তার আদৌ বাস্তবায়ন ঘটবে কি না, তা দেখার জন্য এখন আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।’

অগ্রাধিকার নিয়ে মতপার্থক্য
রাওয়ালের দল কোয়ালিশন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ শরিক কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনিফায়েড মার্ক্সিস্ট লেনিনিস্ট) মহাকালি নদী চুক্তি নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। এটি সই করা হয় ১৯৯৭ সালে। বিতর্কিত এই চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পানচেশ্বর প্রকল্প। এর আওতায় বিশাল একটি এলাকা সেচের আওতায় আনা ও ৬ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা, যা ভাগাভাগি করে নেবে দেশ দুটি। প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা ছিল আট বছরের মধ্যে। কিন্তু চুক্তি সইয়ের ১৭ বছর পরও প্রকল্পটির বিস্তারিত বিষয়াবলী আজও তৈরি করা হয়নি।
কিন্তু রাওয়াল আশা করছেন, ‘মোদির সফরকালে পানচেশ্বর প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়া শুরু হবে। সেই সঙ্গে অরুণ তৃতীয় প্রকল্পের কাজও (দীর্ঘদিন ধরে এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আছে) শুরু করার প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে। কিন্তু ভারতের সহায়তায় এসব প্রকল্পের নির্মাণ ও ভারতের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি সংক্রান্ত চুক্তি পুরোপুরি ভিন্ন। মূলত বিদ্যুৎ বিক্রির এই বিষয়টি নিয়ে চুক্তি সই হতে পারে।’

এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘কেননা এই মুহূর্তে দুটি বিষয় আপনি গুলিয়ে ফেলতে পারেন। ভারতের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরির নামে নেপাল তার পানি সম্পদ হারাচ্ছে বলে এক ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে। এতে নেপালি জনগণের মধ্যে বিতর্ক দেখা দেবে। দেখা দেবে সন্দেহও। এ কারণেই ভারতের সাম্প্রতিক প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। তাই আমাদের সরকারকে আমরা বিষয়টি পরিস্কার করতে বলেছি।’

বিদ্যুৎ-বাণিজ্য নিয়ে নয়া প্রস্তাব মোদির সফরের আগেই চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, পানি সম্পদ নিয়ে দেশ দুটোর মধ্যে অগ্রাধিকার প্রশ্নে একটি ভারসাম্যে পৌঁছানোই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দেশে ব্যবহার ও রপ্তানির জন্য নেপালের প্রয়োজন জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা।

ভারতীয় কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন যে, তাদের মূল লক্ষ্য বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ। আর নেপাল যদি তাদের বিদ্যুৎ দেয়, তাহলে তা হবে বোনাস।

ভারতেরও রয়েছে ব্যাপক পানি-ঘাটতি। নেচার কনসারভ্যান্সির সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে যে, সারা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পানি সংকট রয়েছে ২০টি শহরে। এর মধ্যে নয়াদিল্লি রয়েছে দ্বিতীয় স্থানে। ভূ-উপগ্রহে দেখা যায়, ভারতে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে আশংকাজনক হারে।

এসব বিষয় বিবেচনা করে বিশ্লেষকরা বলছেন, পানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই ভারতের মূল লক্ষ্য। নেপালের মতো জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজন তাদের নেই।

দেশ দুটোর প্রয়োজন দুই রকম হওয়ায় একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, এখন তাদের ‘গিভ অ্যান্ড টেক’ নীতির আশ্রয় নিতে হবে, যা গত কয়েক বছরে কখনোই ঘটেনি।
কিন্তু এখন কি তা ঘটবে?

এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য সবার নজর এখন প্রধানমন্ত্রী মোদি ও তার নতুন কূটনীতির অঙ্গিকারের প্রতি।

 

 

তথ্যসূত্র : বিভিন্ন ওয়েবসাইট

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৪ আগস্ট ২০১৪/রফিক/শাহনেওয়াজ

রাইজিংবিডি.কম

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়