ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৮ জুলাই ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

ভারতের প্রধানমন্ত্রী - নরেন্দ্র মোদি না রাহুল গান্ধী?

মাছুম বিল্লাহ : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৪-২৯ ১১:১৫:৫৬ এএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৪-২৯ ১১:১৫:৫৬ এএম
ভারতের প্রধানমন্ত্রী - নরেন্দ্র মোদি না রাহুল গান্ধী?
Voice Control HD Smart LED

মাছুম বিল্লাহ : ভারতের ১৭তম লোকসভা নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে সাত দফায়। এর মধ্যে প্রথম দফায় ১১ এপ্রিল ২০১৯ অন্ধ্রপ্রদেশ, অরুণাচল, আসাম, বিহার, ছত্তিশগড়, জম্মু ও কাশ্মীর, মহারাষ্ট্র, মণিপুর, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, উড়িষ্যা, সিকিম, বেলেঙ্গানা, ত্রিপুরা, উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখন্ড, পশ্চিমবঙ্গ, আন্দামান  ও নিকোবার দ্বীপপুঞ্জ এবং লাক্ষাদ্বীপে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম দফার ভোটেই রক্ত ঝরেছে অন্ধ্রপ্রদেশে। রাজ্যের একটি কেন্দ্রে ওয়াইএসআর কংগ্রেস এবং তেলেগু দেশম পার্টির  সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে এক টিডিপি নেতা মারধরের কারণে মারা যান।

এ ছাড়াও বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ, ইভিএম ভাঙচুরের মতো ঘটনা ঘটেছে। প্রথম দফায় ২০টি রাজ্যে ৯১ আসনে ভোটগ্রহণ করা হয়। এই দফায় ভোটার ছিলেন সোয়া ১৪ কোটি। ভোটগ্রহণ চলাকালে এক জনসভায় নরেন্দ্র মোদি দাবি করেন, ‘নির্বাচনে আবার মোদিঝড় দেখা যাচ্ছে।’ প্রথম দফায় সবচেয়ে বেশি ভোটার উপস্থিতি ছিল পশ্চিমবঙ্গে, প্রায় ৮১ শতাংশ আর সবচেয়ে কম ছিল ৫০ শতাংশ। জন্মু ও কাশ্মীরে ৭২ শতাংশ। দ্বিতীয় ধাপে ১৮ এপ্রিল ৬১ শতাংশ ভোট পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গে সবচেয়ে বেশি ৭৫ শতাংশ আর সবচেয়ে কম জম্মু-কাশ্মীরে ৪৩ শতাংশ ভোট পড়েছে। আসামে পড়েছে ৭৩ শতাংশ, বিহারে ৫৮ শতাংশ, ছত্তিশগড়ে ৬৮, কর্ণাটকে ৬১, মহারাষ্ট্রে ৫৫, মণিপুরে ৭৪, উড়িষ্যায় ৫৭, পুদুচেরিতে ৭২, তামিলনাড়ু–তে ৬১ এবং উত্তর প্রদেশে ৫৭ শতাংশ ভোট পড়েছে।

দ্বিতীয় ধাপে ১১টি রাজ্য ও একটি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের ৯৫টি আসনে ভোটগ্রহণ হয়। এসব আসনে ভোট ছিল প্রায় সাড়ে ১৫ কোটি আর প্রার্থী ছিল ১৬০০। ভারতের নির্বাচন কমিশন আকথা-কুকথা বলার দায়ে ও নির্বাচনী আইন ভঙ্গের কারণে অনেক নেতাদের শাস্তিও প্রদান করেছে। পুলওয়ামা বালাকোটের উদাহরণ দেখিয়ে ভোট চাওয়ার মধ্য দিয়ে আচরণ বিধি লংঘন করেছেন প্রধানমন্ত্রী। মাহরাষ্ট্রের লাতুরে একটি জনসভায় প্রধানমন্ত্রী প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া ভোটারদের পাকিস্তানের বালাকোটে হামলা করা সেনাদের কথা ভেবে ভোট দিতে বলেন। কংগ্রেসের দাবি এগুলো বলে মোদি নির্বাচনীবিধি ভঙ্গ করেছেন কিন্তু নির্বাচন কমিশন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এরপর ২৩ এপ্রিল তৃতীয় দফা। এতে ২৩ এপ্রিল তৃতীয় ধাপে ১৩টি রাজ্যের ১১৭টি আসনে অনুষ্ঠিত হয়েছে লোকসভা নির্বাচন। ২৯ এপ্রিল চতুর্থ দফা, মে পঞ্চম দফা, ১২ মে ষষ্ঠ দফা ভোট অনুষ্ঠিত হবে। ১৯ মে শেষ ভোটগ্রহণ। ২৩ মে ভোট গণনার পর ফল ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন। সরকার গঠন করতে হলে কোনো দল বা জোটের ২৭২টি আসন পেতে হবে।

ভারতের প্রায় ১৩০ কোটি মানুষের মধ্যে ভোটার প্রায় ৯০ কোটি। ১৯ মে সপ্তম দফায় ৫৯টি আসনে ভোটের মধ্যে দিয়ে ভোটগ্রহণ শেষ হবে এবং ২৩ মে ভোট গণনা ও ফল প্রকাশিত হবে। লোকসভার মোট ৫৪৫টি আসনের মধ্যে দুটি সংরক্ষিত আসন বাদ দিলে ৫৪৩টি আসনের জন্য লড়াইয়ে অংশ নিচ্ছেন পাঁচ শতাধিক রাজনৈতিক দলের প্রায় ১০ হাজার প্রার্থী। নির্বাচন পরিচালনার জন্য প্রায় এক কোটি ১০ লাখ কর্মী ও কর্মকর্তা নিয়োজিত আছেন। এক কথায় মহাকর্মযজ্ঞ। এবারের নির্বাচনে ভোট ব্যাংকের রাজনীতিতে বিভিন্ন ধরনের ইস্যু তোলা হচ্ছে। যেমন- অনুপ্রবেশ নিয়ে শুধু পশ্চিবঙ্গের বিজেপি নেতারাই নয়, স্নায়ুকেন্দ্র দক্ষিণপন্থী রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘও অনুপ্রবেশ নিয়ে উত্তেজিত। অভিবাসনকে প্রচারের বিষয় করেছেন তারা। আসলে অনুপ্রবেশ পৃথিবীজুড়েই এক বড় ইস্যু। হিন্দু শরণার্থী এবং মুসলমান অনুপ্রবেশকারী ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বিভাজনের রাজনীতি শুরু হয়েছে ভারতীয় নির্বাচনের প্রচারে। তবে অসাম্প্রদায়িক ভারতে এ বিষয় ঠিক খাপ খায় না। ভারতে সংবিধান চালু হওয়ার পর ১৯৫২, ১৯৫৭, ১৯৬২ ও ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত একই সঙ্গে বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচন হয়েছে। ১৯৫৭ এর নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গসহ দেশের চার-পাঁচটি রাজ্যে কংগ্রেস হেরে যায়। তারপর রাষ্ট্রপতি শাসন ও নির্বাচন। এ নির্বাচনে কোথাও কোথাও কংগ্রেস জিতে যায়। কিন্তু উত্তর প্রদেশসহ বড় রাজ্যগুলোয় কংগ্রেস হেরে যায়। তারপর থেকেই বিভিন্ন রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে পুনরায় নির্বাচন হয়। কোথাও কংগ্রেস ফিরে, আবার কোথাও বিরোধীরা জিতে যায়। সেই ইতিহাসের ধারাবাহিকতা একটানা ২০০৭ সাল পর্যন্ত একইভাবে চলে আসছিল। ১৯৯৮ সাল থেকে কংগ্রেস থেকে বঙ্গেশ্বরীকে বের করে এনে পশ্চিমবঙ্গ থেকে কমিউনিস্ট এবং কংগ্রেসকে হটানোর উদ্যোগ নেয়। সেই উদ্যোগের ফসল হলেন মমতা ব্যানার্জি।

১৭তম নির্বাচনের আগে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস নেতাদের ডেকেছিলেন। তিনি আলাদাভাবে প্রতিটি জেলার নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন। তারা রাহুল গান্ধীকে স্মরণ করিয়ে দেন, মোদির যেমন স্লোগান কংগ্রেসমুক্ত ভারত, এদিকে মমতা ব্যানার্জি গত ১৪ মাসে তার রাজত্বে অর্থলোভ দেখিয়ে ১৩জন কংগ্রেস বিধায়ক ও অন্যান্য দলের আটজন বিধায়ককে কিনে নিয়েছেন। সাবেক কংগ্রেস সভাপতি ও প্রবীন নেতা সোমেন মিত্রসহ অধীর চৌধূরী, দীপা দাশমুন্সিরা রাহুলকে বলেছেন, মমতার সাথে যদি নির্বাচনি জোট করা হয়, তবে ১৩৫ বছরের কংগ্রেস যার জন্ম হয়েছিল ১৮৮৫ সালে কলকাতায় তা মুছে যাবে। সিপিএম তথা বামপন্থিদের সঙ্গে জোট করলে তারা মমতার মতো কংগ্রেস থেকে বিধায়ক কেনাবেচা করবে না। রাহুলকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। রাহুল তাদের আশ্বস্ত করে তাদের বলেছিলেন, তার সিদ্ধান্ত শিগগিরই তিনি জানাবেন। আমরা অবশ্য খুব একটা জানতে পারিনি।

সাম্প্রতিককালে পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাঙালিরা দলে দলে বিজেপিতে যোগ দিচ্ছেন। গ্রামগঞ্জ কান পাতলেই নাকি শোনা যায় কারা বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। হুইসপ্পারিং ক্যাম্পেইন চলছে- দিদি বড় না দাদা? দিদি কেন প্রধানমন্ত্রী হতে চান, তার ব্যাখ্যা তিনি নিজেই দিল্লির একটি ইংরেজি কাগজে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন। তার বায়োডাটা দিয়ে বলেছেন, আমি সাতবারের এমপি, দুবারের মুখ্যমন্ত্রী, দুবারের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। আমি মনে করি না আমার চেয়ে অভিজ্ঞ আর কোনো নেতা আছেন।  তবে,  উত্তর প্রদেশের দলিত রাণী খ্যাত মায়াবতীও দিল্লির সিংহাসনে বসার আশা প্রকাশ করেছেন। প্রশ্ন উঠছে তাহলে কে হতে যাচ্ছেন ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। মিডিয়াসহ সব জরিপকারী প্রতিষ্ঠানের ফল বলছে যে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও সর্বভারতীয় কংগ্রেসের সভাপতি রাহুল গান্ধীর মধ্যেই সম্ভাবনাটা বেশি। তবে ১৩০ কোটি মানুষের এবং বহু ধর্মের ও বর্ণের দেশের নির্বাচনে বিজয়ের কথা সরাসরি বলা যাচ্ছে না। তবে, জরিপ সব সময় পূর্বাভাস দিতে পারে না।

২০১৪ সালে মোদি যেভাবে অনেক রেকর্ড ভঙ্গ করে নির্বাচনে জিতেছিলেন, ঠিক সেভাবে গত পাঁচ বছরে প্রচার ও বিজ্ঞাপন খাতে ৫ হাজার কোটি রুপি খরচ করে নতুন রেকর্ডিং গড়েছেন। আনন্দবাজার পত্রিকার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে তা উঠে এসেছে। কৃষকের ঋণ মওকুফ করা, বিদেশ থেকে কালো টাকা ফেরানো, বছরে দুই কোটি লোকের কর্মসংস্থানসহ শত শত প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু এগুলো বাস্তবায়নের ধারে কাছে যেতে পারেনি। তারপরেও কি ভারতবাসী তাকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করবেন? যদিও গত নির্বাচনে ৫৪৩ আসনের লোকসভার প্রয়োজনীয় ২৭২ আসনের অতিরিক্ত ১০টি অর্থাৎ ২৮২টি আসনে  বিজেপি এককভাবে বিজয় অর্জন করে এবং তাদের জোটসঙ্গীসহ তারা মোট ৩৩৪টি আসনে বিজয়ী হয়। এর বিপরীতে কংগ্রেস এককভাবে মাত্র ৪৪টি আসনে বিজয় লাভ করে। তাদের কাছাকাছি ৩৭টি আসন পায় জয়ললিতার নেতৃত্বাধীন এ আই এডিএমকে এবং মমতার নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে ৩৪টি আসন পায়। এবারের নির্বাচন ২০১৪ সালের নির্বাচনের চেয়ে একটু ভিন্নভাবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। সে সময় নরেন্দ্র মোদি’ মেক ইন ইন্ডিয়া’ স্লোগান এবং কংগ্রেসের ব্যর্থতাগুলোকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য যে ইশতেহার দেন, তাতে ব্যাপক আশাবাদের সৃষ্টি হয়েছিল সাধারণ ভোটারের মধ্যে। কংগ্রেস সরকারের ১০ বছর শাসনে লাগামহীন দুর্নীতি এবং ক্রমবর্ধমান বেকারত্বকে তুলে ধরে নরেন্দ্র মোদি প্রতি বছর দুই কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি গ্রামীণ উন্নয়নের কিছু পরিকল্পনা তুলে ধরেন, যা তার অনুসৃত গুজরাট মডেলের অনুরূপ। সে সময় সাধারণ ভোটার ব্যাপকভাবে সাড়া দিলেও গত পাঁচ বছরে মোদি সরকার তাদের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে তেমন সাড়া ফেলতে পারেনি। তার মানে কি মোদি দিল্লির মসনদে বসছেন না? এই হিসাব অবশ্য এত সহজ নয়।

সেন্টার ফর ভোটার অপিনিয়ন অ্যান্ড ট্রেন্ডস ইন ইলেকশন রিসার্চ (সিভোটার) তাদের এক জরিপে বলছে যে বিজেপি এককভাবে ২২২ ও এনডিএসহ ২৬৭টি আসন পেতে পারে। সরকার গঠন করতে প্রয়োজন ২৭২ আসন। ২০১৪ সালের তুলনায় এককভাবে বিজেপির ৬০ ও জোটগতভাবে ৬৯টি আসন কমে যেতে পারে। রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস জোট ইউপিএ পেতে পারে ১৪২ আসন। তবে ইউপিএ তে না থাকলেও ঘোর মোদিবিরোধী পশ্চিবঙ্গের মমতা ব্যানার্জি, উত্তর প্রদেশের অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টি ও মায়াবতীর বহুজন সমাজবাদী পার্টি এবং দিল্লির আম আদমি পার্টি মিলে পেতে পারে ১৩৪ আসন। আবার অ্যাসেসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাকিট রিফর্মস (এডিআর) এর মতে ভোটারা বিজেপি থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছেন। ভোটারদের কাছে এ সংস্থাটি ২৪টি প্রশ্ন করেন, উত্তরে ভোটাররা ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করেন। স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, পরিসেবা- সব কিছুতেই বিজেপি পিছিয়ে। আর কংগ্রেসের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, তাদের রাজনৈতিক মেনুফেস্টু হচ্চে সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকাকেন্দ্রিক। তাতেই কি বলা যাবে যে, রাহুল গান্ধী দিল্লির মসনদে বসতে যাচ্ছেন? উত্তর পেতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে সেই ২৩ মে পর্যন্ত। ভারতে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল যদি দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসে তাহলে প্রশ্ন থেকে যায় মহাত্মা গান্ধী আর নেহরুর সেই অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি কি অস্তাচলে যাবে? ভারতের লেখক, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবিরাও বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত। তবে, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে জনগণ যা চাবে তাই হবে।

লেখক : শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৯ এপ্রিল ২০১৯/ইভা

Walton AC
ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন
       

Walton AC
Marcel Fridge