ঢাকা     শনিবার   ১৮ এপ্রিল ২০২৬ ||  বৈশাখ ৫ ১৪৩৩ || ২৯ শাওয়াল ১৪৪৭ হিজরি

Risingbd Online Bangla News Portal

ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি: ক্ষ্যাপা কবির আত্মহনন

ফজল হাসান || রাইজিংবিডি.কম

প্রকাশিত: ১৩:০৪, ১৬ এপ্রিল ২০২৬   আপডেট: ১৩:১৩, ১৬ এপ্রিল ২০২৬
ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি: ক্ষ্যাপা কবির আত্মহনন

রুশ বিপ্লবের অন্যতম কবি, লেখক, নাট্যকার, অভিনেতা, চিন্তাবিদ, সমাজ-বিশ্লেষক, বক্তা এবং রাজনৈতিক কর্মী ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি। তিনি রাশিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে প্রতিভাবান এবং বিতর্কিত কবিদের মধ্যে একজন এবং তাঁকে রাশিয়ান বিপ্লবের ‘খ্যাতনামা নায়ক কবি’ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এছাড়া তিনি ছিলেন রাশিয়ার ভবিষ্যৎবিদ (ফিউচারিস্ট) আন্দোলনের সক্রিয় সদস্য এবং রুশ সাহিত্যের ‘Raging Bull’ (ক্ষ্যাপা ষাড়) হিসেবে পরিচিত। 

এত গুণাবলি, কবি খ্যাতি, পরিচিতি, এমনকি সম্মান ও স্বীকৃতি পাওয়ার পরও কেন ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কিকে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে এই পৃথিবীর সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করে অনন্ত ভুবনে যাওয়ার জন্য আত্মহননের পথ বেছে নিতে হয়েছিল? কে বা কী তাঁকে তাড়া করেছিল এবং কেন? বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, তাঁর অস্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে অনেক ধরনের মতবাদ তৈরি হয়েছে, কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, মৃত্যুর প্রায় একশ বছর পরেও তাঁর আত্মঘাতীর কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।েএই প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য হলো কীভাবে তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন, তাঁর অস্বাভাবিক মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ, আত্মঘাতীর আগে তাঁর মানসিক অবস্থা ও শারীরিক অসুস্থতা এবং তাঁর উত্তরাধিকার বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা। 

ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি (পুরো নাম ভ্লাদিমির ভ্লাদিমিরোভিচ মায়াকোভস্কি) ১৮৯৩ সালের ১৯ জুলাই তৎকালীন রুশ সাম্রাজ্যের (পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন) জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যে (বর্তমানে স্বাধীন রাষ্ট্র) জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে পিতার মৃত্যুর পর তিনি ১৯০৬ সালে মা ও বোনদের সঙ্গে মস্কো চলে যান। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি রাশিয়ান সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটিক ওয়ার্কার্স পার্টিতে যোগদান করেন এবং সক্রিয় ভাবে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তিনি বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের কারণে তিনবার গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং কারাভোগের সময় প্রায় এক বছর প্রচুর বই পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। তখন তিনি মার্কসিষ্ট সাহিত্যের প্রতি ঝুঁকে পড়েন এবং কবিতা লেখা শুরু করেন। কারাগার থেকে ফিরে এসে বিভিন্ন ধরনের শিল্প সম্পর্কিত বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেন, যেমন স্কাল্পচার এবং আর্কিটেকচার। 

রাশিয়ার ফিউচারিস্ট দলে যোগদান করার অল্প সময়ের মধ্যে ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি প্রধান মুখপাত্র হয়ে উঠেন। তিনি ১৯১৭ সালের দিকে (অর্থাৎ রুশ বিপ্লবের আগে) সেই আন্দোলনের অন্যতম ব্যক্তিত্ব হিসাবে পরিচিতি লাভ করেন। তিনি ১৯১৩ সালে প্রথম সারির রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ফিউচারিস্ট মেনিফেষ্টোতে (অ্যা স্ল্যাপ ইন দ্য ফেইস অব পাবলিক টেইস্ট) স্বাক্ষর করেন। সেই সময় তিনি ‘অ্যা ক্লাউড ইন ট্রাউজার্স’ (১৯১৫) এবং ‘ব্যাকবোন ফ্লুট’ (১৯১৬)-এর মতো অসাধারণ কবিতা লেখেন। উল্লেখযোগ্য, ‘অ্যা ক্লাউড ইন ট্রাউজার্স’ তাঁর সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং প্রসিদ্ধ কবিতার মধ্যে অন্যতম। তাঁর কবিতা অনূদিত হয়েছে নানান দেশে, নানান ভাষায়।

ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি বিভিন্ন শাখায় সাহিত্য রচনা করেন এবং বৈচিত্র্যময় কাজের পরিধি তৈরি করেন। তিনি কবিতা লিখেছেন, নাটক লিখেছেন ও পরিচালনা করেছেন, চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন, শিল্প-বিষয়ক জার্নাল সম্পাদনা করেছেন এবং ১৯১৭ সাল থেকে ১৯২২ সাল পর্যন্ত রাশিয়ার গৃহযুদ্ধের কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থনে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা পোস্টার তৈরি করেছেন। এ ছাড়া তিনি প্রায়ই নিজেকে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন কর্মকান্ডের মুখোমুখি করেছেন, যেমন সোভিয়েত রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক সেন্সরশিপ এবং সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদের রাষ্ট্রীয় নীতির বিকাশে জড়িয়ে পড়া। তিনি সোভিয়েত ব্যবস্থার নানান দিক সমালোচনা বা ব্যঙ্গ করে কবিতা ও নাটক লিখেছেন, যেমন ‘টকিং উইথ দ্য ট্যাক্সম্যান অ্যাবাউট পোয়েট্রি’ (১৯২৬) এবং ‘দ্য বাথহাউস’ (১৯২৯)। এসব সাহিত্য সৃষ্টির জন্য তিনি সোভিয়েত রাষ্ট্র ও সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে সমালোচনার সম্মুখীন হন। 

এক সময় ছবি আঁকার দিকে ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির প্রচন্ড ঝোঁক ছিল, কিন্তু ক্রমশ তিনি ছবি আঁকার পরিবর্তে কবিতায়  মগ্ন হন। তাঁর কবিতায় সমাজবাদের জোড়ালো কণ্ঠস্বর ফুটে উঠেছে। কবিতা রচনা ছাড়াও তাঁর পদচারণা ছিল সৃজনশীল সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায়, যেমন নাটক, স্মৃতিকথা, ফিচার এবং ভ্রমণ-বৃত্তান্ত। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে ‘ওড টু দ্য রেভলিউশন’, ‘লেফট মার্চ’, ‘অ্যা স্লেপ ইন দ্য ফেস অব পাবলিক টেষ্ট’, ‘অ্যা ক্লাউড ইন ট্রাউজারস’, ‘দ্য ব্যকবোন ফ্লুট’, ‘দ্য ওয়ার অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ল্ড’, ‘সিম্পল অ্যাজ মুয়িং’, ‘দ্য বেডবাগ’, ‘দ্য বাথ-হাউজ’, ‘প্যারিস সাইকলস’ এবং ‘মিষ্ট্রি ব্যুফে’। ‘সিলেকটেড ওয়ার্কস’ এবং আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘আই, মাইসেলফ্’ রয়েছে। অসাধারণ সুন্দর আবৃত্তি করতেন তিনি। 

এ কথা সত্যি যে, ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি নিজস্ব একটি সাহিত্যশৈলী তৈরি করেছিলেন, যা সেই সময়ে সোভিয়েত শাসনের অধীনে প্রসিদ্ধি অর্জন করে। উদ্দীপ্ত সংকল্প নিয়ে বিপ্লবের সঙ্গে মিলিত হওয়ার তাড়নায় তিনি নিজেকে সোভিয়েত সাহিত্য জগতে ‘সহযাত্রী’ হিসাবে নিজের অস্তিত্বকে খুঁজে পেয়েছিলেন। তবে এজন্য তাঁকে সোভিয়েত সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, যেমন রাশিয়ান প্রোলেতারিয়ান লেখকদের সংস্থা থেকে কঠোরভাবে সমালোচিত হতে হয়েছিল। 

ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির জীবনের শেষ বছরটি ছিল ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ। তিনি ১৯৩০ সালের ১৪ এপ্রিল আত্মহত্যা করেন। তাঁর অন্তোষ্টিক্রিয়ায় (১৭ এপ্রিল) আনুমানিক দেড় লাখ মানুষ উপস্থিত ছিলেন, যা সোভিয়েত ইতিহাসে তৃতীয় বৃহত্তম শোকের অনুষ্ঠান। উল্লেখ্য, শুধু ভ্লাদিমির লেনিন এবং জোসেফ স্টালিনের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে বেশি মানুষের উপস্থিতি ছিল। তাঁকে মস্কোর নভোদেভিচি কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

সোমবার, ১৪ এপ্রিল ১৯৩০। অন্যসব দিনের মতো সেদিনও মধ্য-সকালে পথচারী ও যানবাহন চলাচলের জন্য মস্কো শহরের রাস্তাঘাট মুখরিত হয়ে উঠেছিল, অফিস-আদালতে কর্মচারীদের ব্যস্ততা বেড়ে গিয়েছিল এবং ঘরবাড়িতে লোকজন সাংসারিক কাজে মনোনিবেশ করেছিল। কিন্তু সকাল ১০টা ১৭ মিনিটে ঘটে যায় বিশ্ব ইতিহাসের এক অপ্রত্যাশিত মর্মান্তিক ঘটনা। মস্কো শহরের লুবিয়ানস্কি সড়কের পাশে অবস্থিত একটা নির্দিষ্ট অ্যাপার্টমেন্টের এক কক্ষে রিভলবার থেকে বেরিয়ে আসা পরপর দু’টি গুলির শব্দে হয়তো কেঁপে উঠেছিল পুরো শহর, বিয়োগান্তক খবর শুনে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল শহরবাসী আর পলকের জন্য থমকে গিয়েছিল চলমান ফুরফুরে হাওয়া। বুকের বাম পাশে গুলির আঘাতে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির স্পন্দনহীন নিথর দেহ। তাঁর আকস্মিক প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছিল দেশের সাহিত্য মহলে, এমনকি বিশ্বসাহিত্য অঙ্গনে। রুশ সাহিত্যের প্রখ্যাত বোֹরিস পাস্তারনাকের মতে, ‘ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির মৃত্যুর সংবাদ সবাইকে কাঁপিয়ে দিয়েছে, মুখগুলো সাদা হয়ে গেছে … [মানুষরা] সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল এবং একে অপরকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা খুঁজছিল।’

জানা যায়, জীবিত অবস্থায় ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কিকে শেষবার যিনি দেখেছিলেন, তিনি ছিলেন মস্কো আর্ট থিয়েটারের বাইশ বছর বয়সী অভিনেত্রী ভেরোনিকা পোলোনস্কায়া। সেদিন সকালে তিনি অনুশীলনে যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়া করছিলেন। তিনি ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বের হওয়ার পরপরই বন্ধ দরজার পিছনে গুলির শব্দ শুনতে পান এবং সঙ্গে সঙ্গেই দৌড়ে কক্ষে প্রবেশ করেন। তিনি কবিকে মাটিতে পরে থাকতে দেখেন এবং তাঁর মনে হয়েছিল যে, কবি নিজের পিস্তল দিয়ে গুলি করে আত্মঘাতী হয়েছেন।

বিভিন্ন সূত্র থেকে এ বিষয়টি স্পষ্ট যে, ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি একই পিস্তল দিয়ে নিজের বুকে গুলি করেছিলেন, যা ‘নট বর্ন ফর মানি ’(১৯১৮) চলচ্চিত্রে দেখা গিয়েছিল। উল্লেখ্য, সেই চলচ্চিত্রের  চিত্রনাট্য তিনি জ্যাক লন্ডনের ‘মার্টিন এডেন’ উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে লিখেছিলেন। ‘নট বর্ন ফর মানি’ চলচ্চিত্রের মূল বিষয় ছিল একজন ঊর্বর মস্তিস্কের লেখকের জীবনকাহিনী, যিনি  প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করতে পারেন, অথচ সাফল্য অর্জন করার পরে তিনি সফলতার গভীরে তলিয়ে যান। প্রধান চরিত্রে মায়াকোভস্কি নিজেই অভিনয় করেছেন। তিনি চরিত্রের প্রয়োজনে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন এবং ব্যর্থ হন। আর সেই ব্যর্থতা থেকে তিনি জীবনের নতুন উৎসাহ খুঁজে পান, যা পরে অন্যদের পার্থিব আনন্দের মূল্য বোঝার অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। তাঁর আত্মহত্যার ঘটনাকে ধীরে ধীরে মুক্তির আশা পরিত্যাগ করার চূড়ান্ত ফলাফল হিসাবে দেখা হয়।

ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি নিজের হাতে লেখা আত্মহত্যার চিরকুট রেখে গিয়েছেন, যা এই লেখার শেষে সংযুক্ত করা হয়েছে। চিরকুটে তারিখ লেখা ছিল ১২ এপ্রিল এবং ‘প্রত্যেকের জন্য’। সেখানে তিনি আত্মঘাতীর আগে তাঁর উৎকণ্ঠা এবং মৃত্যুর পরে অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন। উল্লেখ্য, লেখার দিক থেকে ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির চিরকুটটি ছিল অস্বাভাবিক এবং ব্যতিক্রম। কেননা চিরকুটটি গদ্যে লেখা ছিল এবং সেখানে তিনি কাউকে দোষারোপ করা থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করেছেন এবং ক্ষমা চেয়েছেন মা, দুই বোন, লিলিয়া ব্রিক ও ভেরোনিকা পোলোনস্কায়ার কাছে। তিনি সহযোদ্ধাদের (কমরেড) অনুরোধ করেছেন যেন তারা পরিবারের ভরণপোষণের জন্য অর্থকড়ি যোগাড় করেন, এমনকি লিলিয়া ব্রিক ও তাঁর স্বামীকে উদ্দেশ্য করে লেখা অসমাপ্ত কবিতাটি যেন তাদের কাছে পৌঁছে দেন। এছাড়া চিরকুটের সব শেষে তিনি তাঁর দৈনন্দিন বিভিন্ন বিষয়ের প্রতি উদ্বেগের কথাও উল্লেখ করেন, যেমন আয়কর পরিশোধের বিষয়টি। তবে এ কথা সত্যি যে, চিরকুটের লেখার শৈলী এবং প্রকাশ ভঙ্গি তাঁর চির পরিচিত কাব্যিক রচনার মতো নয়, বরং তাঁর বিপ্লবী প্রকাশ ভঙ্গি থেকে স্পষ্টভাবে আলাদা।

বন্ধুদের সঙ্গে মায়াকোভস্কি। লিলিয়া ব্রিক, চলচ্চিত্রকার সের্গেই ইয়েসেনস্টিন, কবি বরিস পাস্তেরনাক (বাঁ থেকে দ্বিতীয়)

ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির আত্মহননের পেছনের কারণ বা প্রভাব অত্যন্ত জটিল এবং বহুমুখী। এ কথা সত্য যে, তাঁর আত্মঘাতীর ঘটনা দশকের পর দশক ধরে আলোচক-সমালোচক এবং বিদগ্ধ পণ্ডিতদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, কিন্তু আসল কারণ আজও বিতর্কিত এবং অমীমাংসিত। তাঁর  অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর পরে প্রাথমিকভাবে কিছু মানুষ অনুমান করেছিলেন যে, তিনি রাশিয়ান রুলেট খেলছিলেন, অন্যরা সন্দেহ করেছিলেন আত্মঘাতী হওয়ার আগে তিনি অসৎ কাজে লিপ্ত ছিলেন, এমনকি কেউ কেউ যুক্তি দিয়েছিলেন যে, রাজনৈতিক ব্যর্থতাই তাঁকে আত্মহত্যা করতে প্ররোচিত করেছে। অন্যদিকে সোভিয়েত সরকার সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্প উপস্থাপন করেছিল—রোমান্টিক হতাশা। 

সুইডিশ লেখক, রুশ ভাষার অনুবাদক এবং ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির জীবনীকার বেনগ্ট জাঙফেল্ড্ট কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ প্রস্তাব করেছেন, যেমন ব্যক্তিগত অস্থিরতা, প্রতিষ্ঠানের ক্রমবর্ধমান শত্রুভাব, তাঁর নাটকের ব্যর্থতা, কণ্ঠস্বরের সমস্যা এবং দর্শকের সংখ্যা ক্রমাগত কমে যাওয়া। সেসব কারণগুলো একত্রিত করার পর একটি জটিল এবং দুঃখজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির অকাল মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। 

যাহোক, বিভিন্ন সূত্র ও গবেষণা প্রবন্ধ-নিবন্ধে প্রকাশিত তথ্য থেকে ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির আত্মহননের কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ সনাক্ত করা যেতে পারে, যেমন: আত্মহত্যার প্রবণতা। এই প্রবণতা কবির জীবনের অন্ধকার প্রতিধ্বনি এবং আত্মহত্যা তাঁর লেখার একটি প্রধান বিষয়, যা তিনি অনেক কবিতার প্রথম লাইন থেকে শেষ লাইন পর্যন্ত উল্লেখ করেছেন। কেননা তাঁর কবিতা এবং অন্যান্য সাহিত্যকর্ম, বিশেষ করে নাটক, প্রায়ই গভীর আকাঙ্ক্ষা এবং হতাশার কারণে মৃত্যুর প্রসঙ্গ প্রতিফলিত হয়েছে। উদাহরণ হিসাবে কয়েকটি কবিতা উল্লেখ করা যেতে পারে। যেমন ‘ক্লিয়ারেন্স সেইল’, এই কবিতায় তিনি লিখেছেন: 
‘এখন থেকে বছর বছরের পর
সংক্ষেপে, যখন আমি আর জীবিত থাকব না–
হয়তো মৃত্যু হবে ক্ষুধায়,
কিংবা পিস্তলের একটি গুলি–
অধ্যাপকগণ […] অধ্যয়ন করবেন
আমাকে
কিভাবে,
কখন,
কোথা থেকে আমি এলাম’

আবার ‘দ্য ব্যাকবোন ফ্লুট’ কাবতায় তিনি লিখেছেন: 
‘অধিকাংশ সময় আমি ভাবি:
সম্ভবত একটি গুলির মাধ্যমে আমার শেষকে চিহ্নিত করা অনেক ভালো হবে’

ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির মধ্যে আত্মহত্যার ধারণা সবসময়ই ছিল। এ প্রসঙ্গে দীর্ঘ সময়ের প্রেমিকা লিলিয়া ব্রিক তাঁর স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন: ‘আত্মহত্যার ধারণা তাঁর (মায়াকোভস্কির) কাছে দীর্ঘমেয়াদী অসুখের মতো ছিল এবং যে কোনো দীর্ঘ মেয়াদী অসুখের মতোই আত্মঘাতী হওয়ার ধারণা তাঁর মধ্যে আরও শক্ত করে বাসা বেঁধেছিল, যা ছিল তাঁর জন্য অনিচ্ছাকৃত …’

বেনগ্ট জাঙফেল্ডটকে দেওয়া সাক্ষাতকারে লিলিয়া ব্রিক বলেছেন, ‘আমি মায়াকোভস্কির মুখ থেকে অনেকবার আত্মহত্যা শব্দটি শুনেছি। তিনি বলেছেন যে, ত্রিশ বছর বাঁচতে চান, তার বেশি নয়।’ আসলে বৃদ্ধ হওয়ার সঙ্গে তাঁর ভয় ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল নারীদের কাছে নিজের আকর্ষণ হারানোর আশঙ্কা। তিনি আত্মহত্যার আগে পঁচিশ বছর বয়সী এক লেখকের কাছে বলেছিলেন, ‘পঁচিশ বছরের আগে একজন পুরুষকে সব নারী ভালোবাসে, কিন্তু পঁচিশের পরে সবাই তাঁকে ভালোবাসে—শুধু যে নারীকে ভালোবাসেন, তিনি ছাড়া।’ 

সাহিত্যক্ষেত্রে, বিশেষ করে কবিতা ও নাটক রচনায়, ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি ছিলেন চরমপন্থী, অর্থাৎ তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল চরম এবং তিনি সমঝোতার জন্য কখনো প্রস্তুত থাকতেন না। লিলিয়া ব্রিকের কথায় জানা যায় যে, তাঁর ক্ষমতার মধ্যে যা কিছু ছিল, তিনি সবই দিয়েছিলেন এবং প্রতিদানে অনেক কিছুই আশা করেছিলেন। অসংখ্য মানুষ তাঁকে ভালোবাসতেন এবং তাঁর অনেক পাঠক ভক্ত ছিল। তিনি চাইতেন, যারা তাঁর কবিতা পড়ে না কিংবা নাটক দেখে না, তাঁরা তাঁর কবিতা পড়ুক এবং নাটক দেখুক, এমনকি যারা তাঁর সান্নিধ্যে আসেননি, তাঁরা তাঁর কাছে আসুক। এছাড়া তাঁর মনে হতো তিনি এমন এক নারীকে ভালোবাসতেন, অথচ সেই নারী তাঁকে ভালোবাসেন না। তিনি চাইতেন, তাঁকে ভালোবাসুক।’ ভালোবাসা, শিল্প, বিপ্লব—ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির কাছে সবকিছুই ছিল এক ধরনের খেলা, যেখানে জীবন মানে জুয়া। তিনি একজন আসক্ত খেলোয়াড়ের মতো খেলতেন, তীব্রভাবে এবং নির্দয়ভাবে। আর তাই তিনি নিশ্চিত জানতেন যে, যদি সেই খেলায় হেরে যান, তাহলে তাঁর জীবনে নেমে আসবে হতাশা এবং দুঃখ-বিষাদ। 

ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি বারবার প্রেমে ব্যর্থ হয়েছেন এবং বিভিন্ন সময়ে প্রেমিকাদের কাছে আত্মহত্যার অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। যদিও কবি হিসাবে তিনি খুবই সফল ছিলেন, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে অনেক হতাশার মুখোমুখি হয়েছিলেন। অনেকেই মনে করেন যে, সম্ভবত তাঁর আত্মঘাতীর আড়ালে লুকিয়ে আছে ব্যর্থ প্রেমের করুণ কাহিনী। 

১৯২৯ সালে রেড আর্মি সৈনিকদের সামনে কবিতা পড়ছেন মায়াকোভস্কি

ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির প্রেমিকা ছিল একাধিক এবং তাঁর সৃজনশীল সাহিত্য কর্মের মতোই প্রেমকাহিনীও ছিল চমকপ্রদ। সমসাময়িক লেখিকা, অনুবাদক, অভিনেত্রী, মডেল, এমনকি সাবেক ছাত্রীও তাঁর জীবনের বিভিন্ন সময়ে প্রণয়িনীর বেশে এসেছিলেন। তাঁর প্রেমিকার তালিকায় ছিলেন লিলিয়া ব্রিক, এলশা ট্রিওলেট (লিলিয়া ব্রিকের বোন), অভিনয় শিল্পী লিলিয়া লেভিনেস্কায়া, ফ্যাশন মডেল তাতিয়ানা ইয়াকোভলেভা, যুক্তরাষ্ট্রে রুশ অভিবাসী অভিনয় শিল্পী ও ফ্যাশন মডেল এলি জোনস, নাতালিয়া গ্রুকশেঙ্কো এবং ভেরোনিকা পোলোনস্কায়া। তাদের মধ্যে প্রায় একমাত্র লিলিয়া ব্রিকের সঙ্গে ছিল দীর্ঘ পনের বছরের সম্পর্ক। একসময় তিনি তাতিয়ানা ইয়াকোভলেভাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু রাজী হননি। উল্লেখ্য, মায়াকোভস্কির প্রেমিকাদের অনেকেই ছিলেন পরস্ত্রী অথবা অন্য কারো বাগদত্তা।

বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির মৃত্যুর ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য কারণ হিসাবে বলা হয় যে, ভেরোনিকা পোলোনস্কায়ার সঙ্গে তর্ক-বিতর্কের পর তিনি আত্মঘাতী হয়েছেন। বিবাহিতা পোলোনস্কায়া কবিকে অত্যন্ত ভালোবেসে ছিলেন, কিন্তু তিনি তাঁর স্বামীকে ছাড়তে ছেড়ে আসতে চাননি। ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির মৃত্যুর পরে ভেরোনিকা পোলোনস্কায়া বলেন, তিনি (ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি) তাঁর কাছে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করেছিলেন ১৩ এপ্রিল (আত্মহত্যার এক দিন আগে), যখন তাঁরা দু’জন ভ্যালেন্টিন কাটায়েভের বাসভবনে ছিলেন। কিন্তু তিনি ভেবেছিলেন, মায়াকোভস্কি আবেগের বশবর্তী হয়ে তাঁকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করেছেন এবং ‘এক সেকেন্ডের জন্যও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে, আসলেই তিনি (মায়াকোভস্কি) এমন কিছু করতে পারেন।’ 

অন্যদিকে নাতালিয়া গ্রুকশেঙ্কো উল্লেখ করেছেন, ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি তাতিয়ানা ইয়াকোভলেভার জন্য পাগল ছিলেন। এ প্রসঙ্গে নাতালিয়া আরও বলেছেন, ‘১৯২৯ সালের জানুয়ারি মাসের কোন একদিন মায়াকোভস্কি আমাকে বলেছিলেন তিনি … মস্তিষ্কে গুলি করবেন, যদি শীঘ্রই তিনি সেই মহিলাকে দেখতে না পান।’

অনেক সময় ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির মৃত্যু তাঁর সাহিত্যকর্ম এবং জীবনের উপর বাহ্যিক শক্তির প্রভাবের কারণে ধরা হতো। এ কথা সত্যি যে, তাঁর সঙ্গে সোভিয়েত রাষ্ট্রের সম্পর্ক ছিল জটিল। কেননা তাঁর অনেক কবিতা ও নাটক বলশেভিকদের প্রতি তাঁর নৈতিক ও দেশপ্রেমিক সমর্থন প্রতিফলিত হয়েছে। 

ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি ১৯২০-এর দশকের শেষের দিকে সোভিয়েত রাজনীতির ধারায় হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। সেই সময় তিনি সীমিত চিন্তাধারার সমসাময়িক সোভিয়েত নাগরিক ও সরকারি কর্মচারীদের উপহাস করে ব্যঙ্গাত্মক নাটক লিখেছিলেন, কিন্তু সেসব নাটক অত্যন্ত খারাপভাবে গ্রহণ করা হয়। তার প্রধান কারণ ছিল সেই সময়ের সমালোচকরা সরকারি দলের প্রতি খুবই নিষ্ঠাবান ও অনুগত ছিলেন। 

জানা যায়, মায়াকোভস্কির মৃত্যুর তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাও দশ দিনের মাথায় রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেন, যা তাঁর মৃত্যুর প্রকৃতি নিয়ে সম্ভাব্য কারণের আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছিল। কেননা প্রথিতযশা কারোর অপ্রত্যাশিত এবং আকস্মিক মৃত্যু প্রায়ই রাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রতি ইঙ্গিত করা হতো, যা প্রথম ক্রুশচেভিয়ান ডি-স্টালিনাইজেশন, পরে গ্লাসনস্ট এবং পেরেস্ত্রইকা সময়ে তীব্র আকার ধারণ করেছিল। সেই সময় সোভিয়েত রাজনীতিবিদরা স্টালিনের খ্যাতি ও সমকালীন প্রতিপক্ষদের অবস্থান দুর্বল করার চেষ্টা করছিল। তবে সোভিয়েত রাষ্ট্র মায়াকোভস্কির মৃত্যুর কারণকে ব্যক্তিগত ও প্রণয়-ঘটিত বললেও বস্তুত সেসব ব্যাখ্যা খুব একটা গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। জানা যায়, জীবনের শেষদিকে সরকারি কর্তৃপক্ষ তাঁকে দেশ ছাড়ার অনুমতি দেয়নি।

এছাড়া ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির কঠোর নীতির প্রতি পূর্ণ সমর্থন থাকার জন্য রুশ প্রলেতারিয়ান লেখক সমিতির সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি ছিল। আর এ কারণে লেখক এবং সাহিত্যিক কর্মকর্তারা তাঁর ব্যক্তিগত শিল্প প্রদর্শনী উপেক্ষা করেছিল। মৃত্যুর কয়েক দিন আগে মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাঁকে তির্যক ভাষায় অবমাননা করেছিল এবং এটিই ছিল জনসাধারণের সামনে তাঁর শেষ উপস্থিতি। তিনি জীবনের শেষদিকে জনসাধারণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছিলেন। কেননা লেখক সমিতি এবং সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে ও মনের মধ্যে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। 

বিশ শতকের জনপ্রিয় এবং সুপরিচিত রুশ গীতিকবি সারগেই আলেকজান্দ্রোভিচ এসেনিনের ১৯২৫ সালে আত্মহত্যা করার পর ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি গভীরভাবে মর্মাহত হয়েছিলেন এবং তিনি এসেনিনের আত্মহত্যাকে কমিউনিজমের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। তবে এসেনিনের মৃত্যুর পর তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করে মায়াকোভস্কি কবিতা লেখা তাঁর নৈতিক দায়িত্ব অনুভব করেছিলেন। তিনি এসেনিনের একটি কবিতার শেষ লাইনগুলোকে নিয়ে ভিন্ন অর্থে উপস্থাপন করেছিলেন, যেন মৃত কবিকে নিজের জীবন নেওয়ার সিদ্ধান্তের জন্য দোষারোপ করছেন: 
‘মারা যাওয়া কঠিন কাজ নয়,
তবে জীবন তৈরি করা অনেকগুন কঠিন।’

কাকতালীয় ভাবে ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কিও পাঁচ বছরের কম সময়ের মধ্যে আত্মহত্যা করেন।

ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির অপ্রত্যাশিত এবং অস্বাভাবিক মৃত্যু হলেও মৃত্যুর পরে তাঁর কবি খ্যাতি রাশিয়ার সীমানা পেরিয়ে বিশ্ব সাহিত্যাঙ্গণে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর উত্তরাধিকার বা লেগ্যাসি হলো বিপ্লবী কবিতা, রাশিয়ান ফিউচারিস্ট আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ও অগ্রগণ্য ভূমিকা এবং সোভিয়েত রাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর জটিল সম্পর্ক, যা তাঁকে বিংশ শতাব্দীর রুশ সাহিত্যে একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি ও লেখক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। 

এ কথা সত্যি যে, মৃত্যুর পরে ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির লেগ্যাসি রাজনৈতিক আবহাওয়ায় জটিল হয়ে উঠেছিল। জোসেফ স্টালিন তাঁকে সোভিয়েত সাহিত্যের উজ্জ্বল প্রতীক হিসেবে ঘোষণা করেন এবং বলেন, ‘তিনি (মায়াকোভস্কি) আমাদের সোভিয়েত যুগের সেরা এবং সবচেয়ে প্রতিভাবান কবি।’ তাঁর প্রতি সম্মান জানিয়ে স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে। এছাড়া রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তাঁর সাহিত্যকর্ম নিয়ে অনুষ্ঠান করা হয়, যদিও সীমিত পরিসরে এবং নির্বাচিত বিষয়ে। তবে তাঁর জীবনের জটিলতা এবং যেসব সমালোচনায় তিনি শাসনবিরোধী অভিমত প্রকাশ করেছিলেন, তা প্রায়শই সেসব অনুষ্ঠানে উপেক্ষা করা হয়।

ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির মৃত্যুর অনেক বছর পর, এমনকি স্ট্যালিনের মৃত্যুর তেইশ বছর পরেও, মায়াকোভস্কিকে রুশ জনগণ প্রচন্ড সম্মান করত। ১৯৭৩ সালে তাঁর আশিতম জন্মবার্ষিকী উদযাপনের পরে রুশ কবি-সাহিত্যিকদের সংগঠনের কমিটি ‘মায়াকোভস্কি—কুড়ি বছরের সাহিত্যকর্ম’ প্রদর্শনী পুনরায় খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সেই একই জায়গায় যেখানে ১৯৩০ সালে প্রথম প্রদর্শিত হয়েছিল। সেই পুনর্গঠিত প্রদর্শনীর উদ্বোধনকালে রুশ কবি-সাহিত্যিকদের সংগঠনের সম্পাদক কনস্টানটিন সিমোনভ ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কিকে বিশ্ব সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার বিষয়টি উল্লেখ করে বলেছিলেন, ‘… কেবলমাত্র সোভিয়েত ইউনিয়নে নয়, সমগ্র বিশ্বের মধ্যে, মায়াকোভস্কি নিজেকে বিপ্লব এবং সমাজতন্ত্র নির্মাণের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।’

সম্প্রতি ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির উত্তরাধিকার পুনঃমূল্যায়ন করা হয়েছে, বিশেষ করে আধুনিক রাজনৈতিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে। তাঁর অমূল্য সাহিত্য সৃষ্টি এখনও সরকারী অনুমোদন (সেন্সরশিপ), শিল্পী স্বাধীনতা এবং সমাজে শিল্প-সংস্কৃতির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করার প্রেরণা জোগায়। এমনকি রাজনৈতিক দমনামূলক অবস্থার মধ্যেও, সমসাময়িক আলোচনায় তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রাসঙ্গিকতাকে প্রকাশ করে।

পরিশেষে সংক্ষেপে বলা যায়, ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির কবিতাকে সমকালীন সামাজিক পরিবর্তন এবং ব্যক্তিগত মত প্রকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসাবে বিবেচনা করা হয়। রুশ সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তাঁর প্রভাব এখনও গুরুত্বপূর্ণ, যা তাঁকে বিশ শতকের শিল্প-সংস্কৃতি ও রাজনীতির ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান দিয়েছে।

ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি ও লিলিয়া ব্রিক

ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির আত্মহননের ঘটনা, বিশেষ করে সম্ভাব্য কারণ, এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানান বিষয়ে বিতর্ক এখনও অব্যহত রয়েছে। রুশ সরকার, তাঁর সমসাময়িকরা এবং বন্ধুরা তাঁর আত্মহত্যাকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য বিভিন্ন কারণ উল্লেখ করেছে। সেগুলোর মধ্যে ব্যক্তিগতভাবে অনুপ্রাণিত ঘটনা অন্যতম কারণ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এ কথা সত্যি যে, তাঁর আত্মহত্যার নেপথ্যে যে কারণই (এক বা একাধিক) থাকুক না কেন, তাঁর আত্মহত্যা ছিল পূর্বপরিকল্পিত। আত্মহত্যার দু’দিন আগে লেখা ‘প্রত্যেকের জন্য’ চিরকূট তার উজ্জ্বল প্রমাণ। কেননা সেখানে তিনি আত্মঘাতী হওয়ার আগে নিজের উৎকন্ঠা এবং মৃত্যুর পরে অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন। 

সবশেষে বলতে হয়, ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির আত্মহত্যা এমন একটি আঘাত ছিল, যা থেকে রুশ সাহিত্য কখনো পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেনি, কারণ তিনি ছিলেন রুশ বিপ্লবের অপ্রতিদ্বন্দ্বী পুরস্কারপ্রাপ্ত ‘ক্ষ্যাপা’ কবি। 

ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির সুইসাইড নোট

‘আমার মৃত্যুর জন্য কাউকে দোষারোপ করবেন না এবং অনুগ্রহ করে অযথা খোশগল্প করবেন না। মৃত ব্যক্তি খোশগল্প ঘৃণা করতো। মা, বোনেরা এবং সাথীরা, আমাকে ক্ষমা করুন—জানি, এটা কোনো ভালো উপায় নয় (আমি অন্যদের এ পদ্ধতি গ্রহণ করার পরামর্শ দিই না), কিন্তু আমার অন্য কোনো বিকল্প নেই। লিলিয়া, আমাকে ভালোবাসো। কমরেড সরকার, আমার পরিবার হলো লিলিয়া ব্রিক, মা, আমার বোনেরা, এবং ভেরোনিকা ভিতোলদোভনা পোলোস্কায়া। যদি আপনারা তাদের জন্য একটি সুষ্ঠু জীবন ব্যবস্থা করতে পারেন, তার জন্য অগ্রীম ধন্যবাদ। আমি যে কবিতা লিখতে শুরু করেছিলাম, সেই অসম্পূর্ণ কবিতাটি ব্রিকদের কাছে পৌঁছি দেবেন। তারা বুঝে নেবে। 
‘‘যেমন তারা বলে, 
‘ঘটনাটি শেষ হয়েছে।’ 
প্রেমের জাহাজ 
দৈনন্দিন জীবনের আঘাতে ভেঙেচুরে গেছে। 
আমি জীবনের সাথে সব মিলিয়ে নিয়েছি,
আর তালিকা দিলেও কিছুই লাভ হবে না। 
পারস্পরিক আঘাত, 
সমস্যা, 
এবং অপমান।”
শুভকামনা। 
ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি’

RAPP-এর সহকর্মীরা, আপনারা ভাববেন না যে, আমি ভীতু। সত্যিই, এর জন্য অন্য কিছু করা যেত না। শুভেচ্ছা। এরমিলভ-কে বলবেন, দুঃখজনক যে আমি সেই শ্লোগান সরিয়েছি, বরং তাঁর জন্য লড়াই করা উচিত ছিল। ভি.এম. আমার ডেস্কের ড্রয়ারের মধ্যে দুই হাজার রুবল আছে এবং তা দিয়ে আমার আয়কর পরিশোধ করবেন। গোসিজদাত থেকে আয়করের হিসাব পাবেন। ভি.এম.”

টীকা [মূল চিরকুটে নেই, তবে পাঠকদের সুবিধার্থে দেওয়া হলো—অনুবাদক]:

লিলিয়া: পুরো নাম লিলিয়া ব্রিক। তিনি ছিলেন ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কির প্রকাশক অসিপ মাক্সিমোভিচ ব্রিকের স্ত্রী। লিলিয়া ব্রিকের প্রতি মায়াকোভস্কির ভালোবাসা এবং তাঁর স্বামীর সঙ্গে বন্ধুত্ব মায়াকোভস্কির কাব্যশৈলীর উপর শক্তিশালী প্রভাব ফেলেছিল। লিলিয়া ব্রিকের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হওয়ার পরও মায়াকোভস্কি তাঁকে সবচেয়ে কাছের মানুষের মধ্যে একজন এবং নিজের পরিবারের অন্যতম একজন সদস্য মনে করতেন।
RAPP: রাশিয়ান প্রোলেতারিয়ান লেখক সমিতি, যা রুশ ভাষায় Rossysskaya assotsiatsia proletarskikh pisatelei. উল্লেখ্য, এই সমিতি সোভিয়েত ইউনিয়নে শিল্প-সাহিত্যকে রাজনীতিকরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
এরমিলভ: পুরো নাম ভাসিলি দ্মিত্রিয়েভিচ এরমিলভ। তিনি ইউক্রেনীয় চিত্রশিল্পী। তাঁকে ‘ইউক্রেনীয় অ্যাঁভা গার্ড-এর জনক’ বলা হয়।
গোসিজদাত: ১৯১৯ থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত সোভিয়েত রাশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা সংস্থা, যা সোভিয়েত প্রকাশনা ব্যবস্থার সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ১৯৩০ সালের আগস্ট মাসে অন্যান্য প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে একত্রিত হয়ে গোসিজদাত ‘অ্যাসোসিয়েশন অব স্টেট পাবলিশিং হাউস’ (রুশ ভাষায় সংক্ষেপে OGIZ) নাম রাখা হয়।

ঢাকা/তারা

সর্বশেষ

পাঠকপ্রিয়