ঢাকা     সোমবার   ১৬ মার্চ ২০২৬ ||  চৈত্র ৩ ১৪৩২ || ২৬ রমজান ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

লাইলাতুল কদর: এক রাত, হাজার মাসের আলোকবর্তিকা

মো. জসিম উদ্দিন || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:২২, ১৫ মার্চ ২০২৬  
লাইলাতুল কদর: এক রাত, হাজার মাসের আলোকবর্তিকা

আরবি ‘লাইলাতুন’ শব্দের অর্থ রাত এবং ‘কদর’ শব্দের অর্থ মাহাত্ম্য বা সম্মান। এ ছাড়াও কদর শব্দের আরেকটি অর্থ হলো ভাগ্য বা পরিমাপ। মহিমান্বিত এই রজনী মুসলিম উম্মাহর জন্য আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে এক বিশেষ উপহার। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-কদরে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, ‘লাইলাতুল কদরি খাইরুম মিন আলফি শাহর’ —অর্থাৎ, এই এক রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। গাণিতিক হিসেবে এক হাজার মাস সমান ৮৩ বছর ৪ মাস, যা একজন গড় মানুষের পুরো জীবনকালের সমান বা তার চেয়েও বেশি। 

এ কথা স্পষ্ট যে, যখন আমরা সমসাময়িক অস্থিরতা ও মানবিক সংকটের দিকে তাকাই, তখন এই রাতটি কেবল ব্যক্তিগত পরকালীন পাথেয় সংগ্রহের সময় নয়, বরং আত্মিক ও সামাজিক পুনর্গঠনের এক শক্তিশালী আলোকবর্তিকা হিসেবে আবির্ভূত হয়।

লাইলাতুল কদরের মূল মাহাত্ম্য নিহিত রয়েছে মানুষের ‘রুহ’ বা আত্মার আমূল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতায় মানুষ যখন বস্তুবাদের নেশায় মত্ত, তখন এই রাত তাকে থামতে শেখায়, নিজেকে চিনতে শেখায়। সহিহ বুখারীর হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে কিয়াম (নামাজ) করবে, তার পূর্ববর্তী সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ 

এই বাণী কেবল ধর্মীয় নির্দেশনা নয়, এর ভেতরে নিহিত রয়েছে মানুষের আত্মিক মুক্তি ও মানসিক প্রশান্তির গভীর বার্তা। বর্তমান বিশ্বে মানসিক অবসাদ, উদ্বেগ ও নৈতিক পথভ্রষ্টতা দ্রুত বাড়ছে। অপরাধবোধ ও আত্মগ্লানি মানুষের মানসিক শক্তিকে দুর্বল করে দেয় এবং তাকে হতাশার দিকে ঠেলে দেয়। এই বাস্তবতায় লাইলাতুল কদরের ক্ষমার বার্তা একজন মানুষকে নতুন আশার আলো দেখায় এবং অতীতের ভুল থেকে মুক্ত হয়ে নতুনভাবে জীবন শুরু করার প্রেরণা দেয়। এক অর্থে এটি এক ধরনের আধ্যাত্মিক শুদ্ধিকরণ—যা হৃদয় থেকে কলুষতা দূর করে আত্মাকে নির্মল করে। 

এই রাতে একজন বান্দা দীর্ঘ সময় সিজদায় লুটিয়ে পড়ে অশ্রু বিসর্জন দিলে তার অন্তরে গভীর পরিবর্তন ঘটে। মহাবিশ্বের স্রষ্টার সামনে নিজের ক্ষুদ্রতা স্বীকার করার মাধ্যমে অহংকার ও আত্মগর্ব দূর হয়ে যায়। জাগতিক মোহ ও ভোগবাদী আকর্ষণ থেকে সরে এসে সে আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত হয়। গবেষণা ও পরিসংখ্যান দেখায়, যারা নিয়মিত আধ্যাত্মিক সাধনায় মনোযোগী হন, তাদের মধ্যে হতাশা ও আত্মহত্যার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। তাই লাইলাতুল কদর শুধু একটি পবিত্র রাত নয়, এটি মানুষের জীবনে আত্মিক পুনর্জাগরণের এক অনন্য সুযোগ, যা নতুনভাবে জীবন গঠনের দিশা দেখায়।

​আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়, এটি একটি পদ্ধতিগত আধ্যাত্মিক সাধনা। লাইলাতুল কদরে এই সান্নিধ্য লাভের পথ আরও প্রশস্ত হয়।

​তিলওয়াতে কুরআন: লাইলাতুল কদরের মূল বিশেষত্ব হলো এই রাতেই মহাগ্রন্থ আল-কুরআন লওহে মাহফুজ থেকে প্রথম আসমানে নাজিল হয়েছে। কুরআন হলো অন্ধকার থেকে আলোর দিকে আসার পথপ্রদর্শক। তাই এই রাতে অর্থসহ কুরআন পাঠ করা এবং এর নির্দেশনাবলী নিয়ে গবেষণা করা সান্নিধ্য লাভের সংক্ষিপ্ততম পথ। কুরআনের প্রতিটি হরফ তিলাওয়াতে যে দশটি নেকি পাওয়া যায়, কদরের রাতে তা কয়েক হাজার গুণ বৃদ্ধি পায়।

বিশেষ দোয়ার শক্তি: আম্মাজান আয়েশা (রা.) যখন রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, এই রাতে কী দোয়া করবেন? রাসুল (সা.) শিখিয়ে দিলেন এক অসামান্য দোয়া— ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি’ (হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করুন)। এই দোয়াটি আমাদের শেখায় যে, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় গুণ হলো ক্ষমা।

​​লাইলাতুল কদরের একটি বড় অনুষঙ্গ হলো ‘সালাম’ বা শান্তি। সূরা কদরের শেষ আয়াতে বলা হয়েছে, ‘সালামুন হিয়া হাত্তা মাতলাইল ফাজর’ (ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত এটি শান্তিময়)। বর্তমান যুদ্ধবিগ্রহ ও সংঘাতপূর্ণ বিশ্বে এই শান্তির বার্তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

​ক্ষমার সংস্কৃতি ও সহনশীলতা: আল্লাহ যখন এই রাতে কোটি কোটি মানুষকে ক্ষমা করেন, তখন একজন মুমিন হিসেবে আমাদের শিক্ষা হলো অন্যকে ক্ষমা করা। সমাজে যখন পারস্পরিক ক্ষমার চর্চা শুরু হয়, তখন প্রতিহিংসা ও বিদ্বেষ কমে আসে। আমরা যদি মানুষের ছোটখাটো ভুলগুলো ক্ষমা করতে শিখি, তবে সামাজিক কলহ ও মামলা-হামলার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। কদরের রাত আমাদের শেখায় কীভাবে চরম উত্তেজনার মুহূর্তেও নিজেকে শান্ত রেখে শান্তির পথে চলতে হয়।

​সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: ইসলামের শান্তির বার্তা কেবল মুসলিমদের জন্য নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য। কদরের রাতে যখন একজন মানুষ বিশ্বশান্তির জন্য দোয়া করে, তখন তার হৃদয়ে ঘৃণা বা বিদ্বেষের কোনো স্থান থাকে না। এই রাত আমাদের সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের পাঠ দেয়, যা একটি আদর্শ সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি।

অনেকেই মনে করেন লাইলাতুল কদর মানে কেবল তসবিহ হাতে জায়নামাজে বসে থাকা। কিন্তু ইসলামের সৌন্দর্য হলো এটি আধ্যাত্মিকতার সাথে মানবিকতাকে এক সুতোয় গেঁথে দিয়েছে। হাদিসে এসেছে, ‘সৃষ্টির সেবা হলো স্রষ্টার সেবা।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মানুষের উপকার করা নফল ইতিকাফের চেয়েও উত্তম। লাইলাতুল কদরের রাতে কোনো অসুস্থ মানুষের সেবা করা, অভাবী প্রতিবেশীর মুখে খাবার তুলে দেওয়া বা এতিমের মাথায় হাত রাখা আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় ইবাদত। ব্যক্তিগত ইবাদতের পাশাপাশি সামষ্টিক কল্যাণের চিন্তা করাই হলো প্রকৃত সংযম।

রমজান আমাদের যে প্রশিক্ষণ দিয়েছে, লাইলাতুল কদর তার চূড়ান্ত পরীক্ষা। কেবল খাবার ত্যাগ করা নয়, বরং মিথ্যা, গিবত, সুদ, ঘুষ ও জুলুম থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখাই হলো প্রকৃত সংযম। এই রাতে নেওয়া একটি সৎ সিদ্ধান্ত একজন মানুষের পরবর্তী ১১ মাসের জীবন পরিচালনাকে প্রভাবিত করে।

ইসলামী অর্থনীতিবিদদের মতে, রমজানের এই সময়ে যাকাত ও সদকার সঠিক বণ্টন দারিদ্র্য বিমোচনে বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখতে পারে। ২০২৫-২৬ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে কদরের রাতে সামর্থ্যবানদের দান-সদকা সমাজের নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

​বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ২০০ কোটিরও বেশি মুসলিম এই রাতটির অপেক্ষা করেন। ২০২৫ সালের গ্লোবাল হিউম্যানিটেরিয়ান ওভারভিউয়ের (OCHA) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৩০৫ মিলিয়ন মানুষের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। লাইলাতুল কদরের রাতে যদি প্রতিটি বিত্তবান ব্যক্তি তাদের যাকাত ও দানের হাত প্রশস্ত করেন, তবে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের দুঃখ লাঘব করা সম্ভব। ​এছাড়াও, আধ্যাত্মিক চর্চা নিয়ে আধুনিক বিজ্ঞান কী বলে? ‘নিউরোথ্রোপোলজি’র গবেষণায় দেখা গেছে, যখন কোনো মানুষ গভীর একাগ্রতার সাথে প্রার্থনা বা ধ্যান করেন, তখন তার মস্তিষ্কের সামনের অংশ সক্রিয় হয়, যা তাকে অধিকতর সহানুভূতিশীল ও ধৈর্যশীল করে তোলে। লাইলাতুল কদরের দীর্ঘ ইবাদত তাই কেবল পরকালীন মুক্তি নয়, বরং ইহকালীন মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও এক মহৌষধ।

​কদর মানেই হলো ভাগ্য নির্ধারণ। তবে এই ভাগ্য কেবল আসমান থেকে নির্ধারিত কিছু নয়, বরং নিজের কর্ম ও প্রার্থনার মাধ্যমে ভাগ্য পরিবর্তনের এক পরম সুযোগ। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।’ (সূরা আর-রাদ: ১১)। ​লাইলাতুল কদর আমাদের সেই পরিবর্তনের সাহস যোগায়। আমরা যদি এই রাতে শপথ নিতে পারি যে—আমরা আর ঘুষ নেব না, এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করব না, সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করব না—তবে সেটিই হবে কদরের রাতের শ্রেষ্ঠ অর্জন।

​সর্বোপরি বলতে পারি, ​লাইলাতুল কদর কেবল বছরের একটি ক্যালেন্ডারভিত্তিক রাত নয়, এটি একটি চেতনার নাম। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী কিন্তু তার সৎকর্ম অনন্তকালীন। হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ এই রাত আমাদের সামনে এক বিশাল দিগন্ত উন্মোচন করে।

​আসুন, এই মহিমান্বিত রাতে আমরা কেবল ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া নিয়ে ব্যস্ত না থেকে দেশ, জাতি এবং সমগ্র বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের জন্য প্রার্থনায় বসি। আমাদের কলামের শিরোনাম যেমন বলছে—এটি ‘এক রাত, হাজার মাসের আলোকবর্তিকা’। এই আলো যেন আমাদের ঘরের কোণ ছাড়িয়ে সমাজ, রাষ্ট্র এবং বিশ্বমানবের হৃদয়ে পৌঁছায়। 

আল্লাহর সান্নিধ্য এবং ক্ষমা লাভ করে আমরা যেন একটি সুন্দর, বৈষম্যহীন এবং প্রেমময় পৃথিবী গড়ে তুলতে পারি—এই হোক এ রাতের প্রধান মিনতি।

ঢাকা/শাহেদ

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়