ঢাকা, শনিবার, ২ পৌষ ১৪২৪, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

ইংরেজি সাহিত্যের ঔপন্যাসিক কাজুও ইশিগুরো || অভিজিৎ মুখার্জি

অভিজিৎ মুখার্জী : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১০-০৮ ২:১৬:২২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১১-২৪ ৫:০৯:২১ পিএম
কাজুও ইশিগুরো

১৯৫৪ সালে জন্মে, বছর পাঁচেক বয়সে চলে এসেছিলেন মা-বাবার সঙ্গে বিলেত, সেই থেকে সেখানেই আছেন, তাই লেখেন ইংরেজিতে। ‘নতুন ডায়স্পোরা’র বহু ভারতীয়ও ইংরেজিতে লেখেন। তাঁদের একজন হলেন, সালমান রুশদি। রুশদি এক জায়গায় বললেন:
Our identity is at once plural and partial. Sometimes we feel that we straddle two cultures; at other times, that we fall between two stools… If literature is in part the business of finding new angles at which to enter reality, then once again our distance, our long geographical perspective, may provide us with such angles.

কথাটা কাজুও ইশিগুরোর ক্ষেত্রে ঠিক কতখানি এবং কীভাবে প্রাসঙ্গিক সেটা আমরা ক্রমেই বুঝতে পারব, তবে বিলেতের সাহিত্যজগতে রুশদির এই দৃষ্টিভঙ্গির কিছুটা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হওয়ায়, ‘ইন্টারন্যাশনাল রাইটারস’ গোত্রের একদল লেখকের আবির্ভাব হলো সেই দেশে। ইশিগুরো বলছেন:
Part of the reason that I was able to make my career as a novelist very rapidly in Britain in the 1980s was because there was – just at the time when I started to write—a great hunger for this kind of new internationalism… publishers in London and literary critics and journalists in London suddenly wanted to discover a new generation of writers who would be quite different from your typical older generation of English writers…And I think I was almost kind of allowed onto the literary scene because I seemed to be an international writer.

তবে, সময় থাকতে উল্লেখ করে রাখছি, ইশিগুরোর ‘হোয়েন উই ওয়্যার অরফ্যানস’ উপন্যাসে এক পুলিশ ইন্সপেকটার, জঘন্য এক অপরাধ সংক্রান্ত তদন্তের সূত্রে বলছেন:
The Heart of the serpent. I’d go to it. Why waste precious time wrestling with its many heads? I’d go this day to where the heart of the serpent lies and slay the thing once and for all…

এটিই হলো কাজুও ইশিগুরোর সাহিত্যসৃষ্টির মূল চরিত্র। সরীসৃপের একেবারে হৃদয়টিতে পৌঁছে, সেখানে আঘাত হানা।
যে কথাটা ইশিগুরো, ও ইংরেজিতে লেখেন এমন ভারতীয়দের উভয়ের পক্ষেই খাটে, সেটা হলো, ইতিহাস চেতনায়, সংস্কৃতির অন্যান্য বিচারে পাশ্চাত্যের প্রাধান্যের বিরুদ্ধে একটা লড়াই, কখনো অন্তর্ঘাত। রুশদির নিজেরই একটা বিখ্যাত প্রবন্ধের নাম, ‘The Empire writes back with a vengeance’, লড়াইয়ের সুরটা সেখানে স্পষ্ট। পরবর্তীকালে বিল অ্যাশক্রফট ও সহযোগীরা একটা বই লেখেন, ‘The Empire writes back’। এতে ওঁরা লিখছেন:
A characteristic of dominated literatures is an inevitable tendency towards subversion, and a study of the subversive strategies employed by post-colonial writers would reveal both the configuration of domination and the imaginative and creative responses to this condition.

জাপানের রাজনৈতিক ইতিহাস ভারতের থেকে অনেকটাই পৃথক। পাশ্চাত্যের উপনিবেশ হয়ে সে অর্থে জাপানকে কাটাতে হয়নি খুব একটা (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে বছর ছ’য়েক বাদ দিলে)। কিন্তু আজ বিশ্বায়নের নামে যে নব্য-সাম্রাজ্যবাদের ভয়াল মেঘ জমেছে তৃতীয় বিশ্বের ভাগ্যাকাশে তার খুব কাছাকাছি একটা অভিজ্ঞতা জাপানের হয়েছে ১৮৬৮ নাগাদ ‘মেইজি’ যুগের শুরু থেকেই। পাশ্চাত্যের বাণিজ্যিক স্বার্থের কাছে আত্মসমর্পণ করে জাপানে যখন প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে বড়োসড়ো পরিবর্তন আনা হয়, তখন থেকেই জাপানের জাতীয় ঐতিহ্য ও সামাজিক সংস্কৃতির ওপর গভীর প্রভাব পড়তে থাকে- যার পরিণতিতে অতি শোকাবহ এক বিপর্যয়ের আশঙ্কা- যা প্রায় জাপানি গদ্য সাহিত্যের যে ‘ক্যানন’, তার প্রতিটি লেখকেরই উপজীব্য বিষয় হয়ে ওঠে। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়, জুনইচিরো তানিজাকির ‘সাসামেয়ুকি’, কাওয়াবাতা ইয়াসুনারির ‘মেইজিন’ ও ‘সেমবাজুরু’, মিশিমা ইউকিও-র টেট্রালজি ‘হো জো নো উমি’ ইত্যাদি। স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে যে একটা ‘শিফট’, অর্থাৎ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের দখলটা যে চলে যাচ্ছে পাশ্চাত্যের হাতে এর বিরুদ্ধে একটা প্রতিরোধ তৈরি করতে চাইছিলেন এই জাপানি লেখকেরা এবং সেখানেই তাদের সঙ্গে ঔপনিবেশিকোত্তর ভারতীয় লেখকদের, যাঁরা ইংরেজিতে লেখেন, তাঁদের খানিকটা মিল। এই মুহূর্তে এই দ্বিতীয় গোত্রের লেখকদের সঙ্গে ইশিগুরোর যাত্রা অনেকটাই যেন সমান্তরাল, তবে উনি কিন্তু সেই ভূমিকায় একা। ইংরেজিতে আর কোরো জাপানি ঔপন্যাসিক গুরুত্বপূর্ণ কিছু লিখে নজরে পড়েননি। পূর্ববর্তী জাপানি লেখকদের সঙ্গে ইশিগুরোর একটা ফারাক হচ্ছে, প্রথমোক্তদের উৎকন্ঠা যেখানে সভ্যতার ইতিহাসের ধারাবাহিকতা নিয়ে, সেখানে ইশিগুরোর লেখার একটা দিক হলো ইতিহাসের নির্ভরযোগ্যতার অভাব নিয়ে। আসল কথা, পৃথিবীর ইতিহাস তো মোটেই এই ইন্টারন্যাশনাল বা আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা হয়নি, ওটি পেশ করা হয় একান্তই পাশ্চাত্যের গৌরবগাথার উপযোগী করে নিয়ে। তাই ইশিগুরোর সব উপন্যাসেই ইতিহাসের, স্মৃতির নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহজ্ঞাপক বাক্যের ছড়াছড়ি। কোথাও আমরা পাচ্ছি:
Memory can be an unreliable thing.

কোথাওবা,

As I say, I am sure these impressions are not accurate, but that is how the evening remains in my mind.

অথবা,

Even to-night, when I sat down here and tried to gather in some sort of order these things I still remember, I have been struck anew by how hazy so much has grown.

এমনকি,

It is possible this is a case of hindsight coloring my memory.

জাপানি গদ্য সাহিত্যের অন্য প্রবীণ-পুরুষদের লেখাতেও একই সাবধানবাণী অভিব্যক্তি পেতে দেখেছি। মিশিমার প্রধান চরিত্র ভয় পায় যে যখন ইতিহাস লেখা হবে, তখন তার মতো তরুণের চিন্তাধারার কোনো সূত্রই তা থেকে আর পাওয়া যাবে না। বেশি পিছিয়ে যেতে হবে না, ঠিক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেই জাপানের সামাজিক পরিস্থিতি কী দাঁড়াল আমরা কি স্পষ্ট করে তা জানতে পেরেছি কোনো সূত্রে? বিধ্বস্ত, চূর্ণ একটা দেশে সামাজিক ফাটলগুলোর চেহারা কী দাঁড়াল- আর কিছু না হোক, শুধু এটুকুই মর্মস্পর্শী করে আমাদের জানিয়ে দেওয়ার জন্যও ইশিগুরো যথেষ্ট ধন্যবাদার্হ। মিশিমার ‘তেন্‌নিন গোসুই’ উপন্যাসেই আমরা টের পেয়েছিলাম একটা অসম্মানের সংস্কৃতির জন্ম নেওয়ার কথা। সেটা আরও স্পষ্টত রাজনৈতিক হলো ইশিগুরোর উপন্যাসে এসে। সামাজিক পারিবারিক সম্পর্ক যে বন্ধন ও প্রথাকে সেযাবৎ অবলম্বন করে টিঁকে ছিল, সেগুলোর যেন বিলোপ করার একটা জোয়ার এসে আছড়ে পড়ল যুদ্ধে হারের ফলে, সেই মানসিক আঘাতের প্রতিক্রিয়ায়। জাপানে বসেই জাপানিরা তখন যেন পরস্পর সম্পর্কহীন। যেন পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অনুকরণে তৈরি হওয়া একটা নতুন পর্যায় শুরু হতে চলেছে তার ইতিহাসে। বেঁচে থাকার মূল আকর্ষণ, ভিত্তি, সবই সেখানে আর্থিক বা পেশাগত সাফল্যটুকুমাত্র।

A Pale View of Hills (1982) উপন্যাসে এরকমই সমাজে দুই নারী এৎসুকো আর সাচিকোর গল্প দিয়ে কাহিনি শুরু হচ্ছে। সাচিকোর আপন বলতে শুধু তার ছোট মেয়ে মারিকো। সাচিকো আর জাপান নিয়ে কোনো স্বপ্ন দেখে না। সে চলে যাবে অ্যামেরিকায়। বলে:
Mariko would be happier there. America is a far better place for a young girl to grow up. Out there, she could do all kinds of things with her life. She could become a business girl. Or she could study painting at college and become an artist. All these things are much easier in America, Etsuko. Japan is no place for a girl. What can she look forward to there?

দুঃস্বপ্নের মতো একটি তরুণীর স্মৃতি/ছবি বারবারই সাচিকো আর মারিকোর বিভ্রান্ত মানসপটে ফিরে ফিরে ফুটে উঠত। ওরা দেখেছিল, তরুণীটি তার শিশুকে জলে ডুবিয়ে মারছে। অ্যামেরিকায় যাওয়ার আগে মারিকোর প্রিয় বেড়ালের বাচ্চাকে জলে ডুবিয়ে মারতে গিয়ে সান্ত্বনাহীন মারিকোকে সাচিকো যা বলে, সেটাই শেষ বিচারে, এক হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীর কথা ভেবে এই উপন্যাসের দীর্ঘনিঃশ্বাস:
“Can’t you think of anything else?” She said, lowering her voice almost to a whisper. “Aren’t you old enough yet to see there are other things besides these filthy little animals? You’ll just have to grow up a little. You simply can’t have these sentimental attachments forever. These are just… just animals don’t you see? Don’t you understand that, child?

পুরনো সেন্টিমেন্টাল জগত একটু কেবল জায়গা পায় কাহিনির এককোণে এৎসুকোর শ্বশুর ওগাতা, আর যুদ্ধে আত্মীয়-পরিজন হারিয়ে, সহায়-সম্বল খুইয়ে নিঃস্ব, বর্তমানে শস্তার সরাইখানার মালকিন, একদা সম্ভ্রান্ত গৃহবধূ মিসেস ফুজিওয়ারার পারস্পরিক ব্যবহারের মধ্যে। সারাজীবন নিষ্ঠা ভরে শিক্ষকতা করেছেন ওগাতা। অথচ তাঁরই ছাত্র, কম্যুনিস্ট হয়ে যাওয়া শিগেও মাৎসুদা এক কাগজে লিখে বসে তাঁর সম্পর্কে অহেতুক অসম্মানজনক নানা উক্তি। নিদারুণ আহত হন শিষ্টস্বভাব, শান্ত মানুষ ওগাতা। তারপর আবার আঘাত আসে নিজেরই ছেলে, একটু নির্বোধ, অফিস-সর্বস্ব জিরো’র কাছ থেকে। ওগাতা বিনা অভিযোগে নিজেকে সরিয়ে নেন দূরে, চূড়ান্ত একাকিত্বের জীবনে।
এৎসুকোকেও অগত্যা পা বাড়াতে হয় এহেন জাপান, জাপানি সমাজ ছেড়ে নতুন সম্পর্কের দিকে। মেয়ে কেইকোকে নিয়ে সে চলে আসে বিলেত। ইয়োরোপিয়ান দ্বিতীয় স্বামীর সংসারে জন্ম নেয় ছোটমেয়ে নিকি। সমস্ত অন্যান্য সম্পর্ক খুইয়ে বিলেতে নতুন পরিবেশে এসে কেইকো’র জীবন তাকে কোনো স্বপ্ন দিতে পারে না। সে আত্মহত্যা করে।
Keiko unlike Niki, was pure Japanese, and more than one newspaper was quick to pick up on the fact. The English are fond of their idea that our race has an instinct for suicide, as if further explanations are unnecessary; for that was all they reported, that she was Japanese and that she had hung herself in her room.

ইতিহাস! আমরাও জানি, এযাবৎ এভাবেই লেখা হয়ে এসেছে ইতিহাস।

নিকি সেদিক থেকে অনেক বেশি আন্তর্জাতিক! ছুটির শেষে মা’কে ছেড়ে বয়ফ্রেণ্ডের কাছে ফিরে যাওয়ার সময় স্যুটকেস গোছাতে গোছাতে বলে:

“So many women just get brainwashed. They think all there is to life is getting married and having a load of kids.” 

… continued to watch her. Then I said,  “But in the end, Niki, there isn’t very much else.”

… The lid of her suitcase would not shut. She pushed down at it impatiently… “God knows why brought so much,” she muttered to herself.

নোবেল জয়ের পর লন্ডনে নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি কাজুও ইশিগুরো


আত্মকেন্দ্রিকতা আর বহুপণ্যভোগ হয়ে উঠেছে বিচ্যুত জীবনের একমাত্র অর্থ, ওগুলোই ছাপিয়ে উঠছে জীবনের পরিসর, সেটা যেমন বোঝা যায়, তার সঙ্গে এ-ও বোঝা যায় যে এই প্রবণতাই ক্রমে ধারাবাহিকতাকে অপ্রয়োজনীয় ‘ব্যাগেজ’ বলে মনে করে। পশ্চিমী ধাঁচের বাইরে গিয়ে সমাজের একটা নির্দিষ্ট চরিত্র মানেই যেন একটা ফালতু বোঝা, অকারণ বহন করতে হয়।

এই যে সংস্কৃতি তার স্বস্থানে থাকতে পারছে না তথাকথিত ইন্টারন্যাশনাইজেশনের ফলে, আদতে পশ্চিমের আধিপত্যে, কবি  W.B. Yeats–এর বয়ানে Things fall apart, the centre cannot hold, এই নিয়েই ইশিগুরোর উপন্যাস  An Artist of the Floating World (1986)। অদ্ভুত স্ববিরোধ-আক্রান্ত জাপানের ছবি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কিছু আগের ও পরের দিনগুলোতে। পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদও যুদ্ধে হারের পর থেকে কীভাবে কাবু করে ফেলছিল জাপানি সমাজকেও, সে বিষয়ে বাস্তব ছবিটা পাওয়া যায় এই বইয়ে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র মাসুজি ওনো একজন অতি উঁচুদরের চিত্রকর। যুদ্ধের অব্যবহিত আগে তাঁর জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক বিশ্বাস গভীর ছাপ ফেলেছিল তাঁর আশেপাশের অনেকের ওপরেই। কিন্তু যুদ্ধে হারের পরে প্রতিক্রিয়া হলো ভিন্ন। সুসংহত প্রচার ও বিভ্রান্ত ক্ষোভ তৈরি করল এক পারস্পরিক অসম্মানের ও পাশ্চাত্য তোষণের সামাজিক পরিমণ্ডল। বিয়ের কথাবার্তা অনেকদূর এগোনোর পর ওনোর মেয়ে নোরিকোকে বিয়ে করা থেকে পিছিয়ে আসে মিয়াকে নামে এক তরুণ। সম্ভবত ওনোকে অভিযুক্ত করেই তার মুখে শোনা যায়: “কিছুলোক দেশটাকে সম্পূর্ণ বিপথে চালিত করেছিল... এরচেয়ে কাপুরুষতা আর হয় নাকি?” ওনো ভাবেন, ‘এরচেয়ে কাপুরুষতা আর হয় নাকি’- এ তো একেবারে তাঁর জামাই সুইচির কথা! সুইচি মাঝেমাঝেই বলে, “এই যে কেন্‌জিকে যারা যুদ্ধে পাঠাল মরতে, তারা এখন কোথায়? দিব্যি বেঁচেবর্তে আছে নিজেরা... এরচেয়ে কাপুরুষতা আর হয় নাকি?” সুইচি রাগত হয়ে একটা পরিবর্তিত জাপান, প্রাগ্রসর জাপানের কথা বলে, যেখানে অ্যামেরিকার অনুকরণই বরং শ্রেয় (পাঠকের অবশ্য মনে হতে পারে: এরচেয়ে কাপুরুষতা আর হয় নাকি!)। ওনোর আরেক জামাই ‘তারো’ বলে: হয়তো একটু তাড়াহুড়ো হচ্ছে কখনো কখনো, তবে বেশিরভাগ ব্যাপারেই অ্যামেরিকানদের থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। এই তো, এ ক’বছরেই জাপানিরা গণতন্ত্র, ব্যক্তিস্বাধীনতা এইসব বিষয়ের গুরুত্ব অনেকটা বুঝতে পেরেছে। এর ওপর ভিত্তি করেই একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে এগোনো যাবে।

নোরিকো ও তারো’র বিয়ের আগে দুপক্ষের মধ্যে আলাপ হওয়ার দিন তারো’র পরিবার শপাঁ, বাখ, কনচের্তো, পিয়ানো, এইসব নানা পাশ্চাত্য সংস্কৃতির বিষয় উত্থাপন করে একধরনের প্রাধান্য ও দাপট তৈরির চেষ্টা করছিল।
একটা দেশের শেকড়টিকে অটুট রেখে ধীরে বিবর্তনকেই ওনো কাম্য মনে করেন, চটজলদি একটা সম্পূর্ণ বিপ্লবের শেকড়হীনতা ওঁকে আশঙ্কান্বিত করে। রেস্তোরাঁয় নিজের নাতির মুখের দিকে চেয়ে ওঁর মনে হয়:
I confess I take a strange comfort from observing children inherit these resemblances from other members of the family, and it is my hope that my grandson will retain them into his adult years.
Of course, it is not only when we are children that we are open to these small inheritances; a teacher or mentor whom one admires greatly in early adulthood will leave his mark, and indeed, long after one has come to re-evaluate, perhaps even reject; the bulk of that man’s teachings, certain traits will tend to survive, like some shadow of that influence, to remain with one throughout one’s life.

অথচ সময় তখন এগিয়ে চলেছে বড় অদ্ভুত ভাবে! নাতি ইচিরোকে খেলতে খেলতে বিচিত্র আওয়াজ করতে দেখে ওনো জানতে চান সে কি কোনো সামুরাই যোদ্ধা সেজেছে, কিংবা শোগুন য়োশিৎসুনে? ওঁকে জানানো হয় যে ইচিরো সেজেছে  Lone Ranger, কাউবয়, আর বলার চেষ্টা করছে ইংরেজি। ওনো আশ্চর্য হয়ে ভাবেন, তাঁর নাতি তাহলে কাউবয় সাজল! মেয়ে সেৎসুকোওঁকে জানায় যে জামাই সুইচি মনে করে, কোনো জাপানি বীর সাজার চেয়ে অ্যামেরিকান কাউবয় সাজা নাকি ঢের ভালো।

চারিদিকে নানা স্ববিরোধের ঢল নামে। সুইচি চায় যে প্রথামাফিক তার স্ত্রী সেৎসুকো স্বামীর মত-ই মেনে চলুক। অথচ তাহলে নিজেরই বাবার প্রতি অসম্মান দেখানোর মতো প্রথাবিরোধী কাজেই বা প্ররোচনা দেয় কেন?
মনোরম, দৃষ্টিশোভন কাসুগা পার্ক হোটেলের ঘরগুলোকে মালিক হঠাৎই কুৎসিত, শস্তা চটকদার করে সাজাতে শুরু করে। তার অ্যামেরিকান খদ্দেররা নাকি অমন হলে তবেই  charmingly Japanese বলে মনে করে।
নিজের ছবি আঁকার জীবনের দিকে ফিরেও ওনো দেখেন সেই জীবনকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনাবলী স্ববিরোধিতায় একেবারে পূর্ণ। প্রথাগত আর সৃষ্টিশীল, বাস্তব আর কৃত্রিম, অদ্ভুতভাবে ক্রমান্বয়ে পরস্পর জায়গা বদলের এক চক্র অনুসরণ করতে করতে গেছে তাঁরই অভিজ্ঞতার সূত্রে।

চক্রবৎ উভমুখী দোলায়চলমানতা এক তুলনারহিত শৈল্পিক সূক্ষ্মতা নিয়ে অভিব্যক্তি পেল পরবর্তী উপন্যাস ‘রিমেইনস অব দ্য ডে’-তে! কিন্তু তার আগে বলে নিই, ইন্টারন্যাশনাল রাইটার গোত্রের লেখক হিসেবে যে তাকে প্রবেশাধিকার দেওয়া হলো ইংরিজি সাহিত্যে, এই নিয়ে লিণ্ডা রিচার্ডসকে এক সাক্ষাৎকারে, একটু রহস্য করে, তিনি কী বলেছিলেন।
I think I kind of unnecessarily put myself in the position of being a kind of international, if you like, quote-unquote writer. That’s how I kind of branded myself right from the start: as somebody who didn’t know Japan deeply, writing in English, whole books with only Japanese characters in. Trying to be part of the English literary scene like that…
I kind of thought that was the role I was supposed to play. That’s why I was there. And so I think for that reason I perhaps am very conscious of the whole international thing.

অথচ ইশিগুরোর পরিকল্পনাটা তো তা নয়, সরীসৃপের একেবারে হৃৎপিণ্ডে গিয়ে আঘাত হানা- বিল অ্যাশক্রফটদের বয়ানে সাবভার্শান, অন্তর্ঘাত। অন্তর্ঘাতের উপায় হিসেবে বেছে নিলেন এবার খোদ বিলেতের নিজের সাংস্কৃতিক তথা সামাজিক ইতিহাসের পটভূমিতে এক বাটলারের জীবনকে উপন্যাসের মাধ্যমে পাঠকের সামনে মেলে ধরা। এই উপন্যাসের ন্যারেটিভের যে চরিত্র, তার সমতুল কিছু কি আমরা অন্যত্র দেখেছি? অ্যামবিভ্যালেন্স, পরস্পর বিপরীত দুটো মূল্যায়নের এক নিখুঁত ভারসাম্য বজায় থেকেছে লেখকের কলম নিঃসৃত টেক্সটে শুধু নয়, যে কোনো পাঠকের মনোজগতেও তার থেকে বিচ্যুতির আশঙ্কা নেই। প্রতিটি মুহূর্তে একই সঙ্গে আমাদের মনে যুগপৎ দুটো প্রতিক্রিয়া হতে থাকে-যা মহান, তাকে হারিয়ে ফেলার বেদনা, আবার একই সঙ্গে যা একটু প্রচ্ছন্নভাবে হাস্যকর তার অসহায়তায় কৌতুক!

লর্ড ডার্লিংটনের বেতনভুক বাটলার হিসেবে মি. স্টিভেনস চাকরি করে ডার্লিংটন হলে। তার বাবাও ছিলেন একজন বাটলার, স্টিভেনসের চোখে একেবারে আদর্শ। অনেক ভেবে নিজের জন্য সে তৈরি করেছে মূল্যবোধের, স্থায়ীত্বের এক সুষ্ঠু মানস জগত। কিন্তু একটা উচ্ছেদের নোটিস পেয়ে যাওয়া সোশাল অর্ডার বা সামাজিক স্তরবিন্যাসকে মান্যতা দিয়ে তার মধ্যেই আদর্শ খুঁজে পাওয়ার ট্র্যাজিক প্রচেষ্টাকে আমরা আর কী চোখে দেখতে পারি? মি. স্টিভেনসের বয়ানে:
Butlers of my father’s generation, I would say, tended to see the world in terms of a ladder… Any butler with ambition simply did his best to climb as high up the ladder as possible… our generation… viewed the world not as a ladder, but more as a wheel… revolving with these great houses at the hub… It was the aspiration of all those of us with professional ambition to work our way as close to this hub…

অথচ কালের চাকার নিচে কী অনিবার্যভাবে পিষ্ট হয়ে হারিয়ে যাওয়া, এইসব মহান আদর্শের!
পিতার তিরোধান ঘটছে ‘রিমেইনস অব দ্য ডে’ উপন্যাসে, পাশাপাশি মানুষ তার মানবিকতা, সভ্যতার দর্শন বিসর্জন দিয়ে, প্রোফেশনাল ভূমিকার দায়টুকু সম্বল করে তৈরি করছে আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উদ্ভবে আত্মিক রিক্ততার ভূমিকা নিয়ে পরবর্তী একটা উপন্যাসের নাম কি হতে পারে না, When We were Orphans (2000)?

ক্রিস্টোফার ব্যাংকস একজন গোয়েন্দা। তার ছোটবেলাটা কেটেছিল সাংহাইয়ে। ওখানেই অল্পদিনের ব্যবধানে তার মা ও বাবা নিখোঁজ হয়ে যাওয়ায় শৈশবেই বিলেত ফিরে এসে সে এক পিসির কাছে মানুষ, বেশ সচ্ছলভাবেই। কেমব্রিজে পড়েছে। একসময় মা ও বাবার খোঁজে ক্রিস্টোফার গিয়ে হাজির হয় সাংহাইতে। শহরে তখন ভয়ানক হিংসার বাতাবরণ। সাংহাইয়ের এক ভয়ানক পদাতিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা হয় তার, খুব কাছ থেকে। সারা পৃথিবী যেন মানুষের মৃত্যুযন্ত্রণায়, আর্তনাদে ভরে যাওয়া অখণ্ড এক বধ্যভূমি বলে মনে হয় ওর। শেষ অবধি ক্রিস্টোফার জানতে পারে এক মর্মন্তুদ কাহিনি। ওর মা’কে অপহরণ করে নিয়ে যায় এক চীনে দস্যু। ওই লোকটি ছিল ইংরেজের আফিমের কারবারের এক এজেন্ট। এই কারবারের চরম বিরোধিতা করেছিলেন ক্রিস্টোফারের মা। অপহরণের পর থেকে চলে মা-র ওপর অকথ্য অত্যাচার- শুধু যে শরীর দিয়ে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছিল তা-ই নয়, দস্যুর বাড়িতে ডিনারে আমন্ত্রিতদের সামনে তাঁকে বিবস্ত্র করে চাবুক মেরে আমন্ত্রিতদের মনোরঞ্জন করা হতো। মহিলা আত্মহত্যা করে এড়াতে পারতেন এসবই, কিন্তু শিশু ক্রিস্টোফারের ভবিষ্যতের কথা ভেবে, ওর অনাথ হয়ে যাওয়া আটকাতে রাজি হয়ে যান এক চুক্তিতে, যেখানে ওঁর বন্দিত্বের বিনিময়ে ওই দস্যু বহন করবে শিশুটির শিক্ষা ও জীবিকানির্বাহের যাবতীয় ব্যয়। যেন ক্রুশবিদ্ধ যিশুর শাস্তিতে মুক্তি পেল বারাব্বাস!
আংকল ফিলিপ বলেছিলেন ক্রিস্টোফারকে:
But now do you see how the world really is? You see what made possible your comfortable life in England? How you were able to become a celebrated detective? A detective! What good is that to anyone? Stolen jewels, aristocrats murdered for their inheritance. Do you suppose that’s all there is to contend with? Your mother, she wanted you to live in your enchanted world forever. But it’s impossible. In the end it has to shatter. It’s a miracle it survived so long for you. 

এই সব কাহিনি ও তার অন্তর্নিহিত ইঙ্গিত আজকের তৃতীয় বিশ্বের সংস্কৃতিতে তথা রাজনীতিতে এতই প্রাসঙ্গিক যে এবছরের নোবেলজয়ীর নির্বাচন তৃতীয় বিশ্বের মানুষের থেকে বিশেষ কৃতজ্ঞতার দাবি রাখে।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/৮ অক্টোবর ২০১৭/তারা

Walton
 
   
Marcel