ঢাকা, সোমবার, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১০ ডিসেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

সন্ধ্যা হলেই লেক ও বিবেকের ময়লা কুড়ায় ওরা!

মহিউদ্দিন অপু : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-১১-১৩ ৫:১৬:২৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১১-১৩ ১০:০০:২৭ পিএম

মহিউদ্দিন অপু : পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন তারা। ২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ উপহার দেয়াই এখন তাদের মূল লক্ষ্য। জেলা পর্যায়ে এ লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে চলমান কার্যক্রমের মধ্যে ব্যতিক্রমী একটি কার্যক্রম হল, বরগুনার পৌর নাথপট্টি লেককে ময়লামুক্ত পরিচ্ছন্ন লেক ঘোষণা করা। পরিচ্ছন্নতার বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে দেশজুড়েই রয়েছে তাদের আরো অনেক উদ্যোগ। হ্যাঁ, আপনি ঠিকই ধরেছেন, বিডি ক্লিন নামের সেই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কথাই বলছি এই প্রতিবেদনে।

দিনশেষে কর্মব্যস্ততার ভিড়েও লেক কিংবা পার্কে ঘুরতে, আড্ডা দিতে কমবেশি সবারই ভালো লাগে। সঙ্গে যদি বাদাম, পপকর্ন, চিপস কিংবা ঝালমুড়ি না হয় লেক কিংবা পার্কে আড্ডাই যেন জমে না। ঘোরাঘুরি হলো। আড্ডা হলো। বাদাম, চিপস, পপকর্ন, ঝালমুড়িও খাওয়া হলো। খাওয়া শেষ হতে একটু দেরি হলেও খাবারের ঠোঙা বা কাগজগুলো পার্ক কিংবা লেকের যেখানে-সেখানে ফেলতে একটুও যেন দেরি হয়না আমাদের অনেকেরই। আশেপাশে কোনো ডাস্টবিন আছে কিনা তাও খোঁজ করা হয়না। অথচ অন্যের ফেলে রাখা ময়লা দেখলে ঠিকই গা শিউরে উঠে, বলা হয় ধ্যাত, পরিবেশটা আগের মতো নেই, নোংরা হয়ে গেছে! 

বরগুনার পৌর নাথপট্টি লেকে সন্ধ্যাকালীন এক ঝালমুড়ির আড্ডার সময় তাঁদের সঙ্গে দেখা। ১০-১৫ জনের একটি দল। সবাই তরুণ। লেকে প্রবেশ করতেই কেউ ঝাড়ু দিচ্ছেন, কেউ গ্লাভস হাতে ঠোঙা ও কাগজ টোকাচ্ছেন, কেউবা জমানো ময়লা ব্যাগে ভরছেন। ময়লার ব্যাগ সরিয়ে নেওয়ার কাজও করছেন কয়েকজন। কেউ কেউ লেকে আসা মানুষদের যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলে ডাস্টবিন বা ময়লা ফেলার

 



নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলার অনুরোধ করছেন।

বিশেষ কোনো আয়োজন নয়, বিশেষ কোন দিনও নয়। সন্ধ্যারাতে তাই এমন পরিচ্ছন্নতার কাজ দেখে খটকা লাগাই স্বাভাবিক। তবে নাথপট্টি লেকে নিয়মিত যারা ঘুরতে আসেন কিংবা নাথপট্টি লেক ঘেঁষা রাস্তাগুলোয় যারা নিয়মিত যাতায়াত কিংবা এই এলাকায় থাকেন, তাদের কাছে দৃশ্যটি নতুন নয় বরং চোখ সওয়া ও জানা। কারণ তরুণদের এই দলটি প্রত্যহ সন্ধ্যায় বরগুনার পৌর নাথপট্টি লেক পরিষ্কার করে।

কথা হলো তাঁদেরই কয়েকজনের সঙ্গে। জানা গেল, তাঁরা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিডি ক্লিনের সদস্য। তাঁরা শুধু নাথপট্টি লেকই নয়, পরিচ্ছন্নতার বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন সারা শহরে। তাঁদেরই একজন নাঈম ইসলাম বলছিলেন, ‘আমরা প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে নাথপট্টি লেকে পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু করি। ময়লামুক্ত পরিচ্ছন্ন বরগুনা পৌর নাথপট্টি লেক ঘোষণার জন্যই আমাদের এই উদ্যোগ।’

 



জানা গেল, নাঈম ইসলাম বরগুনা সরকারি কলেজের অনার্স পড়ুয়া একজন শিক্ষার্থী এবং বিডি ক্লিন বরগুনা জেলার মোডারেটরের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। নাইম ইসলাম আরো বলেন, ‘পরিচ্ছন্নতার অভিযান ছাড়াও বিডি ক্লিন বরগুনার সদস্যদের সহযোগিতায় এ বছর রমজানের ঈদে আমরা বরগুনার ১৮টি গরীব পরিবারের শিশুদের মধ্যে ঈদ শুভেচ্ছা উপহার (জামা) বিতরণ করেছি। বরগুনাকে পরিচ্ছন্ন নগরীতে রূপান্তর করতে বিডি ক্লিনের সচেতনতামূলক বিভিন্ন প্রকার কার্যক্রম আগামী ১ বছরের মধ্যে বরগুনা জেলার সকল পাড়া, মহল্লা, ইউনিয়ন ও উপজেলায় পৌঁছে দিতে সক্ষম হবো বলে আশা করছি।’

বিডি ক্লিন বরগুনার সমন্বয়ক সুদেব বিশ্বাস বললেন, ‘স্থানীয় ও বাইরের অনেকেই বরগুনার নাথপট্টি লেকে আসেন। কিন্তু লেকের পরিবেশ থাকে অপরিচ্ছন্ন। তাই আমরা স্বেচ্ছায় লেকটাকে পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য কাজ করছি। আমরা ময়লা কুড়াই, সঙ্গে সঙ্গে মানুষের বিবেকের ময়লাও কুড়াই। এখানে আমাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো, বরগুনা জেলাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন জেলায় রূপান্তর করা ও বরগুনার মানুষদের যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা ফেলার অভ্যাসকে পরিবর্তন করে পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন করা। নিজে সচেতন থাকা এবং আরেকজন মানুষকে সচেতন করার কর্তব্য থেকেই আমি ও আমার টিম আমাদের কর্তব্য পালন করে চলছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘বিডি ক্লিন বরগুনায় প্রথম যাত্রা শুরু করে ২০১৭ সালের ৮ অক্টোবর এবং এ পর্যন্ত বিডি ক্লিন বরগুনা টিম বরগুনা শহীদ মিনার, বরগুনা টাউনহল, বরগুনা কলেজ রোড, সার্কিট হাউজ ঈদগাহ মাঠ, বরগুনা শিমুলতলা মেলা মাঠসহ বরগুনার বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ২৪ অধিক ইভেন্ট করেছে। এর মধ্যে বরগুনা সরকারি কলেজ, বরগুনা জিলা স্কুল, বরগুনা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, কলেজিয়েট মাধ্যমিক বিদ্যালয়, আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়সহ বরগুনার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে ইভেন্ট ও ক্যাম্পিং করা হয়েছে। বরগুনার অন্যতম গুণী মানুষ চিত্তরঞ্জন শীল, সুখরঞ্জন শীল, যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সাহাবুদ্দিন সাবু, বরগুনা পরিবেশ আন্দোলনের সদস্য সচিব মুসফিক আরিফ, ডা. এম আর আলম কল্প, ডেইলি স্টার এর ফটো সাংবাদিক আরিফ রহমানসহ বরগুনার আরো অনেক গুণী ব্যক্তিবর্গ বিডি ক্লিন বরগুনার সঙ্গে একাত্মা ঘোষণা করে আমাদের পাশে থেকে সবসময় উৎসাহ উদ্দীপনা যোগাচ্ছেন।’

 



বিডি ক্লিন বরগুনা সম্পর্কে জানতে চাইলে স্থানীয় সাংবাদিক সুমন শিকদার বলেন, ‘বিডি ক্লিন বরগুনার সদস্যরা সারাদিন যে যেখানেই থাকুক না কেন, সন্ধ্যায় নাথপট্টি লেকে আড্ডার ফাকে পরিচ্ছন্নতার ইভেন্ট করছে এবং সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার বরগুনার বিভিন্ন জায়গায় সচেতনতামূলক ইভেন্ট করে আসছে। তাদের চলমান এমন কার্যক্রম সত্যি তাই প্রশংসনীয়।

জানা যায়, ২০১৬ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশন শহরজুড়ে ময়লা ফেলার ডাস্টবিন বসালেও সাধারণ মানুষ সেগুলো ব্যবহার করছিল না। ডাস্টবিনের জায়গায় ডাস্টবিন থাকছে, মানুষ ময়লা ফেলছে তার চারপাশে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে লেখাপড়া করা প্রায় ৪০ বছর বয়সী ফরিদ উদ্দিন (বিডি ক্লিনের প্রধান সমন্বয়ক) মানুষের এমন অসচেতনতা অবহেলা দেখে মানুষকে সচেতন করতে, নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলে শহরটাকে সুন্দর করতে, নোংরা গন্ধ থেকে পথচলতি মানুষদের বাঁচাতে পরিচিত কয়েকজনকে ডেকে নিজেরাই হাতে তুলে নিয়েছিলেন ঝাড়ু।

বিডি ক্লিনের ওয়েবসাইট (http://bdclean.org) ও ফেসবুক পেজ (facebook.com/BDcleanup) থেকে আরো জানা যায়, ২০১৬ সালের ৩ জুন ‘পরিচ্ছন্নতা শুরু হোক আমার থেকে’ স্লোগানকে সামনে রেখে প্রতিষ্ঠিত হয় বিডি ক্লিন। সেই থেকে পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে শুরু হওয়া পরিচ্ছন্ন ও জীবাণুমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে অবিরাম কর্মরত সচেতন নাগরিকদের অরাজনৈতিক স্বেচ্ছাসেবী প্ল্যাটফর্ম বিডি ক্লিন এর পরিচ্ছন্নতার কার্যক্রম দেশজুড়ে চলছে।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৩ নভেম্বর ২০১৮/ফিরোজ

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC