ঢাকা     রোববার   ০৯ আগস্ট ২০২০ ||  শ্রাবণ ২৫ ১৪২৭ ||  ১৯ জ্বিলহজ্জ ১৪৪১

চীন ভারত উত্তেজনা: যুদ্ধ নাকি রাজনৈতিক কৌশল

|| রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৪:১৭, ২ জুলাই ২০২০  
চীন ভারত উত্তেজনা: যুদ্ধ নাকি রাজনৈতিক কৌশল

ভারত এবং চীনের মধ্যে সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দু সীমান্ত বিরোধ হলেও বর্তমানে আঞ্চলিক রাজনীতি বা ভূ-রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ দক্ষিণ এশিয়ার দেশ না হওয়া সত্ত্বেও চীন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে চায়। এক্ষেত্রে বাণিজ্য একমাত্র হাতিয়ার। ভারতবর্ষ শাসন করার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশরা বাণিজ্যকে মূল হাতিয়ার করেই ঢুকেছিলো। এর পরের দুইশ বছরের ইতিহাস সবারই জানা। বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্বিতীয় অর্থনীতির দেশ চীন বাণিজ্যিক দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় যতটা প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে, রাজনৈতিকভাবে ততটা পারেনি।

বস্তুত বর্তমান পৃথিবীতে অর্থনীতি শিক্ষা সংস্কৃতি ও উন্নয়নে দক্ষিণ এশিয়া গুরুত্বপূর্ণ। যে কারণে একবার দক্ষিণ এশিয়া হাতের মুঠোয় চলে এলে, এশিয়া মহাদেশ অতঃপর বিশ্ব শাসন করতে চীনের জন্য অনেকাংশে সহজ হয়ে যাবে। যার ঈঙ্গিত পাওয়া যায় কমিউনিস্ট পার্টির বহিষ্কৃত বিপ্লবী নেতার যোগ্য ছেলে ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর মুখে। তার একটাই কথা- চীনকে অবশ্যই পৃথিবীর ‘প্রাপ্য জায়গা’ নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য শত্রুর বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে যেতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না চীন।

শি জিনপিং কমিউনিস্ট পার্টির মূল নেতার স্বীকৃতি পেয়েছে। এর আগে এই স্বীকৃতি পেয়েছিলো কেবল তিন জন। আধুনিক চীনের স্থপতি ও দলের সাবেক চেয়ারম্যান মাও সেতুং, দেং জিয়াওপিং এবং জিয়াং জেমিন। শুধু কি তাই? ২০১২ সালে কমিউনিস্ট পার্টি থেকেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন শি জিনপিং। প্রশ্ন উঠতে পারে, চীন তার অভীষ্ট লক্ষ্য পূরণে কতটা মরিয়া? এজন্য কি একনায়কতন্ত্র কায়েম করেছে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শি জিনপিং? সংবিধান পরিবর্তন করে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রেসিডেন্ট থাকার পথ সুগম করেছে? অথচ ১৯৮২ সালে জিয়াওপিং একনায়কতন্ত্রের ছোবল থেকে দেশকে বাঁচাতে নিয়ম করেন যে, একজন দুই বারের বেশি প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। ২০১৮ সালে সেই নিয়ম বদলে যায়। একজন প্রেসিডেন্ট দুইবার নয়, বরং বহুবার নির্বাচিত হতে পারবে।

লক্ষ্য পূরণে নিজ দেশের সংবিধান না হয় পরিবর্তন করা গেলো কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার বেলা? এখানে একমাত্র বাধা ভারত। তাই ভারতকে কোণঠাসা করতে চীন কৌশলগত পথ অবলম্বন করছে। অন্যদিকে ভারতও চায় দক্ষিণ এশিয়ার বড় ভাই হয়ে আজীবন থাকতে। কিন্তু যে নক্ষত্র আজ আকাশের বিশাল জায়গাজুড়ে আছে, তাকেও একদিন ঝরে যেত হয়। বড় ভাইয়ের জায়গা এখন অনেকটাই নড়বড়ে। বর্তমান রক্ষণশীল সরকার ভারতের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীল ও বৈপরীত্য রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান গোছাতে গিয়ে আঞ্চলিক ও ভূ-রাজনীতি থেকে পিছিয়ে পড়েছে। ফলে সেই সুযোগটি লুফে নিয়ে কাজে লাগাচ্ছে চীন। দক্ষিণ এশিয়ায় বাণিজ্য দিয়ে শুরু করে চীন এখন কৌশলগতভাবে সামরিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।

এর পেছনে অন্যতম কারণ, ভারতকে চাপে রাখতে পারলে দক্ষিণ এশিয়ার বাকি দেশগুলো চীনকে সমীহ করবে। এবং খেয়াল করলে দেখা যায়, বাস্তবে কিন্তু তাই হচ্ছে। এই অঞ্চলের প্রতিটি দেশই বিশ্বাস করে, তারা নিজেরা কতটা স্বাতন্ত্র তা নির্ভর করে চীন-ভারত সম্পর্কের উপর। মালদ্বীপ, ভূটান, নেপাল একের পর এক রাষ্ট্র ভারতের ভূ-রাজনীতির বলয় থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি ভারতের সাথে বিতর্কিত ভূ-খণ্ড লিমপিয়াধুরা, কালাপানি আর লিপুলেখকে নিজেদের মানচিত্রে অন্তর্ভূক্ত করেছে নেপাল। ফলে উপেক্ষিত হয়েছে ১৯৫০ সালের ইন্দো-নেপা শান্তি ও মৈত্রী চুক্তি। ভারতকে নেপাল লেশমাত্র গুরুত্ব দিচ্ছে না। নেপালের মতে, নতুন মানচিত্রের ভিত্তি হচ্ছে ১৮১৬ সালের সুগাউলি চুক্তি। ভারত তাদের সেই দাবি নাকচ করলেও নেপাল তাদের সিদ্ধান্তে অটল। মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কার সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক যাচ্ছে না ভারতের।

অন্যদিকে চীন আত্মবিশ্বাসী। সামরিক শক্তিতেও এগিয়ে তারা। যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার ঠিক পরে, অর্থাৎ তিন ও চার নাম্বারে আছে যথাক্রমে চীন এবং ভারত। সম্প্রতি আকসাই চীনের কাছে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় চীন ও ভারত সংঘর্ষে ভারতের কর্নেলসহ প্রায় দুই ডজন সেনা মারা যায়। গত পাঁচ দশকে দেশ দুটির মধ্যে এটাই সীমান্ত সংঘাতে বড় প্রাণহানির ঘটনা। ১৯৯৬ সালে চীন ও ভারতের মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী প্রকৃত সীমান্ত রেখার দুই কিলোমিটারের মধ্যে কোনো পক্ষই গোলাগুলি বা কোনো প্রকার বিস্ফোরক ব্যবহার করেনি। এখন প্রশ্ন হলো, কোনো অস্ত্র বা বিস্ফোরক ব্যতীত চীন ভারতের এতগুলো সেনা মেরে ফেলল কীভাবে? দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো মধ্যে একটা চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে এই ঘটনা। সীমান্তে দুই দেশের শক্তি পরীক্ষা মূলত দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্যই। মনে রাখতে হবে,  রাজনৈতিক কৌশল এবং যুদ্ধ এক নয়। রাজনৈতিক কৌশলকে হাতিয়ার করে দুই দেশই সীমান্ত সংঘর্ষ ও তাদের মধ্যেকার উত্তেজনা বজায় রাখবে। নিজেদের শক্তি ও সামর্থ প্রদর্শন করবে। চীন যুদ্ধে যাবে না। কারণ দুটি: এক চীনের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক মার্কেট জনবহুল ভারতে। মহামারির কবলে পড়ে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে চীন কোনভাবেই এই মার্কেট হারাতে চাইবে না। দুই, চীনের শত্রু রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ভালো। আন্তর্জাতিকভাবে চীনের সেই অর্থে কোনো বন্ধু দেশ নেই। তাদের একটি বন্ধু দেশ পাকিস্তান। রাশিয়া চীনের নব্য বন্ধু, ভারতের পুরনো। তাই যুদ্ধ বাঁধলে রাশিয়া কোন পক্ষ নেবে বলা মুশকিল। চীনের সঙ্গে জাপান, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোর সম্পর্ক ভালো নয়।

তাছাড়া ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা ও সম্পর্ক গত কয়েক দশকে অনেক দৃঢ় হয়েছে। এরই মধ্যে বিরোধপূর্ণ দক্ষিণ চীন সাগরে নৌ-মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিপাইনের সঙ্গে সম্মিলিত নৌ-মহড়ায় অংশ নেয় ভারত। ভারত বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বেশ কয়েকটি সামরিক জোটে অংশগ্রহণ করেছে। চীন যদি যুদ্ধে যায় তবে এই অঞ্চলে ইন্দো-মার্কিন জোট তৈরি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যেই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পে বলেছেন, চীনের যুদ্ধাংদেহী মনোভাবের কারণে জার্মানি ও ইউরোপ থেকে সেনা কমিয়ে এশিয়ায় মোতায়েন করার চিন্তা করছে মার্কিন সরকার। অতএব চীন ভারত-যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপারে আরও সতর্কতা অবলম্বন করছে।

অন্যদিক ভারতও যুদ্ধে যাবে না। চীনের সঙ্গে যুদ্ধ করা মানে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া। বিশ্ব রাজনীতির বিশাল পরিবর্তন ঘটেছে, অর্থনীতি এখন বিশ্ব রাজনীতির প্রধান চালিকা শক্তি। উল্টো নিহত সেনাদের কথা বলে ভারত চাইছে বিশ্বের কাছে চীনের আগ্রাসী মনোভাবের কথা তুলে ধরতে। যুদ্ধে না যাওয়ার আরো একটি কারণ হলো, সামরিক দিক থেকে চীনের চেয়ে ভারত বহু গুণে পিছিয়ে। এই করোনা মহামারির সময় ভারতের মিত্র রাষ্ট্রগুলো ভাইরাস সামলাতে ব্যস্ত। তারা কতটুকু সাহায্য করতে পারবে বলা যাচ্ছে না। চীনেরও কিন্তু একই অবস্থা। সুতরাং যুদ্ধ হবে না এটা বলা যায়। তবে তারা পরস্পরকে চাপে রাখবে এটা নিশ্চিত।  


ঢাকা/তারা

রাইজিংবিডি.কম

সম্পর্কিত বিষয়:

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়